কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ এ ০৫:১৬ PM

ইঁদুরের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা এবং ধান উৎপাদনে প্রভাব বিশ্লেষণ

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: আশ্বিন সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৭-০৯-২০২৫

ইঁদুরের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা এবং ধান উৎপাদনে প্রভাব বিশ্লেষণ
মো: মোসাদ্দেক হোসেন১
ড. মো: মোফাজ্জল হোসেন২
ইঁদুর একটি পরিচিত প্রাণী যা মানব ইতিহাসের নব্য প্রস্তর যুগ থেকেই বালাই হিসেবে গণ্য হয়েছে। মাঠের ফসল উৎপাদন ও গুদামজাত শস্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ইঁদুর সমস্যায় পড়েনি এমন বোধ হয় কেউ নেই। ইঁদুর আকারে ছোট হলেও বছরে বাংলাদেশে ইঁদুর ১২ থেকে ১৫ লাখ মেট্রিক টনের অধিক খাদ্যশস্য প্রতি বছর ক্ষতি করে (ডিএই, ২০১৩)। ইঁদুর দ্বারা প্রাথমিক ক্ষতি হয় ধান, গম, বাদাম ও নারিকেল ফসলে। আমাদের দেশে ইঁদুরের দ্বারা সৃষ্ট ফসলের ক্ষতির নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান যেমন- পাওয়া কঠিন তেমন ইঁদুরবাহিত রোগেরও কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। গুদামে রাখা শস্যে ইঁদুর এর ক্ষতি বা মলমূত্র ও লোম সংমিশ্রণের তথ্যও সংগ্রহ করা হয় না। শুধু আমরা জানি, প্রায় সমস্ত কৃষি ফসলই ইঁদুর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ৬০ ধরনেরও বেশি রোগ ছড়ায়। সাধারণভাবে, মাঠ ফসলের ৫-৭ শতাংশ এবং গুদামজাত শস্যের ৩-৫ শতাংশ ক্ষতি করে ইঁদুর।  বাংলাদেশে বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে দেখা যায় ইঁদুরের আক্রমণে বছরে আমন ধানের ৫-৭ শতাংশ, গমের ৪-১২ শতাংশ, আলু ৫-৭ শতাংশ এবং আনারসের ৬-৯ শতাংশ ক্ষতি হয়। এ ছাড়াও, ইঁদুর সেচনালা নষ্ট করে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত করে। প্রায় ৭-১০ শতাংশ সেচনালা ইঁদুরের কারণে নষ্ট হয়, যা সেচ প্রদানে সমস্যা তৈরি করে। গবেষণা থেকে জানা যায়, তিন মাসের জন্য ধান গুদামে রাখা হলে ৫ খেকে ১০ ভাগ ইঁদুরের দ্বারা ক্ষতি হতে পারে। বাংলাদেশে গড়ে প্রতি কৃষক পরিবারে প্রতি বছরে ২০০ কেজি ধান ইঁদুরের দ্বারা নষ্ট হয়। বৃষ্টিনির্ভর ও সেচ সুবিধাযুক্ত ধানের জমিতে ফসল কাটার পূর্বে শতকরা ৫-১৭ ভাগ ক্ষতি হয়। ইঁদুরের দ্বারা বাসাবাড়ির অন্যান্য ক্ষতি, শহর-গ্রামের দোকান, কারখানা, রাস্তাঘাট, সেচনালা, জমির আইলের যে ক্ষতি হয় তা বেশির ভাগ সময় বিবেচনা করা হয় না। ইঁদুর বেড়িবাঁধ ও বিভিন্ন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে গর্ত করে এবং মাটি সরিয়ে বাঁধ দুর্বল করে ফেলে। ফলে বাঁধ ভেঙে পানি দ্বারা প্লাবিত হয়ে বাড়িঘর, ফসলাদি ও গবাদিপশুর যে ক্ষতি সাধন করে তার আর্থিক মূল্য বিবেচনা করলে ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যাবে। ইঁদুর আমাদের প্রধান খাদ্য ধান ফসলের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করে, যার ফলে ফলনের ব্যাপক ক্ষতি হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, কিছু এলাকায় ক্ষতি ১০-২০% পর্যন্ত হতে পারে, এমনকি আশ্রয়স্থলের কাছাকাছি ৩০-৫০% পর্যন্তও হতে পারে। ইন্দোনেশিয়ায়, একটি গবেষণায় দেখা যায়, ১৭% ধান উৎপাদনের ক্ষতির জন্য ধানক্ষেতের ইঁদুর দায়ী, কোনো বছর ক্ষতি ২৪.৫৬% পর্যন্ত হতে পারে। ইঁদুর দ্বারা ধান ফসলের যে ক্ষতি  হয় তা কমানো গেলে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশের একদিকে যেমন খাদ্য নিরাপত্তা  নিশ্চিত হবে আবার অন্যদিকে কৃষকের আয়ও বাড়বে। ইঁদুরের হাত থেকে গুদামের ফসল রক্ষা এবং খাদ্যে মলমূত্র ও লোম সংমিশ্রণ বন্ধ করা গেলে স্বাস্থ্য, নিরাপদ খাদ্য এবং পুষ্টি নিশ্চিতের পাশাপাশি রোগের বিস্তারও কমে যাবে। 
মাঠের কালো ইঁদুর ও মাঠের বড় কালো ইঁদুর গ্রীষ্ম মৌসুমে সাধারণত ফসলের ক্ষেত ও গ্রামের বিভিন্ন স্থানে গর্তে থাকে এবং গর্তের মুখ বন্ধ রাখে ও মাটি স্তূপ করে রাখে। একটি গর্তে একটি মাত্র ইঁদুর থাকে। বর্ষার সময় নিম্নভূমি প্লাবিত হলে এবং ফসলের জমিতে বৃষ্টির পানি জমলেই ইঁদুর গিয়ে অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থানে আশ্রয় নেয়। জমিতে পানি থাকে বলে ইঁদুর মাঠের উঁচু স্থানে, রেল সড়ক ও মহাসড়ক, উঁচু গ্রামীণ সড়ক, বেড়িবাঁধ, পুরনো স্থাপনা, পুকুরের পাড়ে এবং ধানের জমির পাশে কচুরিপানার দলে অল্প জায়গায় অবস্থান করে। এ অবকাঠামোগুলো কাটাকাটি করে ইঁদুর বাসা তৈরি করে। ফলে বেড়িবাঁধগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জোয়ার এবং বন্যার পানি ফসলের মাঠ ও গ্রামীণ সড়ক ডুবিয়ে দিয়ে মারাত্মক ক্ষতি করে।
অনেক সময় আমাদের দেশে ইঁদুরের সমস্যা সমাধানের জন্য কোনো চাহিদা থাকে না। ইঁদুরের সমস্যা গ্রামের লোকজন সঠিকভাবে বুঝতে পারে না, সমস্যা সমাধানের জন্য স্থানীয় কোনো পদ্ধতিও কার্যকর নয়। তাই গ্রামের লোকজন এই ক্ষতি স্বাভাবিক হিসেবেই গ্রহণ করে থাকে। গ্রামীণ মানুষের জীবন ও জীবিকার উপর ইঁদুর কী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে তা সঠিকভাবে বুঝে উপযুক্ত দমন ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে পারাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ধানে ইঁদুরের ক্ষতি 
ইঁদুর ধানের চারা অবস্থা থেকে শুরু করে পরিপক্ব গাছ এবং গুদামজাত ধান পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে আক্রমণ করে। মাঠে এরা নতুন রোপিত চারা, কুশি, শীষ এবং ধান খায়। গাছ কেটে ফেলা ও গর্ত খোঁড়ার মাধ্যমে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ইঁদুরের আক্রমণে ক্ষেত্রবিশেষে ধানের ১০% থেকে ২০% পর্যন্ত ফলন নষ্ট হতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে এই ক্ষতির পরিমাণ ৩০% বা তার বেশি হতে পারে, বিশেষত যখন ইঁদুরের প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ থাকে। এক গবেষণায় দেখা গেছে যে ইঁদুরের আক্রমণে ধানগাছের ছড়া গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে (পিআই স্টেজ) ৫৪%, বুট করার সময় ৩২% এবং পাকার সময় ১৬% ক্ষতি হয়েছে। শীষ গঠনের সময় ইঁদুর পূর্ণাঙ্গ ধানের দিকে ঝুঁকে পড়ে, ফলে অপূর্ণ শীষ বা ফাঁপা দানা তৈরি হয়, যা সরাসরি ফলন কমিয়ে দেয়। গুদামে সংরক্ষিত ধানেও এদের তা-ব অব্যাহত থাকে। ধান খাওয়ার পাশাপাশি ইঁদুর মল, মূত্র ও লোমের মাধ্যমে ধান দূষিত করে তোলে, যা ধানকে মানুষের খাওয়ার  অনুপযুক্ত করে তোলে এবং বাজারমূল্য কমিয়ে দেয়। এশিয়া অঞ্চলে প্রতি বছর ইঁদুর দ্বারা লক্ষ লক্ষ টন ধান নষ্ট হয় বলে ধারণা করা হয়। 
সাধারণত আগাম পরিপক্ব ধানের জমিতে ইঁদুরের আক্রমণ বেশি হয়। ইঁদুর ধান গাছের কুশি তেরছা কোণে (৪৫ ডিগ্রি) কেটে দেয়। গাছে শীষ বের হলে শীষ বাঁকিয়ে নিয়ে কচি ও পাকা শীষগুলো কেটে দেয়। ইঁদুর ধান ফসলে তিন মৌসুমেই আক্রমণ করতে পারে। তবে আমন মৌসুমে নিরাপদ আশ্রয়স্থল, পর্যাপ্ত খাদ্য এবং পানি সহজলভ্য হওয়া এবং মৌসুমের শেষভাগে বৃষ্টিপাত কম ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এসময়ে ইঁদুরের প্রজনন খুব বেশি হয়। ফলে ইঁদুরের সংখ্যা অন্যান্য মৌসুমের তুলনায় বেড়ে যায়। ইঁদুরের প্রজনন শুরুর পূর্বেই ইঁদুর দমন করা দরকার। তাই আমন মৌসুমে ইঁদুর দমনের উপযুক্ত সময় ভাদ্র থেকে মধ্য কার্তিক। কারণ এসময় মাঠে ইঁদুরের সংখ্যা কম থাকে। মাঠে প্রচুর খাদ্য না থাকায় ইঁদুর সহজেই এসময় বিষটোপ খেয়ে থাকে। আমন ফসল ক্ষতি করার আগেই ইঁদুর মারতে পারলে এদের সংখ্যা বৃদ্ধি কম হয় এবং  ফসলের ক্ষতিও অনেক কম হয়ে থাকে। ধান রোপণের সময় ও রোপণের ৪৫-৫০ দিনের মধ্যে ধানের জমি ও আশেপাশের এলাকার ইঁদুর দমনের ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
মাঠে ধানের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ইঁদুর প্রজনন প্রক্রিয়াও চালাতে থাকে। তাই ফসলের থোড় ও পাকা অবস্থায় ইঁদুর দমন ব্যবস্থা ততটা কার্যকর হয় না। কারণ এসময় মাঠে ইঁদুরের সংখ্যা অত্যধিক বেড়ে যায়। এসময় ইঁদুরের ক্ষতির মাত্রা বেশি হলেই কেবল ইঁদুরের উপস্থিতি বুঝা যায়, তখন দমন ব্যবস্থা ততটা কার্যকরী হয় না। কারণ মাঠের ফসল রেখে ইঁদুর বিষটোপ খেতে চায় না এবং দমন খরচ অনেক গুণ বেড়ে যায়।
অর্থনৈতিক ও কৃষি ক্ষেত্রে প্রভাব
ধান উৎপাদনে ইঁদুরের আর্থিক প্রভাব দুই রকম- প্রত্যক্ষ ক্ষতি, যেমন ফলন হ্রাস ও মান নষ্ট হওয়া এবং পরোক্ষ ক্ষতি, যেমন- ইঁদুর দমনে ব্যবহৃত শ্রম, যেমন- ইঁদুরনাশক এবং সামাজিক উদ্যোগের ব্যয়। যেসব অঞ্চলে ধান প্রধান খাদ্য ও আয়ের উৎস, সেখানে এই ক্ষতি দারিদ্র্য ও খাদ্য সংকটকে তীব্র করে তোলে। এ ছাড়া ইঁদুর আতঙ্কে কৃষক অনেক সময় সময়মতো চাষ না করে বিলম্ব করে বা নির্দিষ্ট জমি অনাবাদি রাখে (যেমন- আউশ ধান আবাদ) যা কৃষিচক্র ব্যাহত করে এবং সামগ্রিক উৎপাদন কমিয়ে দেয়। এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশে ইঁদুরের আক্রমণ একসময় দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতিও সৃষ্টি করতে পারে।
ইঁদুরের আক্রমণ ধানের উৎপাদনে শুধু পরিমাণগত ক্ষতি নয়, খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক চাপ এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই ক্ষতির মাত্রা বুঝে যথাযথ দমন কৌশল নির্ধারণ অত্যন্ত জরুরি। তাই ইঁদুর দমনে শুধু রাসায়নিক বালাইনাশক নয়, বরং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা  গ্রহণ করা আবশ্যক।

লেখক : ১মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রধান ২মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, কীটতত্ত্ব বিভাগ, বিআরআরআই, গাজীপুর-১৭০১, মোবাইল : ০১৭১২৬২৬৪৫০, ই-মেইল :head.entom@brri.gov.bd

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন