কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২৪ এ ০৪:২৭ PM

সম্ভাবনাময় ফসল লাল ও সবুজ সবজিমেস্তা বহুবিধ ব্যবহার

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: মাঘ সাল: ১৪৩০ প্রকাশের তারিখ: ৩১-০১-২০২৪

সম্ভাবনাময় ফসল লাল ও সবুজ সবজিমেস্তা বহুবিধ ব্যবহার
কৃষিবিদ ইফফাত জাহান নূর
সবজিমেস্তা একটি সম্ভাবনাময় লাভজনক ফসল। একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ কম, অন্যদিকে এটি পুষ্টিকর, সুস্বাদু ও বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য। মানবদেহে দৈনিক পুষ্টি চাহিদা মেটাতে অনন্য একটি খাদ্য সবজিমেস্তা। এর পাতা ও ফলের বৃতি ভিটামিন সি, খনিজ লবণ (মিনারেল) ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের উৎকৃষ্ট উৎস। মেস্তা ফসল সাধারণত পাটের মতোই পরিবেশবান্ধব আঁশ ফসল যার একটি ধরন ব্যবহৃত হয় সবজি হিসেবে। সবজিমেস্তার বৈজ্ঞানিক নাম ঐরনরংপঁং ংধনফধৎরভভধ  যা আমাদের দেশে চুকুর বা রোজেলা নামে পরিচিত। এটি পশ্চিম আফ্রিকা থেকে উদ্ভুত মালভেসি গোত্রের অন্তর্ক্তুক্ত একটি উপগুল্ম জাতীয় একবর্ষজীবী ফসল। এর খাদ্য উপযোগী অংশ এর পাতা ও ফল এবং এর মূল বাণিজ্যিক অংশ হল ফলের মাংসল বৃতি। সবজি মেস্তার পাতা শাক হিসেবে ও এর মাংসল বৃতি কনফেকশনারি খাদ্যসামগ্রী যেমন- চা, জ্যাম, জেলি, জুস, আচার, ড্রাইফ্রুট ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। আমাদের দেশে সাধারণত গাঢ় লাল, লালচে সবুজ এবং সবুজ এই তিন রঙের সবজি মেস্তা দেখা যায়। এর আকর্ষণীয় রঙ ও টক মিষ্টি স্বাদের জন্য খাদ্য হিসেবে এটি খুবই জনপ্রিয় এবং পৃথিবীর অনেক দেশেই সবজিমেস্তা বাণিজ্যিক ভাবে চাষ করা হয়।
‘চুকুর’ ‘চুকাই’ ‘টকফল’ ’সরেল’ বা ‘রোজেলা’ নামে আমাদের সকলের কাছে সুপরিচিত ও দেশে বিদেশে যেটি জনপ্রিয়, সেটি মূলত বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক প্রথম জাত ’বিজেআরআই মেস্তা ২’ (সবজিমেস্তা-১/ভিএম-১)। সম্প্রতি বিজেআরআই বন্য প্রজাতির মেস্তা (খড়পধষ ৎধপব) থেকে বিশুদ্ধ সারি নির্বাচন ও গবেষণার মাধ্যমে অধিক ফলনশীল সবজি হিসেবে আরো একটি উন্নত সবজিমেস্তার জাত উদ্ভাবন করেছে যা জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক ২০২২ সালে ‘বিজেআরআই মেস্তা ৪’ (সবজি মেস্তা ২/ভিএম ২) নামে অবমুক্ত করা হয়। দুটি জাতই অধিক পুষিমানসম্পন্ন এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক ফসল। জাত দুইটির স্বাদ একই রকম টকমিষ্টি হলেও বাহ্যিকভাবে এদের কা- ও ফলের রঙে আছে ভিন্নতা। গাঢ় লাল বর্ণের সবজিমেস্তা-১ এবং সবুজ বর্ণের সবজিমেস্তা-২ যেন বাংলার লাল সবুজ পতাকারই প্রতিচ্ছবি। দুটি জাতের উৎপাদন প্রযুক্তি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
দুটি জাতই সমগ্র বাংলাদেশে চাষ করা যায়। তবে বিশেষ করে উঁচু ও পাহাড়ি এলাকায় বেশি ভাল হয়। অধিক সহনশীলতা থাকায় বাড়ির আঙ্গিনা ও অনাবাদি প্রান্তিক জমিতে চাষ করেও ভালো ফলন পাওয়া যায়। এমনকি শহর এলাকায় বাড়ির ছাদবাগানেও চাষ করা যায়। সবজি মেস্তা আবাদের জন্য জমি তৈরির সময় হেক্টর প্রতি ২-৩ টন গোবর সার প্রয়োগ করা খুবই প্রয়োজন। গাবর সার প্রয়োগ করলে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করার প্রয়োজন হয় না। ছিটিয়ে ও সারিতে উভয় পদ্ধতিতে বীজ বপন করা গেলেও সারিতে বপন করলে গাছের পরিচর্যা করা সহজ হয় এবং এতে ফলনও বৃদ্ধি পায়। সারিতে বপন করলে সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩০-৪০ সেমি.। ছিটিয়ে বপন করলে প্রতি হেক্টরে ১৮-২০ কেজি এবং সারিতে বপন করলে ১৪-১৫ কেজি পরিমাণ বীজ প্রয়োজন হয়। গাছের বয়স ৪০-৪৫ দিনের মধ্যে এক বার নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিস্কার করে গাছ পাতলা করে দিতে হয় যেন গাছ থেকে গাছের দূরত্ব আনুমানিক ৮-১০ সে.মি. থাকে। সাধারণত এ জাতে তেমন কোন রোগ ও পোকার আক্রমণ দেখা যায় না। তবে গাছের রোগ বালাই দেখা দিলে রোগবালাইয়ের আক্রমণ অনুযায়ী ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। এটি বপনের উত্তম সময় ১৫ জ্যৈষ্ঠ থেকে ১৫ শ্রাবন (জুন থেকে জুলাই) পর্যন্ত, যদিও মধ্য চৈত্র থেকে মধ্য আশি^ন (এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ) পর্যন্ত এটি বপনযোগ্য।
বপন সময়ের উপর ভিত্তি করে চার থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে গাছে ফুল আসে।
ফুল আসার ৪০-৪৫ দিন পর ফল পরিপুষ্ট হলে ফল ছিড়ে নিয়ে অথবা মাংসল বৃতি সংগ্রহ করা হয়। এই মাংসল বৃতি ভালভাবে রোদে শুকিয়ে সুস্বাদু খাদ্যসামগ্রী তৈরির জন্য কনফেকশনারীতে প্রেরণ করা হয় বা রান্না করে খাওয়ার জন্য বায়ুরোধী পাত্রে সংরক্ষণ করা হয়। সবজিমেস্তার প্রতিটি ৬ গ্রাম ওজনের ফল থেকে প্রায় ৩ গ্রাম মাংসল বৃতি পাওয়া যায়। সবজিমেস্তার একটি গাছে ৬০-১০০টি ফল ধরে। প্রতি হেক্টরে সবজিমেস্তার ১০-১২ টন পাতা, ১৬-১৮ টন সতেজ বৃতি, ২.৫-৩.৫ টন শুকনো বৃতি এবং ১.১ টন বীজ উৎপাদন হয়। ফল পাতার ফলনের সাথে সঠিক পরিচর্যায় সবজিমেস্তা থেকে মেলে প্রতি হেক্টরে ১.২-১.৬ টন আঁশ। মেস্তার বীজে ২০-২২ শতাংশ তৈল থাকে যা পৃথিবীর অনেক দেশে ভোজ্য তেল হিসেবে এবং কনমেটিক্স শিল্পে ব্যবহৃত হয়।
সবজিমেস্তার গাছের বয়স ৬০-৬৫ দিন হলেই তখন থেকে শাকসংগ্রহ করা যায়। গাছের ৩ মাস (৯০ দিন) বয়স পর্যন্ত পাতা শাক হিসেবে খাওয়া যেতে পারে। আমাদের দেশে এর কচি পাতা সরাসরি ছালাদ হিসাবে, শাক হিসেবে এবং টক পাতার ভর্তা হিসেবে জনপ্রিয়। শুকনা বৃতি পানীয় (ঞবধ), সচ, আচার/চাটনী এবং অন্যান্য ফলাহারে (উবংংবৎঃং) ব্যবহার করা হয়। অনেক সময় কচি পাতা ও মাংসল বৃতি স্বাদবর্ধক হিসেবে তরিতরকারির সাথে মিশিয়ে খাওয়া হয়।
সবজিমেস্তার বহুবিধ ব্যবহার
সবজিমেস্তার পাতা ও ক্যালিক্স (মাংশল বৃতি) : ফাইবার, অ্যাশ, ভিটামিন সি, ভিটামিন বি, মিনারেল ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এর উৎকৃষ্ট উৎস। আফ্রিকান গবেষক সালামি (২০২১) তার গবেষণায় পুষ্টিমান বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, প্রতি ১০০ গ্রাম লাল ও সবুজ সব্জিমেস্তার সতেজ পাতায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রোটিন (১৬.৩৬-২১.২৮%) ও ফাইবার (২২.৮০-৩৫.০১%) রয়েছে এবং পাতা ও ফলের বৃতিতে রয়েছে ৯.৩৫-১৩.৭৪% অ্যাশ ও ২৬.৯৩-৪৮.৩৩% শর্করা।  বিজ্ঞানিদের মতে ১২% এর অধিক প্রোটিন সমৃদ্ধ যেকোন উদ্ভিদ প্রোটিনের একটি উৎকৃষ্ট উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। মানবদেহে ফাইবার কোষ্ঠকাঠিণ্য দুর করে, যকৃত ও পরিপাকতন্ত্রের রোগ কমায়। অ্যাশ বা ছাই বিপাকীয় কার্যকলাপের সময় একটি কোফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। বিজেআরআই এর বিজ্ঞানী মো: জাবলুল তারেক (২০২১) গবেষণা করে দেখেছেন, প্রতি ১০০ গ্রাম সব্জিমেস্তার পাতায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খনিজ লবন বিশেষ করে ক্যালসিয়াম (২.৭%), ম্যাগনেসিয়াম (১.৬%), ভিটামিন এ (১৬৫.৯%) ও ভিটামিন সি (৯৪.৮৮%) থাকে ও বৃতিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোডিয়াম (৯.৫%), পটাসিয়াম (১.৯%), আয়রন (৪২২%) ও ম্যাঙ্গানিজ (১২৬%) থাকে।  হাড়, পেশী, হৃদপিন্ড এবং মস্তিষ্ক সঠিকভাবে কাজ করার জন্য খনিজ লবণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। রোজেলা মানসিক বিকাশে ও অ্যান্টি ডিপ্রেশন চিকিৎসায়ও ব্যবহৃত হয়।
সবজিমেস্তার দুটি জাতই উচ্চ মাত্রার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ যা সবজি হিসেবে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় সংযোজন করলে মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিজেআরআই উদ্ভাবিত সবজিমেস্তা-১ এর উজ্জল লাল রঙ এতে উপস্থিত অ্যান্থোসায়ানিনের এর নির্দেশক। অন্যদিকে সবজিমেস্তা-২ এর সবুজ বৃতির গোলাপি আভা মৃলত এতে উপস্থিত ক্যারোটিনয়েডের জন্য হয়ে থাকে। অ্যান্থোসায়ানিন সামগ্রিক দৃষ্টিশক্তির উন্নয়নে ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এবং ক্যারোটিনয়েড ক্যান্সার কোষ বৃদ্ধি রোধে ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এছাড়াও বিজেআরআই এর বিজ্ঞানী ড. মো: আবুল ফজল মোল্লা (২০২০) এর গবেষনায় দেখা গেছে সব্জিমেস্তায় ফ্ল্যাভনয়েড, প্রোঅ্যান্থোসায়ানিডিন, ফেনলিক কমপাউন্ড ইত্যাদি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উল্লেখযোগ্য পরিমাণে উপস্থিত যা ডায়াবেটিক, স্থুলতা ও ক্যান্সার রোগ নিরাময়ের পাশাপাশি কমায় হৃদরোগের ঝুকি। উল্লেখ্য, প্রতি ১০০ গ্রাম সবজি মেস্তা থেকে পাওয়া যায় ৪৫ ক্যালরি শক্তি।
সবজিমেস্তার বীজে রয়েছে ২২-২৪% ভোজ্যতেল যা মনো ও পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিডের একটি ভালো উৎস। এটি রক্তরসের খউখ ও ঐউখ উভয় কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য কার্যকর হওয়ায় ঔষধ শিল্পে ব্যবহৃত হয়। এক কথায় মানবদেহের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এটি অনন্য ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণায় পাওয়া গেছে এর বীজতেলে ‘টোকোফেরল’ নামক ক্যান্সার নিরোধক উপাদান পাওয়া গেছে যা ফার্মেসি ও চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়াও এর বীজের তৈল সাবানশিল্পে ও শিল্প কারখানাতেও ব্যবহৃত হয়।
পুষ্টিকর ও বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য এই ফসল বাণিজ্যিক উৎপাদনের মাধ্যমে পণ্য রপ্তানি করে দেশীয় আয় বৃদ্ধিতে তথা বাংলাদেশী কৃষকদের আর্থসামাজিক অবস্থা উন্নয়নে অনন্য ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর সুনিশ্চিত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশে এর গুরুত্ব এখনো অস্বীকৃত।
বৈশ্বিক বাণিজ্য রোডম্যাপ অনুযায়ী, ভেষজ পণ্যের সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সবজিমেস্তার চাহিদা দ্বিগুণ হবে। সুতরাং, এখনই আমাদের দেশে এর গুরুত্ব উপলব্ধি করার ও এর বহুমুখী ব্যবহার প্রচার করার উপযুক্ত সময়। সর্বোপরি ফলন, অভিযোজন, পুষ্টিগুণ ও বহুমুখী ব্যবহার বিবেচনায় বিজেআরআই উদ্ভাবিত দুটি জাতই (সবজি মেস্তা-১ ও সবজি মেস্তা-২) বাণিজ্যিক চাষের জন্য এবং মানুষের দৈনিক খাদ্য তালিকায় সংযোজন সুপারিশযোগ্য। ভেজাল, দুষণ ও মহামারীর এই কঠিন সময়ে নানাবিধ পুষ্টিগুণ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ সবজিমেস্তা মানুষের খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করলে নিসন্দেহে কমবে স্বাস্থ্য ঝুঁকি।

লেখক : ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, জেনেটিক রিসোর্সেস এন্ড সিড বিভাগ, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, মানিক মিয়া এভিনিউ, ঢাকা-১২০৭। মোবাইল : ০১৭৬৪৮৫৫৩১৯, ই-মেইল :iffat.jessica@yahoo.com

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন