কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ১৯ মার্চ, ২০২৫ এ ০৮:৪১ PM

মাছের পিটুইটারী গ্ল্যান্ড বা পিজি সংগ্রহ সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের কৌশল

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: চৈত্র সাল: ১৪৩১ প্রকাশের তারিখ: ১৯-০৩-২০২৫

মাছের পিটুইটারী গ্ল্যান্ড বা পিজি সংগ্রহ সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের কৌশল
মোঃ মাসুদ রানা
বাংলাদেশ মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধ, দেশের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য পুকুর, নদ-নদী, খাল-বিল ও হাওর-বাঁওড় রয়েছে, বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিশাল হাওড় এলাকা মৎস্য সম্পদের সূতিকাগার। মাছ সাধারণত প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রজনন করে থাকে, আমাদেরে দেশের খাল, বিল, নদী, হাওর-বাঁওড়ে এক সময় প্রচুর মাছ প্রজনন করত। মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন করার জন্য যে সকল নিয়ামকের প্রয়োজন দিন দিন নষ্ট হয়ে পড়ার কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশে মাছের প্রজনন দিন দিন কমতে থাকে।  ফলে দিন দিন মাছের প্রাপ্যতা দেশের প্রাকৃতিক জলাশয়ে কমতে থাকে, এমনকি কিছু কিছু মাছ প্রজনন করতে না পারায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা গবেষণার মাধ্যমে মাছের কৃত্রিম প্রজনন কৌশল উদ্ভাবন করেন, যেখানে মৎস্য হ্যাচারিতে মাছকে হরমোন প্রয়োগ করে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন করা হয়। 
বাংলাদেশের চাষের মাছের প্রায় ৯০-৯৫ শতাংশ পোনা কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে উৎপাদন করে মৎস্য খামারিদের পোনার চাহিদা পূরণ করা হয়ে থাকে। মৎস্য হ্যাচারিতে কৃত্রিম প্রজননের জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয় যে হরমোন তার নাম পিজি বা পিটুইটারি গ্ল্যান্ড। দেশে দিন দিন মৎস্য হ্যাচারি শিল্প সম্প্রসারণ ঘটায় পিজির চাহিদা বাড়তে থাকে, প্রতি বছর এ চাহিদা পূরণে আমাদের প্রায় ৮০-৯০ কেজি পিজি আমদানি করতে হয়। প্রতি কেজি পিজির বাজারমূল্য প্রায়              ৬০-৭০ লক্ষ টাকা।
মাছের প্রজনন মৌসুমে যে গ্রন্থি গোনাডোট্রপিন নামক হরমোন নিঃসরণ করে তাকে পিটুইটারি গ্ল্যান্ড বা পিজি বলে। মাছের পিজির রং ঈষৎ গোলাপী যার অবস্থান মাছের মস্তিষ্কের ঠিক নিচেই। মাছের পিজির গুণগত মান নির্ভর করে মাছের গুণগত মান ও পরিপক্বতার উপর, সাধারণত পরিপক্ব মাছ (কার্প জাতীয় মাছের ক্ষেত্রে যে সকল মাছ প্রজননক্ষম) হতে পিজি সংগ্রহ করলে তার গুণগত মান ভাল হয়। স্ত্রী বা পুরুষ উভয় প্রকার মাছ থেকেই পিজি সংগ্রহ করা যেতে পারে, পিজি বছরের যে কোন সময় পরিপক্ব মাছ থেকে সংগ্রহ করা যেতে পারে, তবে মাছের প্রজনন মৌসুমে সংগ্রহ করলে উত্তম পিজি পাওয়া যায়। 
বাণিজ্যিকভাবে মাছের পিজি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কৌশল 
সদ্য মৃত মাছ, বরফ দিয়ে সংরক্ষিত বা কোল্ডস্টোর থেকে বের করে বাজারজাত করার যোগ্য মাছ থেকে পিজি সংগ্রহ করা যায়। আমাদের দেশের সকল বাজারেই এখন মাছ কেটে বিক্রি করা হয়, বাজারে যারা মাছ কাটের তাদের বটিওয়ালা বলা হয়ে থাকে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও অনান্য জেলা উপজেলা শহরে প্রতিদিন মাছ কেটে জীবিকা নির্বাহ করছে কযেক লাখ বটিওয়ালা। যেহেতু পিজি সংগ্রহ করার জন্য মাছের মাথার মগজ অপসারণ করতে হয় সেহেতু বাণিজ্যিকভাবে পিজি সংগ্রহ করার জন্য যারা প্রতিনিয়ত মাছ কাটেন তাদের মাধ্যমে করা যায়। বটিওয়ালারা সাধারণত মাছের মাথা শরীর থেকে আলাদা করার পর দ্বিখ-িত করে। পিজি সংগ্রহ করার জন্য মাছের মাথা এমনভাবে দ্বিখ-িত করতে হবে যেন একপাশে ৫২% ও অন্য পাশে ৪৮% অংশ থাকে। যে পাশে বড় অংশ সে পাশে মগজ থাকবে আর সেই মগজের নিচ থেকে পিজি সংগ্রহ করার জন্য একটি নিডিল বা চামুচাকৃতির সুচ লাগবে যা দিয়ে খুব সাবধানে মগজটিকে আলাদা করে বা একপাশে সরিয়ে নিতে হবে, তারপর নিচের পর্দাটি অতি সতর্কতার সাথে সরিয়ে পিজি সংগ্রহ করতে হবে। পিজি সংগ্রহ করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন পিজির দানাটির উপর কোন চাপ বা আঘাত না লাগে, সেক্ষেত্রে সুচটির মাথা দিয়ে সাবধানতার সাথে পিজি বের করে সংরক্ষণ করতে হবে।  আমাদের দেশের মাছ বাজারগুলোতে প্রাপ্ত মাছের মধ্যে রুই, কাতলা, কালিবাউস, মিরর কার্প, গ্রাস কার্প, মৃগেল, বিগহেড কার্প মাছ হতে পিজি সংগ্রহ করা যেতে পারে।  তাৎক্ষণিকভাবে সংগৃহীত পিজি হ্যাচারিতে ব্যবহার করা যেতে পারে বা পরবর্তীতে ব্যবহার বা বাজারজাতকরণের জন্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে। পিজি সংগ্রহ করার সময় কোনো ভাবেই পিজির গায়ে পানি লাগানো যাবে না, পানির সংস্পর্শে আসলে পিজির পচন ও গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়।
পিজি সংগ্রহ করার পর অতি সাবধানতার সাথে তা অ্যালকোহল বা অ্যাসিটোন দ্রবণে সংরক্ষণ করতে হয়। ২০-৩০ সিসি মাপের কাঁচের শিশিতে  অ্যালকোহল বা অ্যাসিটোনসহ পিজি দানা সংরক্ষণ করতে হয়, প্রথমবার পিজি দানা রাখার ১২-১৬ ঘণ্টা পর একবার এবং পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা পর আরেকবার দ্রবণ পরিবর্তন করে পিজি সংরক্ষণ করতে হয়।  অ্যালকোহল বা অ্যাসিটোন দ্রবণ পিজিতে থাকা পানি ও চর্বি শোষণ করে পচন রোধ করে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। এভাবে দ্রবণে সংরক্ষণ করে পিজি প্রায় ১ বছর থেকে ২ বছর ব্যবহার করা যায় তবে ফ্রিজিং করলে ২-৩ বছর ব্যবহার করা যায়। অন্যদিকে পিজিকে ২-৩ মাস পর  দ্রবণ থেকে বের করে ৩০-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার ড্রায়ার ব্যবহার করে শুষ্ককরণ করে কাচের কর্কযুক্ত (এয়ারটাইট) শিশিতে সংরক্ষণ করলে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ করা যায়।
মাছের পিজির বাজার ব্যবস্থা ও সম্ভাবনা 
আমাদের দেশে ছোট-বড় সব মিলিয়ে ৯৮৪ টি মৎস্য হ্যাচারি রয়েছে (মৎস্য অধিদপ্তর, ২০২৩)। এসব হ্যাচারিতে প্রতিনিয়ত বাণিজ্যিকভাবে কৃত্রিম পদ্ধতি ব্যবহার করা পোনা উৎপাদন করে দেশের মাছ চাষিদের পোনার জোগান দেওয়া হচ্ছে। দেশের প্রায় সকল মৎস্য হ্যাচারি আমদানিকৃত পিজির উপর নির্ভর করে টিকে আছে, তাই দেশে উৎপাদিত মৎস্য পিজির ব্যাপক সম্ভাবনা আছে। বাণিজ্যিকভাবে পিজি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের জন্য সংগৃহীত পিজিকে দানার আকার অনুযায়ী আলাদা গ্রেডিং করে নির্দিষ্ট ভায়ালে লেভেলিং করে বাজারজাত করা সম্ভব, তবে অবশ্যই বাজারজাতকরণের পূর্বে মৎস্য অধিদপ্তরের গুণগুত মান নিয়ন্ত্রণ সনদ ও অনুমতিপত্র লাগবে। প্রতি কেজি পিজির বাজারমূল্য প্রায় ৬০-৭০ লক্ষ টাকা (আকারভেদে)। দেশের বড় বড় বাজারগুলোতে যে পরিমাণ মাছ বিক্রয় ও কর্তন হয় তা থেকে যদি সঠিকভাবে পিজি সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হয় তাহলে আমাদের দেশের সকল হ্যাচারির চাহিদা মিটিয়ে পিজি রপ্তানি করা সম্ভব বলে আমি মনে করি।
বাংলাদেশের মাছ বাজারে কর্মরত বটিওয়ালাদের যদি সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে মাছের পিজি সংগ্রহ, সংরক্ষণের কলাকৌশল বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয় তাহলে প্রতিদিন দেশের মাছ বাজারগুলো থেকে বিপুল সংখ্যক পিজি সংগ্রহ করা যাবে। পিজি সংগ্রহ করলে একদিকে যেমন আমাদের পিজি আমদানির উপর নির্ভরতা কমবে অন্যদিকে যারা মাছ কাটে (বটিওয়ালা) তাদের অতিরিক্ত উপার্জনের রাস্তা বের হবে এবং তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হবে। পরিশেষে, বলা যায় দেশের মাছ বাজারগুলো থেকে পিজি উৎপাদনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে যা মৎস্য হ্যাচারি শিল্পে এক নব বিপ্লব আনার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ফিশারিজ, একোয়াকালচার অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা-১২০৭। মোবাইল নংঃ ০১৭৪৫৬২৬১৫৩

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন