কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ এ ০১:৩৪ AM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: মাঘ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ২০-০১-২০২৬
মরিচের পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা
ড. মোঃ জুলফিকার হায়দার প্রধান
মরিচ সোলানেসি পরিবারে অন্তর্ভুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। আমাদের দেশে মূলত মরিচ মসলা ফসল হিসেবে পরিচিত। কাঁচা ও পাকা উভয় অবস্থাতেই এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। পুষ্টিমানে কাঁচামরিচ ভিটামিন এ ও সি সমৃদ্ধ। আমাদের দেশে প্রায় সব অঞ্চলেই এর চাষাবাদ হয়। বাংলাদেশে মরিচের আওতায় জমির পরিমাণ ৯৯০০০ হেক্টর এবং উৎপাদন ৭৫৮০০০ মেট্রিক টন। বাংলাদেশে মরিচের গড় ফলন আশানুরূপ নয়। ফলন কম হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে ক্ষতিকর পোকা মাকড়ের আক্রমণ। বিভিন্ন প্রকার পোকামাকড় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মরিচ উৎপাদনে প্রভাব বিস্তার করে এবং এদের আক্রমণে ফসলের উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট হয়ে যায়। এমতাবস্থায় বিভিন্ন পোকামাকড় হতে ফসল রক্ষার জন্য এদের আক্রমণের ধরন এবং ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা অত্যন্ত জরুরি। নি¤েœ মরিচ ফসলের প্রধান প্রধান পোকামাকড় ও রোগের আক্রমণ এবং ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-
থ্রিপস : নিম্ফ ও পূর্ণবয়স্ক পোকা পাতা ছিদ্র করে রস শোষণ করে ফলে পাতায় ক্ষতের সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত আক্রমণে পাতা উপরের দিকে বেঁকে যায়, শুকিয়ে যায়, গাছের বৃদ্ধি বিঘিœত হয়, পাতা বিকৃত হয়। গাছে প্রাথমিক অবস্থায় এদের আক্রমণ হলে ফলন এবং বীজের মান খারাপ হয়। এরা ফুলের ভেতরে আক্রমণ করে খায়। অতিরিক্ত আক্রমণে ফুল ঝরে পড়ে। এদের পিউপা ধাপ মাটিতে সম্পন্ন হয়।
ব্যবস্থাপনা
সঠিকভাবে সেচ প্রদান করতে হবে। কারণ পোকার রস শোষণের ফলে ক্রমান্বয়ে গাছের কোষ থেকে পানি বের হয়ে পানি শূন্যতার সৃষ্টি হয়। সেচ বা জমি ভিজিয়ে দিলে মাটিতে বিদ্যমান থ্রিপসের প্রিপিউপা ও পিউপা মারা যায়। সাদা ও নীল আঠালো ফাঁদ ব্যবহার করতে হবে। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে ক্লোরফিনাপির জাতীয় কীটনাশক (ইনটিপ্রিড ১০ এসসি ১ মিলি/লিটার) বা ইমিডাকো¬প্রিড জাতীয় কীটনাশক (এডমায়ার ২০ এসএল বা ইমিটাফ ২০ এসএল বা টিডো ২০ এসএল বা গেইন ২০ এসএল বা প্রিমিয়ার ২০ এসএল বা ইমিডাগোল্ড ২০ এসএল) প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি বা মেট্রিক্সিন প্লাস (১মিলি/লিটার) স্প্রে করতে হবে।
জাব পোকা : পূর্ণ বয়স্ক পোকা ও নিম্ফ উভয়েই গাছের নতুন ডগা, পাতা, ফুলের কুঁড়ি, ফুল ও ফল থেকে রস চুষে খায়। কচি গাছে পোকার সংখ্যা বেশি হলে গাছ মারা যেতে পারে। বয়স্ক গাছে এদের আক্রমণে পাতা কুঁকড়ে যায়, হলদে রং ধারণ করে, গাছের বৃদ্ধি কমে যায়।
ব্যবস্থাপনা
ফসলের অবশিষ্টাংশ নষ্ট করতে হবে; আঠালো হলুদ ফাঁদ ব্যবহার করতে হবে; বিভিন্ন বন্ধু পোকা যেমন লেডি বিটল, সিরফিড ফ্লাই ও জবফ ংযড়ঁষফবৎ নববঃষব জাব পোকা খায়। ফসল ক্ষেতে এসব বন্ধু পোকা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; জৈব বালাইনাশক বায়োম্যাক্স এম ১.২ ইসি (১ মিলি/লিটার) অথবা বায়োক্লিন (১ মিলি/লিটার পানি) বা বায়োট্রিন (১.৫ মিলি/লিটার পানি) বা ট্রেসার (০.৪ মিলি/লিটার পানি) বা সাকসেস (১.২ মিলি/ লিটার পানি) হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
সাধারণ কাটুই পোকা : সদ্যজাত লার্ভা একত্রভাবে পাতার সবুজ অংশ খেয়ে আঁচড় (ঝপৎধঃপয) যুক্ত করে ফেলে। পরবর্তীতে লার্ভাগুলো আলাদা হয়ে যায় এবং ব্যাপকভাবে গাছের পাতা খেয়ে ফেলে। পরবর্তীতে এরা গাছের ডগা, ফুল, ফলসহ গাছের যেকোনো অংশ নষ্ট করে ফেলে। ব্যাপক আক্রমণে ফলন মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে।
ব্যবস্থাপনা
নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আক্রান্ত গাছ থেকে ডিমগাদা এবং লার্ভা সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলতে হবে; আক্রান্ত জমি থেকে ফসল সংগ্রহের পর পরবর্তী ফসল লাগানোর আগে জমি ভালোমতো চাষ করতে হবে। এ সময় মাটিতে অবস্থানকারী পিউপা সংগ্রহ এবং নষ্ট করে ফেলতে হবে; উপকারী পোকা অবমুক্তকরণ ঃ জমিতে উপকারী পোকা ব্রাকন অবমুক্ত করে এ পোকার লার্ভা নষ্ট করে আক্রমণের মাত্রা কমানো যায়; সেক্স ফেরোমন ফাঁদ : সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করে সফলভাবে এ পোকা দমন করা সম্ভব। জমিতে ২৫-৩০ মিটার দূরে দূরে ফাঁদ স্থাপন করতে হবে; অতিরিক্ত আক্রমণে সর্বশেষ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ক্লোরানট্রানিলিপ্রোল জাতীয় রাসায়নিক কীটনাশক যেমন- কোরাজেন ১৮.৫ এসসি প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে স্প্রে করতে হবে অথবা স্পিনেটোরাম ১১.৭ এসসি জাতীয় কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি হারে স্প্রে করতে হবে।
সাদা মাছি : নিম্ফ ও পূর্ণ বয়স্ক পোকা পাতার ফ্লোয়েম থেকে ক্রমাগত রস শোষণ করে। পাতা বাদামি বর্ণের হয় ফলে পাতার খাদ্য তৈরি প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। পাতা অসম প্রকৃতির এবং ক্রমান্বয়ে শুকিয়ে যায়। অত্যধিক আক্রমণে গাছের বৃদ্ধি ও ফলন কমে যায়। এরা পাতায় আঠালো মিষ্টিজাতীয় মধু রস নিঃসৃত করে ফলে পাতা আঠালো হয়ে যায় এবং আর্দ্র আবহাওয়ায় এর মধ্যে মোল্ড জন্মে কালো রং ধারণ করে। এরা মরিচ গাছে পাতা মোড়ানো ভাইরাস রোগের বাহক হিসেবে কাজ করে।
ব্যবস্থাপনা
ফসলের অবশিষ্টাংশ নষ্ট ও আগাছা পরিষ্কার করতে হবে; জমিতে আঠালো হলুদ ফাঁদ ব্যবহার করতে হবে; জৈব বালাইনাশক বায়োম্যাক্স (১ মিলি/লিটার) বা ট্রেসার (১ মিলি/লিটার) বা বায়োট্রিন (১.৫ মিলি/লিটার) বা ট্রেসার (০.৪ মিলি/লিটার পানি) বা সাকসেস (১.২ মিলি/লিটার পানি) হারে মিলিয়ে স্প্রে করতে হবে; অতিরিক্ত আক্রমণ দেখা গেলে ইমিডাক্লে¬াপ্রিড জাতীয় কীটনাশক (এডমায়ার ২০ এসএল বা ইমিটাফ ২০ এসএল বা টিডো ২০ এসএল বা গেইন ২০ এসএল বা প্রিমিয়ার ২০ এসএল বা ইমিডাগোল্ড ২০ এসএল) প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি বা ডায়াফেনথিউরন জাতীয় কীটনাশক (পেগাসাস ৫০ এসসি) প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি হারে মিশিয়ে স্প্রে করা যেতে পারে।
মরিচের মাছি পোকা (ঝরষনধ পধঢ়ংরপধৎঁস) : এটি মরিচের নতুন পোকা। বাংলাদেশে ২০২৩ সালে যশোর অঞ্চলে এই পোকাটির আক্রমণ দেখা যায়। স্ত্রী পোকা মরিচের কুড়িতে ডিম পাড়ে। সদ্যজাত লার্ভা ফুলের কুড়িতে আক্রমণ করে ভেতরের অংশ খায়। আক্রান্ত ফুল ঝরে পড়ে। অতিরিক্ত আক্রমণে গাছের প্রায় সব কুড়ি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। পরবর্তীতে এরা কচি ফলেও আক্রমণ করে। আক্রান্ত ফলের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়, ফল ছোট ও বিকৃত হয়। আক্রান্ত ফুলের কুড়ি ও ফলের মধ্যেই এরা লার্ভা ধাপ সম্পন্ন করে এবং আক্রান্ত অংশেই পিউপায় রূপান্তরিত হয়। পূর্ণবয়স্ক পোকা আক্রান্ত কুড়ি ও ফল ছিদ্র করে বের হয়ে আসে। অতিরিক্ত আক্রমণে ১০-৩০% ফলন কমে যেতে পারে। বাংলাদেশ মার্চ-আগস্ট মাসে এদের আক্রমণ বেশি দেখা যায়।
ব্যবস্থাপনা
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ করতে হবে; আক্রান্ত কুঁড়ি ও ফল সংগ্রহ করে লার্ভা পিউপাসহ নষ্ট করে ফেলতে হবে; জৈব বালাইনাশক বায়োম্যাক্স (১ মিলি/লিটার) বা বায়োক্লিন (১ মিলি/লিটার পানি) বা বায়োট্রিন (১.৫ মিলি লিটার পানি) বা ট্রেসার (০.৪ মিলি/লিটার পানি) বা সাকসেস (১.২ মিলি/লিটার পানি) স্প্রে করতে হবে; অতিরিক্ত আক্রমণে এসিটামিপ্রিড জাতীয় কীটনাশক (প্লাটিনাম ২০ এসসি বা তুন্দ্রা ২০ এসসি বা জাফ ২০ এসসি) অথবা ইমিডাক্লোপ্রিড জাতীয় কীটনাশক (এডমায়ার ২০এসএল বা ইমিটাফ ২০ এসএল) প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি স্প্রে করতে হবে। এই পোকা প্রথমে ফুলের কুঁড়িতে এবং পরবর্তীতে কচি ফলে আক্রমণ করে এজন্য প্রাথমিক আক্রমণের শুরুতে (ফুল ফোটার পূর্বেই) স্প্রে করা উত্তম।
ছাতরা পোকা : নিম্ফ এবং পূর্ণবয়স্ক পোকা পাতা, ডগা, ফুল এবং ফল থেকে রস চুষে খায়। পাতার আকার ছোট হয়, পাতা, ফুল এবং কচি ফল ঝরে যায়। গাছ দুর্বল ও খর্বাকৃতি হয়, ফল ধারণ ব্যহত হয়, গাছ শুকিয়ে যায় এবং ফলন কমে যায়।
ব্যবস্থাপনা
গাছ থেকে পোকাসহ আক্রান্ত অংশ সংগ্রহ করে নষ্ট করতে হবে। আক্রান্ত পূর্ববর্তী ফসলের অবশিষ্টাংশ নষ্ট করে ফেলতে হবে; পিঁপড়া এদের মধুরসে আকৃষ্ট হয় এজন্য আশেপাশের পিঁপড়ার সকল আবাসস্থল নষ্ট করে ফেলতে হবে; জৈব বালাইনাশক ফাইটোক্লিন (৫ মিলি/লিটার) এ পোকা দমনে কার্যকর তবে আক্রমণ বেশি হলে থায়মেথোক্সাম জাতীয় কীটনাশক (একতারা ২৫ ডব্লিউ জি বা অন নামের) প্রতি লিটার পানিতে ০.২৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে প্রয়োগ করা যেতে পারে।
লেখক : মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (কীটতত্ত্ব), মসলা গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, শিবগঞ্জ, বগুড়া। মোবাইল : ০১৭১৬-০৭১৭৬৪