কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ এ ০৬:০৭ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: পৌষ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৪-১২-২০২৫
লেটুস পাতার আধুনিক চাষকৌশল
তাহসীন তাবাসসুম
লেটুস পাতা একটি সুপরিচিত সবজি, যা সালাদ, স্যান্ডউইচ ও নানারকম খাবারে ব্যবহার করা হয়। লেটুস পাতায় প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এবং আঁশ রয়েছে, যা শরীরকে সুস্থ রাখে এবং হজমে সহায়তা করে। লেটুস পাতা শুধু খেতেই সুস্বাদু এমন নয়, এর রয়েছে আরো নানারকম উপকারিতা। প্রতি ১০০ গ্রাম লেটুসে আছে ১৫ ক্যালোরি, ২৮ মিলিগ্রাম সোডিয়াম, ১৯৪ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ২.৯ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ১.৪ গ্রাম প্রোটিন, ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন বি-৬, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও ম্যাগনেসিয়াম। তাই খাদ্যতালিকায় সালাদে লেটুস রাখা জরুরি।
বারোমাসি এই উদ্ভিদ শীত প্রধান দেশে সারা বছর চাষাবাদ করা সম্ভব হলেও; আমাদের দেশে কেবল রবি মৌসুমে অর্থাৎ (অক্টোবর-জানুয়ারি) মাস পর্যন্ত বীজ বোনা যায়। এ ছাড়া লেটুস পাতা চাষের মাটি অবশ্যই উর্বর হতে হবে। তবে দো-আঁশ মাটির সাথে প্রয়োজন মতো জৈবসার মিশানো থাকা ভালো। আর লেটুস পাতা চাষাবাদের জন্য বড় জমি দরকার হয় না বরং বসতবাড়ির আঙিনায় বা ছাদে-টবেই এই পাতার চাষ করা সম্ভব।
জমিতে লেটুসপাতা চাষাবাদ পদ্ধতি
লেটুস পাতা চাষাবাদের জমি ৪-৫ বার চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরা করে ভালোভাবে তৈরি করতে হবে। এ ছাড়া জমিতে প্রয়োজনীয় রস থাকে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে; প্রয়োজনে জমিতে সেচ দিতে হবে; লেটুস পাতা বীজ সরাসরি জমিতে বোনা যায় (খুব ছোট বীজ তাই বোনার আগে বীজের সাথে ছাই মিশিয়ে নেওয়া উত্তম); অথবা বীজতলায় চারা তৈরি করে চারা বপন করা যায়; সাধারণত ১ মাস বয়সী লেটুস পাতার চারা বপন করা উত্তম; লাইন করে চারা বপন করলে লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব হবে ১২ ইঞ্চি; আর চারা থেকে চারার দূরত্ব হবে ৮ ইঞ্চি; চারা বপনের পর চারার গোড়ায় মাটি দিয়ে হালকাভাবে চেপে দেওয়া ভালো; এ ছাড়া রোদ ও বৃষ্টি থেকে রক্ষা ৩-৪ দিন চারা ঢেকে রাখা প্রয়োজন।
টবে লেটুসপাতা চাষাবাদ পদ্ধতি
সাধারণত ১৫ ভাদ্র মাস থেকে অগ্রহায়ণের মাঝামাঝি পর্যন্ত বীজ থেকে চারা তৈরি টবে লাগানোর সঠিক সময়। টবে কিংবা ড্রামে খুব সহজেই লেটুস পাতার চাষ করা যায়।
লেটুস পাতা চাষের জন্য খুব বড় টবের প্রয়োজন হয় না; তবে টবের মাটি অবশ্যই উর্বর, হালকা এবং ঝুরঝুরে হতে হবে; দো-আঁশ মাটি ও জৈবসার ভালোভাবে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে; তবে মাটি এঁটেল হলে জৈবসারের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে হবে; এছাড়া প্রতি টবে চার চামচ (চা চামচে) টিএসপি সার ও ভেজানো ১১৬ গ্রাম পরিমাণ সরিষার খৈল মেশানো উত্তম; ভাদ্র থেকে অগ্রহায়ণ পর্যন্ত (সেপ্টেম্বর -নভেম্বর) পর্যন্ত বীজ থেকে চারা তৈরি করে টবে লাগানো যায়; টবে বীজ বোনলে ৩-৪ দিনে চারা গজায়; চারার বপনের ক্ষেতে ৪-৫টি পাতা গজালে টবে (বিকেলে) লাগাতে হবে; সকাল-বিকাল চারার গোড়ায় পানি দিতে হবে; পানি শুকিয়ে গেলে টবের মাটি যেন ফেটে না যায় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে; প্রয়োজনে সেচ দিতে হবে এবং মাঝে মাঝে চারার গোড়ার মাটি হালকাভাবে আলগা করে দিতে হবে।
টবে চারা বপনের পর অনেক সময় দেখা যায় চড়াই, শালিক, বাবুই ইত্যাদি ছোট ছোট পাখি চারার কচি পাতা এবং ডগা খেয়ে ফেলে, অনেক ক্ষেত্রে চারা উপড়ে ফেলে। সেক্ষেত্রে টবটি ঢেকে রাখতে হবে দু-চারটা ছিদ্রবিশিষ্ট পাতলা পলিথিন কাগজ বা লোহার নেট দিয়ে।
সার প্রয়োগ
অধিক ফলন পেতে লেটুস পাতা চাষাবাদের জমিতে প্রয়োজন মতো সার প্রয়োগ করতে হবে। এই পাতা চাষে প্রতি শতাংশ জমিতে গোবর সার ২০ কেজি, খৈল ৮০০ গ্রাম, ইউরিয়া ৪০০ গ্রাম, টিএসপি ১০০ গ্রাম, পটাশ ১০০ গ্রাম প্রয়োগ করতে হবে।
গোবর সার চাষের প্রথম দিকে এবং শেষ চাষের সময় টিএসপি ও পটাশ সার মাটির সাথে ভালো করে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়া ইউরিয়া সার ২ কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে (প্রথম বার চারার বয়স ১০ দিন হলে আর দ্বিতীয় বার চারার বয়স ২০ দিন হলে)। প্রতিবার সার প্রয়োগ করার পর জমিতে সেচ দিতে হবে।
সেচ ও পরিচর্যা
লেটুস পাতা গাছ লাগানোর পর থেকে নিয়মিত পরিচর্যা করতে হবে। চারা লাগানোর পর ছোট পাখিরা ঠুকরে ঠুকরে সেই পাতা খেয়ে ফেলতে পারে। এই ক্ষেত্রে পাতলা পলিথিনের গায়ে ছোট ছোট ছিদ্র করে সেটি দিয়ে গাছটি ঢেকে দেওয়া দরকার। এছাড়াও যেইসব পাতা শুকিয়ে গেছে, সেগুলো তুলে ফেলা উচিত। আশানুরূপ ফলন পেতে জমিতে সব সময় আগাছা মুক্ত রাখতে হবে। গাছ বড় হলে মাঝে মাঝে লেটুস পাতা গাছের গোড়ার মাটি চেপে দিতে হবে। গাছে যদি খুব বেশি ঘন হয়ে যায় তাহলে তা পাতলা করে দিতে হবে। এতে একদিকে যেমন গাছ বেড়ে উঠবে, অন্য দিকে উত্তোলিত গাছ ব্যবহার করা যাবে।
লেটুস পাতার ক্ষেতে নিয়মিত সেচ দিতে হবে; তবে পানি যেন জমে না থাকে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। অতিরিক্ত পানি বের করে দিতে হবে।
লেটুস চাষে বিভিন্ন রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ
লেটুস চাষে সাধারণ পোকা হলো জাবপোকা এবং ফ্লি বিটল, আর সাধারণ রোগ হলো গোড়া পচা রোগ, ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতার দাগ ও ডাউনি মিলডিউ। জাব পোকা নিয়ন্ত্রণের জন্য হাত দিয়ে তুলে বা জৈব কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। লেডিবার্ড, গ্রাউন্ড বিটল, হোভারফ্লাই, প্যারাসাইটয়েড ওয়াপস এবং ইয়ারউইগদের জাতীয় উপকারী পোকা আপনার বাগানে উৎসাহিত করুন, কারণ এরা জাব পোকার প্রাকৃতিক শত্রু। ফ্লি বিটল দ্বারা আক্রান্ত পাতায় অসংখ্য ছিদ্র হয়, যা হাতজাল দিয়ে পোকা ধরে বা আক্রান্ত গাছে ছাই ছিটিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। গোড়া পচা রোগ হলে গাছ তুলে ফেলা উত্তম এবং বীজ ও মাটি শোধন করা প্রয়োজন।
পোকা দমন ও নিয়ন্ত্রণ
জাবপোকা : জৈবিকভাবে পুরোপুরি দমন না হলে হাতজাল দিয়ে পোকা সংগ্রহ করুণ বা আক্রান্ত গাছে ছাই ছিটিয়ে দিন। ০.৫% সাবান পানি (৫ মিলি তরল সাবান প্রতি লিটার পানিতে) স্প্রে করতে পারেন।
শুঁয়োপোকা দমনে
ব্যাসিলাস থুরিংয়েনসিস (ইঞক) নামক জৈব কীটনাশক ব্যবহার করতে পারেন, যা প্রজাপতি ও অন্যান্য উপকারী পোকার ক্ষতি না করে শুঁয়োপোকাকে মেরে ফেলে। বেমিসিয়া তাবাসির মতো পোকা দমনে হলুদ আঠালো বোর্ড ব্যবহার করা যেতে পারে।
রোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রতিরোধ
গোড়া পচা রোগ : এই রোগ দেখা দিলে গাছ তুলে ফেলা উত্তম। বীজ ও মাটি শোধন করে এই রোগ থেকে বাঁচা যায়।
ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতার দাগ : এই রোগ আর্দ্র, শীতল পরিবেশে বেশি দেখা যায়। রোগাক্রান্ত গাছ দ্রুত তুলে ফেলে দিন এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ করুন।
ডাউনি মিলডিউ : এটি একটি ছত্রাকজনিত রোগ। আক্রান্ত পাতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুন এবং আক্রান্ত অংশ সরিয়ে ফেলতে হবে। বাগান ও ফসলের স্থান সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে; বীজ ও মাটি শোধন করা অপরিহার্য; রোগমুক্ত বা সুস্থ চারা ব্যবহার করতে হবে।
ফলন ও ফসল সংগ্রহ : লেটুস গাছের ফলন জাত ও পদ্ধতিভেদে ভিন্ন হয়, তবে সাধারণ জাত বারি লেটুস-১ এর ফলন ২৭-২৯ টন/হেক্টর হতে পারে। চারার বয়স ৩০-৪০ দিনের মধ্যে লেটুস পাতা খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয় এবং এ সময় পাতা সংগ্রহ করা যায়। ফল সংগ্রহের সময় প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পূর্ণ গাছ তুলে অথবা প্রতিটি গাছ থেকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পাতা তুলে নেয়া হবে।
ফলন সংগ্রহ পদ্ধতি
সম্পূর্ণ গাছ তোলা: যখন পুরো গাছ খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়, তখন সম্পূর্ণ গাছটি তুলে ফেলা উত্তম।
আংশিক পাতা সংগ্রহ: যদি প্রয়োজন হয়, তবে একটি গাছ থেকে প্রয়োজনীয় পাতাগুলো বেছে বেছে সংগ্রহ করে ব্যবহার করা যায়। এতে গাছটি আবার বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়।
লেটুস একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ফসল। স্বাস্থ্যসচেতনতা ও পুষ্টিকর খাদ্যভাসে লেটুস পাতার জুড়ি মেলা ভার। তাই লেটুস চাষে যত্নবান হওয়ার পাশাপাশি খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করলে পুষ্টিহীনতা দূর হবে।
(সূত্র : কৃষি বাতায়ন, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট)
লেখক : প্রকাশনা কর্মকর্তা, প্রশিক্ষণ উইং, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা, মোবাইল : ০১৭২০২৫২৭৬৫, ই-মেইল :subhathashin@gmail.com