কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২৩ এ ০৮:৪২ PM

SAU স্মার্ট সোলার সান ড্রায়ার : নিরাপদ শুঁটকি মাছ উৎপাদন ও রপ্তানির হাতিয়ার

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: অগ্রহায়ণ সাল: ১৪৩০ প্রকাশের তারিখ: ১৬-১১-২০২৩

SAU স্মার্ট সোলার সান ড্রায়ার : নিরাপদ শুঁটকি মাছ উৎপাদন ও রপ্তানির হাতিয়ার
মোঃ মাসুদ রানা
মাছ হচ্ছে প্রানিজ আমিষের অন্যতম প্রধান উৎস, মাছ আমরা বিভিন্নভাবে খেয়ে অভ্যস্ত। যেমন ৭০-৮০ শতাংশ মাছ আমরা সরাসরি রান্না করে খেয়ে থাকি। সরাসরি রান্না না করে মাছ দীর্ঘদিন সংরক্ষণের অনেকগুলো পদ্ধতি আছে তার মধ্যে মাছ থেকে রোদ ও বাতাসের সহায়তায় পানি বের করে দিয়ে সংরক্ষণ যা শুঁটকি মাছ বলে আখ্যায়িত হয়, লবণ দিয়ে মাছ সংরক্ষণ, বরফ দিয়ে সংরক্ষণ, ধোঁয়া দিয়ে মাছ সংরক্ষণ ও কাচা মাছকে প্রক্রিয়াজাতকরণ করে বিভিন্ন মৎস্যজাত পণ্য উৎপাদন করে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ উল্লেখযোগ্য। মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ করে সংরক্ষণের যতগুলো পদ্ধতি চলমান আছে তার মধ্যে সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো রোদে মাছ শুকিয়ে সংরক্ষণ করা, যা বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় যুগ যুগ ধরে অনুসরণ করে আসছে। দিনের বেলা মাছের শরীরে রোদ পড়ে, যা মাছের শরীর থেকে পানি বের করে দেয় এবং প্রবাহমান বাতাস মাছের শরীরের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মাছকে পানিশূন্য করে শুকিয়ে ফেলে। মাছ পচনের জন্য দায়ী অণুজীবসমূহের বেঁচে থাকা ও বংশবৃদ্ধি পরিপূর্ণভাবে নির্ভর করে মাছের শরীরের উপস্থিত পানির পরিমাণের উপর, যদি তা না থাকে তাহলে অণুজীবসমূহ বংশবৃদ্ধিও করতে পারে না এবং পচনও ঘটে না। ফলশ্রুতিতে শুঁটকি মাছ সাধারণ তাপমাত্রায় দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়।
বাংলাদেশে আদিকাল থেকে যে পদ্ধতিতে মাছ শুকানো হয় তা হলো খোলা আকাশের নিচে চাটাই বা মাচার উপর জলাশয়, নদী বা সমুদ্র থেকে ধৃত মাছ ছড়িয়ে। প্রচলিত পদ্ধতিতে মাছ শুকানোর প্রতিবন্ধকতাগুলো হচ্ছে-
া    যেহেতু উন্মুক্ত পরিবেশে মাছ শুকানো হয় সেহেতু মাছের শরীরে পানির পরিমাণ বেশি থাকে। মাছ একটি অন্যতম পচনশীল দ্রব্য হওয়ার কারণে দ্রুত সময়ে না শুকানোর কারণে মাছ পচতে শুরু করে এবং মাছের শরীরে বিদ্যমান পুষ্টি উপাদানগুলো ভেঙে অন্য উপাদানে পরিণত হতে শুরু করে যা মানব শরীরের  জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
    মাছের শরীরে বিদ্যমান চর্বি তাপ ও অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে অক্সিডাইজড হয়ে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে, যা  মাছ শুকানোর পরেও মাছের শরীরে বিদ্যমান থাকে। ফলশ্রুতিতে অধিকাংশ ভোক্তা দুর্গন্ধের কারণে শুটকী মাছ পছন্দ করেন না।
  প্রচলিত পদ্ধতিতে যে কাঁচামাল ব্যবহার করা হয় তা খুব কম গুণগতমানসম্পন্ন ফলে খোলা বাতাসে ছড়ানোর সাথে সাথে পচন শুরু হয়। মাছ শুকানোর জায়গা খোলামেলা হওয়ার কারণে মাছি ও অন্যান্য পোকামাকড় মাছের শরীরে বসে এবং তারা সেখানে জায়গা করে ডিম দেয় এবং বংশবৃদ্ধি করে। পোকামাকড় রোধ করার জন্য উৎপাদকরা বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক ব্যবহার করে থাকেন যেমন-ডিডিটি, এলড্রিন, ডায়ালড্রিন। শুঁটকি মাছ উৎপাদকগণ যে সকল রাসায়নিক মাছের শরীরে ব্যবহার করেন তার সবগুলোই মানব স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এবং ক্যান্সারের বাহক।
আমাদের দেশে যেমন শুঁটকি মাছের কদর আছে তেমনি বিশ্ব বাজারে শুঁটকি মাছের রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। আমাদের দেশের শুঁটকি মাছ রপ্তানির অন্যতম বাধা হলো আমাদের উৎপাদিত শুঁটকি মাছ নিরাপদ না। ফলে আমাদের দেশে বিপুল পরিমাণে শুঁটকি মাছ উৎপাদন করলেও রপ্তানি করে বৈদশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারছি না। এখন প্রয়োজনের তুলনায় অধিক মাছ উৎপাদন হচ্ছে এবং দেশে রয়েছে বিশাল সমুদ্র। যদি নিরাপদ ও স্বাস্থ্য সম্মত শুঁটকি মাছ উৎপাদন করা যায় তাহলে বাংলাদেশে যেমন ভোক্তার সংখ্যা বাড়বে তেমনি বিশ্ববাজারে নিরাপদ শুঁটকি রপ্তানি করে দেশের অর্থনিতীতে অবদান রাখা সম্ভব হবে। অধিকন্তু দেশের বেকারত্ব দূরীকরণেও সহায়ক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
নিরাপদ শুঁটকি মাছ উৎপাদন, প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদিত শুঁটকি মাছের সমস্যাগুলো সমাধান ও রপ্তানি বাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে আমি লেখক ও প্রফেসর ড. কাজী আহসান হাবীব মৎস্য অধিদপ্তরের সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পের আর্থিক সহায়তায় উদ্ভাবন করা হয়েছে। ‘ঝঅট স্মার্ট সোলার সান ড্রায়ার’ যা দেশের প্রথম আইওটি বেইজড মাছ শুকানোর যন্ত্র। উদ্ভাবিত যন্ত্রটিতে স্মার্ট টেকনোলজি ব্যবহার করে অটোমেশন করা হয়েছে ফলে ড্রায়ারটি নিজের ড্রায়িং এনভায়ারমেন্ট নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। উদ্ভাবিত ড্রায়ারটিতে সোলার ব্যবহার করা হয়েছে যেখান থেকে ব্যাটারিতে শক্তি সঞ্চিত হয় যা রাতের বেলা তাপ সৃষ্টিতে ব্যবহার করা হয়।
উদ্ভাবিত ড্রায়ারটি দিনের সূর্যের তাপ ব্যবহার করে মাছ শুকাবে রাতের বেলা সোলার থেকে প্রাপ্ত শক্তির সহায়তায় হিটারের মাধ্যমে রাতের বেলা বা সূর্যের অনুপস্থিতিতে তাপ সৃষ্টি করবে ফলে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা মাছ থেকে পানি অপসারণ হবে। মেশিনটিতে ২টি এক্সজাস্ট ফ্যান ব্যবহার করা হয়েছে, যা মাছ থেকে বের হওয়া পানি দ্রুত সময়ের মধ্যে বাইরে বের করে দিবে এবং হিউমিডিটি নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে। মেশিনটির ভেতরে ১টি রোটেটিং ফ্যান ব্যবহার করা হয়েছে যা, ভেতরে তাপ সমভাবে বিন্যাস্ত করবে যা যন্ত্রটির সকল র‌্যাকে মাছ থেকে পানি বের করে দিতে সহায়তা করবে। প্রচলিত পদ্ধতিতে মাছ শুকানোর জন্য দিনের বেলা সময় পাওয়া যায় ৫-৭ ঘণ্টা/দিন কিন্তু উদ্ভাবিত ড্রায়ারটিতে ২৪ ঘণ্টা মাছ শুকানো যাবে ফলে মাছ শুকানোর সময় ৬০% কমে আসবে। একই সময়ে দ্বিগুণ পরিমাণ শুঁটকি মাছ উৎপাদন করে দ্বিগুণ মুনাফা অর্জন করা সম্ভবপর হবে। যেহেতু  ড্রায়ারটি সম্পূর্ণ উচ্চমাত্রার সহনশীল পলিথিন দিয়ে ঘেরা সেহেতু ভেতরে মাছি বা অন্য পোকামাকড় প্রবেশের কোন সুযোগ নাই তাই বিষ প্রয়োগের দরকার পড়বে না ফলে উৎপাদিত শুঁটকি মাছ হবে ভোক্তার জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ। ড্রায়ারটিতে সেনসর বেইজড সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছে যা মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং মেশিনটির ভেতরের সকল প্যারামিটারের মান মোবাইলে আসে। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে যন্ত্রটির ভেতরে তখনও মাছ শুকাবে কারণ দিনের বেলা মাত্র ৩-৪ ঘণ্টা রোদের তাপ পেলেই সোলার ও ব্যাটারি স্বয়ংক্রিয় থাকবে।
শেরোবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভাবিত ড্রায়ারটি ইতোমধ্যে কক্সবাজারের নাজিরাটেক এ অবস্থিত দেশের বৃহত্তম শুঁটকি পল্লীতে তিনটি গ্রুপে ০৩টি বিনামূল্য সরবরাহ করা হয়েছে যেখানে তারা নিরাপদ শুঁটকি উৎপাদন করছে, সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ড্রায়ারটি দেশের সকল শুঁটকি উৎপাদনশীল এলাকায় সরবরাহ করে নিরাপদ শুঁটকি উৎপাদন করে বিদেশে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করা এবং দেশের বেকারত্ব দূরীকরণে সবসময় কাজ করে যাবে বলে উদ্ভাবকগণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
পরিশেষে বলা যায়, উদ্ভাবিত ড্রায়ারটি যেমন নিরাপদ শুঁটকি উৎপাদনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে তেমনি  বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনে রাখবে অনন্য ভূমিকা। এককথায় বলা যায় ড্রায়ারটি হবে স্মার্ট বাংলাদেশের জন্য স্মার্ট টেকনোলজির  এক অনন্য প্রয়াস।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ফিশিং অ্যান্ড পোস্ট হার্ভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা-১২০৭, মোবাইল: ০১৭৪৫৬২৬১৫৩, ই-মেইল :ranadof.bd@yahoo.com

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন