কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২২ এ ০৫:৪৮ PM

এফএও’র Four Betters ক্ষুধামুক্ত বিশ্বের স্বপ্ন বাস্তবায়ন

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: কার্ত্তিক সাল: ১৪২৯ প্রকাশের তারিখ: ১৬-১০-২০২২

এফএও’র Four Betters
ক্ষুধামুক্ত বিশ্বের স্বপ্ন বাস্তবায়ন
মোঃ এনায়েত উল্ল্যাহ রাফি
উন্নয়নের সবধরনের মাপকাঠিতে কিছুদিন আগেও মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক চাহিদাপূরণকে অগ্রাধিকার দেয়া হতো। তৃতীয় বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য ছিল, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্ত একটি দেশ বিনির্মাণ। তবে এ অবস্থার পরিবর্তন এসেছে। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে ২০২২ সালের বাংলাদেশ ক্রমশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচকে এগিয়েছে, স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে চলেছে। বাংলাদেশ বর্তমানে প্রধান দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। সেকারণেই মৌলিক চাহিদা হিসেবে সবার জন্য খাদ্য সংস্থানের পাশাপাশি, সবার জন্য নিরাপদ, পুষ্টিকর, গুণগত  মানসম্পন্ন খাদ্য নিশ্চিত করার বিষয়টি এখন আরও বেশি গুরুত্বের সাথে আলোচিত হচ্ছে। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অন্যতম অভীষ্টসমূহ হলো কল্যাণমুখী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় কাউকে পশ্চাতে না রেখে  সবার জন্য সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমতার ভিত্তিতে সকলের জন্য খাদ্য সহজলভ্য করা ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন।
জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রসপেক্ট, ২০২২ অনুযায়ী চলতি বছরের শেষে পৃথিবীর জনসংখ্যা ৮ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে। এই অতিরিক্ত  জনসংখ্যার সাথে খাদ্যের চাহিদাও বাড়বে বহুগুণ। সেই সাথে সবার জন্য গুণগত মানসম্পন্ন খাদ্য সরবরাহ আর পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠবে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচী (ডঋচ) এর পরিসংখ্যান অনুসারে ২০১৯-২০২২ এই তিন বছরে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের শিকার মানুষের সংখ্যা ২১০ মিলিয়ন থেকে বেড়ে ৩৪৫ মিলিয়নে পৌঁছেছে। প্রতিদিন প্রায় ৮২৮ মিলিয়ন মানুষ অভুক্ত অবস্থায় রাতে ঘুমাতে যায়। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, কোভিড ১৯ বৈশ্বিক মহামারীর প্রকোপে, মানব সৃষ্ট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অসমতা (ক্রমবর্ধমান বৈষম্য), লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং নানাবিধ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক আগ্রাসনের কারণে বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি সত্ত্বেও বেড়েছে খাদ্য ও পুষ্টি সংকট এবং কমছে উর্বর কৃষি জমির পরিমাণ, সেই সাথে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, বিশ্ববাজারে মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি কমছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা।
বিগত তিন বছরে (২০১৯-২০২২) বিশ্বব্যাপী অপুষ্টির শিকার জনসংখ্যা ৮৩ কোটিতে উন্নীত হয়েছে, যা বর্তমান বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় এক দশমাংশ। এশিয়া মহাদেশে প্রায় দুই তৃতীয়াংশ মানুষ পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবের সম্মুখীন। এছাড়াও উন্নয়নশীল দেশসমূহে প্রতি বছর জন্ম নেয়া প্রতি ছয়জন শিশুর মধ্যে একজন অপুষ্টিজনিত কারণে মারা যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী এক চতুর্থাংশ শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবে সঠিক দৈহিক বৃদ্ধি ও বিকাশ থেকে বঞ্চিত হয়। এসব বিষয় বিবেচনায় এনে বলা যেতে পারে, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন বর্তমানে সবচেয়ে বড় এক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। জাতিসংঘের খাদ্য মূল্যসুচক গত বছরের তুলনায় ১৩.১ শতাংশ বেড়েছে। চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বেড়েছে জ্বালানী মূল্য, সারের মূল্য যার ধারাবাহিকতায় বেড়েছে সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয়। ফলস্বরূপ কোনো কোনো ক্ষেত্রে খাদ্যদ্রব্য মূল্য প্রায় ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিগত দশ বছরের খাদ্যদ্রব্য মূল্য বৃদ্ধির সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এ ধরনের পরিসংখ্যান ব্যাখ্যাতীতভাবে নির্দেশ করে যে, উৎপাদনশীলতা বহুগুণবৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও পৃথিবীর মোট জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ এখনো পুষ্টিকর খাদ্যের মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন বর্তমান সময়ের টেকসই উন্নয়ন অর্জনের অন্যতম একটি লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত বছর খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ডিরেক্টর জেনারেল ইতালির লিনসেই একাডেমি আয়োজিত এক সেমিনারে মূল আলোচক হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নিবৃত্তির লক্ষ্যে   কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থার ব্যাপক রূপান্তরের উপর গুরুত্বারোপ করেন। এ আলোচনায় তিনি খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ভবিষ্যৎ কর্ম পরিকল্পনার কৌশলগত রূপরেখা- এফএও’র ফোর বেটারস (ঋড়ঁৎ ইবঃঃবৎং) এর কথা উল্লেখ করেন যার মূল উদ্দেশ্য (ভালো উৎপাদনের মাধ্যমে উত্তম পুষ্টি, সুরক্ষিত পরিবেশ এবং উন্নত জীবন নিশ্চিতকরার মাধ্যমে) ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত বিশ্বের স্বপ্ন বাস্তবায়ন। সেই লক্ষ্য অর্জনে এবারের বিশ্ব খাদ্য দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হল , “কাউকে পশ্চাতে রেখে নয়: ভালো উৎপাদনে উত্তম পুষ্টি, সুরক্ষিত পরিবেশ এবং উন্নত জীবন”। এই মূল প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ১৬ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী বিশ্ব খাদ্য দিবস উদযাপিত হচ্ছে। বাংলাদেশে মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির মৌলিক চাহিদা পূরণে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং এফএও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এমএমআই (গরংংরহম গরফফষব ওহরঃরধঃরাব) প্রকল্প, টেলিফুডের আওতায় বরিশালে ক্ষুদ্র পরিসরে সেচকাজ, কক্সবাজারে ডিজিটাল ভিলেজ প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে এফএও ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য প্রযুক্তি, বাজার এবং অর্থায়নের সহজলভ্যতা নিশ্চিতকরণসহ জাতীয় পর্যায়ে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনে বাংলাদেশ সরকারকে প্রয়োজনীয় সহযোগীতা প্রদান করে যাচ্ছে।
“বিশ্ব খাদ্য দিবস-২০২২” উদযাপন উপলক্ষ্যে নানাবিধ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে জেলা এবং উপজেলা পর্যায়েও বর্ণাঢ্যভাবে আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২২ এর প্রতিপাদ্যকে লালন করে সকলকে একত্রে নিয়ে কাজ করে যেতে হবে ক্ষুধামুক্ত পৃথিবীর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য।  

লেখক : ফিল্ড এসিস্ট্যান্ট, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। মোবাইল : ০১৮৪২২৫৯২৪৮, ই-মেইল : md.ullahrafi@fao.org 

 

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন