কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ এ ০১:২৯ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: বৈশাখ সাল: ১৪৩৩ প্রকাশের তারিখ: ১৬-০৪-২০২৬
ব্লাক থ্রিপসের আক্রমণে অর্থনৈতিক ক্ষতি ও ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জ
ড. মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ ১ এবং সাদীয়া আফরীন জেমী২
বাংলাদেশের কৃষি খাত দেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ জীবিকার মূলভিত্তি। বিশেষ করে সবজি উৎপাদন খাত সাম্প্রতিক দেশকে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। মরিচ, বেগুন, পেঁপে, শিম, কুমড়াজাতীয় ফসল এবং বিভিন্ন শোভাবর্ধক উদ্ভিদ দেশের অভ্যন্তরীণ ভোগের পাশাপাশি সীমিত পরিসরে রপ্তানিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই ফসলগুলোর অধিকাংশই নিবিড় চাষ পদ্ধতিতে এবং বহু এলাকায় সারা বছর উৎপাদিত হয়। ফলে এগুলো বিভিন্ন বালাই ও কীটপতঙ্গের জন্য একটি স্থায়ী আশ্রয় স্থলে পরিণত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ব্ল্যাক থ্রিপস বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থার জন্য একটি নতুন এবং গুরুতর হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি প্রজাতি হলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, চারা আমদানি, শোভাবর্ধক উদ্ভিদের চলাচল এবং আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণের মাধ্যমে দ্রুত বিভিন্ন দেশে বিস্তার লাভ করেছে। ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং পরবর্তীতে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঞ্চলেও এই কীটের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে।
আক্রান্তের অবস্থা ও ক্ষতির চিত্র : বাংলাদেশে বিভিন্ন জেলায় মরিচ উৎপাদন এলাকায় প্রথমে অস্বাভাবিক ফুল ঝরে পড়া, পাতায় ব্রোঞ্জ দাগ এবং ফল বিকৃতির ঘটনা লক্ষ করা যায়। পরবর্তীতে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার মাধ্যমে ঞযৎরঢ়ং ঢ়ধৎারংঢ়রহঁং শনাক্ত হয়। বর্তমানে একাধিক কৃষি অঞ্চলে এই কীটের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে, বিশেষ করে যেখানে মরিচ, বেগুন ও পেঁপে যেখানে নিবিড়ভাবে চাষ করা হয়।
এই কীটের প্রধান আক্রান্ত ফসলসমূহ হলো :
মরিচ (সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত); পেঁপে; শিম ও অন্যান্য ডালজাতীয় ফসল; কুমড়াজাতীয় ফসল; পেয়ারা, তরমুজ; চন্দ্রমল্লিকা, অ্যানথুরিয়ামসহ শোভাবর্ধক উদ্ভিদ; মরিচে আক্রমণের মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি, কারণ ফুল ও কোমল ডগায় থ্রিপসের উপস্থিতি সহজে বৃদ্ধি পায়।
পাতায় ক্ষতি প্রাথমিক লক্ষণ : পাতার নিচে সূক্ষè রূপালি/সাদা আঁচড়ের মতো দাগ; আক্রান্ত স্থানে কোষের ভেতরের সবুজ রঞ্জক (ক্লোরোফিল) নষ্ট হয়ে যায়; পাতার উপরিভাগে ঝিকিমিকি বা ফ্যাকাশে ভাব দেখা যায়।
মধ্যবর্তী পর্যায় : দাগগুলো ধীরে ধীরে ব্রোঞ্জ বা বাদামি রঙ ধারণ করে; পাতার টিস্যু শুকিয়ে নেক্রোটিক (মৃত কোষ) দাগ তৈরি হয়; পাতা কুঁকড়ে যায় বা বিকৃত হয়; পাতার নিচে ছোট ছোট কালো দানার মতো মলচিহ্ন দেখা যায় (এটি থ্রিপস শনাক্তের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ)।
তীব্র আক্রমণে : সালোকসংশ্লেষণ কমে যায়; গাছ দুর্বল হয়ে বৃদ্ধি কমে যায়; কুঁড়ি ঝরে পড়ে বা ফুল বিকৃত হয়; ফলের গায়ে দাগ বা বিকৃতি দেখা যায়; আগাম পাতাঝরা ঘটে; মারাত্মক ক্ষেত্রে গাছ শুকিয়ে যেতে পারে।
ফুল ও ফলের ক্ষতি আক্রমণের ধরন : থ্রিপস ফুলের কুঁড়ি ও পাপড়ির ভেতরে লুকিয়ে কোষরস শোষণ করে; পাপড়িতে বাদামি/ব্রোঞ্জ রঙের দাগ তৈরি হয়; ফুল আংশিক বা সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়; পরাগায়ন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
ফলাফল : ব্যাপক ফুল ঝরে পড়ে; গর্ভাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হলে ফল সেট হয় না; মরিচ, টমেটো, বেগুন, শসা ইত্যাদি ফসলে সরাসরি ফলন কমে যায়; কখনও ফুল বিকৃত হয়ে অস্বাভাবিক ফল গঠন করে।
ফলে আক্রমণের লক্ষণ
বাহ্যিক লক্ষণ : ফলের গায়ে ছোট ছোট ছিদ্র বা আঁচড়ের মতো দাগ; ব্রোঞ্জ বা রূপালি দাগ; ফলের ত্বক রুক্ষ ও শক্ত হয়ে যায়; অসমান বৃদ্ধি ও বিকৃতি।
গুণগত ক্ষতি : ফলের রং ও আকৃতি নষ্ট হয়; বাজারে গ্রেড কমে যায়; রপ্তানিযোগ্য মান নষ্ট হয়; গুরুতর ক্ষেত্রে ফল বাজারজাতের অযোগ্য হয়ে পড়ে।
ফলন ক্ষতি ও অর্থনৈতিক প্রভাব
থ্রিপসের তীব্র আক্রমণকে কেবল একটি সাধারণ বালাই সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি আসলে একটি সমন্বিত কৃষি অর্থনৈতিক সংকটের কারণ হতে পারে। ক্ষুদ্র এই পোকাটি গাছের কচি পাতা, ফুল ও ফলের কোষরস শোষণ করে উদ্ভিদের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম ব্যাহত করে। প্রথমদিকে লক্ষণ তেমন চোখে না পড়লেও ধীরে ধীরে ফুল ঝরে পড়া, ফলের বিকৃতি এবং গাছের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেহেতু মরিচ ও অন্যান্য সবজি ফসলের ফলন সরাসরি ফুল ধারণ ও ফল সেটের ওপর নির্ভরশীল, তাই ফুল পর্যায়ে আক্রমণ হলে ফলনের ওপর তার তাৎক্ষণিক ও মারাত্মক প্রভাব পড়ে।
ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের ক্ষেত্রে এই ক্ষতি আরও গভীর প্রভাব ফেলে। ফলন কমে যাওয়ার কারণে আয় হ্রাস পায়, অথচ পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে তারা প্রায়ই অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করেন। সঠিক রোগ নির্ণয় ও পরামর্শের অভাবে একই ওষুধ বারবার প্র প্রয়োগ করা হয়, যা উৎপাদন ব্যায় বাড়ায় কিন্তু কাক্সিক্ষত ফল দেয় না। বরং থ্রিপস দ্রুত প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে, ফলে ভবিষ্যতে দমন আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে জমির উপকারী পোকামাকড় ধ্বংস হয়, প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং পরিবেশ দূষণ বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘমেয়াদে মাটি ও পানির মানের অবনতি ঘটে, এমনকি খাদ্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে সমস্যার সমাধান কেবল তাৎক্ষণিক কীটনাশক ব্যবহারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। প্রাকৃতিক শত্রু সংরক্ষণ, জৈব ও কম বিষাক্ত উপাদান ব্যবহার এবং প্রয়োজনে সঠিক গ্রুপের কীটনাশক পর্যায়ক্রমে প্রয়োগ করলে ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। পাশাপাশি কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণ সেবার কার্যকর ভূমিকা এই সমস্যা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ।
জীবনচক্র ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি : Thrips parvispinusএর জীবনচক্র দ্রুত এবং পরিবেশ-সংবেদনশীল। অনুকূল তাপমাত্রায় এটি খুব অল্প সময়ে প্রজন্ম সম্পন্ন করে, যা দ্রুত জনসংখ্যা বিস্ফোরণের কারণ।
ডিম পর্যায় : স্ত্রী থ্রিপস পাতার টিস্যুর ভেতরে ডিম পাড়ে। ডিম সাধারণত ৪-৫ দিনের মধ্যে ফুটে যায়। টিস্যুর ভেতরে ডিম থাকার কারণে এগুলো বাহ্যিক কীটনাশক দ্বারা সহজে আক্রান্ত হয় না।
নিম্ফ পর্যায় : ডিম ফুটে প্রথম ও দ্বিতীয় ইনস্টার নিম্ফ বের হয়। এই পর্যায়েই উদ্ভিদে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়। নিম্ফ পাতা ও ফুলের টিস্যু ঘষে কোষরস শোষণ করে। নিম্ফ পর্যায় সাধারণত ৪-৫ দিন স্থায়ী হয় এবং এ সময়ে দুটি মোল্ট সম্পন্ন হয়।
প্রি-পিউপা ও পিউপা : নিম্ফ পর্যায় শেষে প্রি-পিউপা ও পিউপা ধাপে প্রবেশ করে। এই ধাপগুলো অ-খাদ্যগ্রহণকারী এবং সাধারণত মাটির ওপরিভাগ, পাতা বা গোপন স্থানে সম্পন্ন হয়। এই পর্যায় প্রায় ২-৩ দিন স্থায়ী হয়।
প্রাপ্তবয়স্ক পর্যায় : পূর্ণবয়স্ক থ্রিপস ৬-৯ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। স্ত্রী পোকা স্বল্প সময়ের মধ্যেই ডিম পাড়া শুরু করে। উষ্ণ তাপমাত্রায় প্রতিটি স্ত্রী পোকা বহু ডিম উৎপাদন করতে সক্ষম।
তাপমাত্রার প্রভাব : ২৫-৩০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় প্রজন্মকাল কমে যায় এবং জনসংখ্যা দ্রুত দ্বিগুণ হয়। বাংলাদেশে দীর্ঘ উষ্ণ মৌসুম থাকার কারণে বছরে বহু ওভারল্যাপিং প্রজন্ম সৃষ্টি হতে পারে।
এই দ্রুত জীবনচক্র, উচ্চ প্রজনন ক্ষমতা এবং বহুভোজী স্বভাব একত্রে এই কীটকে অত্যন্ত আগ্রাসী করে তুলেছে।
দমন ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা : Thrips parvispinusএর কার্যকর দমন শুধুমাত্র রাসায়নিক পদ্ধতিতে সম্ভব নয়। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা ভিত্তিক বহুমাত্রিক কৌশল গ্রহণ করা অপরিহার্য।
আগাম শনাক্তকরণ ও নজরদারি : নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফুল ও পাতার নিচে নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। নীল বা হলুদ স্টিকি ট্র্যাপ ব্যবহার করে জনসংখ্যা পর্যবেক্ষণ করা যায়। সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষি ব্যবস্থাপনাগত নিয়ন্ত্রণ : আক্রান্ত গাছের অংশ অপসারণ ও ধ্বংস, আগাছা নিয়ন্ত্রণ, ফসল পর্যায়ক্রম অনুসরণ, নার্সারি স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা, প্রতিফলক মালচ ব্যবহার। এগুলো থ্রিপসের প্রাথমিক বিস্তার কমাতে সাহায্য করে।
জৈবিক নিয়ন্ত্রণ : শিকারী মাইট এবং এন্টোমোপ্যাথোজেনিক ছত্রাক ব্যবহারের মাধ্যমে থ্রিপস-এর সংখ্যা দমন করা যায়। জৈবিক পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব।
রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ : নিবন্ধিত ও লক্ষ্যভিত্তিক কীটনাশক সীমিত ও পর্যায়ক্রমে ব্যবহার করতে হবে। একই গ্রুপের কীটনাশক বারবার ব্যবহার করা যাবে না। নির্ধারিত মাত্রা ও সুরক্ষা নির্দেশিকা অনুসরণ করতে হবে। কীটনাশক ব্যবহারের আগে অর্থনৈতিক ক্ষতির মাত্রা বিবেচনা করা উচিত।
উদাহরণস্বরূপ : হেক্সিথায়াজক্স @ ১ মিলি/লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ, ক্লোথাইনিডিন @ ০.৫ মিলি/লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ, ফিপ্রোনিল @ ০.৫ মিলি/লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ, স্পাইরোটেট্রাম্যাট @ ১ মিলি/লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ প্রয়োগ করুন; অথবা ঋওতওসরঃব @ ১ মিলি/লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ।
কোয়ারেন্টিন ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ : আক্রান্ত এলাকা থেকে চারা বা উদ্ভিদ উপকরণ অন্যত্র পরিবহন বন্ধ করতে হবে। নার্সারি পর্যায়ে কঠোর পরিদর্শন ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষক সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ : কৃষকদের সঠিক শনাক্তকরণ, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি এবং কীটনাশক নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান অপরিহার্য। সম্প্রসারণ কর্মীদের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ প্রদান করতে হবে।
লেখক : ১অধ্যাপক, ২ শিক্ষার্থী, ল্যাবরেটরি অব অ্যাপ্লাইড এন্টোমলজি এন্ড একারোলজি, কীটতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-২২০২। মোবাইল: ০১৭১১৪৫২৪৯৬। ই-মেইল: ০১৭১১৪৫২৪৯৬; ঁষষধযরঢ়স@নধঁ.বফঁ.নফ