কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ এ ০৬:০০ PM

কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে গম ও ভুট্টা চাষের গুরুত্ব ও সম্ভাবনা

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: পৌষ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৪-১২-২০২৫

কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে গম ও ভুট্টা চাষের গুরুত্ব ও সম্ভাবনা
মুন্সী আবু আল মো. জিহাদ
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি উৎপাদন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি থেকে শুরু করে দারিদ্র্য দূরীকরণ সহ খাদ্য নিরাপত্তায় এই খাতের অবদান অনস্বীকার্য। এছাড়া ভৌগোলিক ভাবে বাংলাদেশের আবহাওয়া কৃষিকাজের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র তথ্যমতে, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের জিডিপির চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী কৃষিখাতের অবদান ১১.৫৫ শতাংশ। এদেশের প্রধান প্রধান খাদ্যশস্যের (ধান, গম ও ভুট্টা) সিংহভাগই উৎপাদিত হয় রবি মৌসুমে। তবে কৃষি গবেষকদের মতে, টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রধান ফসল ধানের উৎপাদন ঠিক রেখে অন্যান্য ফসল, যেমন গম ও ভুট্টার আবাদ বৃদ্ধি করতে হবে। কৃষিপণ্যের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে ও আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে বহির্বিশ্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রপ্তানি করতে পারাটা হবে কৌশলগত উন্নয়ন। 
আমাদের খাদ্যশস্যের চাহিদার তালিকায় ধানের পরপরই গমের অবস্থান। সময়ের সাথে সাথে মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের কারণে ক্রমাগতই গমের চাহিদা বেড়ে চলেছে। খানা আয়-ব্যয় জরিপ (HIES)  অনুযায়ী, গমের ব্যবহার ছিল ২০২২ সালে ২২.৯ গ্রাম। উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত ভোক্তা পর্যন্ত সকল পর্যায়ে গমের বহুমুখী ব্যবহার পরিলক্ষিত হচ্ছে। এছাড়াও বেকারি শিল্পে গমের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। গমের আটা, ময়দা থেকে তৈরি কেক, বিস্কুট, পাউরুটি ইত্যাদি শুধু দেশের বাজারে নয় বরং আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি হচ্ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য মতে, বিশ্বের যে কয়টি দেশে সবচেয়ে দ্রুতহারে গমের আমদানি বাড়ছে, তার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। বাংলাদেশ সহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই ইউক্রেন থেকে গম আমদানির উপর নির্ভরশীল। 
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা, ২০২৪ এর তথ্যমতে গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে গমের উৎপাদন হয়েছে ১১ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন যেখানে সারাবছরে গমের চাহিদা  মোটামুটি ৭০ থেকে ৭৫ লাখ  মেট্রিক টন। বৈশ্বিক উষ্ণতা, জলবায়ুর পরিবর্তন, গমের ব্লাস্ট রোগ, আবাদী জমি হ্রাস,  অনিয়মিত বাজারদর প্রভৃতি কারণে গমের দেশীয় উৎপাদন ১০-১২ লাখ টনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে যাচ্ছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রমহ্রাসমান গমের আবাদি জমি সম্প্রসারণ করে গমের উৎপাদন বৃদ্ধি করাটাই বর্তমানে মূখ্য চ্যালেঞ্জ। এ সংকট উত্তরণে গম উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে উৎপাদনকে ত্বরান্বিত করা যেতে পারে। উত্তরাঞ্চলে গম চাষের উপযোগী শীতের আমেজ অপেক্ষাকৃত বেশি সময় থাকে বিধায় উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক ইত্যাদি সঠিক সময়ে সরবরাহ বৃদ্ধি বৃদ্ধিকরণ করণ ও সর্বোচ্চ পরিমাণ জমি চাষের আওতায় আনয়ন বাঞ্ছনীয়। ইতোমধ্যে অপ্রচলিত ও পতিত জমি যেমন পাহাড়ি এলাকা, চর, হাওড়, বরেন্দ্র ও দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকা ইত্যাদি গম চাষের আওতায় আনা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক ঘাতসহিষ্ণু (রোগবালাই, তাপ, খরা, লবণাক্ততা) বিভিন্ন গমের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ফলে গমের উৎপাদনশীলতা কিছুটা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমসাময়িককালে উদ্ভাবিত গমের ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী জাত বারি গম ৩৩, বিডাব্লিউএমআরআই গম ৩, বিডাব্লিউএমআরআই গম ৫। ব্লাস্ট রোগে গমের শীষে ছত্রাকের আক্রমণের কারনে আক্রান্ত স্থানে ধূসর কালচে রঙের দাগ পড়ে ফলে শীষের উপরের অংশ শুকিয়ে সাদা হয়ে যায় এবং দানা অপুষ্ট ও বিবর্ণ রঙ ধারণ করে। এজন্য গম বীজ বপনের উপযুক্ত সময়ে (১৫-৩০ নভেম্বর) বীজ বপন করতে হবে যেন শীষ বের হওয়ার সময় বৃষ্টি বা বেশি তাপমাত্রা পরিহার করা যায়। এছাড়াও বপনের পূর্বেই ছত্রাকনাশক (কার্বোক্সিন ৩৭.৫% ও থিরাম ৩৭.৫%) দ্বারা প্রতি কেজি বীজে ৩ গ্রাম হারে বীজ শোধন করে নিতে হবে। তবে প্রতিরোধক ব্যবস্থা হিসেবে শীষ বের হওয়ার সময় একবার ও এর ১২-১৫ দিন পরে আরেকবার ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে। এক্ষেত্রে টেবুকোনাজল ৫০%+ ট্রাইফ্লক্সিস্ট্রোবিন ২৫%, ৬ গ্রাম হারে প্রতি ৫ শতাংশ জমিতে ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা বেশ ফলপ্রসূ। এ সকল প্রযুক্তি কৃষকদের পুনরায় গম চাষে আগ্রহী করে তুলছে। এছাড়াও গম ও ভুট্টার স্থানীয় উৎপাদন বাড়িয়ে তথা আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে কৃষি খাতের আমদানি ব্যয় কমাতে গম ও ভুট্টা চাষিদের জন্য ১ হাজার কোটি টাকার ঋণ সুবিধা চালু করার ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক (সূত্রঃ দৈনিক জনকণ্ঠ, ৮ আগস্ট ২০২২)। সাধারনভাবেই বাংলাদেশের আবাদি জমি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে তদুপরি শস্য প্রতিযোগিতা গমের আবাদি জমিকে গ্রাস করে নিচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের দ্বিতীয় প্রধান এই শস্যের আবাদি জমির সংকোচন রোধকল্পে ক্রপ জোনিং বা ভূমির উপযোগিতা ভিত্তিক ফসল অঞ্চল নির্ধারণ এবং গম চাষীদের ক্ষতি এড়াতে উৎপাদন খরচ বিবেচনা করে ন্যুনতম বাজারদর বেঁধে দেওয়া স্বস্তিদায়ক সমাধান হতে পারে।   
ভুট্টা বাংলাদেশের তৃতীয় প্রধান দানাদার শস্য। তবে চাহিদার বিচারে এখনও মানুষের খাদ্যের তুলনায় পশু খাদ্যের হার খানিকটা বেশীই দেখা যায়। দেশে প্রতিবছরই ক্রমাগতভাবে ভুট্টা উৎপাদন বাড়ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুসারে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভুট্টা উৎপাদন বেড়ে ৬৮.৮৪ লাখ টন ছাড়িয়ে যায়। এ সময়ে আবাদি জমির পরিমাণ ২৬ শতাংশ বেড়ে হয় ৬ লাখ ৪২ হাজার হেক্টর। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী আরও দেখা যায় গত ছয় বছরে ভুট্টার আমদানি প্রায় ৬৫ শতাংশ কমে এসেছে। বর্তমানে দেশে ভুট্টার বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ টন। যার প্রায় ৯০ শতাংশ ই দেশজ উৎপাদন দ্বারা মেটানো সম্ভবপর হচ্ছে। এমনকি যেসব জমিতে সচারচর ধান, গম, তামাক চাষ হতো সেসব জমিতেও বর্তমানে ভুট্টা চাষ চোখে পড়ার মত। এছাড়াও ভুট্টার সাথী ফসল হিসেবে বাঁধাকপি, লালশাক, মেথিশাক, মরিচ ইত্যাদি চাষ করেও অধিক মুনাফা অর্জন করছেন উদ্যমী কৃষকরা। বলাবাহুল্য, ভুট্টার আবাদ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায়  উত্তরবঙ্গের প্রায় সকল জেলাসহ চুয়াডাঙ্গা, জামালপুর সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভুট্টার আবাদি জমি বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে বরিশাল তথা উপকূলীয় অঞ্চলে ভুট্টার আবাদ খুব ই নগণ্য। সম্প্রতি দেশে বাণিজ্যিক  কৃষিখামার (গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, মৎসশিল্প ইত্যাদি) বৃদ্ধি পাওয়ায় খামারের সারা বছরের খাদ্য চাহিদা মেটাতে ভুট্টার ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে, প্রসারিত হচ্ছে ফিডমিলের ব্যবসা। ভুট্টার আটা বা ময়দা খাদ্য হিসেবে যেমন সরাসরি ব্যবহার করা যায় তেমনই এ থেকে খই, কর্ণফ্লেক্স ইত্যাদি তৈরি করা যায়। এছাড়াও অপরিপক্ব ভুট্টা পুড়িয়ে খাওয়া এবং এর বীজ থেকে ভোজ্য তেল ,সাবান, রঙ, বার্নিস প্রভৃতি তৈরি দিন দিন প্রচলিত হচ্ছে। তবে ভুট্টার রসালো কা-, পাতা এবং এগুলো থেকে তৈরি সাইলেজ গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। সে লক্ষ্যে উচ্চ ফলনশীল ভুট্টার জাত ও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিডাব্লিউএমআরআই)। ফসল বহুমূখীকরণ, আধুনিকায়ন ও বাজারের চাহিদাভিত্তিক শস্য উৎপাদন পুরো কৃষিখাতের জন্য মাইলফলক হতে পারে। 
আমদানি নির্ভর কৃষিপণ্য যেমন গম ও ভুট্টার স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুণগত মানসম্পন্ন বীজ প্রাপ্যতা অত্যাবশ্যকীয়। বাজারে ভেজাল বীজের কারণে ফসলের কাক্সিক্ষত উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষত ভুট্টার বীজ অধিকাংশই বাইরের দেশ থেকে আনা হয় কোন মান নিয়ন্ত্রণ ব্যাতিরেকেই। এ বিষয়ে সরকারের যথাযথ হস্তক্ষেপ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য। তবে গুণগত মান সম্পন্ন বীজ ব্যবহারের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি তথা দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করতে সম্প্রতি ধান, গম ও ভুট্টার উন্নত বীজ উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়ানো এবং কৃষক পর্যায়ের বিতরণের তৃতীয় পর্যায়ের একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয় যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। দেশের বিদ্যমান গম ও ভুট্টার প্রকৃত উৎপাদনশীলতা এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা যথাযথ ভাবে নিরূপণ করতঃ বাজার ভারসাম্য বজায় রাখা অতীব জরুরি। চাহিদা অনুযায়ী গম ও ভুট্টা উৎপাদিত হলে আমদানি ব্যয় হ্রাস পাবে, অর্থনীতি হবে শক্তিশালী। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির চাকা বেগবান করতে গম ও ভুট্টার উৎপাদন বৃদ্ধিকল্পে বিদ্যমান সমস্যা, ঝুঁকি, প্রতিবন্ধকতা ও  সম্ভাবনা সংশ্লিষ্ট আর্থ-সামাজিক গবেষণা জোরদারকরণ ও এসকল গবেষণার পৃষ্ঠপোষকতা প্রভূত ফলপ্রসূ কর্মপরিকল্পনার অংশবিশেষ হতে পারে।

লেখক : বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট, নশিপুর, দিনাজপুর, মোবাইল : ০১৬৮০৩২৬০২৫, ই-মেইল :zihad327@gmail.com

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন