মৎস্য খাদ্যের এফসিআরের মান
কমবেশি হওয়ার কারণসমূহ
মোঃ তোফাজউদ্দীন আহমেদ
মাছচাষ এখন আর প্রাকৃতিক খাদ্যনির্ভর নাই। বর্তমান সময়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বাণিজ্যিক মাছ চাষ সম্পূর্ণ সম্পূরক খাদ্যের (ঝঁঢ়ঢ়ষবসবহঃধৎু/গধহঁভধপঃঁৎব/অৎঃরভরপরধষ/ ঋড়ৎসঁষধঃবফ/ওহফঁংঃৎরধষ ঋববফ) ওপর ভিত্তি করে সম্প্রসারিত হচ্ছে। মৎস্য খামারের বিনিয়োগের প্রায় ৬০-৭০% ব্যয় হচ্ছে মৎস্য খাদ্য ক্রয়ে। সকল খামারি মৎস্য খাদ্যের গুণগত মানের বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন। কারণ এ খাদ্যের উপরই মাছের পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিত করে, মাছের স্বাস্থ্য, মাছের বর্ধন তথা খামারের উৎপাদন ও সর্বোপরি খামারির লাভ-লোকসানও খাদ্যের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। এজন্য খামারে প্রয়োগকৃত খাদ্যের কার্যকারিতা তথা খাদ্যের মাংসে রূপান্তর (ঋঈজ-ঋববফ ঈড়হাবৎংরড়হ জধঃরড়) হার অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে।
অর্থাৎ ২ কেজি খাবার খেয়ে যদি ১ কেজি মাছ উৎপাদিত হয়ে থাকে তবে এখানে এফসিআর হবে ২ঃ১। যে খাদ্য যত ভাল তার এফসিআরের মান তত কম। আধুনিক বা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মাছ চাষে চাষির মাছ উৎপাদনে প্রয়োগকৃত খাদ্যের এফসিআরের মান ও এফসিআরের মান নির্ণয় পদ্ধতি এবং এতদবিষয়ক সম্যক ধারণা থাকা আবশ্যক।
খাদ্য রূপান্তর হার (ঋঈজ-ঋববফ ঈড়হাবৎংরড়হ জধঃরড়) এর মান নির্ণয় পদ্ধতি
খাদ্য রূপান্তর খাদ্য প্রয়োগ এবং খাদ্য গ্রহণের ফলে জীবের দৈহিক বৃদ্ধির অনুপাত। অর্থাৎ ১ কেজি মাছ পেতে যত কেজি খাবার খাওয়াতে হয়, সেটাই খাদ্য রূপান্তর হার বা এফসিআর।
এফসিআর প্রদানকৃত খাদ্য
দৈহিক বৃদ্ধি
বৃদ্ধি = আহরণকালীন মোট ওজন-মজুদকালীন মোট ওজন
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি পুকুরের মজুদকালীন মোট মাছের ওজন ছিল ৫ কেজি। নিয়মিতভাবে খাদ্য প্রয়োগ করার ফলে ৬ মাস পরে আহরণ কালে মোট ৭৫ কেজি মাছ পাওয়া গেল এবং মনে করি এই ৬ মাসে মোট ১০৫ কেজি খাদ্য প্রয়োগ করা হয়েছিল। এখানে এফসিআর এর মান হলো।
এফসিআর = = ১.৫ : ১
বর্তমান প্রেক্ষাপটে কম এফসিআরে এবং কম খরচে মাছ উৎপাদনই মৎস্যচাষিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। মাছের বিদ্যমান বাজার দরে কোন একটি মৎস্যচাষ ব্যবস্থাপনায় মৎস্য খাদ্যের এফসিআর মান ১.০ থেকে ১.৫ এর মধ্যে থাকলে, তা লাভজনক হবে বলে আশা করা যায় এবং এফসিআর এর মান ২.০ বা তার বেশি হলে চাষির জন্য মাছচাষে লাভ করা কঠিন।
এফসিআর নির্ণয়ের প্রয়োজনীয়তা
সাধারণত প্রতি ১৫ দিন পর পর বা আধুনিক বাণিজ্যিক চাষে ৭ দিন পরপর চাষিরা খাদ্য পরিবর্তন করে থাকে। খাদ্য পরিবর্তনের সময় অবশ্যই খাদ্যের এফসিআর নির্ণয় করতে হবে। মাছচাষে যেহেতু খাদ্য বাবদ বেশির ভাগ খরচ হয়ে থাকে, সেহেতু এফসিআর নির্ণয়ের মাধ্যমে চাষি তার পুকুরে খাদ্য বাবদ খরচ তথা পুকুরের মাছচাষের লাভ ও ক্ষতি হিসাব করতে পারবেন।
খাদ্যের কার্যকারিতা ও এফসিআর এর মানের প্রভাবকসমূহ
মাছের প্রজাতি ও বয়স : কোন কোন মাছ সম্পূরক খাদ্যের প্রতি সহজে আকৃষ্ট হয়, আবার কোন কোন মাছে সম্পূরক খাদ্য গ্রহণে অনাগ্রহতা দেখা যায়। যেমন-তেলাপিয়া, পাঙ্গাস মাছ যেভাবে কৃত্রিম বা সম্পূরক খাবারে অভ্যস্ত, কার্পজাতীয় সকল জাতীয় মাছ সেভাবে অভ্যস্ত না। তাই পাঙ্গাস, তেলাপিয়া মাছের থেকে কার্পজাতীয় মাছের খাদ্যের এফসিআর বেশি হবে। আবার একই প্রজাতির পোনা মাছের ক্ষেত্রে খাদ্য মাংসে রূপান্তর ক্ষমতা বেশি। ফলে বড় মাছ থেকে পোনা উৎপাদনে এফসিআর এর মান কম হবে।
খাদ্য উপকরণের গুণাগুণ : বাজারে বিভিন্ন মানের খাদ্য উপকরণ পাওয়া যায়। যেমন- এ গ্রেড ফিসমিল, বি গ্রেড ফিসমিল, সি গ্রেড ফিসমিল ইত্যাদি। আবার সরিষার খৈল, অটোকুঁড়া প্রভৃতি উপাদানেরও গুণাগুণ ও দামের তারতম্য বাজারে পরিলক্ষিত হয়। উদাহরণস্বরূপ চালের কুঁড়া ও তেল নিষ্কাষিত চালের কুঁড়া (উঙজই) উল্লেখযোগ্য। যত ভালো মানের উপকরণের সহায়তায় খাদ্য তৈরি করা হবে, খাবারের মান তত ভালো হবে এবং উক্ত খাদ্যের এফসিআর এর মান তত কমবে। আবার উপকরণ গুদামজাতকরণের সময় ও অবস্থার উপরও খাদ্যের মান তথা এফসিআর নির্ভর করে। যেমন- সরিষার খৈল যদি দীর্ঘ সময় দোকান বা গুদামে সংরক্ষিত থাকে তবে মান কমে যায় এবং তা দ্বারা তৈরি খাদ্য মানসম্পন্ন হবে না। আবার বাজারে প্রাপ্ত অনেক খৈল ভাঙা, চূর্ণ বা ভেজাল অবস্থায় পাওয়া যায়, যা দিয়ে তৈরি খাদ্য ভালো মানের হবে না এবং খাদ্যের এফসিআর এর মান বেড়ে যাবে। খাদ্য উপকরণ ভালো হলে মাছ খাদ্য গ্রহণের পর সহজে হজম হবে এবং ভালোভাবে আত্তীকরণ হওয়ায় মাছের বর্ধন দ্রুত হবে। খাদ্য উপকরণের গুণগত মানের ওপর নির্ভর করে উক্ত খাদ্যের হজম মাত্রা কি হবে। তাই উপকরণ সংগ্রহের সময় এসব বিষয় অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।
প্রস্তুতকৃত খাদ্যের আকার : চাষকৃত মাছের আকারের সাথে প্রয়োগকৃত খাবারের আকারের সামঞ্জস্য থাকা আবশ্যক। পুকুরে ছোট আকারের মাছ থাকলে পাউডার বা ছোট আকারের খাবার দিতে হবে এবং বড় মাছ থাকলে বড় আকারের খাবার দিতে হবে। অন্যথায় খাদ্য অপচয় হবে এবং এফসিআরের মান বেশি হবে ও খাদ্য বাবদ খরচ বেশি হবে।
প্রস্তুতকৃত খাদ্যের পুষ্টিমান : প্রস্তুতকৃত খাদ্যের পুষ্টিমান বিশেষ করে আমিষের মানের ওপর এফসিআর অনেকাংশে নির্ভর করে। খাদ্যে যদি মাছের উপযুক্ত পরিমাণ গুণগত আমিষ বিশেষ করে প্রয়োজনীয় এমাইনো এসিডের ভারসাম্য পূর্ণ আমিষ থাকে তবে উক্ত খাদ্যের এফসিআর এর মান কম হবে। আবার নির্দিষ্ট মাছের নির্দিষ্ট বয়সের জন্য যে পরিমাণ আমিষ খাদ্যে থাকার কথা, তা যদি না থাকে তবে খাদ্যের এফসিআর এর মান বেশি হবে। পুকুর/জলাশয়ের পানির গুণাগুণ খাদ্যে এফসিআর মানের উপর প্রভাব রাখে।
তাপমাত্রা : একটি নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে মাছের বিপাকীয় হার বাড়ে এবং মাছের খাদ্য গ্রহণের হারও বাড়বে। সাধারণত প্রতি ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে মাছের খাদ্য গ্রহণের হার দ্বিগুণ হয়। ফলে তাপমাত্রা মাছের বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে এবং এফসিআর মানের কম হবে।
অক্সিজেন : বাণিজ্যিক মাছচাষে পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে পারলে মাছের বিপাকীয় হার বাড়বে এবং মাছের খাদ্য গ্রহণের হারও বাড়বে। ফলে মাছের বৃদ্ধি বাড়বে এবং এফসিআর এর মান কম হবে। আধুনিক মাছ চাষে খামারিরা অধিক পুষ্টিকর খাবার প্রয়োগ করে থাকে যা হজমের জন্য মাছের শরীরে অধিক শক্তি ব্যয় করতে হয়। শক্তি জোগানে রক্ত প্রবাহে অক্সিজেনের মাত্রা একটি নিয়ন্ত্রক উপাদান। পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা ভালো (৫ পিপিএম এর ওপরে) থাকলে, মাছের শরীরে খাদ্য আত্তীকরণের হার (অংংরসরষধঃরড়হ ৎধঃব) বেড়ে যায়। পঞ্চাশ শতক আকারের একটি পুকুরে বাজারে প্রচলিত চার পাখা বিশিষ্ট একটি এ্যারেটর দিনে ২-৩ ঘন্টা ব্যবহার করলে পানি আন্দোলিত হবে, পানির সঞ্চালন হবে, অক্সিজেন যুক্ত হবে, পানির পরিবেশ উন্নত হবে এবং খাদ্যের এফসিআর এর মান কম হবে।
ঘোলাত্ব : পুকুরের পানি যদি অধিক ঘোলা থাকে, তবে পুকুরে অক্সিজেন স্বল্পতা দেখা দেয় বা মাছ বেশি দূরের খাবার কণা দেখতে পারে না ফলে মাছের খাদ্য গ্রহণের প্রবণতা কমে যায় এবং খাদ্যের অপচয় হয় ও এফসিআর এর মান ভালো হয় না। সাধারণত বৃষ্টি হওয়ার সাথে সাথে পানি ঘোলা থাকে এবং এ সময় খাদ্য প্রয়োগ করলে খাদ্য অপচয় বেশি হয়।
পিএইচ : কম-বেশি হলে মাছ খাদ্য গ্রহণ কমবেশি হয়। সাধারণত পানির পিএইচ মান ৭.৫-৮.৫ থাকলে মাছ স্বাভাবিকভাবে খাদ্য গ্রহণ করে, মাছের বর্ধন ভাল হয় এবং এফসিআর এর মান কম হয়। বিশেষ করে গুলসা-পাবদা মাছচাষে পানির পিএইচ এর মান ৮ এর উপরে উঠে গেলে মাছের খাদ্য গ্রহণ হার অনেকাংশে কমে যায়। এরূপ পরিবেশে মাছ ক্ষুধার কারণে খাদ্য গ্রহণ করলেও সে খাদ্য সঠিকভাবে হজম হয় না, ফলস্বরূপ খাদ্যের আত্তীকরণও ভালো হয় না।
পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্যের প্রাচুর্যতা : পানিতে যদি চাষকৃত মাছের জন্য উপযুক্ত প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি হয় তাহলে সম্পূরক খাদ্যের পাশাপাশি কিছু প্রাকৃতিক খাদ্যও মাছ গ্রহণ করবে। সেক্ষেত্রে এফসিআর এর মান কম হতে পারে। রুইজাতীয় মাছের সম্পূরক খাদ্য তৈরিতে এটি বিবেচনা করা বিশেষভাবে প্রযোজ্য।
খাদ্য প্রয়োগের পরিমাণ : অনেক চাষি অধিক লাভের আশায় বা জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে অসতর্কতা বশত প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাদ্য প্রয়োগ করে থাকে। তাদের মধ্যে একটা ধারণা রয়েছে যে, অধিক খাদ্য ব্যবহার করলে, মাছ বেশি খাবে, দ্রুত বড় হবে এবং বেশি লাভবান হওয়া যাবে। কিন্তু এতে দেখা যায়, খাদ্যের অপচয় বেশি হয়, বর্ধিত খাদ্য পুকুরে পচে ক্ষতিকর গ্যাসের সৃষ্টি করে চাষের মাছকে পীড়ন অবস্থার মধ্যে ফেলে। এর ফলে খাদ্যের এফসিআর এর মান বেড়ে চাষি মাছচাষে লাভ থেকে বঞ্চিত হয়। পুকুরে খাদ্য প্রয়োগের পরিমাণ সতর্কতার সাথে নির্ণয় করতে হবে।
মোট খাদ্য = মাছের গড় ওজন ী খাদ্য প্রয়োগের হার (%) ী সরাসরি খাদ্য গ্রহণকারী মোট মাছের সংখ্যা।
খাদ্য প্রয়োগের সময় নির্ধারণ : প্রয়োগকৃত খাদ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য মাছের প্রজাতি ও ঋতু (বা তাপমাত্রা) বিবেচনায় নিতে হবে। কোন কোন প্রজাতির মাছ রাতে খেতে পছন্দ করে। যেমন শিং-মাগুর, গুলসা-পাবদা, ট্যাংরা মাছ। এসব মাছে সাধারণত দিনের প্রখর রৌদ্রে খাদ্য প্রয়োগ করলে, মাছ খাদ্য গ্রহণ কম করবে এবং খাদ্যের অপচয় হবে ও এফসিআর এর মান বেশি হবে। এ কারণে একটি পুকুরে প্রতি দিন নির্দিষ্ট সময়ে খাদ্য প্রয়োগ করতে হবে।
দিনে কয়বার খাদ্য প্রয়োগে করা হয় (ঋববফরহম ঋৎবয়ঁবহপু) : মাছের মোট ওজনের উপর নির্ভর করে পরিমিত পরিমাণ খাবার পুকুরে দিতে হবে। খাবার কোন সময় বেশি দেওয়া যাবে না। তবে কোন কোন মাছচাষে কিছুটা কম দেয়া ভালো তবুও কোনোভাবেও বেশি খাদ্য দেয়া সমিচীন নয়। দিনের জন্য হিসাবকৃত মোট খাদ্য ২-৩ ভাগে ভাগ করে দিলে খাবারের উত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হবে। তবে দিনে কয়বার মাছকে খাদ্য দিতে হবে তা অনেকাংশে নির্ভর করে মাছের আকারের ওপর। সাধারণত ছোট মাছকে ৪-৫ বার খাবার দিতে হয়। এভাবে খাদ্য প্রয়োগ করলে মাছ খাদ্য দ্রুততম সময়ে খেয়ে ফেলবে এবং খাদ্য পানিতে বেশি সময় অবস্থান করে পুষ্টি হারাবে না। এভাবে খাদ্যের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে খাদ্যের এফসিআর এর মান ভালো হবে এবং মাছের বৃদ্ধি সমভাবে ঘটবে।
প্রয়োগকৃত খাদ্যের প্রতি মাছের সাড়া (ঋববফরহম জবংঢ়ড়হংব) পুকুরে খাবার দেবার সময় অবশ্যই লক্ষ রাখতে হবে খাদ্যের প্রতি মাছের আচরন। মাছের খাবার গ্রহণ গাণিতিক হিসাবের ওপর নির্ভর করে না। খাদ্যের প্রতি মাছের সাড়া নির্ভর করে ১) খাদ্যের উপযোগিতা ২) চাষের পুকুরের পানির পরিবেশ, ৩) অন্যান্য পীড়ন যেমন পানির দূষণ, পানির অন্যান্য গুণাগুণ (কেবল এ্যামোনিয়া এবং পিএইচ নয়), হ্যান্ডেলিং মাছের ক্ষুধার ওপর প্রভাব রাখে। যখন মাছ পীড়ন অবস্থায় পড়ে, মাছের ক্ষুধা দ্রুত কমে যায়। খাদ্য প্রয়োগের সময় কিছুটা সময় নিয়ে খাওয়াতে হবে, খাদ্যের প্রতি মাছের সাড়া অনুসরণ করে অবশিষ্ট খাদ্য পুকুরে প্রয়োগ করতে হবে। খাদ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য সব খাদ্য পুকুরে একবারে প্রয়োগ না করায় ভালো।
প্রোবায়োটিকের ব্যবহার : মাছের খাদ্য হজমে বা খাদ্য উপাদান সরলীকরণে প্রোবায়োটিক বিশেষ ভূমিকা রেখে থাকে। যেহেতু প্রোবায়টিক পরিবেশ পরিশোধনে এবং পোষকের শরীরে উপকারী অণুজীবের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে ফলে মাছ ভালো পরিবেশ নিশ্চিত করাই মাছকে পীড়ন থেকে রক্ষা করে এবং মাছের খাদ্য ব্যবহারে অধিক পারঙ্গমতা প্রকাশ করে। ফলে প্রয়োগকৃত খাদ্যের এফসিআরের মানের ওপর ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে।
এফসিআর ও এ্যরেটরের ভূমিকা : বর্তমান সময় আধুনিক প্রযুক্তির জয়জয়কার। মাছ চাষের পুকুরে এ্যারেটর সংযোজন করতে পারলে নিরাপদ মাছ চাষে কয়েক ধাপ এগিয়ে যাওয়া যায়। মাছ চাষের পুকুরের দ্রবণীয় অক্সিজেনেরে অভাব একটি সাধারণ সমস্যা। যান্ত্রিক এ্যারেটর এ সমস্যা দূর করা ছাড়াও পুকুরের সাধারণ অক্সিজেনের মাত্রা (৫ পিপিএম) বাড়িয়ে দেয় ফলে মাছের খাদ্য গ্রহণ হারসহ খাদ্যের হজম হার বৃদ্ধি পায়। মাছের শরীরে খাদ্যের আত্তীকরণ বৃদ্ধি পায় ফলে সার্বিকভাবে খাদ্যের ঋঈজ এর মান ভালো হয়। ফলে কম খাবারে মাছের অধিক উৎপাদন পাওয়া যায়।
খাদ্যের এফসিআর এবং খাদ্যে আমিষের পরিমাণের সম্পর্ক
খাদ্যের আমিষের মাত্রা বেশি হলে সাধারণত এফসিআর এর মান কম হয়। অর্থাৎ অধিক আমিষ সমৃদ্ধ খাদ্য প্রয়োগে ১ কেজি মাছ উৎপাদন করতে তুলনামূলক কম খাদ্য লাগে। কিন্তু অধিক আমিষ সমৃদ্ধ খাদ্য তৈরি করলে খাদ্যের দাম বেশি হবে। প্রকৃতপক্ষে কম খরচে মাছের খাদ্য প্রদানের জন্য অধিক আমিষ সমৃদ্ধ খাদ্য প্রয়োগ করা উচিত। খাদ্যের উপকরণ, খাদ্যের আমিষে মাত্রা, খাদ্যের মূল্য, এফসিআর এর মান এবং পানির দূষণ পরস্পর সর্ম্পকযুক্ত।
খাদ্যের এফসিআর এর মান কি ১ এর কম হতে পারে
এটা সম্ভব কারণ মাছের পেশিতে পর্যাপ্ত পানি থাকে কিন্তু মাছের খাদ্য তুলনামূলক শুষ্ক থাকে অর্থাৎ পানির পরিমাণ কম থাকে। একটি ভালো মানের খাদ্য মাছ গ্রহণ করে প্রয়োগকৃত খাদ্যের অধিক পরিমাণে পানি সমৃদ্ধ পেশি (গড়রংঃ ঋষবংয) তৈরি করতে পারে। যদি আমরা নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্য গ্রহণে যে মাছ উৎপাদিত হয়েছে তা খাদ্যের অনুরূপ শুকিয়ে এফসিআর হিসাব করি তবে এফসিআর এর মান ১ এর কম হওয়া সম্ভব নয়। যদি পুকুরে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাবার থাকে তবেও খাদ্যের এফসিআর এর মান ১ এর কম হওয়া সম্ভব। সাধারণত মাছ প্রদত্ত সম্পূরক খাদ্যের পাশাপাশি পুকুরে অবস্থিত প্রাকৃতিক খাদ্যও গ্রহণ করে এবং কেবলমাত্র সম্পূরক খাদ্যে পালিত মাছের থেকে অধিক বর্ধন লাভ করে। এফসিআর এর মান কম যুক্ত ভালোমানের খাদ্যের অপর একটি সুবিধা হলো পুকুরে তুলনামূলক অধিক মাছচাষের সুযোগ করে দেয় কারণ এ ধরনের খাদ্যের অবশেষ কম থাকে যা পুকুরের পানিতে কম দূষণ ঘটায়। পুকুরের পানির উত্তম গুণাগত অবস্থা পুকুরের ধারণক্ষমতা ও উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।
মাছ চাষের লাভ-লোকসান নির্ধারণে মাছের খাদ্য এককভাবে ভূমিকা রাখে। সুতরাং খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল মাছচাষের ক্ষেত্রে খাদ্যের প্রয়োগের ক্ষেত্রে খাদ্যের কার্যকারিতার বিষয়ে বিশেষ নজর রাখতে হবে। খাদ্যনির্ভর প্রযুক্তিতে মাছচাষ লাভজনক পর্যায়ে রাখতে খাদ্যের এফসিআর এর মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বুঝতে হবে এফসিআর এর মানের সামান্য বৃদ্ধি এক জন মাছ চাষিকে মাছচাষে সাফল্যজনকভাবে লাভবান হতে বঞ্চিত করতে পারে।
লেখক : প্রাক্তন বিভাগীয় উপপরিচালক, মৎস্য অধিদপ্তর, মোবাইল : ০১৭৫১৯৩৯৯৩২,