লিচুর ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা পরিচিতি ও ব্যবস্থাপনা
ড. মো. আলতাফ হোসেন
লিচু বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান জনপ্রিয় গ্রীষ্মকালীন ফল, যা গ্রীষ্মের আগমনের অগ্রদূত হিসেবে কাজ করে। ফলটি ভিটামিন, খনিজ এবং স্বাস্থ্যকর এন্টিঅক্সিডেন্টের ভালো উৎস এবং মিষ্টি ও পুষ্টিকর হওয়ায় বিশেষ করে বাচ্চাদের নিকট খুবই জনপ্রিয়। লিচু ফলটি কম ক্যালোরিযুক্ত হওয়ায় ওজন কমাতে সাহায্য করে, ত্বককে সুন্দর রেখে বার্ধক্যের লক্ষণগুলো প্রতিরোধ করে, হার্টের সমস্যা ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়, মেটাবলিজম বাড়ায় এবং সর্বোপরি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। লিচু ফলটি সুস্বাদু, রসালো শাঁস এবং উজ্জ্বল গাঢ় ফ্যাকাশে লাল বা গাঢ় লাল বর্ণের হওয়ায় এটাকে “ফলের রানী” নামে অভিহিত করা হয়।
বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই লিচু ফসলের চাষ হয়ে থাকে, তবে চাষের প্রধান এলাকা হলো বৃহত্তর যশোর, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, খুলনা, ঢাকা, কুষ্টিয়া, সিলেট এবং চট্টগ্রাম জেলা। বাংলাদেশে প্রায় ৮,৮১০ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয় এবং যার উৎপাদন প্রায় ১,০৪,৭১০ মেট্রিক টন (বিবিএস ২০২২-২৩)।
বাংলাদেশে বিভিন্ন জাতের লিচু চাষ হয়ে থাকে তাদের মধ্যে অন্যতম হলো বোম্বাই, মাদরাজী, মঙ্গলবারী, মোজাফ্ফরপুরী, রাজশাহী, কদমী, বেদানা, চায়না-৩, বারি লিচু-১, বারি লিচু-২, বারি লিচু-৩, বারি লিচু-৪, বারি লিচু-৫ ইত্যাদি। সম্প্রতি বছরগুলোতে দেশের অভ্যন্তরে ও বৈদেশিক বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় লিচু একটি বাণিজ্যিক ফল হিসেবে আবির্ভূত হওয়ায় কৃষকদের মাঝে এর চাষের আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু বিভিন্ন পোকামাকড়ের আক্রমণে চাষিরা লিচু চাষে মারাত্মক হুমকিতে পড়ছেন। লিচু ফসল প্রায় ১ ডজন পোকামাকড় দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকে, যা কাক্সিক্ষত ফলন লাভে বাধা সৃষ্টি করে। পোকামাকড়গুলো হচ্ছে- লিচুর ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা, লিচুর মাকড়, পাতা মোড়ানো পোকা ইত্যাদি। এসকল পোকামাকড়ের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ক্ষতিকর পোকা হচ্ছে লিচুর ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা। চাষিদের জন্য এ পোকাটি লিচু চাষে অন্যতম প্রধান সমস্যা। আগস্ট-অক্টোবর মাসে বের হওয়া কচি ডগাগুলো আক্রান্ত হলে নষ্ট হয়ে যায় এবং সেগুলোতে ফুল আসে না। এদের আক্রমণে ৭-৭০% পর্যন্ত কচি ডগা মারা যেতে পারে এবং ৩০-৫২% পর্যন্ত ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, যা বাংলাদেশে লিচুর কম
ফলনের অন্যতম প্রধান কারণ (আলম ২০১১)।
পোকা পরিচিতি এবং ক্ষতির ধরন ও প্রকৃতি
সারা বছরে পোকাটি কয়েকবার বংশবৃদ্ধি করে। স্ত্রীমথ (স্ত্রী পোকা) গোধুলীলগ্নে পুরুষ পোকার সাথে মিলিত হয়ে রাতের বেলা নতুন ডগার পাতার নিচের পৃষ্ঠে ডিম পাড়ে। একটি স্ত্রী পোকা ৩০-৫০টি পর্যন্ত ডিম পাড়তে পারে, সাধারণত প্রতিদিন ৫-৬টি ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে ৪-৫ দিন পর কীড়া বের হয়। নতুন পাতা গজানো পর্যায়ে কীড়া কচি ডগায় ছিদ্র করে ভিতরে ঢুকে খায় এবং মারাত্মক আক্রমণে ডগা শুকিয়ে মারা যায়। লিচুর ফল ধারণ মৌসুমে এ পোকা ২ বার বংশবৃদ্ধি করে। প্রথমবার, ফল ধরার ১০-১২ দিন পর লবঙ্গ আকারের ফলের বৃতির নিচে স্ত্রীমথ ডিম পাড়ে এবং ডিম ফুটে কীড়া বের হয়ে কচি ফলের ভেতরে প্রবেশ করে বিচি খেয়ে ফেলে, যার জন্য আক্রান্ত ফল ঝরে পড়ে। এ পর্যায়ে মারাত্মক আক্রমণে লিচুর ফলন সাংঘাতিকভাবে কমে যায়। দ্বিতীয়বার, ফলের রং আসার সময় অর্থাৎ সংগ্রহের ১৫-২০ দিন পূর্বে স্ত্রীমথ ফলের বোঁটার শেষ প্রান্তে এককভাবে ডিম পাড়ে। ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে ফলের আঁটি (বীজ) খেয়ে ফলের বোঁটার নিচে কালো থেকে বাদামি রঙের মল ত্যাগ করে। এ পর্যায়ে আক্রমণ মারাত্মক হলে ফল ঝরে পড়ে, পচে যায়, ভেতরের শাঁস নরম ও বিবর্ণ হয়ে খাওয়ার অনুপযুক্ত হয়ে যায়। আর ঝরে না পড়লেও ফল কিনতে গিয়ে ক্রেতারা ফলের বোঁটার নিচে পোকার মল দেখলে তাদের রুচিতে বাধে এবং ফলের বাজারমূল্য অনেক কমে যায়।
পোকার কীড়াগুলো প্রথম দশায় দুগ্ধবৎ সাদা এবং হালকা বাদামি মাথা বিশিষ্ট হয়ে থাকে। পূর্ণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত কীড়া হলুদাভ রঙের বাদামি মাথা বিশিষ্ট হয়। ৫টি দশায় ১০-১২ দিনে কীড়া ধাপ সম্পন্ন হয়। পূর্ণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত কীড়া পাতায়, ফলের গায়ে অথবা উদ্ভিদের বর্জিতাংশে পুত্তলি ধাপ সম্পন্ন করে। পুত্তলি ধাপে ৭-১০ দিন অতিবাহিত করে ধুসর বাদামি বর্ণের প্রাপ্ত বয়স্ক পোকায় (মথে) পরিণত হয়।
আবহাওয়াগত প্রভাব
লিচুর ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা উষ্ণ (২৫-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ও আর্দ্র আবহাওয়া পছন্দ করে। উচ্চতর তাপমাত্রায় এদের উন্নয়ন ও প্রজনন ত্বরান্বিত হয়, যা আক্রমণ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। আর্দ্র আবহাওয়ায় পোকার বিভিন্ন দশার বৃদ্ধি ও উন্নয়ন দ্রুত হয় এবং প্রতি ফলে আক্রমণের সংবেদনশীলতাও বৃদ্ধি পায়। এজন্য লিচুর উৎপাদন মৌসুমে বৃষ্টিপাত হলে ফলছেদক পোকার অধিক আক্রমণের জন্য অত্যন্ত অনুকূল আবহাওয়া তৈরি হয় এবং পোকার আক্রমণ অনেকগুণে বৃদ্ধি পায়। বায়ুপ্রবাহহীন শান্ত আবহাওয়া প্রাপ্ত বয়স্ক পোকার (মথের) চলাফেরা সহজতর করে, মিলন ও প্রজনন কার্যক্রমে সুবিধা হয় এবং নতুন পোষক গাছে গমনের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, যা আক্রমণ বৃদ্ধিতে প্রভাবিত করে ।
সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা
নতুন পাতা-ডগা গজানো অবস্থায়
এ পোকার আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য আগস্ট-অক্টোবর মাসে নতুন গজানো পাতা ও ডগায় অন্তর্বাহী কীটনাশক যেমন- ইমিডাক্লোপ্রিড ২০ এসএল প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলিলিটার হারে মিশিয়ে ১৫ দিন অন্তর ২টি স্প্রে দিতে হবে।
পুষ্পমঞ্জরি গজানো অবস্থায়
সাধারণত জানুয়ারির শেষ থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময়ে লিচুর বিভিন্ন জাতে পুষ্পমঞ্জরি বের হয়ে থাকে। পুষ্পমঞ্জরিতে স্ত্রী পোকাদের ডিম দেয়া থেকে বিরত রাখার জন্য ফুল ফুটে যাওয়ার আগেই প্রতিষেধক হিসেবে প্রতি লিটার পানিতে ৪ মিলিলিটার হারে নিমতেল অথবা অনুমোদিত মাত্রায় নিমঘটিত বালাইনাশক যেমন- এ্যাজাডিরেকটিন স্প্রে করতে হবে।
ফল ধরার পর
া সাধারণত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ হতে মার্চ মাস পর্যন্ত সময়ে জাতভেদে লিচুর ফলধারণ হয়ে থাকে। ফল ধরার ১০-১২ দিন পর ফলগুলো যখন লবঙ্গ আকারের হয়, সেসময়ে ইমিডাক্লোপ্রিড ২০ এসএল কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলিলিটার হারে মিশিয়ে প্রথমবার স্প্রে করতে হবে।
া প্রথম স্প্রে করার ১২-১৫ দিন পর শাঁস বর্ধনপর্যায়ে সাইপারমেথ্রিন ১০ ইসি কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার হারে মিশিয়ে দ্বিতীয়বার স্প্রে করতে হবে।
া যদি আবহাওয়া স্বাভাবিক থাকে অর্থাৎ কোন সবিরাম বৃষ্টিপাত না হয় তাহলে-স্পাইনোসেড ৪৫ এসসি প্রতি লিটার পানিতে ০.৪ মিলিলিটার হারে অথবা ইমামেকটিন বেনজয়েট ৫ এসজি প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম হারে অথবা ল্যাম্বডা সায়হ্যালোথ্রিন ২.৫ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার হারে অথবা ক্লোরানট্রানিলিপ্রোল ১৮.৫ এসসি প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলিলিটার হারে মিশিয়ে ফল সংগ্রহের ১৫-২০ দিন পূর্বে তৃতীয়বার স্প্রে করতে হবে। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়ায় অর্থাৎ অবিরাম বৃষ্টিপাত হলে আরও ১-২ টি অতিরিক্ত স্প্রে দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
সতর্কতা
া লিচু গাছে ফুল ফোটা থেকে শুরু করে ফল ধরা পর্যন্ত সময়ে কোন ধরনের স্প্রে করা যাবে না। এতে মৌমাছি দ্বারা পরাগায়ন কার্যক্রম ব্যাহত হবে। আবার কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় ফুটন্ত ফুলের পরাগরেণু নষ্ট হয়ে ফল ধারণ কমে যেতে পারে।
া একই কীটনাশক বারবার প্রয়োগ করা যাবে না।
া ভালো বাগান ব্যবস্থাপনা অনুশীলন করতে হবে যেমন- লিচু সংগ্রহের পর জুন-জুলাই মাসেই পোকা ও রোগাক্রান্ত ডাল-পালাগুলো ছেঁটে পরিষ্কার করে সার প্রয়োগ করতে হবে।
নিরাপত্তা বিধান
া ফল সংগ্রহের পর ডাল-পালা ছাঁটাই, বাগান আগাছামুক্ত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
া প্রথমপর্যায়ে মাটিতে ঝরে পড়া পোকাক্রান্ত কচি ফলগুলো সংগ্রহ করে মাটির গভীরে পুঁতে ফেললে পরবর্তীতে পোকার সংখ্যা কমে যেতে সাহায্য করবে।
া লিচু ফল সবুজ থেকে ফ্যাকাশে লালচে রং ধারণের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে ১০০-১৫০টি ফল একসাথে করে মশারির নেটে তৈরি ব্যাগ দিয়ে ঢেঁকে ব্যাগের মুখ বেঁধে রাখলে ফল সংগ্রহ পর্যন্ত ফলছেদক পোকার আক্রমণ হবে না, আবার অন্যদিকে বাদুরের আক্রমণও কম হবে।
া গাছের ভেতরে ও বাইরে সকল শাখা-প্রশাখায় সমভাবে পাওয়ার স্প্রেয়ার দ্বারা স্প্রে করলে দমন ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাবে।
া শুধুমাত্র পরিষ্কার আবহাওয়ায় স্প্রে দিতে হবে নতুবা স্প্রে করার পর ঐ একই দিনে যদি বৃষ্টি হয় তাহলে পুনরায় স্প্রে করতে হবে।
া অনুমোদিত আঠাজাতীয় পদার্থ (ঝঃরপশবৎ) সঠিক মাত্রায় কীটনাশকের সাথে মিশিয়ে প্রয়োগ করলে অধিকতর ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। এছাড়া বর্ষা মৌসুমে এটা কীটনাশকের কার্যকারিতা উন্নত করে, তবে প্রয়োগের পর অন্তত ৪ ঘণ্টা অপেক্ষমান সময় দিতে হবে।
া লিচুর ডগা ও ফলছিদ্রকারী পোকা ব্যবস্থাপনাকে অধিকতর ভালো ও কার্যকরী করতে হলে লিচু চাষিরা সবাই মিলে যৌথভাবে দমন ব্যবস্থাপনা নিয়ে অগ্রসর হতে হবে।
উল্লেখিত সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা, সতর্কতা ও নিরাপত্তা বিধানাবলী যথাযথভাবে অনুসরণ করলে লিচুর ডগা ও ফলছিদ্রকারী পোকা অত্যন্ত কার্যকরীভাবে দমন করা সম্ভব। এতে করে, লিচু উৎপাদনে দেশ আরও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে এবং উৎপাদনকারীদের জীবনমান উন্নত হবে।
লেখক : মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (কীটতত্ত্ব), আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী, পাবনা, মোবাইল : ০১৭২৫০৩৪৫৯৫, ই-মেইল : hossain.draltaf@gmail.com