কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ এ ০৫:২০ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: পৌষ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৪-১২-২০২৫
ব্রয়লার ফিড গরুর জন্য নয়
মোঃ ফজলুল করিম
গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো প্রাণিসম্পদ। দেশের আর্থসামাজিক তথা বেকার সমস্যা, দারিদ্র্য বিমোচন এমনকি নারীর ক্ষমতায়নে এ খাতের জুড়ি মেলা ভার। গ্রাম থেকে শহর, শহর থেকে মেট্রোপলিটন সবখানেই নতুন নতুন উদ্যোক্তা এ খাতকে তারা ভাগ্য পরিবর্তনের উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছে। প্রাণিসম্পদের অনেকগুলো খাতের মধ্যে বিফ ফ্যাটেনিং বা গরু হৃষ্টপুষ্টকরণ একটি ইমার্জিং খাত হিসেবে বিবেচিত। কতিপয় অসাধু অর্থলোভী গরু হৃষ্টপুষ্টকরণ খামারিদের মধ্যে অধিক মুনাফা লাভের আশায় গরুকে পোল্ট্রি ফিড খাওয়ানোর খুব বেশি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে গ্রোথ প্রোমোটার, স্টেরয়েড, হরমোন ও নিষিদ্ধ হরমোন অতিমাত্রায় প্রয়োগ করা হচ্ছে। ব্রয়লার আধুনিক র্যাশন ফরমুলেশন অনুযায়ী, ১ থেকে ১৬ দিন বয়স পর্যন্ত মুরগির বাচ্চার খাদ্য ব্রয়লার স্ট্রার্টার, ১৭ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত ব্রয়লার গ্রায়ার এবং ২৬ থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত ব্রয়লার ফিনিশার খাওয়ানো হয়। এই খাদ্য শুধু ব্রয়লার মুরগির জন্যই নির্ধারিত। বিভিন্ন উপাদান মিশ্রিত উচ্চমাত্রার এই ব্রয়লার ফিড খেয়েই ২০ থেকে ২৫ দিন বয়সের একটি মুরগির ১ থেকে ১.৫/২ কেজি ওজন হচ্ছে। গরু খামারিরা এসব দেখে দ্রুত মোটাতাজাকরণের আশায় গরুকেও পোলট্রি ফিড খাওয়াচ্ছে।
ব্রয়লার ফিড খাওয়ানোর ক্ষতিকর দিক
ফিডের বিচিত্রতা : ব্রয়লার ফিড যেখানে মূলত শস্য দানা দিয়ে তৈরি সেখানে গরুর দরকার আঁশজাতীয় দানাদার খাদ্য।।
গ্যাস্ট্রিক পিএইচ পার্থক্য : মুরগীর ফিড খাওয়ালে মুরগীর গ্যাস্ট্রিক পিএইচ সহনীয় মাত্রায় থাকে অন্য দিকে গরুর গ্যাস্ট্রিক পিএইচ ৬ এমনকি ৫ এর নিচে নেমে আসতে পারে।
হজম প্রক্রিয়ায় বৈষম্য : মুরগীর পাকস্থলী এক প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট হলেও গরুর পাকস্থলী চার প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট। মুরগির খাদ্যে শর্করা জাতীয় খাদ্য উপাদান বেশি থাকে বিধায় মুরগির জন্য হজমে সহজপাচ্য হলেও গরুর জন্য নয়। গরুর পাকস্থলীতে ফাইবার জাতীয় খাদ্য উপাদান সহজে হজম হয়। তাই ব্রয়লার ফিডে থাকা স্টার্চ গরুর পাকস্থলীতে সহজে হজম হয় না এবং অতিরিক্ত এসিড তৈরি করে। ফলে এটি গ্রহণ করলে গরুর পাতলা পায়খানা, বদহজম, টিমপ্যান্যাইটিস, ব্লট এবং পেট ফাপার মতো নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়।
প্রোটিন ও এনার্জি পার্থক্য : মুরগির ফিডে অধিক পরিমাণে উচ্চ প্রোটিন ও এনার্জি থাকে যা গরুর জন্য প্রযোজ্য নয়। গরুকে ব্রয়লার ফিড খাওয়ালে প্রচুর পরিমাণে মেটাবলিক হিট তৈরি হয় যা গরুর শরীরে অতিরিক্ত তাপ ও চর্বি তৈরি করে। এতে গরুর হিটস্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। মাংসের গুণগত মান নষ্ট করে। ব্রয়লার ফিডে প্রচুর শক্তি থাকে, যা মুরগির শরীরে দ্রুত ওজন বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
অতিরিক্ত রাসায়নিক ও অ্যান্টিবায়োটিক :
ব্রয়লার ফিডে দ্রুত বৃদ্ধির জন্য গ্রোথ প্রোমোটর, অ্যান্টিবায়োটিক ও সিন্থেটিক ভিটামিন মেশানো থাকে। এন্টিককসিডিওস্ট্যাট হিসেবে মাদুরামাইসিন, এন্টিফাংগাস/ এন্টিমাইকোটক্সিন ব্যবহার হয় যা গরুর জন্য ক্ষতিকর ইন্ডাইজেশন হয়। শ্বাসকষ্ট এবং রুচি কমে যেতে পারে। এসব উপাদান গরুর প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ফলে ছোটখাটো সংক্রমণও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে এবং মৃত্যু ঘটাতে পারে।
উচ্চ প্রোটিন : ব্রয়লারের খাবারে মূলত উচ্চমাত্রার অ্যানিম্যাল প্রোটিন ব্যবহার করা হয় যেমন-ফিশমিল, মিট মিল, বোন মিল এবং পোল্ট্রি মিল যা মোট খাদ্য উপাদানের ২০-২২% প্রোটিন থাকে। গরুর জন্য দরকার উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, যা রেশনের ১২-১৫% প্রোটিন পর্যন্ত হতে পারে।
ফাইবার বা রাফেজ নির্ভর খাদ্য : ব্রয়লারের খাবার প্রধানত কনসেন্টেট নির্ভর হওয়ায় ফাইবার কম লাগে যা মোট খাদ্য উপাদানের ২-৫%। কিন্তু গরুর খাবার সাধারণত ফাইবার নির্ভর ২০-৩৫% যা রাফেজ থেকে আসে।
অধিক কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা- ব্রয়লার ফিডে ৬০-৬৫% দ্রবণীয় শর্করা থাকে। কিন্তু ফ্যাটেনিং এর জন্য ২৫% দ্রবণীয় শর্করা প্রয়োজন পড়ে। ফলে, অতিরিক্ত শর্করা মাংসে আর্দ্রতা বাড়ায়। মাংসের স্বাদ খারাপ হয়। পেটে এসিডোসিস এবং ইন্ডাইজেশন হয়। ফি গ্যাস জমা হয়, যা ডায়াফ্রামের ওপর চাপ দেয় এবং মারা যায়।
ডাইজেশনে পার্থক্য : ব্রয়লারের ডাইজেশন মূলত এনজাইমেটিক কিন্তু গরুর হলো মাইক্রোভিয়াল ডাইজেশন।
অপ্রাকৃতিক চর্বি ও তেল : ব্রয়লারের মাংসে চর্বি বাড়ানোর জন্য তেলজাতীয় উপাদান ব্যবহার করা হয় যা গরুর জন্য সাধারণত দরকার পড়ে না।
রুমেনের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট : গরুর রুমেনে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো প্রাকৃতিক খাবার হজমে সাহায্য করে। কিন্তু ব্রয়লার ফিড খেলে এসব ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হয়ে যায়, ফলে গরু সহজেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয় এবং সংক্রমণের কারণে মৃত্যু ঘটতে পারে।
গরুকে ব্রয়লার ফিড খাওয়ানোর ভয়াবহতা :
হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি এবং মৃত্যু হার বেড়ে যায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং সংক্রমণে মৃত্যু ঘটাতে পারে- ব্রয়লার ফিডে থাকা রাসায়নিক উপাদান লিভার ও কিডনিতে জমা হয়, ফলে কিডনি ফেইলিওর বা লিভার সিরোসিস হতে পারে, যা ধীরে ধীরে মৃত্যু ডেকে আনে।
ব্রয়লার ফিড বেশি খেলে গরুর দুধ ও মাংসের বিষাক্ততা, অতিরিক্ত ওজন ও হৃদযন্ত্রের সমস্যা, হার্ট ফেইলিওর, ব্লোট ও এমনকি শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
পোল্ট্রি বা ব্রয়লার মুরগীর ফিড গরুকে খাওয়ালে ফিডে উপস্থিত এম,বি,এম এর কারণে গরুর বোভাইন স্পঞ্জিফরম এন্সেফালোপ্যাথি, সালমোনেলোসিস, বটুলিজম ইত্যাদি মারাত্মক রোগ হতে পারে। পোল্ট্রি ফিড গাভীকে খাওয়ালেও উপরে উল্লেখিত রোগগুলো ছাড়াও আরেকটি রোগ হতে পারে যেটি হলো ম্যাসটাইটিস। রেডি ক্যাটেল ফিড খাওয়ানো গাভীতেই ম্যাস্টাইটিসের প্রাদুর্ভাব এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের ব্যাঘাত বেশি দেখা যায়।
এক কেজি ব্রয়লার ফিড ৭৫-৮০ টাকা যা খামারির জন্য মোটেই খরচ সাশ্রয়ী নয়। তবে কিছু খামারি রিস্ক নিয়ে ব্রয়লার ফিড খাইয়ে কিছু ভালো ফলাফল পেয়েছেন। কারণ, আমাদের দেশে মাটির দূষণে,কীটনাশকের অতি ব্যবহারে মাটিতে পুষ্টিগুণ অনেকটাই কমে গেছে। তাই ঘাসেও প্রয়োজনীয় পুষ্টি নাই। খামারিরা গরুকে ভালো মানের কিছু খাওয়াতে না পারায় গরুর শরীরে প্রোটিন এবং ভিটামিনসহ সব কিছুর ঘাটতি থাকে। তাই ব্রয়লারের খাবার দিলে গরুতে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন হয় এবং ওজন বাড়ে। চামড়ার নিচে ফ্যাট জমা হয়। দেখতেও সুন্দর হয়। কিন্তু দীর্ঘ দিন খাওয়ালে গরু স্টোক করে বা এসিডোসিসে হঠাৎ মারা যায়। এতে করে সমাজ তথা দেশের মারাত্বক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। যেসব গরুকে ব্রয়লার ফিড খাওয়ানো হয় সেসব গরু যদি কোরবানি না দিত তাহলে অনেক গরু মারা যেত। যেটি কি না বিফ ফ্যাটেনিং ইন্ডাস্ট্রি তথা দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্নক হুমকিস্বররূপ।
জনস্বাস্থ্যে ঝুঁকি
পোল্ট্রি বা ব্রয়লার ফিড খেয়ে গরু জটিল রোগে আক্রান্ত হয় এবং এ গরুর গোশত খেয়ে মানুষেরও ম্যাড কাউ ডিজিজসহ বিভিন্ন জটিল রোগ হতে পারে যা মৃত্যুর দিকে নিয়ে যেতে পারে। ফিডের স্টেরয়েড আমাদের শরীরের জন্য ভয়াবহ ক্ষতি করতে পারে। এতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়াসহ লিভার, কিডনি নষ্ট হতে পারে। আগুনে জ্বালালেও এটি নষ্ট হয় না। বেশি পরিমাণে শরীরে গেলে স্ট্রোকও হতে পারে। শিশুদের জন্য যা আরো মারাত্মক। এ জাতীয় প্রাণীর গোশত নিয়মিত খেলে মানুষের শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমে। এ ছাড়া, ব্রয়লার ফিডে ব্যবহৃত এন্টিবায়োটিক রেসিডিউ আকারে মানুষের শরীরে অনুপ্রবেশ করে এএমআর বা সুপার বাগ তৈরি করতে পারে।
ঝুঁকি নিরসনে খামার ব্যবস্থাপনায় করণীয়
বিভিন্ন খাদ্য উপাদানের পুষ্টিগুণ বিচার করে একজন পুষ্টি বিশেষজ্ঞর পরামর্শ নিয়ে গরুর খাদ্য নিজে বানানো উচিত। আধুনিক মানসম্মত বাসস্থান নিশ্চিত করে সুষম খাদ্য ও পরিষ্কার পানি প্রদানের মাধ্যমে ফিডার বা ঘাসজাতীয় খাদ্যের সংস্থান রাখা মোটাতাজা গরুর জন্য অত্যন্ত জরুরী। ঘাস, সাইলেজ বা প্রোটিনের উচ্চ উৎস হিসেবে লিগুমিনাস বা মাষকালাই জাতীয় শস্যেও (প্রোটিন ১৭-১৮%) তৈরি করে সারা বছরব্যাপী খাওয়ানো যায় এবং এটি সম্পূর্ণরূপে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ামুক্ত।
টেকসই খামার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উচ্চ পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ফাইবার জাতীয় খাবার প্রদানই হলো নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ সরবরাহপূর্বক জনস্বাস্থ্যে ঝুঁকি নিরসনের একমাত্র আধুনিক পন্থা। এ ছাড়া পোল্ট্রি বা ব্রয়লার ফিডের বিকল্প হিসেবে সুষম দানাদার খাদ্য যেমন- সয়াবিন বা মাসটার্ড অয়েল কেক, বিভিন্ন ধরনের ডালের ভুসি, ভালো মানের প্রোটিন বা ডিবি ভিটামিন, উন্নত ক্যালসিয়াম-ফসফরাস বা ভিটামিন মিনারেল প্রিমিকস প্রভৃতি প্রয়োগ করা অনস্বীকার্য। সবসময় আমাদের মনে রাখতে হবে গরুকে উদ্ভিজ্জ আমিষই দিতে হবে, প্রানিজ আমিষ নয়! গরুকে গরুর খাবারই দিতে হবে পাখি বা মুরগির খাবার নয়!
লেখক : অতিরিক্ত জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, গাইবান্ধা, মোবাইল : ০১৭২৪১৪১৬৬২,