কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ৩১ মার্চ, ২০১৯ এ ০৪:০৭ PM

কোলেস্টেরল মুক্ত ভোজ্যতেল ‘সূর্যমুখী’ (ফাল্গুন ১৪২৫)

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: ফাল্গুন সাল: ১৪২৫ প্রকাশের তারিখ: ৩১-০৩-২০১৯

তেল জাতীয় ফসলগুলোর মধ্যে সূর্যমুখী পৃথিবীর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। এ দেশের মাটি ও জলবায়ু সূর্যমুখী চাষের জন্য খুবই উপযোগী। রবি ও খরিফ উভয় মৌসুমে এর চাষ করা যায়। তবে রবি মৌসুমে এর চাষ করলে ফলন ভালো পাওয়া যায়।


পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে সূর্যমুখী তেলে কোনো কোলেস্টেরল নেই বললেই চলে এবং যথেষ্ঠ পরিমাণে লিনোলিক অ্যাসিড থাকায় এ তেল স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। দেশীয় তেল নিষ্কাশন যন্ত্রের সাহায্যে সহজেই সূর্যমুখীর বীজ থেকে তেল নিষ্কাশন করা যায়। সূর্যমুখীর পরিপক্ব বীজে ৪০-৪৫ ভাগ তেল সঞ্চিত থাকে।


তেল হিসেবে চাষ করলে একদিকে যেমন লাভবান হওয়া যায় তেমনি অন্যদিকে এর খৈল গবাদিপশু ও মাছের উৎকৃষ্ট খাদ্য এবং গ্রামাঞ্চলে এর কাণ্ড জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয়। শুধু তেল হিসেবে নয়, ইদানীং অনেকেই বাসাবাড়ির গেট, ছাদ বা ছাদের কার্নিশ, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মন্দির ও মাদ্রাসা সংলগ্ন মাঠ এবং শৌখিন ঊর্ধ্বতন অফিস প্রধানদের বাংলোর সামনে শোভাবর্ধনের জন্য ব্যাপকভাবে সূর্যমুখীর চাষ করে থাকে।


সব চাইতে বড় কথা হচ্ছে- দেশে ভোজ্যতেলের ঘাটতি রয়েছে যথেষ্ঠ পরিমাণে। তেলের ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি সুস্থ-সবল ও নিরোগভাবে বেঁচে থাকলে হলে কোলেস্টেরল মুক্ত ভোজ্যতেল সূর্যমুখীর চাষ বাড়াতে হবে।
 

চাষ পদ্ধতি
মাটি : প্রায় সব ধরনের মাটিতে সূর্যমুখীর চাষ করা যায়। তবে সুনিষ্কাশিত মাঝারি উঁচু দোআঁশ মাটি সূর্যমুখী চাষের জন্য উপযোগী। ইদানীং সেচ সুবিধা বরেন্দ্র অঞ্চলসহ চরাঞ্চলের বেলে দোআঁশ ও উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত মাটিতেও ব্যাপকভাবে এর চাষ হচ্ছে।

 

জাত: বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট চাষ উপযোগী ২টি জাত উদ্ভাবন করেছে। জাত দু’টো হচ্ছে- সূর্যমুখী কিরণী (ডিএস-১) এবং বারি সূর্যমুখী- ২।
 

বীজের পরিমাণ : বিঘা প্রতি সূর্যমুখী কিরণী (ডিএস-১) বীজ লাগে ১ - ১.৫ কেজি এবং বারি সূর্যমুখী-২ এর বিঘা প্রতি বীজ লাগে ১.৫ - ২ কেজি।
 

জমি তৈরি : বাণিজ্যিক ভাবে চাষের জন্য জমি গভীরভাবে ৪/৫টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে সমান করে নিতে হবে।
 

সার প্রয়োগ: জমি চাষের আগে বিঘাপ্রতি পচা গোবর বা আর্বজনা পচা সার ১-১.৫ টন ছিটিয়ে জমি চাষ করতে হবে। শেষ চাষে বিঘাপ্রতি ইউরিয়া সার ৮-১০ কেজি, ট্রিপল সুপার ফসফেট ২০-২৫ কেজি, মিউরেট অব পটাশ ২০-২৫ কেজি. জিপসাম ১৫-২০ কেজি, জিংক সালফেট  ২ কেজি ছিটিয়ে চাষের কাজ শেষ করতে হবে।


বীজ বপন : সূর্যমুখীর বীজ সারি করে লাগানো ভালো। সারি থেকে সারির দূরত্ব ১.৫-২ ফুট এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব হবে ৯ থেকে ১০ ইঞ্চি।


উপরি সার প্রযোগ : ভালো ফলনের জন্য কমপক্ষে ২ বার কিছু পরিমাণ রাসায়নিক সার উপরি প্রয়োগের ব্যবস্থা নিতে হবে। বীজ থেকে চারা গজানোর ২০-২৫ দিন পর ১ম বার এবং বীজ থেকে চারা গজানোর ৪০-৪৫ দিন দ্বিতীয় বার বিঘাপ্রতি ইউরিয়া সার ৮-১০ কেজি এবং তার সাথে এমওপি সার ৪-৫ কেজি একত্রে মিশিয়ে চারার গোড়ার চারিধারে কিছুটা দূর দিয়ে ছিটিয়ে ভালোভাবে মাটির  সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। প্রয়োজনে হালকাভাবে পানি সেচ দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে।
গাছ পাতলাকরণ: অতিরিক্ত গাছ থাকলে গাছ সুস্থ-সবল ও গাছের বাড়-বাড়তি ভালো হয় না, তাই চারা গজানোর ১৫-২০ দিন পর প্রতি গোছায় ১টি সুস্থ-সবল নিরোগ চারা/গাছ রেখে বাকি গাছগুলো তুলে ফেলে দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে।


আগাছা: আগাছা যে কোনো ফসলের প্রধান শত্রু। ক্ষেতে

আগাছা থাকলে ব্যবহার করা খাদ্যে ভাগ বসাই। গাছের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। রোগ ও পোকা-মাকড়ের আক্রমণ বেড়ে যায়। গাছের বাড়-বাড়তি কমে যায়। গাছ দুর্বল হয় এবং ফলন কমে যায়। তাই ক্ষেতে আগাছা দেখা মাত্রই তা দমনের ব্যবস্থা নিতে হবে। আগাছা দমনে নিড়ানি সাবধানে ব্যবহার করতে হবে যাতে নিড়ানির ধারালো আগায় গাছের শিকড় বা কা- কেটে বা ছিঁড়ে না যায়।
সেচ: সূর্যমুখী চাষের জন্য সেচ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাণিজ্যিক চাষে ভালো ফলনের জন্য কমপক্ষে ৩ বার সেচ দেয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। ১ম সেচ বীজ বপনের ২৫-৩০ দিন পর অর্থাৎ গাছে ফুল আসার আগে, ২য় সেচ বীজ বপনের ৪৫-৫০ দিন পর পুষ্পস্তবক তৈরির সময় এবং ৩য় বার সেচ দিতে হবে বীজ বপনের ৬৫-৭০ দিন পর অর্থাৎ বীজ পুষ্ট হওয়ার আগে।


রোগ-বালাই: সূর্যমুখী ক্ষেতে সাধারণত পাতা ঝলসানো ও শিকড় পচা রোগ হতে পারে। ক্ষেতে যাতে পানি না জমে সেদিকটা খেয়াল রাখতে হবে। আক্রমণ পরিলক্ষিত হলে নিকটস্থ কৃষিকর্মীর পরামর্শ মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
ফসল কর্তন ও ফলন : সূর্যমুখীর বীজ বোনার ৬৫-৭০ দিন

পর ফুলের বীজ পুষ্ট হওয়া শুরু হয়। সূর্যমুখী কাটার সময় হলে গাছের পাতা হলুদ হয়ে আসে এবং পুষ্পস্তবকসহ (মাথা) গাছগুলো নুয়ে পড়ে। বীজ কালো রং ধারণ করে এবং দানাগুলো পুষ্ট ও শক্ত হয়। মৌসুম অনুসারে ফসল পরিপক্ব হতে ৯০-১১০ দিন সময় লাগে।
 

ফলন: মৌসুম অনুসারে বিঘাপ্রতি গড় ফলন ৬-৮ মণ পর্যন্ত হতে পারে।
তেল নিষ্কাশন: সূর্যমুখীর বীজ দেশীয় যন্ত্রে নিষ্কাশন করলে শতকরা ২৫ ভাগ এবং এক্সপোলারে নিষ্কাশন করলে শতকরা ৩০-৩৫ ভাগ পর্যন্ত তেল পাওয়া যেতে পারে।

 

বীজ সংরক্ষণ : বীজ সংরক্ষণের পূর্বে অপরিপক্ব ও ভাঙা বীজগুলো বাছাই করে ফেলে দিতে হবে। সুস্থ-সবল নিরোগ ও ঝকঝকে পরিষ্কার বীজ ভালোভাবে রোদে শুকিয়ে ঠাণ্ডা করে নিতে হবে। প্রতি ৩০ কেজি বীজের জন্য ২৫০ গ্রাম ক্যালসিয়াম কার্বাইডসহ ভেতরে পলিথিন দিয়ে চটের বস্তা, মোটা পলিথিন ব্যাগ বা টিনের ড্রামে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত পরামর্শের জন্য নিকটস্থ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উপজেলা কৃষি অফিস কিংবা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে।

 

তুষার কুমার সাহা

এ,আই, সিও, কৃষি তথ্য সার্ভিসের আঞ্চলিক কার্যালয়, রাজশাহী, মোবা : ০১৭১৬৪৩৯০৮৩,tushar521964@gmail.com

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন