কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫ এ ০৫:৪৮ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: কার্ত্তিক সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-১০-২০২৫
ভুট্টার আধুনিক জাত ও উৎপাদন কলাকৌশল
ড. মোহাম্মদ মোবারক হোসেন
স্বল্প পরিচর্যায় উচ্চফলন, অধিক লাভ ও নিশ্চিত বাজার তৈরি হওয়ায় দেশে ধান ও গমের বদলে ভুট্টার আবাদ বাড়ছে। মূলত উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ধান ও গম চাষের বদলে কৃষকেরা এখন ভুট্টা চাষে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। কৃষকেরা এখন ভুট্টা চাষকে ব্যবসা হিসেবে দেখছেন। কারণ ভুট্টা চাষের মোট আয় বোরো ধানের চেয়ে আড়াই থেকে তিনগুণ বেশি । তা ছাড়া গম ও অন্যান্য ফসলের তুলনায় কম পানি ও কীটনাশকের প্রয়োজন হয়। উপরন্তু বাংলাদেশের আবহাওয়া ভুট্টা উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এটি রবি, খরিপ উভয় মৌসুমে চাষ করে বেশ ভালো ফলন পাওয়া যায়।
বর্তমানে দেশে ভুট্টার বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৭৫ লাখ টন। প্রতি বছরই ৮ থেকে ১০ লাখ টন হারে চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মোট ভ্ট্টুার ৮৫ ভাগই প্রাণি খাদ্য শিল্পে ব্যবহৃত হয়। দেশে উৎপাদিত ভুট্টার ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে ৮০ হাজার কোটি টাকার এই শিল্প। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গত এক দশকে দেশে ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে আড়াই গুণ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ভুট্টার উৎপাদন ছিল ২৭ লাখ ৫৯ হাজার টন। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৬৬ লাখ টন। আর দেশে উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানিও কমছে। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে ভুট্টার আমদানি হয়েছিল ২১ লাখ ১৪ হাজার টন। চলতি অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ১৪ লাখ টন। উৎপাদনের পাশাপাশি ভুট্টা চাষে আবাদি জমির পরিমাণও বেড়েছে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভুট্টার আবাদ হয়েছে ৫.৭৮ লাখ হেক্টর জমিতে। এক দশক আগে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে আবাদ হয়েছিল ৩.৫৫ লাখ হেক্টর জমিতে। সঠিক জাত ও আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে দেশে ৯০ লক্ষ টনের বেশি ভ্ট্টুা উৎপাদন করা সম্ভব।
(তথ্যসূত্র : বিডব্লিউএমআরআই বার্ষিক গবেষণা রিপোর্ট ২০২৩-২৪)
ভুট্টার আধুনিক ও উচ্চফলনশীল জাতসমূহ
বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত ভুট্টার ২০টি হাইব্রিড জাত ও ০৯টি ওপেন পলিনেটেড কম্পোজিট জাত উদ্ভাবন করেছে। এসব জাতের রয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য। যেমন- গুণগত মানসম্পন্ন প্রোটিন সমৃদ্ধ বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৫; গো-খাদ্যোপযোগী বারি ভুট্টা-৭, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৩, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৭, বিডব্লিউএমআরআই হাইব্রিড বেবি কর্ন-১; মধ্যম মাত্রার খরাসহিষ্ণু বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১২, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৩; লবণাক্ততা সহিষ্ণু বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৬; অধিক তাপসহিষ্ণু বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৪, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৫, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৭; খাটো আকৃতির (হেলে পড়া প্রতিরোধী) বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৪, বিডব্লিউএমআরআই হাইব্রিড ভুট্টা-১; উচ্চফলনশীল জাতগুলো হচ্ছে বিডব্লিউএমআরআই হাইব্রিড ভুট্টা-১, বিডব্লিউএমআরআই হাইব্রিড ভুট্টা-২।
ভুট্টা উৎপাদনের আধুনিক কলাকৌশল
জমি নির্বাচন ও তৈরি : সাধারণত পানি জমে থাকে না এমন বেলে দো-আঁশ বা দো-আঁশ মাটি ভুট্টা চাষের জন্য সবচেয়ে ভালো। মাটিতে ‘জো’ থাকা অবস্থায় জমি ও মাটির প্রকারভেদে ৩-৪টি আড়াআড়ি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে ও সমান করে নিতে হবে। অতিরিক্ত পানি বের করে দেয়ার জন্য জমির চারপাশে ও মাঝে আড়াআড়ি নালা তৈরি করতে হবে।
বপন সময় : বছরের যেকোনো সময় ভুট্টা চাষ করা গেলেও ভালো ফলনের জন্য রবি মৌসুমে কার্তিকের ২য় সপ্তাহ থেকে অগ্রহায়ণের ৩য় সপ্তাহ (অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে ডিসেম্বরের ১ম সপ্তাহ) বপনের উপযুক্ত সময়। খরিপ-১ মৌসুমে ফাল্গুনের শুরু থেকে মধ্য চৈত্র (মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের শেষ পর্যন্ত) বপন করা উত্তম।
বীজের পরিমাণ ও বপন দূরত্ব : প্রতি হেক্টরে ২০-২২ কেজি বীজ বীজ বপন করতে হয়। সারি থেকে সারির দূরত্ব ৬০ সেমি./২৪ ইঞ্চি এবং সারিতে বীজ থেকে বীজের দূরত্ব ২৫ সেমি./১০ ইঞ্চি। এই দূরত্ব অনুসরণ করে বপন করলে প্রতি গর্তে একটি করে গাছ হিসেবে হেক্টরপ্রতি গাছের সংখ্যা হবে ৬৬,৬৬৬টি।
সারের মাত্রা ও প্রয়োগ পদ্ধতি : ভুট্টা চাষে ভালো ফলন ও মাটির স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য জমিতে সুষম সার প্রয়োগ করা উচিত। ভুট্টার জমিতে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম, জিঙ্ক সালফেট, বরিক এসিড ও গোবর/আবর্জনা পচা সার হেক্টরপ্রতি রবি মৌসুমে ৫৮০, ৩০০, ২৩৫, ২৩৫, ১৫, ৯.৫ ও ৭৫০০ কেজি বোরো এবং খরিপ-১ মৌসুমে ৪৪৫, ২৫০, ১৯৮, ১৬০, ১০, ৭.৫ ও ৫০০০ কেজি হারে প্রয়োগ করতে হবে।
শেষ চাষের আগে ইউরিয়া সারের এক-তৃতীয়াংশ এবং অন্যান্য সারের সমুদয় অংশ জমিতে সমানভাবে ছিটিয়ে চাষ ও মই দিয়ে ভালোভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। অবশিষ্ট ইউরিয়ার অর্ধেক বীজ বপনের ৪৫-৫৫ দিন পর/৮-১০ পাতা অবস্থায় উপরিপ্রয়োগ করে গাছের গোড়ায় কোদাল দিয়ে সার মিশ্রিত মাটি তুলে দিয়ে সেচ দিতে হবে। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া ৭৫-৮৫ দিন পর/পুরুষ ফুল আসার সময় উপরিপ্রয়োগ করে জমিতে সেচ দিতে হবে। যেসব জমিতে ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি থাকে সেখানে হেক্টরপ্রতি ১২০ কেজি ম্যাগনেশিয়াম সালফেট জমি চাষের সময় প্রয়োগ করতে হবে।
ডলোচুন প্রয়োগ : অম্লীয় মাটিতে (ঢ়ঐ<৫.৫) ফসফরাসসহ গাছের অধিকাংশ মুখ্য পুষ্টি উপাদানের সহজলভ্যতা হ্রাস পায়। তাই অম্লীয় মাটিতে ফসলের ফলন কম হয়। অম্লীয় মাটিতে বীজ বপনের কমপক্ষে ৭ দিন পূর্বে জোঁ থাকা অবস্থায় হেক্টরপ্রতি ১০০০ কেজি হারে সমানভাবে ডলোচুন প্রয়োগ করে চাষ দিয়ে ভালোভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হয়। মাটি শুকনো হলে হালকা সেচ দিয়ে ভিজিয়ে দিতে হবে। একবার ডলোচুন প্রয়োগ করলে পরবর্তী তিন বছর প্রয়োগ করতে হয় না। অম্লীয় মাটিতে ডলোচুন প্রয়োগ করলে ভুট্টার ফলন ২০-২৫% বেড়ে যায়।
আগাছা দমন : চারা গজানোর পর ৩০-৩৫ দিন পর্যন্ত জমি আগাছা মুক্ত রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে বীজ বপনের ২৫-৩০ দিন পর নিড়ানি অথবা আগাছানাশক যেমন ক্যালারিস এক্সট্রা ১ লিটার পানিতে ৬ মিলি হারে, জি-মেইজ অথবা জোয়ানকানা ১ লিটার পানিতে ৫ মিলি হারে বা ট্রায়াজিন ১ লিটার পানিতে ৪ মিলি হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। আগাছানাশক প্রয়োগের সময় জমিতে পর্যাপ্ত রস থাকা আবশ্যক।
সেচ ও নিষ্কাশন : মৌসুম ও মাটির প্রকারভেদে ৩-৪টি সেচ দেয়া প্রয়োজন হতে পারে। বীজ বপনের ২৫-৩০ দিন পর প্রথম সেচ, ৫৫-৬০ দিন পর ২য় সেচ, ৮০-৮৫ দিন পর ৩য় এবং ১০০-১১০ দিন পর বা দানা বাঁধার সময় ৪র্থ সেচ দিতে হবে। জমিতে পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা রাখতে হবে। জমিতে কোনোভাবেই যেন পানি জমে না থাকে সেদিকে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। অতিরিক্ত পানি দ্রুত জমি থেকে বের করে দিতে হবে।
রোগবালাই দমন : ফিউজারিয়াম স্টক রট দমনের জন্য গাছে ফুল আসার দুই সপ্তাহ পরে কার্বেন্ডাজিম যেমন অটোস্টিন ৫০ ডব্লিউজি ১ লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে মাটিসহ গাছের গোড়া পর্যন্ত ১ সপ্তাহ পরপর ২ বার স্প্রে করতে হবে। পাতা ঝলসানো, পাতার মরিচা অথবা পাতার দাগ দেখা দিলে টিল্ট ২৫০ ইসি বা ফলিকিউর বা টেবুকোনাজল ১ লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে মিশিয়ে ১৫ দিন সম্পূর্ণ গাছে স্প্রে করতে হবে। পাতার খোল ঝলসানো রোগ হলে কার্বেন্ডাজিম যেমন- অটোস্টিন ১ লিটার পানিতে ১ গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্র্রে করতে হবে।
পোকামাকড় দমন : বর্তমানে ভুট্টার মাঠে কিছু পোকার আক্রমণ দেখা যায়। আক্রমণ মাত্রা কম হলে পোকার ডিম বা কীড়া হাতে সংগ্রহ করে মেরে ফেলা উত্তম। এ ছাড়া প্লাবন সেচ প্রয়োগে কাটুই পোকার কীড়া ও ফল আর্মি ওয়ার্মের পুত্তলি ধ্বংস করা যায়। তবে আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে ডার্সবান ২০ ইসি বা পাইরিফস ২০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ৫ মিলি হারে মিশিয়ে বিকেলে গাছের গোড়ায় স্প্রে করে কাটুই পোকা, ডিটারজেন্ট বা সাবানের গুঁড়া প্রতি লিটার পানিতে ৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে গাছে প্রয়োগ করে জাবপোকা, মার্শাল ২০ ইসি বা ডায়াজিনন ৬০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি হারে মিশিয়ে অথবা ফুরাডান ৫জি প্রতি গাছের উপরিভাগে তিন থেকে চারটি দানা প্রয়োগ করে ডগা ছিদ্রকারী পোকা দমন করা যায়।
ফল আর্মি ওয়ার্ম পোকা নিয়ন্ত্রণের জন্য রাসায়নিক কীটনাশক ফরতেনজা দিয়ে ভুট্টা বীজ শোধন করে (২.৫ মিলি/কেজি বীজ) বপন করতে হবে। জৈব বালাইনাশক ফাওলিজেন ১.০ মিলি/লি. হারে পানিতে মিশিয়ে ৭ দিন অন্তর ২-৩ বার সম্পূর্ণ গাছে স্প্রে করতে হবে। তবে আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে জৈব কীটনাশক যেমন স্পিনোসাড (ট্রেসার ৪৫ এসসি প্রতি লিটার পানিতে ০.৪ মিলি অথবা সাকসেস ২.৫ এসসি প্রতি লিটার পানিতে ১.৩ মিলি হারে) মিশিয়ে ৫ শতাংশ জমিতে ১০ লিটার হিসেবে প্রতি ৭ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।
ফলন : রবি মৌসুমে ভুট্টার ফলন ১১.১৮ টন/হেক্টর ও খরিপ মৌসুমে ফলন ৮.১৩ টন/হেক্টর। গড়ে ১০.৭০ টন/হেক্টর।
ফসল সংগ্রহ, মাড়াই ও সংরক্ষণ : মাঠে গাছের মোচা খড়ের রং ধারণ করলে ও পাতা কিছুটা হলদে হলে এবং মোচা থেকে ছড়ানো দানার গোড়ায় হালকা ‘কালো দাগ’ দেখা গেলে মোচাগুলো গাছ থেকে সংগ্রহ করে যত দ্রুত সম্ভব খোসা ছাড়িয়ে নিতে হবে। অতঃপর তিন থেকে চার দিন রৌদ্রে ভালো করে শুকিয়ে দানা ছাড়াতে হবে। পুনরায় দানাগুলো দুই থেকে তিন দিন রৌদ্রে শুকিয়ে দানার জলীয় অংশের পরিমাণ শতকরা ১১ ভাগ হলে ছিদ্র মুক্ত ড্রাম অথবা মোটা পলিথিনসহ চটের বস্তায় বিক্রয়ের আগ পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়।
লেখক : ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট, নশিপুর, দিনাজপুর-৫২০০, মোবাইল : ০১৭১৪-৭৮২৭০৪, ইমেইল :mobarak.hossain@bwmri.gov.bd