কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫ এ ০৬:১০ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: অগ্রহায়ণ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৬-১১-২০২৫
কৃষিতে নতুন মাত্রা আখা
চুলার বায়োচার
ড. সালমা লাইজু১ সেখ জিয়াউর রহমান২
বায়োচার এক ধরনের চারকল বা কয়লা যা পাইরোলাইসিস (সীমিত অক্সিজেনের উপস্থিতিতে বা অক্সিজেনবিহীন তাপের) পদ্ধতির সাহায্যে বিভিন্ন জৈব পদার্থ, যেমন-ধানের তুষ, কাঠের গুঁড়া, কাঠ, মুরগির বিষ্ঠা এমনকি নালা-নর্দমার বর্জ্য পদার্থ, আবর্জনা ৩০০-৬০০০ সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পুড়িয়ে তৈরি করা হয়। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় বায়োচার খুবই কার্যকরী। যেখানে মাটিতে জৈব উপাদান থাকার কথা শতকরা ৫ ভাগ, সেখানে বিভিন্ন অঞ্চলের মাটি পরীক্ষা করে তা পাওয়া গেছে শতকরা ১ ভাগের কম থেকে ২ ভাগের মধ্যে। মাটির জীবন ফিরিয়ে আনতেই এই উদ্যোগ। বায়োচার পরিবেশ সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করে, মাটির স্বাস্থ্য উন্নত করে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সহায়তা করে।
সিসিডিবির ডেভেলপমেন্ট পলিসি অ্যাডভাইজার এবং বায়োচার প্রজেক্টের টিম লিডার এম মাহাবুবুল ইসলাম এবং সমীরণ বিশ^াস (কানাডিয়ান বিজ্ঞানী জুলিয়ানের সমন্বয়ে) উদ্ভাবন করেছেন আখা (কৃষি বান্ধব চুলা), এতে রান্নার পাশাপাশি উৎপাদিত হয় বায়োচার, যা দেশে নতুন। আখা (গ্যাসোফায়ার) এমন একটি রান্নার চুলা যাতে কাঠ, খড়-কুটা, ডাল, পাতা, ধানের তুষ, কাঠের গুঁড়া, কচুরিপানা, গোবর ইত্যাদি ব্যবহার করে পাইরোলাইসিস পদ্ধতিতে বায়োচার (কয়লা) তৈরি করা হয়।
বায়োচারের পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা নিচে আলোচনা করা হলো :
কার্বন অপসারণ : বায়োচার তৈরির প্রক্রিয়ায় কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুম-ল থেকে অপসারণ করে মাটির সাথে মিশে যায়, যা কার্বন অপসারণ এবং কার্বন ধরে রাখার একটি কার্যকর উপায়।
মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন : বায়োচার মাটিতে যোগ করার ফলে মাটির উর্বরতা বাড়ে, জল ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং মাটির অম্লতা হ্রাস পায়। এটি উদ্ভিদের বৃদ্ধি এবং ফলন বৃদ্ধিতে সহায়ক।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতি : কৃষি ও বনজ বর্জ্যকে বায়োচারে রূপান্তর করে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারত, তাকে কাজে লাগানো যায়। এর ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতি ঘটে এবং পরিবেশ দূষণ হ্রাস পায়।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা : বায়োচার কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করে এবং কার্বন সংরক্ষণে সাহায্য করে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মাটির কার্বন বৃদ্ধি : বায়োচার মাটিতে কার্বন ধরে রাখে, যা মাটির কার্বন সংরক্ষণের পরিমাণ বৃদ্ধি করে এবং মাটির উর্বরতা বাড়ায়।
মাটির অণুজীবের উন্নতি : বায়োচার মাটির উপকারী অণুজীবের জন্য একটি আবাসস্থল সরবরাহ করে, যা মাটির স্বাস্থ্য এবং উর্বরতা বৃদ্ধিতে সহায়ক।
দূষণ হ্রাস : বায়োচার ব্যবহারের ফলে রাসায়নিক সারের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পায়, যা পরিবেশ দূষণ কমাতে সহায়ক।
বায়োচার তৈরি উপকরণ
যেসব এলাকায় ফলমূল বেশি উৎপাদিত হয় সেসব এলাকায় বায়োচার তৈরির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে যেমন-টাঙ্গাইলের মধুপুরে কলার অবশিষ্টাংশ ও আনারসের অবশিষ্টাংশ প্রচুর পরিমাণে রাস্তার পাশে স্তূপকৃত অবস্থায় পড়ে থাকে, যা অহেতুক নষ্ট হচ্ছে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এসব উচ্ছিষ্ট দ্রব্য সংগ্রহ করে আমরা বাণিজ্যিকভাবে বায়োচার উৎপাদন করতে পারি। বায়োচার তৈরির প্রধান উপাদান হলো বিভিন্ন ধরনের জৈব পদার্থ। এই পদার্থগুলোকে অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে উচ্চ তাপে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে বায়োচার তৈরি করা হয়। প্রধান উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে কাঠের গুঁড়া, ধানের তুষ, বিভিন্ন ফসলের অবশিষ্টাংশ, পশুর সার, পৌরসভার বর্জ্য এবং অন্যান্য কার্বন সমৃদ্ধ জৈব পদার্থ।
কৃষিতে বায়োচারের ভূমিকা
বায়োচার জমিতে একবার ব্যবহার করলে দীর্ঘ সময় আর ব্যবহার করতে হয় না। বায়োচার কার্বনকে বছরের পর বছর মাটিতে ধরে রাখে, ফলে বায়োচার মাটিতে প্রায় ১০০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয় ও মাটির উর্বরা শক্তি, পানির ধারণ ক্ষমতা, সারের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে। বায়োচার মাটিতে গাছের খাদ্য উপদানগুলো ধরে রাখে, মাটিতে লবণাক্ততা ও খরার প্রভাব এবং মাটির অম্লত্ব দূর করে। মাটিকে সংশোধন করে, বায়োচার মাটিতে অবস্থানকারী ছোট ছোট অণুজীবকে সক্রিয় করে তোলে। পরিবেশবান্ধব এই বায়োচার পদ্ধতি ব্যবহারে জমির ফলন দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। বায়োচার ব্যবহারে রাসায়নিক সার ও পানি সেচ কম দিতে হয়। ফলে কৃষকের খরচ কমে যায়। ধান, আলু, বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষে ও এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশে আখা চুলা তৈরি হয়। কেউ চাইলে নিজেও তৈরি করতে পারবে। সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করলে ২০০০-২২০০ টাকা খরচ হবে। মাটি দিয়ে ছাচগুলো তৈরি করলে খরচ আর ও কম পড়বে। উল্লেখিত বেসরকারি সংস্থাগুলোর সাথে যোগাযোগ করলে ও কেনা যাবে। আমাদের দেশের তরুণসমাজকে যদি এ কাজে যুক্ত করা করা যায় তাহলে বেকার সমস্যার সমাধান হবে, পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আখায় তাড়াতাড়ি রান্না হয়, খড়ি কম লাগে; ধোঁয়া হয় না, হাঁড়ি-পাতিল কালি হয় না; যে জ¦ালানি পোড়ানো হয়, রান্না শেষে তার চার ভাগের এক ভাগ বায়োচার পাওয়া যায়; আখায় ধোঁয়া নির্গত না হওয়ায় ব্যবহারকারীর স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি হয় না এবং শতকরা ৩০ ভাগ জ¦ালানি সাশ্রয় হয়।
বায়োচার বিক্রি করে ও আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যায়। এই চুলা কিনে রান্নার কাজ করা যাবে এবং প্রাপ্ত পোড়ানো কয়লা বায়োচার হিসেবে নিজ জমিতে ব্যবহার করতে পারবে। ১ কেজি কাঠ জ¦ালানি হিসেবে ব্যবহার করে ৮০০ গ্রাম কয়লা পাওয়া যায়। এই কয়লা কার্বন সমৃদ্ধ এবং মাটিতে একটি মিডিয়ার মতো কাজ করে।
বায়োচার প্রয়োগ পদ্ধতি
আখা চুলায় বায়োচার উৎপাদন করা যায়। এই চুলা হতে পোড়ানো কাঠ-কয়লা গুঁড়া করে ক্ষেতে ছিটিয়ে দিতে হয়। অন্য জৈবসারের সাথে মিশিয়ে ও জমিতে দেয়া যায়। মাটির জৈব পদার্থ বৃদ্ধিতে বায়োচার অতীব গুরুত্বপূর্ণ, মাঠপর্যায়ে বায়োচার জনপ্রিয় করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের কৃষি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। এক দিকে জলবায়ু পরিবর্তন ও মাটির উর্বরতা হ্রাস অন্যদিকে টেকসই কৃষির প্রয়োজনীয়তা-এই দুই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বায়োচার হতে পারে এক কার্যকরী সমাধান। এটি শুধু ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিই করে না বরং কৃষকের আয় বাড়ায়, পরিবেশ রক্ষা করে এবং সর্বোপরি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
লেখক : ১অতিরিক্ত পরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ময়মনসিংহ অঞ্চল, ময়মনসিংহ ২সহকারী তথ্য অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, আঞ্চলিক কার্যালয়, ময়মনসিংহ। মোবাইল : ০১৭১৬৭৮৮৭৫৫,