কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ১৭ জুন, ২০২৫ এ ০৬:৫১ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: আষাঢ় সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-০৬-২০২৫
মিষ্টিআলুর উইভিল পোকা পরিবেশগত
প্রভাব ও দমন কৌশল
শেখ নাদিয়া১ মাসুমা মমতাজ মীম২ ড. মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ৩
মিষ্টিআলু একটি গুরুত্বপূর্ণ কন্দ জাতীয় ফসল, যা এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকা ও ওশেনিয়া মহাদেশের গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে ব্যাপকভাবে চাষ করা হয়। এটি অত্যন্ত পুষ্টিকর এবং সহজে চাষযোগ্য খাদ্যশস্য, যা বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গ্লোবাল খাদ্যশৃঙ্খলে মিষ্টি আলু সপ্তম গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য হিসেবে পরিচিত, যার বৈশ্বিক উৎপাদন বছরে প্রায় ১৩১ মিলিয়ন টন এবং চাষের জন্য প্রায় ৯ মিলিয়ন হেক্টর জমি প্রয়োজন হয়। (ঋঅঙঝঞঅঞ, ২০০৯)
এটি উচ্চমাত্রার শর্করা, ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি, আয়রন, পটাশিয়াম, উদ্ভিজ্জ আঁশ ও প্রোটিন সমৃদ্ধ হওয়ায় এটি একটি শক্তিশালী পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। মিষ্টিআলুর লতা ও পাতা পশুখাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করা হয়, যা কৃষকদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা প্রদান করে। বাংলাদেশের যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর চরাঞ্চলে শুকনো মৌসুমে এই ফসলের চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বারি-২, কমলা সুন্দরী, তৃপ্তি, ওকিনাওয়া, মুরাসাকি (জাপানি), পার্পল স্টার প্রভৃতি জাত স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ব্যাপকভাবে চাষ করা হচ্ছে। তবে, অন্যান্য অনেক ফসলের মতোই মিষ্টিআলুও বিভিন্ন পোকামাকড় দ্বারা আক্রান্ত হয়, যার মধ্যে উইভিল পোকা (ঈুষধং ভড়ৎসরপধৎরঁং) অন্যতম। এটি ফসলের সবচেয়ে ভয়াবহ শত্রু হিসেবে পরিচিত এবং ফলনের উল্লেখযোগ্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। (শধুং, ২০০৬)
মিষ্টিআলুর উইভিল পোকা এবং এর ক্ষতির পরিমাণ
উইভিল পোকা মিষ্টিআলুর পাতার পাশাপাশি কা- ও কন্দ খেয়ে ফসলের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে। এই পোকার আক্রমণের ফলে মিষ্টিআলুর গাছ ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে, যা ফলন কমিয়ে দেয় এবং ফসলের গুণগতমান নষ্ট করে। গবেষণা থেকে জানা যায় যে, উইভিল আক্রান্ত ক্ষেত্রের ফলন ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে এবং বাজার মূল্য ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে প্রতি বছর প্রতি হেক্টরে ২ থেকে ৩ টন ফসল নষ্ট হতে পারে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে, উইভিল পোকা বিশ্বের অনেক দেশে বিশাল আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আফ্রিকায় এই পোকা প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি করে, যা কৃষকদের জন্য একটি মারাত্মক চ্যালেঞ্জ। ফিলিপাইনে উইভিল আক্রান্ত ফসলের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ নষ্ট হয়। বাংলাদেশেও এই পোকার কারণে কৃষকদের লক্ষ লক্ষ টাকা ক্ষতি হয়, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। তাছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা উইভিল পোকার প্রজনন হার বৃদ্ধি করতে পারে, ফলে এর বিস্তার আরও ব্যাপক হতে পারে। ঠা-া আবহাওয়ায় পোকার জীবনচক্র দীর্ঘ হয় এবং তাদের প্রজনন হার কমে যায়, তবে ক্রমবর্ধমান গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলে এই পোকার সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
পোকার বাহ্যিক গঠন এবং জীবনচক্র
উইভিল পোকাটি দেখতে অনেকটা পিপড়ার মতো এবং দৈর্ঘ্যে সাধারণত ৬ থেকে ৮ মিলিমিটার হয়। এদের মাথা ও পেট কালো রঙের এবং বক্ষ ও পা উজ্জ্বল লালচে-কমলা রঙের হয়ে থাকে। মুখের অগ্রভাগে সূচালো এবং লম্বা শুঁড় থাকে, যা স্ত্রী উইভিলের জন্য লতা, কা- ও কন্দে ছিদ্র করে ডিম পাড়তে সহায়তা করে। স্ত্রী উইভিল সাধারণত পুরুষের তুলনায় লম্বাটে হয় এবং এদের শুঁড় বেশি দীর্ঘ ও সরু হয়। একবার পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পর স্ত্রী উইভিল প্রতি জীবনচক্রে ১০০ থেকে ১৫০টি ডিম পাড়তে পারে এবং গড়ে ২ থেকে ৩ মাস বাঁচতে পারে।
উইভিল পোকার সম্পূর্ণ জীবনচক্র ৩০ থেকে ৪৫ দিন সময় নেয় এবং এতে চারটি প্রধান ধাপ রয়েছে, যা হলো ডিম, লার্ভা, পিউপা ও পূর্ণবয়স্ক পোকা। স্ত্রী উইভিল মিষ্টিআলুর লতা, কা- বা কন্দের অভ্যন্তরে ছিদ্র করে ডিম পাড়ে। ডিমগুলো ছোট এবং সাদাটে রঙের হয়। চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে লার্ভা বের হয়, যা দেখতে সি-আকৃতির এবং এর কোনো পা থাকে না। লার্ভা আলুর কন্দের মধ্যে সুড়ঙ্গ তৈরি করে এবং স্টার্চ খেয়ে ফসলের গুণগতমান নষ্ট করে। এরপর এটি পিউপা দশায় প্রবেশ করে এবং সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ উইভিলে পরিণত হয়।
ফসলের ক্ষতির ধরন এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা
উইভিল পোকার সবচেয়ে ক্ষতিকারক ধাপ হলো লার্ভা, যা আলুর কন্দের ভেতরে সুড়ঙ্গ তৈরি করে এবং স্টার্চ খেয়ে ফসলের গুণমান নষ্ট করে। উইভিল পোকার আক্রমণের ফলে ছত্রাকের সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, যা আরও বেশি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্টার্চ খাওয়ার কারণে আলুর মধ্যে টারপিন উৎপন্ন হয়, যা আলুকে তিতা এবং দুর্গন্ধযুক্ত করে তোলে। ফলে বাজারে এই আলুর গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পায় এবং রপ্তানির সম্ভাবনা কমে যায়।
উইভিল দমনের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে প্রথমেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে জমিতে একটানা মিষ্টিআলু চাষ না করে ফসল পরিবর্তন পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত। আক্রান্ত আলু ও লতা জমি থেকে সরিয়ে ধ্বংস করতে হবে, যাতে পোকার বিস্তার রোধ করা যায়। মাটির নিচে আলুর টিউবার ১০ সেন্টিমিটার গভীরে লাগালে উইভিলের আক্রমণ কমে যাবে। ফেরোমন ট্র্যাপ ব্যবহার করে পূর্ণবয়স্ক উইভিল দমন করা যায়।
প্রাকৃতিক দমন ব্যবস্থার মধ্যে পরাগজীবী বোলতা (ইৎধপড়হ ংঢ়ঢ়.) উইভিলের ডিম ও লার্ভাকে আক্রমণ করে এবং নেমাটোড (ঝঃবরহবৎহবসধ, ঐবঃবৎড়ৎযধনফরঃরং ংঢ়ঢ়.) উইভিলের লার্ভাকে ধ্বংস করে। এছাড়া ছত্রাক (ইবধাঁবৎরধ নধংংরধহধ, গবঃধৎযরুরঁস ধহরংড়ঢ়ষরধব) ব্যবহার করে উইভিল দমন করা সম্ভব। রাসায়নিক দমন ব্যবস্থায় পাইরিথ্রয়েড, নিওনিকোটিনয়েড ও অর্গানোফসফেট কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। পরিবেশবান্ধব উপায় হিসেবে নিমের নির্যাস ও পাইরিথ্রাম ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে, দীর্ঘমেয়াদে কীটনাশক প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি থাকায় সমন্বিত পদ্ধতিতে কীটনাশক ব্যবহার করা শ্রেয়।
পরিবেশগত কারণ এবং এর প্রভাব
উইভিল পোকার বিস্তারের অন্যতম প্রধান কারণ হলো পরিবর্তনশীল জলবায়ু ও পরিবেশগত কারণসমূহ। উষ্ণ আবহাওয়ায় এই পোকা দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে পারে এবং দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় থাকে। অতিরিক্ত আর্দ্রতা উইভিলের লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক পোকাদের টিকে থাকার হার বাড়িয়ে দেয়, যা সংক্রমণের হার বৃদ্ধি করে। একইভাবে, খরা বা বন্যার মতো চরম জলবায়ুগত পরিবর্তন মিষ্টিআলুর শারীরবৃত্তীয় কাঠামো পরিবর্তন করে, যা উইভিলের জন্য আরো সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে উইভিলের বিস্তার কমানো সম্ভব।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি এবং গবেষণার প্রয়োজনীয়তা
মিষ্টিআলুর উইভিল পোকা দমনে আরও কার্যকর সমাধানের জন্য গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বায়োটেকনোলজির মাধ্যমে উইভিল প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবন করা যেতে পারে। বর্তমানে বায়োপেস্টিসাইড ও ফেরোমন ট্র্যাপ ব্যবহার করে উইভিল নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন গবেষণা চলছে, যা কৃষকদের জন্য পরিবেশবান্ধব ও কার্যকর সমাধান হতে পারে। একই সঙ্গে, কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা ও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনার কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী উইভিল দমন সম্ভব।
টেকসই কৃষির উন্নয়নের জন্য পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উইভিল প্রতিরোধী কৌশল গ্রহণ করা দরকার। গবেষণার মাধ্যমে যদি উইভিল প্রতিরোধী মিষ্টিআলুর জাত তৈরি করা যায়, তবে এটি কৃষকদের জন্য বড় ধরনের সুবিধা বয়ে আনবে। এ ছাড়া, উন্নত কীটনাশক ও জৈবিক নিয়ন্ত্রণ কৌশল প্রয়োগ করে উইভিলের ক্ষতিকর প্রভাব হ্রাস করা সম্ভব। ভবিষ্যতে স্মার্ট ফার্মিং ও ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে উইভিল পোকার উপস্থিতি দ্রুত শনাক্ত করা এবং যথাযথ প্রতিকার গ্রহণ করা সহজ হবে।
মিষ্টিআলুর উইভিল পোকা কৃষকদের জন্য একটি বড় সমস্যা, যা ফসলের গুণমান নষ্ট করে এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধন করে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এর বিস্তার বাড়ছে, তাই সতর্ক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুসরণ করলে উইভিল দমন করা সম্ভব এবং কৃষকদের লাভ বৃদ্ধি পাবে।
লেখক : ১-২শিক্ষার্থী, ল্যাবরেটরি অব অ্যাপ্লাইড এন্টোমলজি এন্ড একারোলজি, কীটতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-২২০২। ৩অধ্যাপক, ল্যাবরেটরি অব অ্যাপ্লাইড এন্টোমলজি এন্ড একারোলজি, কীটতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-২২০২। মোবাইল: ০১৭১১৪৫২৪৯৬। ই-মেইল :ullahipm@bau.edu.bd