কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ২৬ জুলাই, ২০২২ এ ০৫:২৯ PM

আমে লাভবান গোমস্তাপুরের কৃষি উদ্যোক্তা সেরাজুল ইসলাম

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: শ্রাবণ সাল: ১৪২৯ প্রকাশের তারিখ: ২৬-০৭-২০২২

আমে লাভবান গোমস্তাপুরের কৃষি
উদ্যোক্তা সেরাজুল ইসলাম  
কৃষিবিদ মো. আব্দুল্লাহ-হিল-কাফি১ মো: আমিনুল ইসলাম২
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আমের রাজধানী হিসেবে খ্যাত। এ অঞ্চলে বিভিন্ন জাতের আম উৎপাদন হয়। অথচ আমের মৌসুম ছাড়া সারাবছর আম পাওয়া যায় না। এ চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল সেরাজুলের মাথায়। মানুষ কেন বারমাস সুস্বাদু আম খেতে পায় না। তাঁর এই উদ্বুদ্ধর কথা নিজ ভাই কমান্ডার রেজাউল করিমকে বলেন। ভাইয়ের পরামর্শে তিনি নিজ গ্রাম বোয়ালিয়া ইউনিয়নের নওদাপাড়া এলাকায় একটি বাগান তৈরি করেন। ওই বাগানে একটি প্রজেক্ট করেন। অমৌসুমে তার আম বাগানে গাছে ঝুলছে বিভিন্ন জাতের পাকা আম ও ডালে ডালে মুকুলের সমারোহ। গোমস্তাপুর উপজেলা পার্বতীপুর ইউনিয়নের মহেশপুর গ্রামের প্রত্যন্ত মাঠের একটি বাগানের এ দৃশ্য দেখা যায়। প্রথমে পরীক্ষামূলক চাষাবাদ করে আজ সফলতার মুখ দেখছেন অসময়ের (বারোমাসি) আম উদ্যোক্তা সেরাজুল ইসলাম।
তিনি ওই মাঠে ব্যক্তি মালিকাধীন ১২ বিঘা জমি লিজ নিয়ে এ আম উৎপাদন শুরু করেছেন। পাকা আমসহ আমের চারা বিক্রি করছেন। সেখানে বারোমাসী ম্যাংগো ফার্ম নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। ওই বাগান থেকে তিনি বছরে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন।
সেই প্রজেক্টে পরীক্ষামূলকভাবে আম উৎপাদনে সফলতা অর্জন করে এবং ভালো একটা মুনাফা পায়। এরপর থেকে তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পরবর্তীতে সেরাজুল ইসলাম উপজেলার পার্বতীপুর ইউনিয়নের মহেশপুর গ্রামে ১২ বিঘা জমি লিজ নেন। ওই জমিতে ২০১৯ সালের জুন মাসে প্রজেক্ট হিসেবে আ¤্রপালি জাতের আমগাছ থেকে সাইনিং শুরু করেন। পরে বারোমাসি বারি-১১ জাতের আম উৎপাদন করতে থাকে। তার ওই বাগানে প্রায় দেড় হাজারের অধিক বিভিন্ন জাতের আমগাছ রয়েছে। ওই গাছগুলো থেকে বছরে তিনবার আম ধরে বলেন উদ্যাক্তা সেরাজুল ইসলাম। এখন তিনি সাড়ে তিন’শ থেকে সাড়ে চার’শ টাকা কেজি ধরে আম বিক্রি করছেন।
এ বিষয়ে সেরাজুল ইসলাম বলেন, দেশসহ বিশ্বে যেহেতু আমের পরিচিত রয়েছে, আম ফুরিয়ে গেলে অসময়ে আর আম পাওয়া যায়না। কিভাবে অসময়ে আম পাওয়া যাবে। এ চিন্তা থেকে বিভিন্ন স্থানে জাত সংগ্রহ করতে থাকি। কিন্তু সে জাতগুলো ভালো না। খোঁজ করতে করতে ঢাকা থেকে এ জাত সংগ্রহ করি। তারপর পরিকল্পনা করি। সফল হয়েছি।
এক বিঘা জমিতে প্রায় ৪ লাখ টাকার আম বিক্রি করা হয়েছিল। এ সফলতা থেকে তিনি উপজেলার মহেশপুর গ্রাম এলাকায় ব্যক্তি মালিকের ১২ বিঘা জমি লিজ নেয়া হয়। সেখানে তিনি অসময়ে আম উৎপাদন শুরু করেন।
তিনি আম চাষের বিষয়ে বলেন, যেমন : বারি আম-১১। এ জাতের গাছ বছরে তিনবার ফল দেবে। ডিসেম্বর-জানুয়ারি, এপ্রিল ও জুলাই-আগস্টে এ আম পাওয়া যাবে। এটি খেতে খুবই  সুস্বাদু। তবে আঁশ আছে। এটি আকারে লম্বাটে। প্রতিটি আমের গড় ওজন হয় ৩০০-৩১৭ গ্রাম। কাঁচা আমের ত্বক হালকা সবুজ। আর পাকলে ত্বক হয় হলুদাভাব সবুজ। আঁটির ওজন ২৫ গ্রাম অর্থাৎ পাতলা আঁটির আমটির ৭৯ ভাগ খাওয়া যায়। মিষ্টতার পরিমাণ জানি যে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ টিএসএস।
তিনি আরো বলেন, আমরা আমের চাষ করে থাকি লাভ পাওয়ার জন্য। আম চাষ থেকে লাভ পেতে হলে আমাদের একটি ভালো জাত নির্বাচন করতে হবে যেন ফলন ভালো হয়। আমাদের দেশে নানা জাতের আম রয়েছে। এদের মধ্যে কিছু উন্নত হাইব্রিড জাত হলো- আ¤্রপালি, বারি-৭, বারি-১১, কাটিমন, ভাসতারা, গৌড়মতি ইত্যাদি। এদের মধ্যে আ¤্রপালি চাষ করা বেশ লাভজনক। এটি আকারে অনেক বড় হয় এবং খেতে ও বেশ সুস্বাদু। এই জাতের আম ঘরেও বেশ কয়েক দিন রেখে দেওয়া যায়। তাছাড়া এর ফলনও অন্যান্য জাতের তুলনায় অনেক বেশি।
শুধু বাগান বা বাড়ির আঙিনায় নয় ছাদের উপরে ড্রামে, পুকুরপাড়ে বাণিজ্যিকভাবে  বাগানে বারোমাসি  জাতের আমগাছ লাগানো যায়। বসতবাড়িতে শখ করে দু-একটা গাছ লাগানো যেতে পারে। তবে কেউ যদি দুই-এক হেক্টর জমিতেও এ জাতের বাণিজ্যিক বাগান গড়তে চান তো সে ক্ষেত্রে আ¤্রপালি আমের চেয়ে লাভ কম হবে না। এ জাতের আমের গাছ লাগানোর জন্য চাই উঁচু জমি, যেখানে বন্যা বা বৃষ্টির পানি আটকে থাকে না। বেলে, বেলে দোআঁশ ও উপকূলের লোনা মাটি ছাড়া যেকোনো মাটিতে এই জাতের আম চাষ করা যেতে পারে। এই জাতের আম চাষ করা যায় লাল মাটি ও পাহাড়েও। তবে দো-আঁশ ও এঁটেল-দোআঁশ মাটি সবচেয়ে ভালো। এরূপ মাটিতে জৈবসার ব্যবহার করে চাষ করলে গাছের বাড়বাড়তি ও ফলন ভালো হয়। আম চাষ করতে গেলে প্রথমে মাটি তৈরি করতে হবে। এটা অনেকটা জমি নির্বাচনের মত। যদি টবে আম চাষ করতে চান তাহলে টবের জন্য মাটি তৈরি করে নিতে হবে। টবে আম চাষের জন্য উর্বর দো-আঁশ মাটি সর্বোত্তম। টবের মাটির সাথে গোবর, টিএসপি ও কম্পোস্ট সার মেশাতে হবে যেন মাটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে সার তৈরি হয়। পানি নিষ্কানের জন্য টব বা ড্রামের নিচের দিকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ছিদ্র করে দিতে হবে।
আমের চারা রোপণের উত্তম সময় জেনে নিতে হবে। আমের চারা রোপণের জন্য জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাস সর্বোত্তম। এ সময় পর্যাপ্ত পরিমাণের বৃষ্টি হয় তাই চারা পর্যাপ্ত খাবার পায় ও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়াও ভাদ্র-আশ্বিন মাসে আ¤্রপালি চারা লাগানো যেতে পারে। এটিও একটি উপযুক্ত সময়। যদি পানি সেচের জন্য যথেষ্ট সুযোগ সুবিধা থাকে তাহলে সারা বছরই আমের চারা রোপণ করা যেতে পারে। আমের বীজ বপন ও রোপণ করতে হবে  সঠিক পদ্ধতিতে এবং সঠিক সময়ে পানি সেচ দেয়া প্রয়োজন। আমের চারা সোজা করে লাগাতে হবে। চারা রোপণের পর গাছের গোড়ার মাটি হাত দিয়ে টিপে টিপে কিছুটা উঁচু করে দিতে হবে যেন পানি গাছের গোড়া দিয়ে না ঢুকে একটু দূর দিয়ে ঢুকে। চারা লাগানোর পর চারাটিকে একটি কাঠির সাথে সোজা করে বেঁধে দিতে হবে। চারা লাগানোর প্রথম দিকে পানি কম পরিমাণে সেচ দিতে হবে এবং ধীরে ধীরে পানি সেচের পরিমাণ বাড়াতে হবে। আমের চারা দ্রুত বৃদ্ধির জন্য ঘন ঘন পানি দিতে হয় এবং পর্যাপ্ত সূর্যের আলোর ব্যবস্থা আছে এমন স্থানে রোপণ করতে হয়। বাড়ির ছাদের টবে অথবা ড্রামে আমের চারার কলম লাগানোর পর পানি দিবেন। নিয়মিত পানি দিতে হবে। কলমের চারা যদি লম্বা হয় তখন ডালপালা মাটিতে লেগে যায় সেক্ষেত্রে ডালপালার আগা কেটে দিতে হবে। টব বা ড্রাম ছাদ থেকে কিছুটা উপরে রাখতে হবে তাহলে ছাদের কোন ক্ষতি হবে না। টব বা ড্রামের চার কোণায় চারটি ইট ব্যবহার করে উঁচু করে দেওয়া যেতে পারে বা অন্যান্য পদ্ধতিও অবলম্বন করা যেতে পারে।
আম গাছের পরিচর্যার বিষয়ে এই চাষি বলেন, আমগাছে বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় আক্রমণ করে ফসল নষ্ট করে। বিশেষ করে যখন গাছে মুকুল ধরে তখন পোকা আক্রমণ করে যার কারণে আম কুঁড়ি অবস্থায় ঝরে যায়। আবার যখন আম কিছুটা বড় হয় তখন আমের ভেতরেও পোকা হয়ে থেকে যায় ফলে ফলন খুব একটা ভালো হয় না। এসব সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য নিকটস্থ কৃষি বিভাগ থেকে পরামর্শ নিয়ে কীটনাশক ব্যবহার করা উচিত।
পরিশেষে তিনি বলেন, সাধারণত আম হচ্ছে একটি গ্রীষ্মকালীন ফল। আমাদের দেশে বৈশাখ শেষের দিকে ও জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রথমের দিকে আম সংগ্রহ করার উপযুক্ত সময়। আম সংগ্রহ করার সময় দু-তিনটি পাতাসহ বোঁটা কেটে আম সংগ্রহ করলে ভালো হয়। তাহলে আমের গুণগতমান ভালো থাকবে। বোঁটার নিচে অথবা আমের উপরিভাগ কিছুটা হলদে ভাব ধারণ করবে যাকে আমরা আধাপাকা বলে থাকি তখনই আম সংগ্রহ করতে হবে।
কৃষক অথবা তরুণদের উদ্দেশে বলেন, প্রজেক্ট হিসেবে কাজ শুরু করে এখন সফলতার মুখ দেখছেন তিনি। তার ওই বাগানে আছে, বারি-১১, কাটিমন, বানানা ম্যাংগো, গৌরমতি, বিশ্বনাথ চ্যাটার্জি, খিরসাপাত, আশ্বিনাসহ বিভিন্ন জাতের আম। এ ছাড়া অসময়ে আমের জন্য অন্যজাতের আম পরীক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। নিজেরসহ এলাকার লোকজনের কাজের কর্মস্থান হয়েছে। বাগান থেকে বিঘাপ্রতি তিন লাখ টাকার আম বিক্রি হবে।
আগামীতে এর চেয়ে অনেক বেশি হবে বলে আশা করছেন। তিনি ধারণা করছেন তার জীবনের একটা মোর ঘুরে যাবে। এদিকে সফল উদ্যোক্তা সেরাজুল ইসলামের সম্ভাবনায় আম উৎপাদনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এলাকায়, সরকারি প্রণোদনা পেলে বেশি বেশি আম উৎপাদন করে বাংলাদেশ তথা বিশ্বে রপ্তানি করে দেশ ও বিদেশের মানুষকে অসময়ে আমের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হবেন বলেন তিনি ।
গোমস্তাপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সীমা কর্মকার বলেন, কয়েক মাস আগে সেরাজুল ইসলামের বাগান পরিদর্শন করি। তাঁকে বাগান পরিচর্যার বিষয়ে অনেক রকম পরামর্শ দেয়া হয়েছে। অসময়ে এত বড় বারোমাসি বাগানের আম চাষি ও নতুন উদ্যোক্তা সেরাজুল ইসলামের লক্ষ্যমাত্রা দেখে তিনি মুগ্ধ। তিনি আরো বলেন, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তাকে প্রয়োজনীয় যতটুকু সাহায্য সহযোগিতা সম্ভব তা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এ ছাড়া তার বাগানের প্রজেক্ট বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাসহ অন্যান্য বিষয়ে সহযোগিতা করে যাবে উপজেলা কৃষি বিভাগ।

লেখক : ১আঞ্চলিক কৃষি তথ্য অফিসার, ২কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, রাজশাহী, মোবাইল : ০১৭৬৭৭৬৫৫৫৮; ইমেইল: ধসরহঁষ.ধরপড়@মসধরষ.পড়স

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন