কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬ এ ০২:২৩ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: মাঘ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ২০-০১-২০২৬
মনোসেক্স তেলাপিয়ার গুণগত মানসম্পন্ন পোনা উৎপাদনে সমস্যা ও করণীয়
মোঃ তোফাজউদ্দীন আহমেদ
তেলাপিয়া মাছের মনোসেক্স পোনা উৎপাদনের জন্য একজন হ্যাচারি পরিচালকের উপযুক্ত অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধাসহ মাছের জীববিজ্ঞান তথা ব্রুড নির্বাচন, ব্রুড উন্নয়ন, ব্রুড প্রতিপালন বিষয়ে কারিগির জ্ঞান থাকা আবশ্যক। কার্প হ্যাচারি পরিচালনা বা ক্যাটফিশ হ্যাচারি পরিচালনা আর তেলাপিয়ার হ্যাচারি পরিচালনা এক বিষয় নয়। তেলাপিয়ার হ্যাচারির ক্ষেত্রে কর্মীদের অধিক কারিগরি জ্ঞান থাকা আবশ্যক, কারণ তেলাপিয়ার ব্রুড নির্বাচন প্রতিপালনে অধিক প্রযুক্তিগত বিষয় জড়িত। বর্তমানে পরিচালিত বেশিরভাগ হ্যাচারির কর্মীর শিক্ষাগত যোগ্যতা পর্যাপ্ত নয়। তারা বেশিরভাগ অন্য হ্যাচারির সহযোগী কর্মীর কাজ করতে গিয়ে ব্যবহারিক কাজগুলো শিখেছে কিন্তু প্রযুক্তিগত উপযুক্ত জ্ঞান না থাকায় তাদের দ্বারা কোনোভাবেই উন্নত মানের পোনা উৎপাদন সম্ভব নয়। তাদের দ্বারা সংখ্যাগত পোনা উৎপাদন করা যাবে কিন্তু গুণগত মানের পোনা উৎপাদন নিশ্চিত করা যাবে না। অনেক হ্যাচারির মালিকও এ বিষয়গুলো ভালোভাবে জানেন না তারা কেবল কর্মী কী পরিমাণ পোনা উৎপাদন করতে পারল সেটাকেই যোগ্যতার মানদ- হিসেবে বিবেচনায় প্রাধান্য দেন। এ বিষয় আরো পরিষ্কার হবে পরবর্তী আলোচনা থেকে।
ব্রুড মাছ নির্বাচনে অসচেতনতা : বেশির ভাগ হ্যাচারি পরিচালক/কর্মী সাধারণ চাষের মাছ, আর ব্রুড মাছের মাঝের পার্থক্যের বিষয়টি জানেন বা বোঝেন না। অনেকে হ্যাচারি প্রতিষ্ঠার সময় ব্রুড হিসেবে যে সীমিত মাছ সংগ্রহ করে থাকেন তা দিয়েই বংশ পরমপরায় পোনা উৎপাদন করে আসছেন। তেলাপিয়ার ক্ষেত্রে এ বিষয়টি অধিক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে পোনার মানগত দিকে। কারণ তেলাপিয়ার জীবনকাল কার্পজাতীয় মাছের তুলনায় ছোট। এরা দ্রুত পরিপক্বতা লাভ করে এবং পুকুরের মধ্যেই বছরে একাধিক বার ডিম দিয়ে থাকে। আবার বেশির ভাগ হ্যাচারি মালিক বা পরিচালক প্রতি বছর ব্রুড সংগ্রহ করেন না বা সংগৃহীত ব্রুড পৃথকভাবে সংরক্ষণ করেন না। প্রথমত তারা অনেকে এর প্রয়োজনীয়তাই বিষয়টি গুরুত্ব দেন না। অনেকে জেনেও পৃথক পৃথক ব্রুডের জন্য পৃথক পুকুর প্রয়োজন হয় তাতে খরচ বেশি পড়ার ভয়ে আলাদাভাবে সংরক্ষণ করেন না। অনেকের ক্ষেত্রে বাস্তবতা হচ্ছে, যে ব্রুড পুকুর থেকে প্রতি উৎপাদন মৌসুমে ডিম সংগ্রহ করেন সেখানে এমনিতেই অনেক পোনা উৎপাদন হয়, সে পোনাই ক্রমে হ্যাচারি মালিকের জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে ব্রুডে সংযুক্ত হয়। কারণ ডিম সংগ্রহের ব্রুডের পুকুরে উৎপাদিত অনাকাক্সিক্ষত পোনা অপসারণের কোন ব্যবস্থা হ্যাচারিগুলোতে দেখা যায় না। আমরা জানি তেলাপিয়া ৩ মাস বয়সেই পরিপক্বতালাভ করে এবং ডিম উৎপানে সক্ষম হয়। অর্থাৎ হ্যাচারি মালিকের অগোচরেই তার ব্রুডের সাথে নতুন সদস্য যুক্ত হয়ে যায়। এভাবে ব্রুড সংযুক্ত হলে কোনোভাবেই ভালো মানের পোনা উৎপাদন করা যাবে না।
করণীয় : ব্রুড মাছ একটি পরিকল্পিত উপায়ে উৎপাদিত কৌলিতাত্ত্বিকভাবে সমৃদ্ধ গুণাবলি সংবলিত মাছ। অপরিকল্পিতভাবে কোনো ব্রুড মাছ মজুদে সংযুক্ত করা যাবে না। এ বিষয়ে অবশ্যই যত্নবান হতে হবে এবং কোন সনামধন্য প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত এবং ব্রুড হিসেবে ঘোষিত তেলাপিয়ার পর্যাপ্ত সংখ্যক পোনা মাছ সংগ্রহ করে তার থেকে বাছাই করে ভালো বর্ধনশীল মাছগুলোকে ব্রুড হিসেবে নির্বাচন করে খামারে রাখতে হবে। ব্রুড তৈরির জন্য পোনা বিদেশ থেকেও আনার ক্ষেত্রে এবিষয়ে সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে। সংগৃহীত (১+ বয়স) ব্রুড হতে ২য় ও ৩য় বছর ডিম সংগ্রহ করে সে ব্রুড বাতিল করে বাজারে পাঠিয়ে দিতে হবে। যতই সে ব্রুডের স্বাস্থ্য ভালো থাক বা ডিম উৎপাদনে সক্ষম হোক। একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর ব্রুড হতে উৎপাদিত পোনার গুণাগুণ ভালো হয় না। প্রতি বছরের ব্রুড পৃথকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। এক ব্যাচের সাথে আর এক ব্যাচের মধ্যে মিশ্রিত করে রাখলে ব্রুড ছাটাইয়ে জটিল সমস্যা দেখা দেবে। পারতপক্ষে নিজের খামারের মাছ হতে ব্রুড সংগ্রহ না করায় উত্তম। নিজের খামার থেকে ব্রুড সংগ্রহের ক্ষেত্রে পৃথক ব্যবস্থাপনা/কৌশল প্রয়োগ করতে হবে।
অন্তঃপ্রজনন সমস্যা : আগের অনুচ্ছেদে আলোচনা করা হয়েছে কীভাবে ব্রুড মাছের পুকুরে অনাকাক্সিক্ষত বাচ্চা উৎপাদিত হয়ে ব্রুডে পরিণত হচ্ছে। এভাবে অধিকাংশ হ্যাচারিতে একই পুকুরে একই সাথে দাদা-দাদী, নানা-নানী, বাবা-মা, নাতি-নাতিনসহ কয়েক বংশধর একই পুকুরে থাকাতে কাছাকাছি রক্তের সম্পর্কীয়দের মাঝে প্রজনন ঘটে এর ফলে যে বাচ্চা উৎপাদিত হয় তা মারাত্মকভাবে অন্তঃপ্রজননে দূষিত। কার্পজাতীয় মাছের অন্তঃপ্রজনন ঘটতে অনেক সময় লাগে কিন্তু তেলাপিয়ার একটি হ্যাচারিতে এ সমস্যাটি খুব দ্রুত সংঘটিত হয়, যদি হ্যাচারির কর্মীগণ এ বিষয়ে বিশেষ সচেতন না থাকেন। তেলাপিয়া পুকুরের পরিবেশে ডিম ছাড়ে এবং অল্প বয়সে পরিপক্বতালাভ করে এবং একই বছরে কয়েক বার ডিম দেয় ফলে অন্য মাছের তুলনায় তেলাপিয়ার অন্তঃপ্রজনন সমস্যা অধিকতর প্রকট আকারে ঘটে। অন্তঃপ্রজননের মাধ্যমে উৎপাদিত পোনা প্রতি বংশে পৈতিৃক বৈশিষ্ট্যের ২৫% গুণাগুণ হারায়। এ বিষয়ে অধিকাংশ হ্যাচারি মালিক বা কর্মী অজ্ঞতার কারণে অন্তঃপ্রজনন পরিহারের পদক্ষেপ বিষয়ে তারা ভাবেন না। এর ফলেই অধিকাংশ হ্যাচারির পোনার গুণগত মান অবনয়ন ঘটে।
সমস্যা উত্তোরণের উপায় : প্রথমত নিজস্ব হ্যাচারির পোনা থেকে ব্রুড উৎপাদন পরিহার করতে হবে। যদি করতেই হয় তবে অন্য একটি উৎসের ব্রুডের সাথে লিঙ্গ পরিবর্তন করতে হবে। বিষয়টি এরূপ যে নিজের ব্রুড পুকুর থেকে নির্দিষ্ট সময়ে সংগৃহীত পোনা একটি পৃথক পুকুরে প্রতি পালন করতে হবে এবং অপর উৎস থেকে আনা ব্রুড অপর একটি পুকুরে পৃথকভাবে প্রতিপালন করে উভয় গ্রুপের মধ্যে হতে ব্রুড বাছাই করার সময় এক মজুদের পুরুষের সাথে অন্য মজুদের স্ত্রী মাছের সাথে জুটি বাঁধতে দিতে হবে। এটা একধরনের ব্রুড নির্বাচন কৌশল যার মাধ্যমে অন্তঃপ্রজনন পরিহার করা যায়। তবে ভালো হয় প্রতি বছর নতুন এক ব্যাচ মাছ আনা এবং তা পৃথকভাবে লালন পালন করে অধিকতর ভালোগুলোকে ব্রুড হিসেবে নির্বাচন করা।
ব্রুড প্রতিপালন : যতই উন্নত মানের ব্রুড মাছ সংগ্রহ করা হোক না কেন যদি তা ভালোভাবে উপযুক্ত পরিবেশে লালন পালন না করা হয় তা থেকে ভালো মানের পোনা আশা করা যায় না। অধিকাংশ হ্যাচারির ব্রুড মাছের ব্যবস্থাপনা ভালো নয় বা কীভাবে করলে ভালো বলা যাবে সেটাও অনেকে জানেন না। আবার অনেকে জানলেও খরচ কমানোর জন্য এ ক্ষেত্রে আপোষ করতে দেখা যায়। এর ফলে পোনার মানের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে এবং মাছ চাষি সঠিক উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হন। এখানে হ্যাচারি মালিক লাভক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নিতে চান না। তবে পরিণতিতে তিনিও ক্ষতিগ্রস্ত হন। কারণ মাছ চাষি সব সময় তার উৎপাদন অন্যদের সাথে তুলনা করেন এবং তার উৎপাদন যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেন। চাষি একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে ২য় বার একই উৎসের পোনা সাধারণত ক্রয় করেন না, ফলে হ্যাচারি মালিক তার ক্রেতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে যাবেন। ব্রুড প্রতিপালনের ক্ষেত্রে সংঘটিত প্রধান সমস্যাগুলো নি¤েœ উল্লেখ করা হলো-
ব্রুড মাছের পুকুর উপযুক্ত নয় : ব্রুড মাছের পুকুর যেভাবে খনন করার প্রয়োজন বা ব্রুড প্রতিপালন পুকুরের অবকাঠামোগত সুবিধা থাকতে হবে সে বিষয়ে অনেক ক্ষেত্রে সঠিকভাবে অনুসরণ করেন না। যার ফলে ব্রুড প্রতিপালন সঠিকভাবে করতে পারেন না। এ ব্রুড থেকে যে পোনা উৎপাদিত হয় তা মানসম্পন্ন হয় না। অধিকাংশ হ্যাচারিতে ব্রুড মাছ সারসরি পুকুরে রেখে ডিম সংগ্রহ করা হয় সে জন্য ব্রুডের পুকরে সারা বছর একটি নির্দিষ্ট গভীরতায় (৫-৬) পানি রাখতে হবে এবং সে গভীরতা নিশ্চিত করার জন্য পাড়ের নিদিষ্ট উচ্চতায় পানির বহির্গমন পথ রাখতে হবে যাতে অতিরিক্ত পানি বের হয়ে যায় এবং নির্দিষ্ট গভীরতা বজায় থাকে। পুকুরের তলদেশ সমান হতে হবে এবং একদিকে ঢালু হলে ভালো হয়। পুকুরটি আয়তকার তথা কিছুটা লম্বাকার হলে ভালো হয়। পুকুরের আয়তন ৩০-৩৫ শতাংশ হলে ব্রুড পরিচর্যা বা ব্রুড ধরে ডিম সংগ্রহে সুবিধা হয়। তবে যারা হাপা পদ্ধতিতে ব্রুড সংরক্ষণ করেন তাদের ক্ষেতে আরো বড় আকারের পুকুর হলেও সমস্যা নাই। পুকুরের সমস্ত পানি প্রয়োজনে বের করে দেবার জন্য নির্গমণ পথ রাখতে হবে।
অধিক ঘনত্বে ব্রুড সংরক্ষণ : সব মাছের জন্য কত আয়তনের পুকুরে কতগুলো মাছ লালন পালন করা যাবে তার একটি আদর্শ পরিমাণ আছে। বিশেষ করে ব্রুড মাছের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি অধিকতর গুরুত্বের দাবি রাখে। কিন্তু বেশিরভাগ হ্যাচারির ব্রুড পুকুরে অধিক ঘনত্বে মাছ রাখা হয়, যার জন্য উৎপাদিত পোনার গুণগত মানের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মা মাছ যত স্বাচ্ছন্দে থাকবে তার অভ্যন্তরীণ অঙ্গের বর্ধন তত ভালো হবে। ভালো মানের উৎপাদনের জন্য প্রতি শতাংশে ৯০টির মতো ব্রুড রাখা যেতে পারে। যার ৬০টি স্ত্রী মাছ এবং ৩০টি পুরুষ মাছ হবে। অর্থাৎ স্ত্রী এবং পুরুষের অনুপাত ২ঃ১ হতে পারে তবে ৩ঃ১ হলেও তেমন কোনো সমস্যা হয় না। হাপার ক্ষেত্রে প্রতি ঘন মিটারে একই অনুপাতে ২-৩টি ব্রুড রাখা যেতে পারে। অধিক ঘনত্বে ব্রুড থাকলে মা মাছে দেরিতে ডিম আসে এবং ডিমের পরিমাণ কম হয় এবং ডিমের পুষ্টির মানও ভালো হয় না ফলে এ ডিম থেকে উৎপাদিত পোনার মান কোনোভাবেই ভালো হতে পারে না।
ভালো মানের খাদ্য সরবরাহ করা : সাধারণভাবে সবাই জানে যে, মায়ের স্বাস্থ্য ভালো হলে তার থেকে উৎপাদিত বাচ্চার স্বাস্থ্যও ভালো হবে। মাকে হৃষ্ট-পুষ্ট রাখার জন্য ভালো পুষ্টিমানের খাদ্য পরিমিত পুরমাণে খাওয়াতে হবে। কিন্তু এ বিষয়েও অনেক হ্যাচারি পরিচালকগণ যত্নবান নন। সাধারণ মাছ চাষের মাছ, আর ব্রুড মাছের খাদ্য ব্যবস্থাপনা এক নয়। ব্রুডের ক্ষেত্রে খাদ্য সুষম কিনা সেটা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ভালো ব্রুড পরিচর্যা নিশ্চিত করার জন্য বাজারের খাবারের সাথে বাড়তি ভিটামিন ও মিনারেল প্রিমিক্স খাদ্যের সাথে মিশিয়ে মাঝে মধ্যে ব্রুড মাছকে খাওয়াতে হবে, যাতে খাদ্যে কোনো দরকারি উপাদানের ঘাটতি না হয়। যে হ্যাচারির ব্রুড মাছের খাদ্য ব্যবস্থাপনা ভালো সে হ্যাচারির পোনার বাচার ও বর্ধন হার অবশ্যই ভালো হবে।
পুকুরের পানি ব্যবস্থাপনা : তেলাপিয়ার হ্যাচারির ব্রুড পুকুরের পানি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রুড পুকুরের পানির রাসায়নিক গুণাগুণ আদর্শ মাত্রায় আছে কি না তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো হ্যাচারির পুকুরের রাসায়নিক গুণাগুণ পরীক্ষার কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। ন্যূনতম সপ্তাহে একবার এসব রাসায়নিক উপাদানের পরিমাপ নিতে হবে। ব্রুড ব্যবস্থাপনায় এটি খুবই গুরুত্বের দাবি রাখে। ব্রুড মাছের পুকুরে পানি পরিবর্তন ব্যবস্থার পাশাপাশি এ্যারেশন সুবিধা থাকলে ভালো হয়। কিন্ত পরিতাপের বিষয় অধিকাংশ হ্যাচারির ব্রুড মাছের পুকুরে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা দেখা যায় না। আর এ ব্যবস্থা না থাকার কারণে অধিকাংশ ব্রুড মাছের পুকুরে ভোরে মাছ ভেসে খাবি খেতে দেখা যায়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এটাকে অনেকে সমস্যা বলে মনে করেন না। ব্রুড মাছ অক্সিজেন ঘাটতিজনিত সমস্যাই থাকলে তার গোনাডের স্বাভাবিক বর্ধন বাধাগ্রস্ত হয়। এ ধরনের পীড়ন অবস্থায় থাকা ব্রুড মাছ থেকে উৎপাদিত ডিম ভালোভাবে পুষ্ট হয় না এবং এ ডিম থেকে উৎপাদিত পোনার মান ভালো হয় না।
হ্যাচারিতে অপরিণত বয়স এবং ছোট আকারের ব্রুড মাছ ব্যবহার : ব্রুড হিসেবে যে মাছ নির্বাচন করতে হবে তার বয়স অবশ্যই ১ বছর পূর্ণ হতে হবে। অধিকাংশ হ্যাচারিতে এ বিষয়টি অনুসরণ করা হয় না ডিম আছে অতএব, ব্রুড হিসেবে সে মাছ থেকে ডিম সংগ্রহ করা যেতে পারে। কিন্তু তেলাপিয়া মাছ তিন মাস বয়স এবং ৩০-৩৪ গ্রাম আকারের হলেই পরিপক্বতা লাভ করতে দেখা যায়। কিন্তু একটি পরিমিত বয়স এবং আকার না হলে সে মাছ থেকে ডিম সংগ্রহ করলে ভালো মানের বাচ্চা উৎপাদিত হবে না। ব্রুড মাছের আকার কমপক্ষে ১৫০ গ্রামের উপরে হতে হবে। বেশি বয়স্ক (৩+) এবং বেশি বড় আকারের ব্রুড মাছের থেকেও ভালো মানের ডিম পাওয়া যায় না। বেশি বড় আকারের ব্রুড মাছ ব্যবহার উপযোগী নয় এবং আর্থিকভাবেও লাভজনক নয়।
স্বল্প সংখ্যক ব্রুড ও একই ব্রুড বার বার ব্যবহার : অধিকাংশ হ্যাচারি মালিক ব্যবসার লাভের দিকটাকে বেশি প্রাধান্য দেন এ কারণে স্বল্প সংখ্যক ব্রুড বারবার ব্যবহার করে পোনা উৎপাদনের কৌশল অবলম্বন করেন। অল্প ব্রুড প্রতিপালনে কম সংখ্যক পুকুর লাগে এবং ব্যবস্থাপনায় খরচও কম লাগে। কিন্তু এর ফলে উৎপাদিত পোনার মান ভালো হয় না এবং দ্রুত অন্তঃপ্রজনন সমস্যার সম্মুখীন হয়। প্রতিটি হ্যাচারিতে পর্যাপ্ত সংখ্যক ব্রুড রাখা একান্ত প্রয়োজন এবং একটি উৎপাদন মৌসুমে একটি ব্রুড মাছ থেকে দুইবারের বেশি ডিম সংগ্রহ না করায় ভালো। এ ক্ষেত্রে স্পেন্ট ব্রুড মাছকে ভাল খাবার ও পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
ব্রুডের কুল নামা সংরক্ষণ না করা : প্রতি বছর সংগৃহীত ব্রুড মাছের উৎস্য, সংগ্রহের সময়কাল, কত নাম্বর পুকুরে মজুদ করা হয়েছে, সংগৃহীত ব্রুডের পূর্বপুরুষ এর উৎস্য, রোগের ইতিহাস একটি রেজিস্টারে যত্নসহকারে সংরক্ষণ করতে হবে। প্রতিবার স্থানান্তার এবং ডিম সংগ্রহের তথ্য লিপিবদ্ধ রাখতে হবে। উক্ত ব্যাচের পোনা উৎপাদন এবং পোনার সার্বিক ফলাফল তথ্য যতটুকু পারা যায় সংরক্ষণ করতে হবে। এ ধরনের তথ্য, বিশ্লেষণ করে ব্রুড সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সুবিধা হয়।
ব্রুড মাছের পুকুরের অনাকাক্সিক্ষত পোনা অপসারণের ব্যবস্থা না থাকা : আগেই বলা হয়েছে যে, তেলাপিয়ার ব্রুড মাছ যেখানে লালন পালন করা হয় সেখানে অনাকাক্সিক্ষত পোনা উৎপাদন হয় সে জন্য উক্ত পোনা অপসারণের কার্যকর ব্যবস্থা রাখতে হবে। প্রথমত হ্যাচারির কর্মীদের এর খারাপ দিকগুলো বুঝাতে হবে এবং তারা কোনভাবেই ব্রুডের পুকুরে পোনা বড় হতে না দেয় সে বিষয়ে যত্নবান হতে বলতে হবে। পোনা মাছ খেয়ে বড় হয় এ ধরনের প্রজাতির মাছ যেমন- চিতল, ফলি, পাবদা জাতীয় কিছুমাছ ব্রুডের পুকুরে ছেড়ে দিতে হবে। এর ফলে অনাকাক্সিক্ষত পোনার সংখ্যা রোধ করা যাবে এবং উল্লেখিত মাছের একটি বাড়তি উৎপাদনও পাওয়া যাবে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত বিভাগীয় উপপরিচালক, মৎস্য অধিদপ্তর, ই-মেইল :tofaz2010@gmail.com, মোবাইল : ০১৭৫১৯৩৯৯৩২