কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ এ ০৬:৩২ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: পৌষ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৪-১২-২০২৫
আলুর বালাই দমন
অধ্যাপক ড. মো. সদরুল আমিন
ফসল উৎপাদন সময় ও মোট দেশভিত্তিক খাদ্য ফসল উৎপাদনের বিবেচনায় আলু বাংলাদেশের এক নম্বর ফসল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রায় ৪০ কোটি টন আলু উৎপাদিত হয়। চীন ১০ কোটি ও ভারত ৫ কোটি টন উৎপাদন করে। বাংলাদেশে এর উৎপাদন প্রায় ১ কোটি টনের উপরে। বিশ্বে আলু উৎপাদনের জমি প্রায় ১.৬ কোটি হেক্টর, গড় ফলন প্রায় ২১ টন/হে.। তবে ইউরোপের অনেক দেশে এর ফলন প্রায় ৬০ টন/হে পর্যন্ত। কৃষি ডায়েরি ২০২৫ (কৃতসা) মতে বাংলাদেশে এর গড় ফলন ২৪.৬ টন/হে। এতে বলা যায় দেশে আলুর ফলন বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং এটা হেক্টরে ৪৫ টন পর্যন্ত হতে পারে। আলু চাষে উন্নত পদ্ধতি অবলম্বন করে এই সফলতা পাওয়া সম্ভব। বর্তমানে দেশে প্রায় ২০% জমিতে গতানুগতিক জাবড়া-মালচ আলু চাষ হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে দেশের প্রায় ৫০% জমিতে আধুনিক পদ্ধতিতে বালাই দমন করে ৩০ লক্ষ টন ফলন বাড়িয়ে ১ লক্ষ হেক্টর আলুর জমি অন্য গুরুত্বপূর্ণ ফসলে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের মতে ২০০০ সালে আলুর দৈনিক গ্রহণ ছিল ৫৮ গ্রাম, ২০২০ সালে তা হয় ৭৭ গ্রাম, ২০২৪ সালে বিভিন্ন উৎস মতে ১০০-১৪৫ গ্রাম।
আলুর ফলন বাড়ানোর উপায় : প্রথমত প্রধান প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে জাত প্রযুক্তি অবলম্বন, সুষম সার ব্যবহার, যান্ত্রিক চাষ পদ্ধতি, এলাকা ও ডিজিটাল আবহাওয়া ভিত্তিক ফসল পরিচর্যা এবং আধুনিক বালাই দমন প্রযুক্তি। এর মধ্যে বাংলাদেশে আলুর কতিপয় বালাই সহনশীল জাতসহ সর্বমোট প্রায় ১৫০টি জাত রয়েছে। দ্বিতীয়ত, আলুতে সার ব্যবহার সুষম মাত্রার তুলনায় বেশিই হচ্ছে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে এরমধ্যে আলুর রোগের ডিজিটাল মনিটরিং পরিচর্যা অনুশীলন করা হচ্ছে। চতুর্থত, আধুনিক বালাই দমন প্রযুক্তি অবলম্বন করা প্রয়োজন। আধুনিক বালাই দমন প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্ত প্রধান বিষয় হলো- এটি আলু উৎপাদন এলাকাগুলোত আরও বাড়ানো প্রয়োজন। সঠিক ওষুধ, সঠিক সময়, সঠিক মাত্রা ও সঠিক নিয়ম প্রতিপালন করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে আলু চাষের সমস্যার মধ্যে বালাই সমস্যা অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এর প্রভাব বেড়ে চলেছে। দেশে আলুর প্রায় ১৫টি প্রধান বালাই শনাক্ত করা যায়। এর মধ্যে ৮টি রোগ, ৭টি পোকা যার অধিকাংশই আবহাওয়া ও মৃত্তিকা গুণাবলী প্রভাবান্বিত। যেমন- রোগের মধ্যে নাবী ও আগাম ধসা, কা- ও গোড়া পচা, উইল্টিং, ভাইরাস রোগ, দাদ ও শুকনা পচা ইত্যাদি। পোকার মধ্যে রেেয়ছে কাটুই পোকা, সূতলী পোকা, জাবপোকা, পাতা ও ফ্লি বিটল, সোলান সাদা মাছি ও শোষক পোকা।
এখানে উল্লেখ্য যে ১৮৪৫ সালে নাবী ধসা রোগের কারণে ফলন বিপর্যয়ে আয়ারল্যান্ডে আলু খাদ্যাভাবে ১০ লক্ষে মানুষ মারা গিয়েছিল। সুতরাং ধসা রোগ আলুর জন্য কত মারাত্মক তা অনুমেয়। একইভাবে আলুর অন্যান্য বালাইও আবহাওয়া, সময়, জাত ও এলাকাভেদে চরম ক্ষতিকর হতে পারে। বাংলাদেশে তা প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশের অন্তত আলু উ্ৎপাদনকারী ১০টি জেলার জন্য (জয়পুরহাট, দিনাজপুর, নীলফামারী, রংপুর, রাজশাহী, বগুড়া, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ) গড়ে অন্তত ৫০টি বালাইনাশক সুপারিশ করা আছে যা না-বুঝে প্রয়োগ করতে থাকলে প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন ব্যয় হবে ৫০ টাকার উপরে। কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে বিবেচনা করে সর্বোচ্চ ৮টি স্প্রের মধ্যে সীমিত রাখলে উৎপাদন ব্যয় অর্ধেকেরও কম হবে। এ বিষয়টি নিয়েই এখানে আলোচনা করা হলো।
আলুর প্রধান প্রধান রোগের মধ্যে ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস রয়েছে। অম্ল মাটিতে ছত্রাকের কার্যশীলতা (স্ক্যাব বা দাঁদ রোগ) বেশি। তাই মাটির অম্লত্ব পরিশোধন করে নিলে এ রোগ কমে যায়। বালাইনাশক নির্বাচনের ভিত্তি হিসাবে ছত্রাক-ব্যাকেটেরিয়া দমনে কার্যকর মৌল-বস্তু বিবেচনা করতে হবে। বর্তমানে ব্যবহৃত পুরাতন রোগনাশক অধিকাংশই ছত্রাকনাশক বেশি, ব্যাক্টেরিয়ানাশক কম। যেমন- কার্বেন্ডাজিম, মেনকোজেব, কপার অক্সিক্লোরাইড ইত্যাদি। এ ছাড়াও অক্সিক্লোরাইড ৬০% এবং ডাইমেথোমর্ফ ১৩% (৭৩ ডব্লিউ পি)। সিস্টেমিক বা প্রবহমান ছত্রাকনাশক ৩-৫টা স্প্রে করলে ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া উভয় রোগের ক্ষেত্রে উপকার পাওয়া যেতে পারে। এতে ছত্রাক ও ব্যাকেটেরিয়া রোগ হ্রাস পাবে।
আলুর মৃত্তিকাভিত্তিক পোকা দমন করার জন্য অতি পুরাতন বা পোকার সম্ভাব্য প্রতিরোধ সৃষ্টি হয়ে যাওয়া বালাইনাশকের চেয়ে প্রজন্মের উপযুক্ত বালাইনাশক প্রয়োগ তুলনামূলক বেশি উপকারী হতে পারে। তবে বর্তমানে একাধিক দ্রব্যের ককটেইল ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়, যা পরিবেশ ও রপ্তানি আলু উৎপাদনের জন্য খুবই ক্ষতিকর। তাই সবকিছু সমন্বিতভাবে বিবেচনা করে বালাইনাশক ৬-৮টি স্প্রে করলে আলুর ফলন ও আন্তর্জার্তিকায় বৈপ্লবিক উন্নয়ন ঘটাতে পারে। সাথে সাথে অবশ্যই উপযুক্ত জাত নির্বাচন, সুষম সার ব্যবহার ও জাবড়া-মালচ বদলে গাছের গোড়া বাঁধন পদ্ধতি এবং আবহাওয়া ও ফসল পরিচর্যাভিত্তিক বালাইনাশক প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আলুতে বালাইনাশক ব্যবহারের গুরুত্ব যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বালাইনাশক নির্বাচন যেভাবে করতে বলা হয়েছে তাতে আশা করা যায় উৎপাদন ব্যয় কমবে, ফলন বাড়বে, পণ্যের সেফটি বাড়বে, পরিবেশ ভালো থাকবে, আলুর রপ্তানিমান ও আন্তর্জাতিক তাৎপর্য বাড়বে। পুরাতন আর নয়, কৃষিতে আধুনিকতা সর্বকাম্য।
লেখক : অধ্যাপক, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর। মোবাইল : ০১৭২৬৫৪৮৪৮৫