কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫ এ ০৬:০৪ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: অগ্রহায়ণ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৬-১১-২০২৫
আন্তঃফসল চাষাবাদ ব্যবস্থাপনা
(আলু ও ডাল)
কৃষিবিদ মোঃ সেলিম
আন্ত:ফসল চাষ হলো একই জমিতে একই সময়ে একাধিক ফসলের চাষ করা। এর মাধ্যমে একই সাথে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন করে ফলন ও আয় বাড়ানো যায় এবং মাটির স্বাস্থ্যও ভালো রাখা যায়। এটিকে সাথী ফসল অথবা মিশ্র চাষও বলা হয়ে থাকে। আলু-ডাল আন্ত:ফসল চাষাবাদ একটি লাভজনক কৃষি প্রযুক্তি যেখানে একই জমিতে আলু ও ডাল জাতীয় শস্য একসাথে চাষ করা হয়। এটি মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে, উভয় ফসলের ফলন ও কৃষকের লভ্যাংশ বাড়ায়। গবেষণা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক উদ্ভাবিত নতুন নতুন উচ্চফলনশীল জাত, উন্নত প্রযুক্তি, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ও কৃষি বিজ্ঞানীদের সার্বিক প্রচেষ্টায় বিগত একযুগে হেক্টর প্রতি আলুর উৎপাদন অনেক বেড়েছে। কিন্তু ডাল ফসলের হেক্টর প্রতি গড় ফলন তেমন বাড়েনি। যার ফলে বাড়তি জনসংখ্যার আমিষের চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না এবং দেশে ডাল ফসলের ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে, বাংলাদেশে ডাল জাতীয় ফসলের আবাদকৃত জমির পরিমাণ ৬.৬১৮ লক্ষ হেক্টর যা উৎপাদিত ডালের পরিমাণ ৮.৪৬৬ লক্ষ মেট্রিক টন (কৃষি ডাইরি ২০২৫)। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতিদিন একজন মানুষের ৪৫ গ্রাম ডাল খাওয়া উচিত সেই তুলনায় আমরা ভক্ষণ করি গড়ে মাত্র ১৭ গ্রাম। অপর্যাপ্ত উৎপাদনের জন্য এদেশের জনগণের মাথাপিছু দৈনিক ডালের প্রাপ্যতা খুবই কম। সুতরাং আন্ত:ফসল চাষাবাদ উক্ত সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আলুর উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ডাল ফসলের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
ডাল শুটি জাতীয় ফসল হওয়ায় অপেক্ষাকৃত কম উর্বর জমিতেও ডালের চাষ করা যায়। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি মাটির উর্বরা শক্তি ও জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধিতে এবং অর্থনৈতিক খাতকে শক্তিশালী করতে ডালের আবাদ বাড়ানো একান্ত প্রয়োজন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটউট থেকে উচ্চফলনশীল বিভিন্ন জাত এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে। ডাল ফসল চাষে এসব প্রযুক্তি ও উন্নত জাত ব্যবহার করে অধিক ফলন পাওয়া সম্ভব। তাই ডাল ফসল চাষ করলে মাটিতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহের পাশাপাশি দেশে ডালের চাহিদা অনেকাংশে মেটানো সম্ভব হবে। এদিকে কৃষক আলুর জমিতে আলু ছাড়া অন্য কোনো ফসল চাষে আগ্রহী নয়। কাজেই বিপুল জনসংখ্যার পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে আলুর সাথে ডালের আন্ত:ফসল আবাদ প্রযুক্তিটি একটি সময়োপযোগী প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
প্রযুক্তির বৈশিষ্ট্য
প্রযুক্তিটি কৃষকের জন্য বেশ সহজলভ্য; আলু ফসল চাষ করতে ব্যবহৃত সার, কীটনাশক, সেচ দ্বারাই আলু-ডাল আন্ত:ফসল চাষাবাদ সম্ভব; আলুর সাথে ডাল ফসল রোপণ করলে আলুর ফলন কমবে না অথচ বাড়তি ফসল হিসেবে ডাল ফসল পাওয়া যাবে; আলু-ডাল আন্ত:ফসল চাষাবাদ ব্যবস্থাপনায় অগাছা দমনে অনেক শ্রম, সময় ও অর্থেও সাশ্রয় হয়; আলু ফসলের একক চাষের জন্য নিয়মিত কেইলে মাটি উঠিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হলেও আলু-ডাল আন্ত:ফসল চাষাবাদ ব্যবস্থাপনায় কেইলে মাটি উঠিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন; নাই আলু ও ডাল জাতীয় ফসল একত্রে চাষ করলে ডাল জাতীয় শস্যের শিকড় বায়ুম-লের নাইট্রোজেন মাটির উর্ববরতা বাড়ায় ফলে মাটির স্বাস্থ্য উন্নত হয়; একই জমিতে দুটি ফসল চাষ করার ফলে কৃষকরা তাদের জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারে; ডালজাতীয় শস্য আগাছা জন্মাতে বাধা দেয়, ফলে আগাছা দমনে খরচ কমে যায়; আলু ও ডাল জাতীয় ফসলের আন্ত:ফসল চাষাবাদ ব্যবস্থাপনা রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কমাতে সাহায্য করে যা কীটনাশকের ব্যবহার হ্রাস করে; আলু ও ডালজাতীয় ফসলের আন্ত:ফসল চাষাবাদ ব্যবস্থাপনা উভয় ফসলের ফলন বৃদ্ধি করে।
উপযোগী এলাকা : বাংলাদেশে আলুর চাষযোগ্য সকল এলাকা যেমন- দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, রংপুর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, জয়দেবপুর, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, যশোর, জামালপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বরিশাল, পটুয়াখালী ইত্যাদি অঞ্চলে এ প্রযুক্তি রবি মৌসুমে ব্যবহার করা যায়। প্রযুক্তিটির মাধ্যমে একসাথে আলু ও ডাল ফসল পাওয়া যাবে। বাংলাদেশে আলুর চাষযোগ্য সকল এলাকায় এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়।
আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট : দুটি ফসল একসাথে চাষ করার ফলে কৃষকরা তাদের আয় বৃদ্ধি করতে পারে। প্রযুক্তিটি আর্থিকভাবে বেশ লাভজনক, বাংলাদেশের বিপুল জনসংখ্যার জন্য একই সাথে শর্করা ও আমিষের চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রান্তিক চাষিরা স্বল্প পুজিতে আলু-ডাল আন্ত:ফসল চাষাবাদ প্রযুক্তির মাধ্যমে লাভবান হতে পারেন।
প্রযুক্তি ব্যবহারের তথ্য ও মাঠ পর্যায়ের তথ্য : প্রচলিত বর্তমান পদ্ধতিতে সারি থেকে সারি দূরত্ব ৬০ সেমি. ও বীজ থেকে বীজের দূরত্ব ২৫ সেমি. বজায় রেখে আস্ত আলু রোপণ করতে হবে। তবে আলু রোপনের পূর্বে ডাল ফসল ছিটিয়ে রোপন করতে হবে। আলু ও ডাল ফসল রোপণের পর কেইলে মাটি উঠিয়ে দিতে হবে। আলু-ডাল ফসল আন্ত:ফসল চাষাবাদের ক্ষেত্রে ডাল ফসলের বীজের হার, একক ডাল ফসলের বীজের হারের চেয়ে কিছুটা কম হবে। আলু-ডাল আন্ত:ফসল রোপণের জন্য জমি প্রস্তুত হওয়ার পর কন্দাল ফসল গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক সুপারিশকৃত মাত্রায় জৈব ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হবে। সেচ, আগাছা দমন ও অন্যান্য আন্ত:পরিচর্যা এবং বালাইনাশক সঠিকমাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। আলুর সাথে খেসারীর আন্ত:ফসল চাষের ক্ষেত্রে কৃষককে অধিক লাভবান হতে হলে বারি আলু-২৫ এর সাথে বারি খেসারি-৩ চাষ করতে হবে। রোপণের ৪৫ দিন পর থেকে এক সপ্তাহ পরপর খেসারি শাক তোলা যাবে এবং ৯৫ দিন পর আলু ফসল উত্তোলন করা যায়। এতে হিসাব করে দেখা যায় আলুসহ কৃষক প্রতি হেক্টরে ৩.৫ (তিন লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) টাকা মুনাফা পেতে পারে। বারি আলু-২৫ এর সাথে বারি মটর-৩ আন্ত:ফসল চাষাবাদ ব্যবস্থাপনায় কৃষক সর্বোচ্চ মুনাফা পেতে পারেন কারন এক্ষেত্রে রোপনের ৫০-৫৫ দিন পর উচ্চ মূল্যের সবজি হিসেবে মটরশুটি উত্তোলন করা যায়। তবে কৃষক চাইলে রোপনের ১০০ দিন পর আলু ও পাকা মটর একসাথে উত্তোলন করতে পারেন। আলু-মটর আন্ত:ফসল চাষাবাদ ব্যবস্থাপনায় আয়-ব্যয়ের অনুপাত হিসাব করে দেখা যায় কৃষক প্রতি হেক্টরে ৪ (চার) লক্ষ টাকা লাভ করতে পারেন যা শুধু আলু চাষ করে কখনোই সম্ভব হবে না। আলু ও ছোলা আন্ত:ফসল চাষাবাদ ব্যবস্থাপনায় আয়-ব্যয়ের অনুপাত পর্যলোচনা করে দেখা যায় কৃষক উচ্চ আমিষ সমৃদ্ধ ডাল ফসল কৃষক ছোলার পাশাপাশি শর্করা সমৃদ্ধ আলু একসাথে বাজারে বিক্রি করে অধিক মুনাফা ঘরে আনতে পারে। আলু ও ছোলা আন্ত:ফসল চাষাবাদ ব্যবস্থাপনায় প্রতি হেক্টরে কৃষক প্রায় ৩.৫-৪.০ লক্ষ টাকা আয় করতে পারে। গরীবের মাংস বলে পরিচিত মসুর ডাল আলুর সাথে আন্ত:ফসল চাষাবাদের মাধ্যমে আয়-ব্যয়ের অনুপাত পর্যালোচনা করে কৃষক প্রতি হেক্টরে প্রায় ৩-৩.৫ লক্ষ টাকা আয় করতে পারেন যা একক ফসল চাষে সম্ভবপর নয়।
প্রযুক্তি হতে ফলন প্রাপ্তি : শাক হিসেবে খেসারি ও মটরশাক সংগ্রহ করা। সবজি হিসেবে ৬০-৭০ দিনের মধ্যে সবুজ মটর সংগ্রহ করা যায়। ডাল হিসেবে সংগ্রহ করতে চাইলে পরিপক্ব অবস্থায় ৯৫-১০০ দিন পর সংগ্রহ করতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তা (আলু) ও পুষ্টি চাহিদা (ডাল ফসল) একসাথে পূরণ হবে।
লেখক : বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, কন্দাল ফসল গবেষণা উপকেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, মুন্সিগঞ্জ। মোবাইল : ০১৯১৬৯০১৭৪৩,