কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৩ এ ০৫:০৭ PM

মাঘ মাসের কৃষি (১৫ জানুয়ারি-১৩ ফেব্রুয়ারি)

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: পৌষ সাল: ১৪৩০ প্রকাশের তারিখ: ১৭-১২-২০২৩

মাঘ মাসের কৃষি
(১৫ জানুয়ারি-১৩ ফেব্রুয়ারি)
কৃষিবিদ ফেরদৌসী বেগম
হাড় কাঁপানো শীতের আভাস নিয়ে হাজির হয় মাঘ মাস । কথায় আছে মাঘের শীত নাকি বাঘকেও হার মানায়। জলবায়ু পরিবর্তনে তীব্র শীতের মাঝেও খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যস্ত থাকে কৃষিজীবী ভাইবোনেরা। কেননা এ মাস বোরো মৌসুমের পাশাপাশি কৃষির ব্যস্ততম সময়। তাই আসুন আমরা জেনে নেই মাঘ মাসে কৃষিতে করণীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো।
বোরো ধান
ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। ধানের চারা রোপণের  ১৫-২০ দিন পর প্রথম কিস্তি, ৩০-৪০ দিন পর দ্বিতীয় কিস্তি এবং ৫০-৫৫ দিন পর শেষ কিস্তি হিসেবে ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। বোরো ধানে নিয়মিত সেচ প্রদান, আগাছা দমন, বালাই ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য পরিচর্যা করতে হবে। রোগ ও পোকা থেকে ধান গাছকে বাঁচাতে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ, আন্তঃপরিচর্যা, যান্ত্রিক দমন, উপকারী পোকা সংরক্ষণ, ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করা, আলোর ফাঁদ এসবের মাধ্যমে ধানক্ষেত বালাই মুক্ত করতে পারেন। এভাবে রোগ ও পোকার আক্রমণ প্রতিহত করা না গেলে শেষ উপায় হিসেবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে সঠিক বালাইনাশক, সঠিক সময়ে, সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।
গম
গমের জমিতে যেখানে ঘনচারা রয়েছে তা পাতলা করে দিতে হবে। গম গাছ থেকে যদি শিষ বেড় হয় বা গম গাছের বয়স ৫৫-৬০ দিন হয় তবে জরুরিভাবে গমক্ষেতে একটি সেচ দিতে হবে। এতে গমের ফলন বৃদ্ধি পাবে। ভালো ফলনের জন্য দানা গঠনের সময় আরেকবার সেচ দিতে হবে। গম ক্ষেতে ইঁদুর দমনের কাজটি সকলে মিলে একসাথে করতে হবে।
ভুট্টা
ভুট্টাক্ষেতে গাছের গোড়ার মাটি তুলে দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং অন্যান্য কারণে এসময় ভুট্টা ফসলে আর্মিওয়ার্ম, ফল আর্মিওয়ার্ম ইত্যাদি পোকার আক্রমণ দেখা যায়। আক্রান্ত গাছ থেকে লার্ভাগুলো হাত দ্বারা সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলতে হবে। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে স্পেনোসেড (ট্রেসার ৪৫এসসি@ ০.৪ মিলি./লিটার) বা এবামেকটিন বেনজোয়েট (প্রোক্লেম ৫ এসজি বা সাহাম ৫ এসজি @ ১ গ্রাম/লিটার) বালাইনাশক প্রয়োগ করতে হবে।
আলু
আলু ফসলে নাবি ধসা রোগ দেখা দিতে পারে। সে কারণে ¯েপ্রয়িং শিডিউল মেনে চলতে হবে। মড়ক রোগ দমনে দেরি না করে ২ গ্রাম এক্সট্রামিল অথবা ডাইথেন এম ৪৫ অথবা সিকিউর অথবা মেলুডি ডুও প্রতি লিটার পানির সাথে মিশিয়ে নিয়মিত ¯েপ্র করতে হবে। মড়ক লাগা জমিতে সেচ দেওয়া বন্ধ করতে হবে। তাছাড়া আলু ফসলে মালচিং, সেচ প্রয়োগ, আগাছা দমনের কাজগুলোও করতে হবে। আলু  গাছের বয়স ৮০ দিন হলে মাটির  সমান করে গাছ কেটে দিতে হবে এবং ১০ দিন পর আলু তুলে ফেলতে হবে। খুব সহজে ও কম খরচে আলু উত্তোলন করতে পটেটো ডিগার যন্ত্র ব্যবহার করুন। ক্ষতির হার ১% এর নিচে এবং শ্রমিক ৫০% সাশ্রয় হয়। আলু তোলার পর  ভালো করে শুকিয়ে বাছাই করতে হবে এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে।
তুলা
তুলা সংগ্রহের কাজ এ মাস থেকেই শুরু করতে হবে। তুলা সাধারণত ৩ পর্যায়ে সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। শুরুতে ৫০% বোল ফাটলে প্রথম বার, বাকি ফলের ৩০% পরিপক্ব হলে দ্বিতীয় বার এবং অবশিষ্ট ফসল পরিপক্ব হলে শেষ অংশের তুলা সংগ্রহ করতে হবে। রৌদ্রময় শুকনা দিনে বীজ তুলা উঠাতে হয়। ভালো তুলার সাথে যেন খারাপ তুলা (পোকায় খাওয়া, রোগাক্রান্ত) কখনো না মেশে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। ভালো তুলা আলাদাভাবে তুলে ৩-৪ বার রোদে শুকিয়ে বস্তায় ভরে মাচা বা দানেস এর উপর সংরক্ষণ করতে হবে। ইঁদুর নষ্ট করতে না পারে, সেদিকে খেয়াল করতে হবে।
ডাল ও তেল ফসল
মসুর, ছোলা, মটর, মাসকালাই, মুগ, তিসি এ সময় পাকে। সরিষা, তিসি বেশি পাকলে রোদের তাপে ফেটে গিয়ে বীজ পড়ে যেতে পারে, তাই এগুলো ৮০ ভাগ পাকলেই সংগ্রহের ব্যবস্থা নিতে হবে। ডাল ফসলের ক্ষেত্রে গাছ গোড়াসহ না উঠিয়ে মাটি থেকে কয়েক ইঞ্চি রেখে ফসল সংগ্রহ করতে হবে। এতে জমির উর্বরতা এবং নাইট্রোজেন সরবরাহ বাড়বে। এ সময় চর অঞ্চলে পেঁয়াজের সাথে বিলে ফসল হিসেবে বাদাম চাষ করতে পারেন।
শাকসবজি
বেশি ফলন পেতে  শীতকালীন শাকসবজি যেমন ফুলকপি,  বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, ওলকপি, শালগম, গাজর, শিম, লাউ, কুমড়া, মটরশুঁটি এসবের নিয়মিত যত্ন নিতে হবে। উত্তম কৃষি চর্চা অনুসরণ করে জৈবসার, জৈব বালাইনাশক, ফেরোমন ফাঁদ  সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বালাই দমন করতে হবে। শীতকালে মাটিতে রস কমে যায় বলে সবজি ক্ষেতে চাহিদামাফিক সেচ দিতে হবে।
ফুল
জারবেরা ফুল নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সারা বছর চারা লাগানো যেতে পারে তবে শীত মৌসুম অর্থ্যাৎ অক্টোবর-নভে¤¦র মাস চারা লাগানোর সর্বোত্তম সময়। জারবেরার শিকড় গভীরে প্রবেশ করে বিধায় বার বার হালকা ¯িপ্রংকলার (ঝঢ়ৎরহশষবৎ) সেচের পরিবর্তে প্লাবন সেচ (ঋষড়ড়ফ ওৎৎরমধঃরড়হ) দেয়া উত্তম। পানি সেচের সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয়। কারণ জারবেরা ক্ষেতে জলাবদ্ধতা মাটিবাহিত রোগ সংক্রমণ ত¦রানি¦ত করে। আবার মাটিতে পানির অভাব হলে গাছ ঢলে (ডরষঃরহম) পড়ে, সেক্ষেত্রে ফুলের পুষ্পদ- ছোট হয়ে যায়।
বেড তৈরি হলে চারা লাগানোর কমপক্ষে এক সপ্তাহ আগে বেডের প্রতি ১০ বর্গ মিটারের জন্য ৬০ কেজি পচা জৈব সার, ১.৫ কেজি ইউরিয়া অথবা ১ কেজি এমোনিয়াম সালফেট, ২.৫ কেজি ট্রিপল সুপার ফসফেট, ৫০০ গ্রাম মিউরেট অব পটাশ ও ৫০ গ্রাম ম্যাগনেশিয়াম সালফেট প্রয়োগ করে ভালভাবে মাটিতে মিশিয়ে দিয়া প্রয়োজন। জারবেরার বেড তৈরির সময় সারের যে বেসাল ডোজ দেয়া হয় তার পাশাপাশি নিম্নলিখিত মাত্রায় পুষ্টি সরবরাহ করতে হবে। চারা রোপণের প্রথম ২-৩ সপ্তাহ গাছে কোন সার প্রয়োগ করা যাবে না। জারবেরা বেডের প্রতি ১০ বর্গ মিটার জমিতে গাছের চারপাশে ২৫০ গ্রাম ক্যালসিয়াম এমোনিয়াম নাইট্রেট এবং ১৫০ গ্রাম মিউরেট অব পটাশ প্রতি ১৫ দিন অন্তর প্রয়োগ করতে হবে। ১২ সপ্তাহ পর থেকে গাছে ফুল আসা শুরু হলে এনপিকে (ঘচক) (১৫:২০:৩০) প্রতি লিটার পানিতে ১.৫ গ্রাম মিশিয়ে ২-৪ সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতিদিন জমিতে প্রয়োগ করলে ভাল মানের বেশি ফুল পাওয়া যায়।
গাছপালা
শীতে গাছের গোড়ায় নিয়মিত সেচ দিতে হবে। গোড়ার মাটি আলগা করে দিতে হবে এবং আগাছামুক্ত রাখতে হবে। সাধারণত এ সময় আমগাছে মুকুল আসে। গাছে মুকুল আসার পর কিন্তু ফুল ফোটার আগে টিল্ট-২৫০ইসি প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি অথবা ১ মিলি কন্জা প¬াস অথবা ২ গ্রাম ডাইথেন এম-৪৫ প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হবে। এসময় প্রতিটি মুকুলে অসংখ্য হপার নিম্ফ দেখা যায়। আম গাছে মুকুল আসার ১০ দিনের মধ্যে কিন্তু ফুল ফোটার পূর্বেই একবার এবং এর একমাস পর আর একবার প্রতি লিটার পানির সাথে ১.০ মিলি সিমবুস/ফেনম/ডেসিস ২.৫ ইসি মিশিয়ে গাছের পাতা, মুকুল ও ডালপাল ভালোভাবে ভিজিয়ে ¯েপ্র করতে হবে।
সুপ্রিয় পাঠক, অত্যন্ত সংক্ষেপে মাঘ মাসে কৃষিতে করণীয় কাজগুলোর উলে¬খযোগ্য দিক তুলে ধরা হলো। আপনারা আপনাদের অভিজ্ঞতা ও পরিবেশের গ্রহণযোগ্যতার সমন্বয়ে কাজ করলে সফলতা আসবেই। কৃষির যে কোনো সমস্যায় উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।

লেখক : সম্পাদক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা।  টেলিফোন : ০২৫৫০২৮৪০৪, editor@ais.gov.bd

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন