সারের যথেচ্ছ ব্যবহার
ও মাটির স্বাস্থ্য
মোঃ মোতাসীম আহম্মদ
মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ ও ফসলের ফলন বৃদ্ধির জন্য আমরা সচারাচর সার ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু সারের পরিমাণ বা মাত্রা নিয়ে আমরা খুব কমই চিন্তা করি। অথচ পরিমাণমত সার প্রয়োগেই কেবল মৃত্তিকা পরিবেশ ভালো রেখে লাভজনক ফলন দিতে পারে। আমরা সার ব্যবহার করি প্রধানত দুইটি কারণে। প্রথমত, মাটির উর্বরতা শক্তি সঠিক মানে রাখার জন্য অর্থাৎ ফসলের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের মাত্রা ঘাটতি থেকে উচ্চতর পর্যায়ে রাখা এবং দ্বিতীয়ত কোনো নির্দিষ্ট ফসলের নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের চাহিদা থাকতে পারে এবং সে অনুযায়ী পুষ্টি উপাদানের মান পরিমিত মাত্রার উপরে রেখে সুষম সরবরাহ নিশ্চিত করা।
সার প্রয়োগ করার সময় ও প্রয়োজনীয়তা
বর্তমানে হাইব্রিড বা উচ্চফলনশীল আধুনিক জাতের ফসল আবাদ করে থাকি। ফসলের বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য উদ্ভিদ পুষ্টি উপাদানের সহজলভ্যতা সময়মতো সঠিক রাখা জরুরি। মাটিকে অধিক পরিমাণে বা প্রয়োজনীয় পরিমাণ পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করতে সক্ষম করার জন্য সার ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
আমরা প্রধানত ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি, এমওপি, গন্ধক, দস্তা, বোরণ ও জৈবসার ব্যবহার করে থাকি। কৃষকের মাথায় সবসময় একটি চিন্তা থাকে যে, তার জমিতে যেন সর্বোচ্চ ফলনই হয়। যার ফলে সারের প্রয়োগ সুষম হয় না বা অতিরিক্ত প্রয়োগ হয়ে থাকে।
রাসায়নিক সার বনাম জৈবসার
রাসায়নিক সারের কার্যক্রম জৈবসারের তুলনায় খুবই দ্রুত। রাসায়নিক সার অধিক পরিমাণ পুষ্টি উপাদান ধারণ করে, অন্যদিকে এর উদ্ভিদ সহজলভ্যতাও দ্রুত, যার ফলে কৃষকের ফলাফল সচক্ষে দেখতে পায়। যেমন, ইউরিয়া সার প্রয়োগের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ফসলে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু রাসায়নিক সারের অতিমাত্রায় ব্যবহার কৃষি পরিবেশ ও প্রতিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। মাটিতে এর বিরূপ প্রভাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মাটির অম্লত্ব বৃদ্ধি, বিভিন্ন ধরনের ফসলের বিষক্রিয়া এবং মৃত্তিকার অণুজীবের উপর ক্ষতিকর প্রভাব।
অপরপক্ষে জৈবসার বিভিন্ন প্রকার পুষ্টি উপাদান ধারণ করে, তবে এর পরিমাণ শতকরা হিসাবে কম। আবার এই পুষ্টি উপাদান ফসলের জন্য সহজলভ্য হতে কিছুটা বেশি সময় প্রয়োজন হয়। তবে জৈবসার মাটিতে বিদ্যমান অণুজীবের বাসস্থান হিসেবে কাজ করে। এ বিচারে মাটির জৈব অংশকেই মাটির প্রাণ বলা হয়, যার পরিমাণ আয়তন হিসাবে ২.৫% এর বেশি থাকার কথা। কোনো জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ কম থাকা মানে হলো ঐ মাটির জীবনীশক্তি কমে যাওয়া।
বাংলাদেশের আবহাওয়ায় জমিতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ পুষ্টি উপাদান বজায় রাখা খুবই কঠিন। আবহাওয়া প্রতিনিয়ত পরিবর্তন, তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তনের ফলে প্রতিনিয়ত জৈব পদার্থ ক্ষয় হয়ে যায়। এজন্য প্রতি বছর বা প্রতি ফসলে পরিমাণমতো জৈবসার প্রয়োগ জরুরি।
বাংলাদেশে রাসায়নিক সারের ব্যবহার
বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি রাসায়নিক সারের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে আবাদী জমি ছিল ৮১.১০ লাখ হেক্টর এবং মোট রাসায়নিক সারের ব্যবহার ছিল ৬৫.৫৩ লাখ মেট্রিক টন। যা গত বছর অর্থাৎ ২০২৩-২৪ সালে ছিল ৬৮.১৩ লাখ টন এবং এটা প্রায় শতকরা ১৮ ভাগ বেশি এবং প্রতি হেক্টরে ব্যবহার করা হয়েছে ৩৯০ কেজিরও বেশি রাসায়নিক সার।
রাসায়নিক সারের ব্যবহার সীমিত রাখতে করণীয়
া ফসল বিন্যাসভিত্তিক সার প্রয়োগ করা প্রয়োজন। ইউরিয়া সার ছাড়া বাকি প্রয়োগকৃত সার এর একটি নির্দিষ্ট অংশ জমিতে থেকে যায়। জৈবসার থেকেও ফসল কিছু অংশ পুষ্টি উপাদান পেয়ে থাকে। সারের পরিমাণ হিসাব করার ক্ষেত্রে সেই অংশটিও গ্রহণ করতে হবে।
া সার প্রয়োগ পদ্ধতি মেনে চলতে হবে। জোঁ অবস্থায় সার প্রয়োগ করলে সারের ব্যবহার সীমিত করা সম্ভব। পাশাপাশি পলি মালচিং ব্যবহার করে মাটির আদ্রতা সংরক্ষিত থাকে, আগাছা নিয়ন্ত্রণ এবং সার ও সেচের প্রয়োজন কম হয়।
া প্রয়োগকৃত নাইট্রোজেন এর ৬০% এরও বেশি বিভিন্ন উপায়ে মাটি থেকে হারিয়ে যায়। কাজেই প্রতিটি ফসলের প্রয়োজন অনুযায়ী ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হবে। কোনো সবুজ সারজাতীয় ফসল উৎপাদনে বায়োমাস হেক্টরে ১২-১৫ টন হলে সবুজ সারের পরবর্তী ফসলে হেক্টরপ্রতি ২৫ থেকে ৩০ কেজি নাইট্রোজেন কম প্রয়োগ করতে হবে। যদি শুটিজাতীয় ফসলের (গ্রেইন লিগিউম) জ্বালানি অংশটুকু (ঝঃড়াবৎ) মাটিতে মেশানো হয় তা হলে হেক্টরপ্রতি ৮-১০ কেজি নাইট্রোজেন কম প্রয়োগ করতে হবে।
া নিম্ন ও উচ্চ পিএইচ সম্পন্ন উভয় মাটিতে ফসফরাসের প্রাপ্যতা কম। শতকরা ১৫ থেকে ২৫ ভাগ এবং ফসফেট সার প্রয়োগের পর এর অবশিষ্ট অংশ মাটিতে থেকে যায়। অধিক অম্ল থেকে মৃদু ক্ষার মাটিতে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ফসলে ফসফরাসের হার ধান ও পাটের জন্য শতকরা ৪০-৫০ ভাগ এবং ভুট্টা, শাকসবজি, মসলা ও ডালের জন্য শতকরা ৩০-৪০ ভাগ কম প্রয়োগ করতে হবে। অধিক অম্ল ও চুনযুক্ত মাটিতে শুধুমাত্র ধান ও পাটের জন্য শতকরা ৩০-৪০ ভাগ কম প্রয়োগ করতে হবে। ভুট্টা, শাকসবজি, মসলা এবং ডালের জন্য পূর্ণমাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।
া হালকা বুনট, সোপান এবং পিডমেন্ট মাটিতে পটাশিয়ামের প্রাপ্যতা কম। ধান, কন্দ, পাট, আখ, ফল ও সবজি ফসলের পটাশিয়াম এর চাহিদা বেশি। পটাশিয়াম মাটি পরিমিত হলেও রক্ষণাবেক্ষণ ডোজ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। আলু, আখ এবং শাকসবজি পরবর্তী ফসলে পটাশিয়াম প্রয়োগ ৩০-৪০% হ্রাস করা যেতে। পটাশিয়াাম পরবর্তী ফসলে ২০-৪০% হ্রাস করা যেতে পারে যদি প্রতি হেক্টরে ২-৪ টন ফসলের অবশিষ্টাংশ থাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়।
া অনেক ক্ষেত্রে পটাশ সার প্রয়োগ করেও পটাশিয়ামের প্রয়োগ সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় না। সে কারণে জমিতে পটাশিয়াম পরিমিত পরিমাণে থাকা সত্ত্বেও মেইনটেনেন্স ডোজ হিসেবে পটাশিয়াম প্রয়োগ করতে হবে।
া যদি পটাশিয়াম উচ্চমাত্রায় জমিতে প্রয়োগ করা হয় তাহলে গোল আলু, ভুট্টা, তামাক, আখ, শাকসবজি এবং মসলা আবাদের পরবর্তী ফসলে সুপারিশকৃত মাত্রার শতকরা ৩০-৪০ ভাগ পটাশিয়াম কম প্রয়োগ করতে হবে।
া যদি প্রতি হেক্টর জমিতে ২-৪ টন শস্যের অবশিষ্টাংশ/ধানের খড় সঠিকভাবে পুনঃ আবর্তন করা হয় তাহলে পরবর্তী ফসলে শতকরা ২০-৪০ ভাগ পটাশিয়াম কম প্রয়োগ করতে হবে।
া খরিফ মৌসুমে উচ্চ তাপমাত্রার কারণে পটাশিয়াম অবমুক্তির বা জবষবধংব এর পরিমাণ বেশি তাই সুপারিশকৃত মাত্রা থেকে শতকরা ১০-১৫ ভাগ পটাশিয়াম কম প্রয়োগ করতে হবে।
া ‘আপল্যান্ড’ ফসল (অর্থাৎ ধান ফসল বাদে) আবাদের ক্ষেত্রে গন্ধকের প্রাপ্যতা/লভ্যতা বেশি এবং অন্যদিকে ওয়েটল্যান্ড ধান ফসল আবাদের ক্ষেত্রে গন্ধকের প্রাপ্যতা/লভ্যতা কম। এ উপাদানের উল্লেখযোগ্য অংশ মাটিতে অবশিষ্ট থেকে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। ওয়েটল্যান্ড ফসলে পূর্ণমাত্রায় গন্ধক সার প্রয়োগ করা প্রয়োজন। ওয়েটল্যান্ড ফসলের (খরিফ-২ মৌসুমে) পরবর্তী আপল্যান্ড ফসলে (তেলবীজ, ভুট্টা, শাকসবজি ও মসলা ছাড়া) সুপারিশকৃত মাত্রার শতকরা ৫০ ভাগ গন্ধক প্রয়োগ করতে হবে। তবে তৈলবীজ, ভুট্টা, শাকসবজি এবং মসলা জাতীয় ফসলে পূর্ণমাত্রায় গন্ধক প্রয়োগ করার সুপারিশ করা হয়েছে । ধান-ধান-ধান অথবা সবজি-সবজি-সবজি ফসল বিন্যাসের ক্ষেত্রে ২য় ও ৩য় ফসলে সুপারিশ মাত্রার ৫০% প্রয়োগ করতে হবে ।
া ম্যাগনেসিয়াম, পিডমন্ট এবং তিস্তা প্লাবনভূমির মাটিতে প্রাপ্যতা সাধারণত কম থাকে এবং সেক্ষেত্রে রবি শস্য এবং খরিফ ফসলে উভয়েই প্রয়োগ করা উচিত যেমন পাট। ভেজা জমির ধানের আবাদের জন্য ম্যাগনেসিয়ামের প্রয়োজন নেই। যদি মাটির ঢ়ঐ বাড়ানোর জন্য ডলো-চুন (ঈধঈঙ৩.গমঈঙ৩) ব্যবহার করা হয় তবে তিন বছরের মধ্যে গম সার প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না।
া চুনযুক্ত ও ওয়েটল্যান্ড ধানের জমিতে মাটির দস্তার প্রাপ্যতা/লভ্যতা কম। চুনযুক্ত মাটিতে (এইজেড ১০, ১১, ১২ এবং ১৩) রবি এবং খরিফ উভয় ফসলে দস্তা প্রয়োগ করতে হবে। দুই বা তিনটি ধান-ধান ফসল বিন্যাসে, প্রথম ফসলে পূর্ণমাত্রায় এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় ফসলে শতকরা ৫০ ভাগ কম দস্তা সার প্রয়োগ করতে হবে। রবি ফসলে দস্তা সারের দরকার হবে না যদি রোপা আমন ধানে পূর্ণমাত্রায় এ সার প্রয়োগ করা হয় । ধান-ধানবিহীন ফসল বিন্যাসে (ভুট্টা, গোল আলু, শাকসবজি ও মসলা জাতীয় ফসল ব্যতিত) দস্তা সার শুধু ধান ফসলে প্রয়োগ করতে হবে। ভুট্টা, গোল আলু, শাকসবজি এবং মশলা জাতীয় ফসলে পূর্ণমাত্রায় দস্তা সার প্রয়োগ করতে হবে।
া শুষ্ক জমিতে বোরনের প্রাপ্যতা কম। রবি ফসলে একবার বোরন গ্রহণ করা উচিত। তবে বার্ষিক ক্রপিং প্যাটার্নে খরিফ-১ ফসল দিয়ে রবি শুরু হলে যেখানে খরিফ-১ ফসলে পূর্ণ মাত্রার বোরন সার সুপারিশ করা হয়।
া যদি জৈবসার যেমন গোবর, মুরগির বিষ্ঠা সার, য়োসেলারী অথবা কম্পোস্ট ব্যবহার করা হয়, তবে রাসায়নিক সার থেকে পুষ্টির পরিমাণ সমন্বয় করতে হবে এভাবে যে জৈবসারের ৫০% অবমুক্ত হয়েছে।
া বৃষ্টিনির্ভর অবস্থায় ধান ও পাটের জন্য ফলন হ্রাস হতে পারে ১৫%, আলুর জন্য ২০% এবং আখ, এবং গম, তৈলবীজ, সবজি এবং মশলার জন্য ৩৫%, যার জন্য সমস্ত সুপারিশকৃত সার পুষ্টি উপাদান (নাইট্রোজের, ফসফরাস, পটাশিয়াম, গন্ধক, ম্যাগনেসিয়াম, দস্তা ও বোরন) সেচকৃত অবস্থার চেয়ে ২৫% কমাতে হবে ।
া আন্তঃফসল পদ্ধতির জন্য, সহঃফসলের সারের পরিমাণ ফসল ঘনমাত্রার ওপর ভিত্তি করে ২০-৫০% হবে কিন্তু প্রধান ফসলের ফসলের জন্য সুপারিশকৃত ডোজ পূর্ণমাত্রায় হবে।
সুষম সার ব্যবহার এবং এর সুফল
সুষম সারের পরিমাণ ফসলের প্রকার, জাত, চাষাবাদ পদ্ধতি, ফসল চাষের মৌসুম এমনকি জমির অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে আলাদা হতে পারে। সুষম সার সুপারিশ পেতে হলে তিনটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। প্রথমত, জমির উর্বরতার অবস্থা অর্থাৎ মাটিতে উদ্ভিদ পুষ্টি উপাদানের উপস্থিতি এবং এর পরিমাণ। দ্বিতীয়ত, ফসলের পুষ্টি উপাদান চাহিদা বা প্রয়োজনীয়তা এবং তৃতীয়ত, মৌসুমভিত্তিক বিভিন্ন উদ্ভিদ পুষ্টি উপাদানের সহজলভ্যতা বা চাষাবাদ পদ্ধতি। এই তিনটি বিষয় একইসাথে বিবেচনা করে সুষম সার সুপারিশ করা যেতে পারে। যেমন, ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯ জাতদ্বয়ের পুষ্টি উপাদানের চাহিদা ভিন্ন ভিন্ন। চাষাবাদ মৌসুম এবং চাষাবাদ পদ্ধতি উদ্ভিদ পুষ্টি উপাদানের সহজলভ্যতার ওপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে। উদাহরণস্বরূপ গন্ধক সারের সহজলভ্যতা আপল্যান্ড ফসলের ক্ষেত্রে কম হয়ে থাকে। তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাতের কারণেও বিভিন্ন সারের ফসলের জন্য সহজলভ্যতার ভিন্নতা দেখা যায়।
(তথ্যসূত্র: সার সুপারিশ গাইড ২০১৮, ২০২৪; কৃষি ডায়েরি ২০২৪, ২০২৫; ভূমি ও মৃত্তিকা সম্পদ ব্যবহার নির্দেশিকা; অনলাইন পোর্টাল ইত্যাদি)
লেখক : প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, যশোর। মোবাইল: ০১৯১৩-৩৪১৯৫৭,