কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬ এ ০২:৩২ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: মাঘ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ২০-০১-২০২৬
ব্রির বিজ্ঞানীদের অবদান বিএলবি ও ব্লাস্টমুক্ত ধান!
ড. এম. আব্দুল মোমিন
ধান চাষে কৃষকরা প্রধানত বায়োটিক (জৈবিক) ও অ্যাবাপেটিক (পরিবেশগত) দুই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন। বায়োটিক বা জৈবিক সমস্যাগুলো হলো- ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও ভাইরাসজনিত রোগ যেমন- ব্লাস্ট, বাদামি দাগ, খোলপচা, ব্যাকটেরিয়াল লিফ ব্লাইট বা বিএলবি ইত্যাদি। এছাড়া বিভিন্ন পোকামাকড়ের আক্রমণও বায়োটিক প্রভাবে হয়, যার কারণে ধানের ফলন বোরো মৌসুমে ১৫%, আউশে ২৪% এবং আমনে ১৮% কমে যায়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ঋঅঙ) এর মতে, বিভিন্ন রোগ ও পোকামাকড়ের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ৩৭% পর্যন্ত ধান নষ্ট হয়। সব ধরনের ফসলের ক্ষেত্রে এই ক্ষতির পরিমাণ বার্ষিক বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশে, রোগ ও পোকামাকড়ের কারণে ধানের ফলন তিন মৌসুম মিলিয়ে গড়ে প্রায় ১৮% ফলন এ কারণে হ্রাস পায়। তবে নির্দিষ্ট কিছু রোগের তীব্র আক্রমণে ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বাড়তে পারে।
আর ধান চাষে এবায়াটিক বা অজৈবিক সমস্যাগুলো হলো- বন্যা, খরা, উচ্চ তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, মাটির ক্ষারত্ব, যা গাছের বৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ক্রমাগত জলবায়ু পরিবর্তন ক্রমেই এই সমস্যাগুলোকে আরও তীব্র করছে, যার ফলে টেকসই ফলন নিশ্চিত করতে সঠিক ব্যবস্থাপনা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এখন পর্যন্ত লবণাক্ত সহনশীল, খরা সহনশীল, জলমগ্নতা সহনশীল, ঠান্ডা সহনশীল, জোয়ার-ভাটা সহনশীলসহ নানা ধরনের ৩৭টি জাত উদ্ভাবন করেছে। যা থেকে দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ২০ ভাগ আসে। খাদ্য নিরাপত্তায় প্রতিকূলতা সহিষ্ণু জাতগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন জলবায়ু অভিঘাত সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনে বেশ সফলতা পেলেও জৈবিক বালাই প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবনে এতদিন দেশের বিজ্ঞানীরা কিছুটা পিছেয়ে ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রি বালাই প্রতিরোধী ও সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনে দারুণ সাফল্য অর্জন করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ভাবিত ব্রি ধান১০১ ও ব্রি ধান১১৪ তেমনি দুটি বালাই প্রতিরোধী জাত। ব্রি ধান১০১ বোরো মওসুমের ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা পোড়া রোগ প্রতিরোধী। পাতাপোড়া বা বিএলবি রোগ বোরো মৌসুমের একটি মারাত্মক রোগ, যা ঢধহঃযড়সড়হধং পধসঢ়বংঃৎরং ঢ়া.ড়ৎুুধব নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয় এবং এই রোগে আক্রান্ত হলে ধানের পাতায় হলদেটে দাগ তৈরি করে, যা পরে বাদামি হয়ে শুকিয়ে যায়, অনেকটা পোড়া দাগের মতো, ফলে ফলন ব্যাপকভাবে কমে যায়। এ রোগ বোরো ধানের বীজ, সেচের পানি বা বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। বিএলবি প্রতিরোধী জাত ব্রি ধান১০১ একটি উচ্চফলনশীল জাত। এর ডিগ পাতা খাড়া, প্রশস্ত ও লম্বা। পাতার রঙ গাঢ় সবুজ। গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৭.৭২ টন। তবে উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে এর ফলন হেক্টরপ্রতি ৯ টন পর্যন্ত পাওয়া যায়। এ জাতের দানা লম্বা ও চিকন এবং সোনালী বর্ণের। এ জাতের গড় জীবনকাল ১৪২ দিন, যা বোরো মওসুমের জনপ্রিয় জাত ব্রি ধান৫৮ এর চেয়ে ৪ (চার) দিন আগাম। ১০০০টি পুষ্ট ধানের ওজন গড়ে ২৩.১ গ্রাম। ধানের দানায় অ্যামাইলোজের পরিমাণ শতকরা ২৫.০ ভাগ এবং প্রোটিনের পরিমাণ শতকরা ৯.৮ ভাগ। ভাত ঝরঝরে ও খেতে বেশ সু-স্বাদু। জাতটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো- এটি ব্যাকটেরিয়াজনিত পোড়া রোগ প্রতিরোধী।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা মাঠে পরপর তিন বছর ফলন পরীক্ষা করার পর বোরো ২০২০ মওসুমে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকের মাঠে আঞ্চলিক এ জাতের উপযোগিতা যাচাই করা হয়। এর জীবনকাল ব্রি ধান৫৮ এর আগাম এবং ফলন বেশি হওয়ায় প্রস্তাবিত জাত হিসেবে নির্বাচিত হয়। এরপর জাতীয় বীজ বোর্ডের মাঠ মূল্যায়ন দল বোরো ২০২১ মওসুমে কৃষকের মাঠে প্রস্তাবিত জাতের ফলন পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। কৃষকের মাঠে ফলন পরীক্ষা সন্তোষজনক এবং মাঠপর্যায়ে ব্যাকটেরিয়াজনিত পোড়া রোগ প্রতিরোধী বলে বিবেচিত হওয়ায় বোরো মওসুমের ব্যাকটেরিয়াজনিত পোড়া রোগ প্রতিরোধী জাত হিসেবে চূড়ান্তভাবে ২০২২ সালে জাতটি অবমুক্ত করা হয়। বিএলবিপ্রবণ এলাকার কৃষকদের মধ্যে ইতোমধ্যে জাতটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
ধানের ব্লাস্ট রোগ আরেকটি মারাত্মক ক্ষতিকর রোগ। বলা যায়, বোরো মৌসুমে এটি প্রধান রোগ। যা চুৎরপঁষধৎরধ মৎরংবধ বা চুৎরপঁষধৎরধ ড়ৎুুধব নামক ছত্রাকের কারণে হয়ে থাকে। এটি চারা অবস্থা থেকে শুরু করে ধান পাকার আগ পর্যন্ত যেকোনো সময় দেখা দিতে পারে এবং পাতা, গিট ও শীষে আক্রমণ করে, আক্রমণের স্থানের ভিত্তিতে এটিকে পাতা ব্লাস্ট, গিঁট ব্লাস্ট ও শীষ ব্লাস্ট নামে কৃষকরা চিনে থাকেন। এই রোগ প্রতিরোধের জন্য রোগ-প্রতিরোধী জাত ব্রি ধান১১৪ উদ্ভাবন করেছেন ব্রির বিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশে ধানের ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী এটাই প্রথম জাত। ব্লাস্ট রোগ ধানের পাতা, গিট এবং শীষের গোড়ায় আক্রমণ করে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। বিশেষত ফুল আসার সময় বা তার পরে শীষের গোড়ায় যে আক্রমণ হয় তা থেকে ধান রক্ষা করা সম্ভব হয় না। এ রোগ দমনে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এ রোগ প্রতিরোধী ধানের জাত ব্যবহার করা। ব্লাস্ট রোগ হলে কৃষক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শতভাগ ফসল নষ্ট হয়। এ সমস্যা থেকে উত্তরণে ব্রি বিগত কয়েক বছর গবেষণা করে চলতি বছর ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী এ জাতটি অবমুক্ত করেছে। গবেষণার মাধমে এ জাতে ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী জিনের (পিআই৯) অনুপ্রবেশ করানো হয়।
বিগত কয়েক বছর মাঠপর্যায়ে গবেষণা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ২০২৫ সালের মে মাসে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক ব্রি ধান১১৪ কে মাঠপর্যায়ে চাষাবাদের অনুমোদন দেয়া হয়। উদ্ভাবিত জাতটিতে আধুনিক উফশী ধানের সকল বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। গড় জীবনকাল ১৫৪ দিন যা বোরো মৌসুমের আরেকটি জনপ্রিয় জাত ব্রি ধান৮৯ এর মতো এবং ব্রি ধান২৯ থেকে ৪-৫ দিন আগাম। এ জাতের ডিগ পাতা লম্বা, খাড়া ও প্রশস্ত। গাছের কা- শক্ত এবং হেলে পড়ে না। পাতার রঙ গাঢ় সবুজ। চালের আকার আকৃতি মাঝারি মোটা, রঙ সাদা, ভাত ঝরঝরে এবং খেতে সুস্বাদু। দানায় অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৭.০% ভাগ এবং প্রোটিনের পরিমাণ ৭.৭% ভাগ। ব্রি ধান১১৪ এর গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৮.২ টন। সময়মতো রোপণ করলে এবং উপযুক্ত পরিচর্যায় হেক্টরপ্রতি ১০.২৩ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। বিঘায় প্রায় ৩৩-৩৫ মণ ফলন হয়।
এ জাতটি উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দিয়েছেন ব্রির উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. তাহমিদ হোসেন আনছারী। সহযোগীতায় ছিলেন ব্রির উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের বিজ্ঞানীগণ। এ গবেষণায় অর্থায়ন করেছে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন (কেজিএফ)। বিজ্ঞানী ড. তাহমিদ হোসেন আনছারীর জানান, মার্কার অ্যাসিস্টেড সিলেকশন পদ্ধতি ব্যবহার করে ব্রি ধান২৯ জাতের সাথে জিরকাস কর্তৃক সরবরাহকৃত ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী একটি লাইনের সংকরায়নের মাধ্যমে এ নতুন জাতটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী হওয়ায় উৎপাদন পর্যাযে এ রোগের জন্য কোনো ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করতে হবে না। মাঠপর্যায়ে এ জাতের চাষাবাদ করে কৃষক ব্রি ধান৮৯ এবং ব্রি ধান২৯ এর চেয়ে কিছুটা বেশি ফলন পাবে। মাঠে কৃষক যখন ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত শীষ নির্ণয় করে ততক্ষণে রোগকাতর জাতের ধানের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়ে যায়। তখন বা এর পরে ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করে লাভ হয় না। নতুন উদ্ভাবিত জাতের চাষাবাদে কৃষক ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধে নিশ্চিন্ত থাকবে এবং ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হবে না। এতে নিশ্চিত ফসল সুরক্ষাসহ কৃষকের আর্থিক সাশ্রয় হবে। প্রতি বছর বোরো মৌসুমে ব্লাস্ট রোগ নিয়ন্ত্রণে সারা দেশে মাঠপর্যায়ে ব্যবহৃত হাজার কোটি টাকার ছত্রাকনাশকের ব্যবহার প্রয়োজন পড়বে না। এতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত ছত্রাকনাশকের পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে দেশ রক্ষা পাবে।
সম্প্রতি ‘কীটনাশকের ঝুঁকি নিরসন’ শীর্ষক এক সেমিনারের দেওয়া তথ্যানুসারে ‘দেশে বালাইনাশকের বর্তমান বাজার প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার, শুধু গত ৫ বছরেই ব্যবহার বেড়েছে ৮১.৫ শতাংশ। যেখানে ১৯৭২ সালে যেখানে বালাইনাশক ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার মেট্রিক টন, সেখানে ২০২২-২৩ সালে তা বেড়ে ৪০ হাজার মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে। ধান যেহেতু আমাদের প্রধান ফসল এর মধ্যে বেশির ভাগ বালাইনাশক ধান উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। ফলে এই ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে যা ভাতনির্ভর বাঙালি জনগোষ্ঠীর জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। এক্ষেত্রে ব্রি উদ্ভাবিত বিএলবি ও ব্লাস্ট প্রতিরোধী জাত ব্রি ধান১০১ এবং ব্রি ধান১১৪ উদ্ভাবন একটি বিরাট মাইলফলক।
লেখক : ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), গাজীপুর-১৭০১। মোবাইল : ০১৭১৬৫৪০৩৮০,