কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৫ এ ১০:৪৩ PM

উচ্চরক্তচাপ প্রতিরোধে ড্যাশ ডায়েটের ভূমিকা

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: ভাদ্র সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৭-০৮-২০২৫

উচ্চরক্তচাপ প্রতিরোধে ড্যাশ 
ডায়েটের ভূমিকা
সোনিয়া শারমিন
উচ্চরক্তচাপ বা হাইপারটেনশন একটি নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত, যা নীরবে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি করে। বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষ এই স্বাস্থ্য সমস্যার শিকার এবং এর জটিলতা মারাত্মক হতে পারে। উচ্চরক্তচাপ একটি অসংক্রামক রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অসংক্রামক রোগের কারণে প্রতি বছর বিশ্বে সাত কোটি দশ লাখ লোক মারা যায়, যা মোট মৃত্যুর তিন ভাগের দুই ভাগ। বাংলাদেশের হৃদরোগ জনিত অসুস্থতায় মৃত্যুর একটি বড় কারণ হলো উচ্চরক্তচাপ। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রায় ২৭% থেকে ৩১% মানুষ উচ্চরক্তচাপে ভুগছেন। জনসংখ্যার হিসাবে এই সংখ্যা ৪ কোটির বেশি হতে পারে। ২০১৭-২০১৮ সালের বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, ১৮ বছরের বেশি বয়সী ২৭.৩% মানুষ উচ্চরক্তচাপে আক্রান্ত ছিলেন। নারী ও পুরুষের মধ্যে পার্থক্য: কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীরা উচ্চরক্তচাপে বেশি ভোগেন। তবে অন্যান্য জরিপে নারী ও পুরুষের মধ্যে আক্রান্তের হারে খুব সামান্য পার্থক্য দেখা যায়। বাংলাদেশে প্রতি ০৫ জন প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে ০১ জনের উচ্চরক্তচাপ রয়েছে (ঘঈউ ৎবঢ়ড়ৎঃ, ওপফফৎ’ন, ২০২১) তবে আশার কথা হলো, জীবনযাত্রার কিছু পরিবর্তন এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এটি এমন একটি খাদ্য পরিকল্পনা, যা শুধু রক্তচাপ কমায় না, বরং সুস্বাদু খাবার উপভোগ করার মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনকেও উৎসাহিত করে। ট.ঝ. ঘবংি ্ ডড়ৎষফ জবঢ়ড়ৎঃ ২০২৫ সালে ড্যাশ ডায়েটকে “সেরা হৃদয়-স্বাস্থ্যকর ডায়েট” এবং “উচ্চরক্তচাপের জন্য সেরা ডায়েট” হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ড্যাশ ডায়েট : ড্যাশ ডায়েট ((DASH Diet) এর পূর্ণরূপ হলো “Dietary Approaches to Stop Hypertension অর্থাৎ উচ্চরক্তচাপ কমানোর জন্য খাদ্যতালিকা যা বিশেষভাবে উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করার জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছে। এটি ন্যাশনাল হার্ট, লাং অ্যান্ড ব্লাড ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত একটি বিজ্ঞানসম্মত খাদ্য পরিকল্পনা। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, এটি রক্তচাপ কমাতে কার্যকর। প্রথমত, ড্যাশ ডায়েট রক্তচাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম, এমনকি ওষুধ ছাড়াই, যারা উচ্চরক্তচাপে ভুগছেন তাদের ক্ষেত্রে এই ডায়েট বিশেষ উপকারী,  কম সোডিয়াম গ্রহণের সাথে ড্যাশ ডায়েট মিলিতভাবে রক্তচাপ আরও কার্যকরভাবে কমাতে পারে, (Sacks, F. M., et.al.2001).  মৃদু উচ্চরক্তচাপযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ড্যাশ ডায়েটের ইতিবাচক প্রভাব তুলে ধরে (Appel, L. J., et.al.1997).
ড্যাশ ডায়েটের মূল বিষয়
উচ্চ রক্তচাপ হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগ এবং অন্যান্য গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস (যেমন- অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া, ফল ও সবজি কম খাওয়া এবং অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ) উচ্চরক্তচাপের অন্যতম প্রধান কারণ। তা ছাড়াও অপর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম, স্থূলতা ও অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস, বয়স বৃদ্ধি এবং পারিবারিক ইতিহাসের কারণেও উচ্চরক্তচাপ হতে পারে। ড্যাশ ডায়েট এই ঝুঁকিগুলো কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে যাতে শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করার পাশাপাশি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক উপাদানগুলো বেশি পরিমাণে থাকে এবং ক্ষতিকর উপাদানগুলো কম থাকে। ড্যাশ ডায়েট কোনো কঠোর বা স্বল্পমেয়াদি ডায়েট নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস যা ফল, সবজি, শস্য, এবং কম চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবারের উপর জোর দেয়। একই সাথে লবণ, চিনি ও সম্পৃক্ত চর্বি গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে আনার কথা বলে এই ডায়েট। ড্যাশ ডায়েটের মূল বিষয়গুলো নিম্নরূপ :
* ফল, সবজি এবং শস্যজাতীয় খাবার গ্রহণ করা। 
* কম চর্বি যুক্ত বা চর্বিবিহীন দুগ্ধজাত খাবার, মাছ, মাংস, বাদাম এবং উদ্ভিজ্জ তেল যোগ করা।
* সম্পৃক্ত চর্বি (যেমন : চর্বিযুক্ত মাংস, ননিসহ দুগ্ধজাত খাবার) এবং চিনি যুক্ত পানীয় ও মিষ্টি খাবার ত্যাগ করা। 
ড্যাশ ডায়েটের খাদ্য পরিকল্পনা :
ফল ও সবজি : প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে ফল যেমন- আপেল, কলা, কমলা, বেরি, তরমুজ ইত্যাদি ও সবজি যেমন-পালং শাক, গাজর, ব্রকলি, টমেটো, মিষ্টি আলু এবং অন্যান্য পুষ্টিকর সবজি (৪-৫ পরিবেশন) গ্রহণ করা উচিত। এগুলো ভিটামিন, খনিজ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ফাইবারের চমৎকার উৎস, যা রক্তচাপ কমাতে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। বিভিন্ন রঙের ফল ও সবজি খাবারের তালিকায় যোগ করা উচিত। 
শস্য : পূর্ণশস্য (৬-৮ পরিবেশন) যেমন- আস্ত শস্যের রুটি, বাদামি চাল, ওটস, কুইনোয়া ইত্যাদি গ্রহণ করা উচিত। প্রক্রিয়াজাত শস্যের তুলনায় পূর্ণ শস্যে ফাইবার, ভিটামিন ও খনিজ বেশি থাকে। 
কম ননিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার : ননিছাড়া বা কম চর্বিযুক্ত দুধ, দই ও পনির (২-৩ পরিবেশন) ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর ভালো উৎস, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।    
চর্বিহীন আমিষ : মাছ, মুরগি (ত্বক ছাড়া), এবং শিমজাতীয় খাবার (দৈনিক ৬ আউন্সের কম) আমিষের ভালো উৎস এবং এগুলোতে সম্পৃক্ত চর্বি কম থাকে। সপ্তাহে কয়েকবার মাছ খাওয়া ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সরবরাহ করে, যা হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।  
বাদাম, বীজ ও শিম : পরিমিত পরিমাণে বাদাম ও বীজ (সপ্তাহে ৪-৫ পরিবেশন) স্বাস্থ্যকর চর্বি ম্যাগনেসিয়াম , পটাশিয়ামের উৎস। তবে এদের ক্যালোরির পরিমাণ বেশি হওয়ায় সীমিত পরিমাণে গ্রহণ করা উচিত।  
স্বাস্থ্যকর চর্বি : উদ্ভিজ্জ তেল (যেমন- জলপাই তেল, ক্যানোলা তেল), অ্যাভোকাডো পরিমিত পরিমাণে (প্রতিদিন ২-৩ পরিবেশন) গ্রহণ করা যেতে পারে। সম্পৃক্ত চর্বি ও ট্রান্স ফ্যাট (যেমন- ভাজা খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার) পরিহার করা উচিত।    
লবণ ও চিনি কম : ড্যাশ ডায়েটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো লবণ (সোডিয়াম) এবং অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার কম গ্রহণ করা (সপ্তাহে ৫ পরিবেশনের কম)। প্রক্রিয়াজাত খাবারে লুকানো লবণ এবং চিনি থাকে, তাই তা এড়িয়ে যাওয়া উচিত। রান্নার সময় লবণের ব্যবহার কমানো এবং খাবারের স্বাদ বাড়ানোর জন্য ভেষজ ও মসলা ব্যবহার করা যেতে পারে। দৈনিক ২০০০ ক্যালোরির ড্যাশ খাদ্য পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সহায়ক একটি খাদ্য তালিকা সারণি দ্রষ্টব্য।
সারণি : ড্যাশ ডায়েটের খাদ্যতালিকা 
* দৈনিক ১,৫০০ মিলিগ্রাম সোডিয়াম গ্রহণ ২,৩০০ মিলিগ্রাম সোডিয়াম গ্রহণের চেয়েও বেশি রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে।
উৎস: উধংয ঊধঃরহম চষধহ, ন্যাশনাল হার্ট, লং অ্যান্ড ব্লাড ফাউন্ডেশন (ঘঐখইও)
ড্যাশ খাদ্য পরিকল্পনা উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া 
সোডিয়াম গ্রহণ হ্রাস : এই ডায়েটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো লবণ বা সোডিয়ামের পরিমাণ কমিয়ে আনা। অতিরিক্ত সোডিয়াম শরীরে জল ধারণের ক্ষমতা বাড়ায়, যা রক্তচাপ বৃদ্ধি করে।
পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম সরবরাহ : ফল, সবজি ও কম ফ্যাটযুক্ত দুগ্ধজাত খাবারে পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম প্রচুর পরিমাণে থাকে। এই খনিজ উপাদানগুলো রক্তনালীকে প্রসারিত করতে এবং রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে।
আঁশ সমৃদ্ধ খাবার : ড্যাশ ডায়েটে প্রচুর পরিমাণে আঁশ থাকে, যা হজমক্ষমতাকে উন্নত করে এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে।
সম্পৃক্ত চর্বি ও ট্রান্স ফ্যাট কম : এই ডায়েটে অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট কম থাকায় এটি হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতেও সহায়ক।
ড্যাশ ডায়েট কেবল একটি ডায়েট নয়, এটি একটি স্বাস্থ্যকর জীবনধারা। উদাহারণস্বরূপ :
আনোয়ার হোসেন, বয়স ৬২ বছর, একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। কয়েক বছর ধরে তিনি উচ্চরক্তচাপে ভুগছিলেন। নিয়মিত ওষুধ খাওয়া সত্ত্বেও তার রক্তচাপ প্রায়ই ১৪০-৯০ এর উপরে থাকত। ডাক্তার তাকে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনার পরামর্শ দেন এবং ড্যাশ ডায়েটের কথা বলেন।
প্রথম দিকে আনোয়ার সাহেব কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন, কারণ তার দীর্ঘদিনের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা কঠিন মনে হচ্ছিল। তবে তার স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের কারণে তিনি ড্যাশ ডায়েট অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি ধীরে ধীরে তার খাদ্যতালিকা পরিবর্তন করতে শুরু করেন। প্রতিদিনের খাবারে প্রচুর পরিমাণে ফল ও সবজি যোগ করেন। ভাতের পরিমাণ কমিয়ে আস্ত শস্যের রুটি ও ব্রাউন রাইস খাওয়া শুরু করেন। মাছ ও মুরগি তার প্রধান প্রোটিনের উৎস হয়ে ওঠে এবং তিনি লাল মাংস খাওয়া কমিয়ে দেন।
আনোয়ার সাহেব চর্বিবিহীন দুধ ও দই গ্রহণ করতে শুরু করেন এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত লবণ পরিহার করেন। নাশতার সময় তিনি বাদাম ও ফল খেতেন। 
কয়েক মাস পর আনোয়ার সাহেব নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে গেলে ডাক্তার অবাক হয়ে যান। তার রক্তচাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ১২৫/৮০ তে নেমে এসেছে। তিনি আরও হালকা ও সতেজ অনুভব করতে শুরু করেন। ডাক্তারের পরামর্শে তার ওষুধের ডোজও ধীরে ধীরে কমানো হয়।
আনোয়ার সাহেব বলেন, “প্রথম দিকে একটু অসুবিধা হলেও, এখন আমি এই খাদ্যাভ্যাসের সাথে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ড্যাশ ডায়েট শুধু আমার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আনেনি, আমাকে আরও সুস্থ ও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হলো, এই ডায়েটে অনেক সুস্বাদু খাবার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তাই মনে হয় না আমি কোনো পছন্দের খাবার ত্যাগ করেছি। আনোয়ার হোসেনের এই গল্পটি দেখায় যে সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং ড্যাশ ডায়েট অনুসরণ করে উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

লেখক : ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ফলিত ও পুষ্টি গবেষণা ইনস্টিটিউট, আঞ্চলিক কার্যালয়, খুলনা। মোবাইল : ০১৭৪৮০৩৭৮২৮; 

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন