কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ২১ আগস্ট, ২০২৩ এ ০৩:৩২ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: ভাদ্র সাল: ১৪৩০ প্রকাশের তারিখ: ২১-০৮-২০২৩
কৃষিপণ্য থেকে নিরাপদ ফ্রাইড চিপ্স তৈরির ভ্যাকুয়াম
ফ্রাইং প্রযুক্তি
১ ড. মো: গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী ২মো: হাফিজুল হক খান
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কৃষি উৎপাদন সমগ্র বিশে^র রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃত। কৃষি আমাদের গর্ব করার মতো বিষয় হিসেবে প্রাধান্য পাচ্ছে। খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় কৃষক ও কৃষি পেশার সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গের শ্রম ও নিরলস প্রচেষ্টা এবং কৃষিবান্ধব সরকারের যথাযথ উদ্যোগ উন্নয়নের মহাসড়কে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কৃষির জয়গান এখন সর্বত্র। তা সত্ত্বেও কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হওয়া, সংগ্রহোত্তর ক্ষতির পরিমাণ কমানো ও প্রক্রিয়াজাত শিল্পকে এগিয়ে নেয়ার চ্যালেঞ্জ রয়ে গিয়েছে। দেশে বছরব্যাপী কৃষিপণ্যগুলোর কিছু সরাসরি খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আবার কিছু ফসল প্রক্রিয়াজাত করে খাবারের কাঁচামাল ও সংরক্ষণের মাধ্যমে বহুবিধ খাদ্যদ্রব্য বছর জুড়ে তৈরি করা সম্ভব। যেমন- মচমচে চিপ্স অন্যতম একটি প্রস্তুতকৃত খাদ্য যা বিভিন্ন ফসল থেকে তৈরি করা হয় এবং এর চাহিদা সমগ্র পৃথিবী জুড়ে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন গণজমায়েত এ অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সাধারণত সরাসরি তেলে ভেজে সরবরাহ করছে আবার বাসায় তৈরিকৃত চিপসপণ্য মোড়কজাত করেও বিক্রয় করছে।
প্রচলিত পদ্ধতিতে সাধারণত কোন কাঁচা ফল বা সবজির টুকরো বা ফালিকে তেলে কিছুক্ষণ রেখে ফ্রাই করে পণ্যটি পুরো মচমচে করা হয়। এখানে পণ্যকে ভাজার জন্য তেলকে তাপ পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয় যা খাবারের সরাসরি সংস্পর্শে আসে।
ভ্যাকুয়াম ফ্রাইং একটি উন্নত ও বাণিজ্যিক পদ্ধতি যেখানে কম তাপমাত্রা ও চাপে ভাজা চিপস জাতীয় পণ্যের গুণগত মান বজায় থাকে এবং এটি স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ বিধায় বিভিন্ন ফল ও সবজির চিপস পণ্য তৈরিতে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।
সাধারণত যে সকল ফল বা সবজি বেশি মিষ্ট হয় বা চিনির পরিমাণ অধিক থাকে সে সকল পণ্য ১৫০-১৮০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বা তারও অধিক তাপমাত্রায় তেলে ভাজা হলে ভাজা পণ্য বাদামি বর্ণ ধারণ করে। গবেষণা ফলাফলে দেখা যায় যে, তেলের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ না করার ফলে ভাজা চিপস পণ্যে মাত্রাতিরিক্ত কারসিনোজেনিক উপাদান এক্রাইলামাইড উৎপন্ন হয়, যা মানবদেহে ক্যান্সার সৃষ্টির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এ গবেষণা পরিচালনাকালে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহকৃত সহজলভ্য ভাজা আলুর চিপস রেজিস্টারকৃত ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃত গবেষণাগারে পরীক্ষা করার পর দেখা যায় যে, আলু কেটে রৌদ্রে শুকিয়ে প্রচলিত পদ্ধতিতে তেলে ভাজা হলে মচমচে আলুর চিপসে ৫৬৩-১০১৮০ মাইক্রোগ্রাম/কেজি এক্রালামাইড পাওয়া যায়, যা প্রতিদিন আমাদের শরীরের সর্বনিম্ন গ্রহণযোগ্য মাত্রার ৩-৫০ গুণ বেশি (টিডিআই ২.৬ মাইক্রোগ্রাম/কেজি; একজন মানুষের গড় ওজন ৭০ কেজি হিসেবে ১৮২ মাইক্রোগ্রাম/কেজি)। উন্নত দেশে বাণিজ্যিক উপায়ে কৃষিপণ্য বিশেষ করে উদ্যানতাত্ত্বিক ফসল, কন্দাল ও অন্যান্য ফসল থেকে চিপ্স তৈরিতে ভ্যাকুয়াম ফ্রাইং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। ইহা স্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। নিরাপদ ও গুণগতমান অক্ষুণœ রেখে উৎকৃষ্টমানের মচমচে চিপ্স পণ্য তৈরিতে সহায়তা করে।
বাংলাদেশের ¯œ্যাক্স শিল্পে ভ্যাকুয়াম ফ্রাইং প্রযুক্তির ব্যবহার স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনায় নিরাপদ ভাজা চিপ্স (ফ্রাইড পণ্য) তৈরি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এ পণ্যের ব্যাপক সম্ভাবনা দেশে যেমন রয়েছে তেমনি বিদেশে রপ্তানিতে রয়েছে। এটি একদিকে যেমন পরিবেশবান্ধব অন্যদিকে নিরাপদ ও উচ্চমান সম্পন্ন ভাজা চিপ্স তৈরিতে একটি আদর্শ পদ্ধতি হিসেবে সারা বিশে^ সমাদৃত। এ প্রযুুক্তি ব্যবহার করে নির্ধারিত তাপমাত্রা ও নিদিষ্ট সময় অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের ফলমুল ও সবজি যেমন : আম, কাঁঠাল, আনারস, কলা, আলু, মিষ্টিআলু, গাজর, পেঁপে, মানকচু, কাসাভা ইত্যাদি থেকে বহুবিধ মচমচে ভাজা চিপ্স অনায়াসে প্রক্রিয়াজাত করা যায়।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই) এর পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ কর্তৃক উদ্ভাবিত স্বল্পমূল্যের ভ্যাকুয়াম ফ্রাইং মেশিন ও ডি-ওয়েলিং মেশিন কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন প্রকার মচমচে চিপ্স পণ্য তৈরির মাধ্যমে নিঃসন্দেহে পারিবারিক আয় বৃদ্ধি ও দারিদ্র বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সহায়তা করবে। বিএআরআই উদ্ভাবিত মেশিন ব্যবহারের মাধ্যমে আলু স্লাইচ বা টুকরো সরাসরি শুকানো ছাড়াই ভাজা যায়, উৎকৃষ্ট বর্ণ ধারণ করে এবং সমভাবে চিপ্স মচমচে হয়। এছাড়াও গবেষণায় দেখা যায় যে, মচমচে ভাজা আলুর চিপ্সে এক্রালামাইডের পরিমাণ প্রায় ৭৪-৮১ মাইক্রোগ্রাম/কেজি যা এক জন মানুষের শরীরের ওজন অনুযায়ী সর্বনিম্ন গ্রহণযোগ্য মাত্রার অর্ধেক পরিমাণ। উল্লেখ্য যে, বারি ভ্যাকুয়াম ফ্রাইং যন্ত্রটির মূল্য আমদানিকৃত যন্ত্রের তুলনায় বহুলাংশে সাশ্রয়ী। এটি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের ব্যবহার উপযোগী। যন্ত্রটি আকারে ছোট ও সহজেই যে কোন স্থানে স্থানান্তরিত করা যায় এবং অল্প জায়গায় স্থাপন করা যায়। ভ্যাকুয়াম ফ্রাইং যন্ত্রটির পরিচালনা পদ্ধতি অতি সহজতর। তৈরিকৃত ভ্যাকুয়াম ফ্রাইং যন্ত্রটি স্থানীয় যেকোন ওয়ার্কশপে তৈরি করা যাবে এবং স্বল্প খরচে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করা যায়।
ডি-ওয়েলিং এর মাধ্যমে তৈরিকৃত চিপ্স থেকে ১৫ ভাগের অধিক পরিমাণে তেল নিংড়ানো যায় ফলে এটি অল্প চর্বিযুক্ত হয়। বাজারে যেসব ভাজা চিপ্স পণ্য পাওয়া যায় তার অধিকাংশই ক্রেকার্স পণ্য। কিন্তু ভ্যাকুয়াম প্রযুক্তি ও প্রটোকল ব্যবহার করে প্রকৃত ফেশ-কাট (ৎবধষ ভৎবংয-পঁঃ) ফ্রাইড বা ভাজা চিপস তৈরি করা যায়। গবেষণায় পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে যে, ভ্যাকুয়াম ফ্রাইং মেশিনের মাধ্যমে আলু, কলা, কাঁঠাল, গাজর, আনারস, আম, মানকচু থেকে চিপ্স তৈরিতে সাধারণত ১০০-১২০ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড তাপমাত্রা প্রয়োজন হয় এবং ৫ মিনিট থেকে ৬০ মিনিট পর্যন্ত তেলে ডুবিয়ে ভাজতে হয়। ফল বা সবজির টুকরোর পরিমাণ, পুরুত্ব ও কোষের ধরনের উপর ভিত্তি করে চিপ্স ভাজার সময় নির্ধারণ করা হয়। প্রচলিত পদ্ধতিতে মচমচে চিপ্সের উপরিভাগে অধিক পরিমাণ তেল লেগে থাকে বা দেখা যায় যা খাওয়ার সময় আমাদের শরীরের ভেতরে প্রবেশের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। অনেক সময় টিস্যু পেপার, কাগজ বা অন্যকোন দ্রব্যাদি ব্যবহার করে চিপ্সের উপরিভাগের লেগে থাকা তেল মুছে বা বের করে নেয়ার চেষ্টা করা হয়, যা কখনই স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। আবার প্রচলিত পদ্ধতিতে তৈরিকৃত চিপ্সের সংস্পর্শে থাকা অতিরিক্ত তেল সংরক্ষণ সময় কমায় এবং কিছুদিন পরে প্যাকেটে রাখা চিপ্সে তেলের দুর্গন্ধ (ৎধহপরফ) তৈরি করে। গবেষণায় লক্ষ্য করা হয়, ফল বা সবজির টুকরো ভাজার পরে মচমচে চিপ্স ১-২ মিনিট ডি-ওয়েলিং করলে চিপ্স থেকে প্রায় ১০ ভাগ তেল নিষ্কাশন বা বের হয়ে আসে যা পুনরায় চিপ্স তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। ফয়েল প্যাকেটে মচমচে চিপ্স রেখে যথাযথভাবে নাইট্রোজেন ফ্রাশ করলে সংরক্ষণকৃত চিপ্স ৬ মাসের অধিক গুণগতমান বজায় রেখে সংরক্ষণ করা যায়। কাজেই আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখতে নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ অপরিহার্য। এ বিবেচনায় মুখরোচক খাদ্য পণ্য হিসেবে কৃষিজাত দ্রব্য দিয়ে তৈরিকৃত ভাজা চিপ্সকে নিরাপদ করাও সময়ের দাবি। সর্বোপরি ভাজা চিপ্সকে নিরাপদ ও পুষ্টিগুণ বজায় রেখে সর্বত্রই গ্রহণযোগ্য করতে ভ্যাকুয়াম ফ্রাইং প্রযুক্তিকে ব্যবহার করার কোন বিকল্প নেই।
লেখক : ১ ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ২মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ, বিএআরআই, গাজীপুর। মোবাইল : ০১৭১২২৭১১৬৩, ই-মেইল : ferdous613@gmail.com