কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২৪ এ ০৫:০১ PM

সুস্বাদু মাংসের উৎস হিসেবে পেকিন হাঁস পালন : সুযোগ ও সম্ভাবনা

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: মাঘ সাল: ১৪৩০ প্রকাশের তারিখ: ৩১-০১-২০২৪

সুস্বাদু মাংসের উৎস হিসেবে পেকিন
হাঁস পালন : সুযোগ ও সম্ভাবনা
ডা: মোঃ সোলায়মান হোসাইন১ মোঃ শাহরিয়ার হায়দার২ শাহরিয়ার আল মাহমুদ৩
কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে কাজ করে চলেছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত শীর্ষ উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। পল্লী এলাকার জনগণের আর্থিক সক্ষমতাকে বৃদ্ধি করতে বরাবরই সম্ভাবনাময় কৃষি প্রযুক্তি, নতুন জাত প্রভৃতি নিয়ে গ্রামীণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে পিকেএসএফ। কেবলমাত্র নতুন প্রযুক্তি সম্প্রসারণই ৯ সদস্যদেরকে কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের সহযোগী হিসাবে কাজ করছে জাতীয় ও আন্তর্জাাতিক পরিম-লে সুপরিচিত এ প্রতিষ্ঠান। প্রাণিসম্পদ খাতে এমনই একটি সম্ভাবনাময় উপখাত হলো সুস্বাদু ও অধিক মাংস উৎপাদনশীল পেকিন জাতের হাঁসের খামার স্থাপন কার্যক্রম। আমাদের স্থানীয় জাতের অধিকাংশ হাঁসই সুস্বাদু ও অধিক মাংস উৎপাদনশীল নয়, এগুলো মূলত ডুয়াল টাইপ অর্থাৎ একই সাথে ডিম এবং মাংস উভয়ই উৎপাদন করে থাকে। এ জাতীয় হাঁস বছরে গড়ে ১২০টি ডিম দেয় ওজন হয় ১.৫ থেকে সর্বোচ্চ ২.০ কেজি এবং এ ওজন হতে সময় লাগে ন্যূনতম ৬-৭ মাস। এ সকল হাঁসে মাংসের পরিমাণ কম থাকায় হাড়ের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি হয়, ফলে ভোজন রসিকদের তৃপ্তি পরিপূর্ণতা পায় না। দেশে ক্রমবর্ধমান হাঁসের মাংসের চাহিদার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সুস্বাদু ও অধিক মাংস উৎপাদনশীল পেকিন জাতের হাঁসের প্যারেন্ট স্টক আমদানি করছে এবং বাচ্চা উৎপাদন করে খামারি পর্যায়ে সরবরাহ করছে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ জাতের হাঁস সম্প্রসারণে সরকারের পরিপূরক হিসেবে পিকেএসএফ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে। পেকিন জাতের হাঁসের উৎপত্তিস্থল চীন দেশ হলেও বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অধিক উৎপাদনশীল স্ট্রেইন উৎপাদন ও বিপণন করে আসছে।
পেকিন হাঁসের বৈশিষ্ট্য
    দেশি হাঁসের তুলনায় আকারে প্রায় দ্বিগুণ, ধবধবে সাদা পালকে আবৃত শরীর এবং ঠোট ও পায়ের পাতা কমলা রঙের;
    আট সপ্তাহ বয়সে পুরুষ হাঁসের ওজন সর্বোচ্চ ৪ কেজি এবং মাদি হাঁসের ওজন ৩.৭ কেজি হয়ে থাকে;
    এ জাতের হাঁসের খাদ্যকে মাংসে রূপান্তর করার দক্ষতা প্রায় ২.৭; এবং
    এ জাতের হাঁস পালনে পুকুরের কোন  প্রয়োজনীয়তা নেই বরং মাচা পদ্ধতিতে মুরগির মতো পালন করা যায়।
পেকিন জাতের হাঁস পালনে করণীয় বিষয়সমূহ
বাচ্চা সংগ্রহ ও পরিবহন : গুণগত মানসম্পন্ন পেকিন জাতের হাঁসের বাচ্চা সংগ্রহ করতে হবে। সরকারি হাঁসের খামারসহ সুনাম আছে এমন হ্যাচারি হতে সুস্থ সবল বাচ্চা সংগ্রহ করতে হবে। বাচ্চা উৎপাদনকারীর নিকট হতে বাচ্চার দৈহিক বৃদ্ধি সম্পর্কিত তথ্য, খাদ্য রূপান্তরের দক্ষতা হার, বাচ্চা মৃত্যুর হার ইত্যাদি বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। বিশেষত নাভি শুকানো বাচ্চা দেখে নিতে হবে। বাচ্চা পরিবহনের সময় গাড়িতে অতিরিক্ত ঝাঁকুনি লাগানো যাবে না এবং প্রখর সূর্যের আলো থেকে রক্ষা করতে হবে।
আবাসন ব্যবস্থাপনা : সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করতে হলে মাচা পদ্ধতিতে পালন করা উত্তম। বাচ্চা সংগ্রহের পূর্বেই ঘর পরিষ্কার করে জীবাণুনাশক দিয়ে ঘর ও লিটার স্প্রে করতে হবে। বাচ্চা তোলার ১২ ঘণ্টা পূর্বেই চিকগার্ডের ভেতরে এক ইঞ্চি পরিমাণ উঁচু করে লিটার বিছিয়ে তাপ দেবার জন্য ব্রুডার চালু রাখতে হবে। সর্বোচ্চ ২৫০টি বাচ্চার জন্য একটি ব্রুডার দিলে সবচেয়ে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। তাপমাত্রা পরিমাপের জন্য ব্রুডারের নিচে থার্মোমিটার রাখতে হবে। প্রতি ১০০টি বাচ্চার জন্য ৫-৬টি ছোট গোলাকার খাদ্য পাত্র এবং ৫টি পানির পাত্রের ব্যবস্থা রাখতে হবে। ব্রুডারে ছাড়ার পর বাচ্চাকে প্রথম ৫-৬ ঘণ্টা স্যালাইন ও ভিটামিন-সি মিশ্রিত পানি খাওয়াতে হবে এবং একইসাথে স্টাটার ক্রাম্বল ফিড সরবরাহ করতে হবে। এ সময় ব্রুডারে বাচ্চার অবস্থান দেখে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বাচ্চার ব্রুডিং বা তাপ ব্যবস্থাপনা : হাঁসের বাচ্চাকে ৭-১০ দিন বয়স পর্যন্ত কৃত্রিম উপায়ে তাপ প্রদান করাকে ব্রুডিং বলে। এ সময়ে সাধারণত ব্রুডারের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রাখতে হয় এবং ২৪ ঘণ্টা আলো প্রদান করতে হয়।
হাঁসের ঘর নির্মাণ : বন্যা বা বৃষ্টিতে পানি জমে না এমন উঁচু জমিতে মাটি হতে ২.৫ ফুট উঁচুতে মাচা তৈরি করতে হবে। ঘরের বেড়া প্লাস্টিক বা লোহার তারের জালি এবং টিনের চালা দেয়া যেতে পারে। প্রতি ১০০টি পেকিন জাতের হাঁসের জন্য ২০ হাত লম্বা (৩০ ফুট) এবং ৭ হাত (১০ ফুট) চওড়া ঘর হলে ভালো হয়। ঘরে এমনভাবে বেড়া দিতে হবে যাতে হাঁসের শরীরে পর্যাপ্ত বাতাস লাগে। ঘরের চতুর্দিকে ৪-৫ ফুট দূরত্বে নেট দিয়ে বেড়া দিয়ে বাফার এলাকা নির্মাণ করে দিলে খামারে রোগের সংক্রমণ অনেকাংশে হ্রাস পায়।
তাপ ও আলোক ব্যবস্থাপনা : বয়স অনুযায়ী পেকিন হাঁসের তাপ ও আলোক ব্যবস্থাপনা নিম্নে দেয়া হল-
খাদ্য ব্যবস্থাপনা : সাধারণত মাংস উৎপাদনশীল জাতের হাঁসকে প্রথম সপ্তাহে ক্রাম্বল এবং ২য় হতে ৮ম সপ্তাহ পর্যন্ত পিলেট জাতীয় খাদ্য সরবরাহ করতে হবে এবং যতটুকু খাবার খেতে পারে ততটুকু খাবার সরবরাহ করতে হয়। ঋববফ ঈড়হাবৎংরড়হ জধঃরড় (ঋঈজ) এর দিকে লক্ষ্য রাখতে হয়। কাক্সিক্ষত ওজন নিশ্চিত হচ্ছে কি-না তা যাচাই করার জন্য দৈবচয়ন ভিত্তিতে হাঁসের ওজন করে দেখতে হবে। খামারের জন্য ক্রয়কৃত খাদ্য শুকনা জায়গায় রাখতে হবে। দুই সপ্তাহ সময়ের বেশি সময় খাদ্য মজুদ করে না রাখাই উত্তম, কেননা এতে মোল্ড বা ছত্রাকের সংক্রমণ ঘটতে পারে। পোকামাকড় বা ইদুর দ্বারা খাদ্য যেন দুষিত না হয় সে বিষয়টিতে গুরুত্বারোপ করতে হবে।
পানি ব্যবস্থাপনা : হাঁস যতটুকু খাদ্য খায় তার দ্বিগুণ পরিমাণ পানি পান করে। তাই হাঁসের খামারে সার্বক্ষণিক পরিষ্কার ও পানযোগ্য পানি সরবরাহের ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে।  
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা : খামারের অভ্যন্তরে যেন বাইর হতে কোন জীবাণু প্রবেশ করতে না পারে সে ব্যবস্থা রাখতে হবে আর খামারে সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ থাকবে। প্রতিবার খামারে প্রবেশের পূর্বে ও পরে হাত-পা জীবাণুনাশক স্প্রে করে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। খামারে উৎপাদিত বর্জ্য নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। খামারে কোন হাঁস অসুস্থ হলে সেটিকে দ্রুত সুস্থ হাঁস হতে পৃথক করতে হবে। খামারে জটিল কোন সমস্যা হলে সাথে সাথে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে এবং নিম্নোক্ত টিকা প্রদান কর্মসূচি অনুসরণ করতে হবে-
মূলত দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেকারত্ব হ্রাসে পেকিন জাতের হাঁস পালন একটি উল্লেখযোগ্য আয় বর্ধনমূলক কর্মকা- হতে পারে। এ হাঁস পালন করলে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ (যাদের কাছে থেকে উপকরণ বা উপাদান সংগ্রহ করে উৎপাদনের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করা হয়) এ পেকিন জাতের হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন ও বিপণন, খাদ্য উৎপাদনকারী ও বিপণনকারী, ভ্যাকসিন উৎপাদন, ভ্যাকসিন প্রয়োগকারী এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদানকারী খাত যেমন গতিশীলতা অর্জন করতে পারে অপরদিক ফরোয়ার্ড লিংকেজ (যাদের মাধ্যমে ভোক্তার নিকট উৎপাদনকারী কর্তৃক উৎপাদনকৃত জিনিস পৌঁছায়) এর আওতায় পাইকার-ফড়িয়া, হাঁস-মুরগি বিক্রেতা, সুপারশপ প্রভৃতি খাতও মজবুত ভিত্তি পেতে পারে আর ভোক্তা পেতে পারে নিরাপদ ও সুস্বাদু মাংস। ফলশ্রুতিতে উপকৃত হতে পারে সমগ্র প্রাণিসম্পদ খাত সংশ্লিষ্ট সকল ব্যবসায়ী ও ভোক্তাগণ। শত বিপত্তি উপেক্ষা করে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হতে প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি খাতের আন্তরিক সমন্বয়। পিকেএসএফের  আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় সদস্যপর্যায়ে বাস্তবায়িত প্রদর্শনীতে উৎপাদিত মাংস নিরাপদ, কেননা এ সকল ক্ষেত্রে বেস্ট ম্যানেজমেন্ট প্র্যাকটিস অনুসরণ করায় খামারে রোগের সংক্রমণ হয় না বললেই চলে। খামারে যদি কোন কারণে রোগের বিস্তার ঘটে তাহলে রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারিয়ান দ্বারা চিকিৎসা প্রদান করা হয়। এন্টিবায়োটিক ঔষধ প্রয়োগ করা হলে ন্যূনতম মেয়াদের উইথড্রল পিরিওড (ঔষধ প্রত্যাহারকাল) অনুসরণ করা হয় যেন মাংসে কোন এন্টিবায়োটিক রেসিডিউ না থাকে। পিকেএসএফ এর সহযোগী সংস্থা নড়িয়া উন্নয়ন সমিতির (নুসা) সদস্য লাকিয়া বেগম, স্বামী: মজিবর হাওলাদার, কদমফুল মহিলা সমিতি, গ্রাম: সোন্ডা, ইউনিয়ন: ডিঙ্গামানিক, উপজেলা: নড়িয়া, জেলা: শরীয়তপুর কর্তৃক ৬০ দিন মেয়াদে পেকিন হাঁস পালন সংক্রান্ত আয়-ব্যয়ের তথ্য সারণি-১ দ্রষ্টব্য।লেখক : ১মহাব্যবস্থাপক, ২ব্যবস্থাপক এবং ৩উপ-ব্যবস্থাপক, সমন্বিত কৃষি ইউনিট, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ), আগারগাঁও, ঢাকা-১২০৭। মোবাইল নম্বর: ০১৬৮২ ৭৫৮৫২৬; ই-মেইল:shahriar67bau@gmail.com;;

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন