কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ এ ০২:২৯ PM

বেলের গুণাগুণ ও উপযোগিতা

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: ফাল্গুন সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-০২-২০২৬

বেলের গুণাগুণ ও উপযোগিতা
অসীম চন্দ্র শিকদার
আমাদের দেশে বসন্তকালীন একটি জনপ্রিয় প্রাচীন ফল বেল। তাপদাহ চৈত্রে এক গ্লাস বেলের সরবত দেহের ক্লান্তি দূর করে মনে আনে প্রশান্তি। তবে বেল গাছ শুধু ফলদ বৃক্ষ নয়, বরং হাজার বছর ধরে আমাদের স্বাস্থ্য সেবায় এবং পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। গাছে বেল পাকলেও পাখির দ্বারা নষ্ট করার ভয় থাকে না, কারণ বেলের খোসা অত্যন্ত শক্ত। এ কারণেই বেলের ইংরেজি নাম ‘উড আপেল’ বা ‘স্টোন আপেল’।
বেল গাছ ও বেল : বেল আমাদের উপ-মহাদেশেরই ফল। বেলের বৈজ্ঞানিক নাম অবমষব সধৎসবষড়ং ঈড়ৎৎবধ. বেল রুটাসী বা লেবু পরিবারের সদস্য। বেল গাছ আমাদের দেশের প্রাচীন একটি পর্ণমোচী বৃক্ষ। বেল গাছের উচ্চতা ১০ থেকে ১৬ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। ছোট অবস্থায় গাছে শক্ত ও তীক্ষè কাঁটা থাকে এবং গাছ বড় হলে অবস্য কাঁটা কমে যায়। বসন্ত কালে গাছের সকল পাতা ঝরে গিয়ে বর্ষায় নতুন পাতা জন্মায়। বেল পাতা ত্রিপত্র যুক্ত, সবুজ, ডিম্বাকার; পত্রফলকের অগ্রভাগ সুঁচালো। বেলের জন্য তেমন উর্বর মাটির প্রয়োজন হয় না আর তেমন যতেœরও প্রয়োজন পরে না। অম্ল বা ক্ষার যুক্ত যেকোনো মাটিতে এবং পরিবেশে বেল গাছ জন্মাতে পারে। তাই বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই কম-বেশি বেল পাওয়া যায়। বেল গাছে রোগ ও পোকার আক্রমণও তেমন দেখা যায় না। তবে পূর্ণ মাত্রায় ফল ধরতে দীর্ঘ সময় লাগে; প্রায় ১৫ বছরের মতো। প্রবাদ আছে বেল গাছ লাগিয়ে ফলের আশা করা বৃথা; অর্থাৎ বেল গাছ খুব ধীরগতিতে বৃদ্ধি পায়।
বেল গোলাকৃতির শক্ত খোলস যুক্ত একটি ব্যতিক্রমী ধরনের ফল। একটি বেলের ওজন ৫ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। গ্রীষ্মকালে গাছে ফুল ও কুড়ি ধরে আর বসন্তকালে পরিপক্ব হয় অর্থাৎ বেল পাকতে এক বছর সময় লাগে। গ্রীষ্মকালের আকর্ষণীয় এবং সুস্বাদু ফল হলেও বেল গাছে পূর্ণ মাত্রায় ফল ধরতে এবং ফল পরিপক্ব হতে দীর্ঘ সময় লাগে বিধায় আর কণ্টকীয় বৃক্ষ হওয়ার জন্য বেল গাছ রোপণে মানুষের আগ্রহ কম। বেলের বোঁটা খুব শক্ত, পাকলেও গাছ থেকে সহজে ঝরে পড়ে না। লাল মাটি অঞ্চলে বেল খুব ভালো হয়। কাঁচা অবস্থায় বেল সবুজ থাকে পাকলে হলুদ বর্ণ ধারণ করে। পাকা বেলের শাস কমলা বা হলুদ বর্ণের, মিষ্টি এবং মিষ্টি গন্ধ এবং আঁশযুক্ত হয়ে থাকে। ফলের শাঁস ৮-১৫টি কোয়া বা খ-ে বিভক্ত থাকে। কোয়াতে চটচটে আঠা ও বীজ থাকে।
জাত এবং বংশবিস্তার : বেল সাধারণত বীজ দ্বারা বংশবিস্তার করা হয়। তবে অঙ্গজ বংশবিস্তারও করা যায়। বেল গাছের বর্ধিত শিকড় থেকে যে চারা উৎপন্ন হয় তা দিয়েও বংশবিস্তার করা যায়। অঙ্গজ বংশবিস্তারে মাতৃ গাছের গুণাগুণ বজায় থাকে। বেল সাধারণত দু’জাতের দেখা যায়। একটি বড় আকৃতির জাতের-যাকে আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয় বেলি বেল, আর একটি ছোট আকৃতির জাতের। বড় আকৃতির বেল সাধারণত গাজীপুর ও রাজশাহীতে পাওয়া যায়, যার একেকটির ওজন ৫ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। আর এক ধরনের টক জাতের বেল আছে, যাকে কদবেল বলা হয়। তবে এখানে মিষ্টি জাতের বেল নিয়েই আলোচনা করব। বেল একটি সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফল হলেও ইতোপূর্বে পরিকল্পিত বেল চাষের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয় নাই। বিলম্বে হলেও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিটের বিজ্ঞানীরা বারি বেল-১ নামে বেলের একটি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছেন। এ জাতের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো রোপণের ৫ বছরের মধ্যে ফলন দেয়, আর প্রতি বছর ভালো ফলন দিয়ে থাকে। বাংলাদেশের যেকোনো অঞ্চলে এ জাতের বেল চাষাবাদ করা যায়। অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ফলের ওজন ৭৫০ গ্রাম থেকে ১১০০ গ্রাম হয়ে থাকে আর গড় ওজন ৯০০ গ্রাম, মোট খাদ্যাংশ ৭৮ ভাগ, মিউসিলেজ বা আঠা এবং আঁশ তুলনামূলক কম, খোসা অত্যন্ত পাতলা। ফলে এই গ্রীষ্মকালীন লোভনীয় ফলটির বাণিজ্যিক চাষাবাদের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
বেলের গুণাগুণ ও উপকারিতা : বেল মিষ্টি ও সুস্বাদু একটি ফল। ছোট বড় সবাই বেল পছন্দ করে। বেলের গুণাগুণ বলে শেষ করা যাবে না। গাছের পাতা, ছাল, ফল ও শিকড়- একটি ভেষজ ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে প্রাচীনকাল থেকে। অত্যধিক গরমে, হিটস্ট্রোক, বদহজমের মতো সমস্যায় বেলের শরবত একাই একশো। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বেলের কদর বেশি। কাঁচা পাকা দুই প্রকার বেলের মধ্যেই বিস্ময়কর ঔষধিগুণ রয়েছে। তবে পাকা বেলের চেয়ে কাঁচা বেল বেশি ঔষধিগুণে সমৃদ্ধ। ডায়রিয়া ও আমাশয় নিরাময় এবং প্রতিরোধে বেলের জুড়ি নাই। কাঁচা বেল ডায়রিয়া ও আমাশয় রোগের জন্য অত্যন্ত উপকারী। তাই কাঁচা বা কচি বেল পাতলা করে কেটে রৌদ্রে শুকিয়ে শুঁট করে সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে। এই শুঁট এতটাই জনপ্রিয় যে, বর্তমানে মুদি দোকানে সারা বছর বেলের শুট পাওয়া যায়। এই শুঁট রাতে পানিতে ভিজিয়ে রেখে সেই পানি সকালে খালি পেটে নিয়মিত পান করলে পেটের পীড়া থেকে মুক্তি মেলে, এ ছাড়া বেলের শুট দিয়ে চা প্রস্তুত করেও পান করা যায়। কাঁচা ও পাকা বেল খেলে দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়, শক্তি বর্ধক হিসেবেও কাজ করে। বেলে থাকা থায়ামিন ও রিবোফ্লাবিন-হৃৎপি-, লিভার ও কিডনি ভালো রাখতে সাহায্য করে এবং কোলন ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়। এতে মেথানল নামের একটি উপাদান রয়েছে যা ব্লাড সুগার কমাতে কাজ করে। পাকা বেলে ভিটামিন সি, এ, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও পটাশিয়ামের মতো মূল্যবান পুষ্টি উপাদানে ভরপুর। বেলে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। বেল শিশুদের স্মরণশক্তি বৃদ্ধি করে। বেল পাতার রস মধু ও গোলমরিচ এর গুঁড়া মিশিয়ে পান করলে জন্ডিস রোগ নিরাময় হয়। মহিলাদের নিয়মিত বেল বা বেলের শরবত খাওয়া প্রয়োজন- এতে তাদের ব্রেস্ট ক্যান্সার ও জরায়ু ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। প্রস্টোজেন হরমোন লেভেল বাড়িয়ে মহিলাদের ইনফার্টিলিটির ঝুঁকি কমায়। বেলের উপকারের কথা খনাও বলে গেছেন। তার একটি বচনে পাই-‘বেল খেয়ে খায় জল, জির যায় রসাতল।’ জির অর্থ হলো কৃমি; অথাৎ বেল খেয়ে জল পান করলে বা বেলের শরবত খেলে কৃমি নাশ হয়। তাই বেলের মৌসুমে প্রতিদিন সকালে খালি পেটে এক গ্লাস বেলের শরবত পান করা ভালো, আর বাকি সময় বেলের শুঁট ভিজানো পানি বা শুঁট দিয়ে তৈরি চা পান করা যেতে পারে। এর ফলে অবাঞ্ছিত না না রোগ থেকে আমরা সহজেই পরিত্রাণ পেতে পারি।
বাংলা সাহিত্যে বেল : বাংলা সাহিত্যেও বেল উপেক্ষিত নয়। রবীন্দ্রনাথ, সুকুমার রায়, জসীমউদ্দীনের কবিতা ও ছড়াতে বেল এসেছে। বাংলায় বহুল প্রচলিত আর একটি প্রবাদ “ন্যাড়া বেলতলা একবারই যায়”। শক্ত খোলস যুক্ত ফলটি মাথায় পড়লে সমূহ বিপদের সম্ভাবনা, আর কেউ যদি ন্যাড়া মাথা হয় তার জন্য তো আরও ভয়ানক! ন্যাড়া মাথার ওপর বেল পড়লে অবস্থা বেগতিক হওয়ার আশঙ্কা থাকে, আর তা থেকেই প্রবাদ বাক্যটির উৎপত্তি ধরাই যায়। যদিও একটি কাল্পনিক উদাহরণ; তবে আমরা প্রায়ই ভুল করে থাকি আর সেই ভুলের মাশুলও গুনতে হয়। প্রবাদটি থেকে এই শিক্ষাই পেতে পারি যে, একবার ভুল করার পর ভবিষ্যতে সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে তার প্রতি সতর্ক থাকা। বিখ্যাত শিশু সাহিত্যিক সুকুমার রায় তার “ন্যাড়া বেলতলায় যায় ক’বার” ছড়াতে বেল ফলটিকে অমর করে রেখে গেছেন-
রাজা বলে, “কেইবা শোনে যে কথাটা ঘুরছে মনে, মগজের নানান কোণে- আন্ছি টেনে বাইরে তায়, সে কথাটি বলছি শোন, যতই ভাব যতই গোন, নাহি তার জবাব কোন কূলকিনারা নাইরে হায়। লেখা আছে পুঁথির পাতে, “নেড়া যায় বেল তলাতে”, নাহি কোনো সন্ধ তাতে-কিন্তু প্রশ্ন ক’বার যায় ? এ কথাটা এদ্দিনেও পারে নিকো বুঝ্তে কেও, লেখে নিকো পুস্তকেও দিচ্ছে না কেউ জবাব তায়। লাখোবার যায় যদি সে যাওয়া তার ঠেকায় কিসে ? ভেবে তাই পাইনে দিশে নাই কি কিচ্ছু উপায় তার ? এ কথাটা যে¤িœ বলা রোগা এক ভিস্তিও’লা, টিপ্ ক’রে বাড়িয়ে গলা প্রণাম র্কল দু পায় তাঁর। হেসে বলে, “আজ্ঞে সে কি ? এতে আর গোল হবে কি? নেড়াকে তো নিত্যি দেখি আপন চোখে পরিষ্কার-আমাদেরি বেলতলা যে নেড়া সেথা খেল্তে আসে হরে দরে হয়তো মাসে নিদেন পক্ষে পঁচিশ বার।”.....
হিন্দু সংস্কৃতিতে বেল : বাংলাদেশে বেল গাছ একটি সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হিন্দু ধর্মালম্বীরা বেলকে ‘শ্রীফল’ বলে। বেল গাছের সংস্কৃত নাম ‘বিল্ব বৃক্ষ’ তাই পাতাকে বলে বিল্বপত্র। বেল পাতা ও গাছকে হিন্দুরা পবিত্র বলে মনে করে থাকে। বেল পাতা ত্রিফলক যুগ্মপত্র অর্থাৎ একটি বোঁটায় তিনটি করে পাতা থাকে, হিন্দুরা যাকে বলে ত্রিনয়নের প্রতীক। হিন্দুদের পূজায় ত্রিনয়নের এবং ত্রিলোকের প্রতীক হিসেবে বিল্বপত্র আর ফল ব্যবহার হয়। বেল গাছকে হিন্দুরা পবিত্র মনে করে বলে বেল গাছের কাঠ ও পাতা-রান্না বা দৈনন্দিন ব্যবহারের, আসবাব তৈরির কাজে ব্যবহার করে না।
বেলের বিস্ময়কর ঔষধিগুণ এবং পুষ্টিগুণ থাকা সত্ত্বেও অযতেœ আর অবহেলায় আমাদের পরিবেশ থেকে বেল ও বেল গাছ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে; অথচ এই একটি গাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও স্বাস্থ্যসেবায় তিনি দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। দুঃখজনক হলেও সত্য- সহজ বেল চাষ এখনও অবহেলিত। এ দেশে বেলের বাগান করার নজির নেই। বাড়ির আনাচে কানাচে এবং বাগানের মাধ্যমে বেল চাষ বাড়িয়ে বেলের উৎপাদন বৃদ্ধি করে দেশের মানুষের পুষ্টি এবং রোগ প্রতিরোধের ঘাটতি সহজেই মেটানো যেতে পারে। এতে আমাদের যেমন চিকিৎসা ব্যয় কমবে, আবার ফল আমদানি জনিত বৈদেশিক মুদ্রারও সাশ্রয় হবে। এ ছাড়া বেল একটি দামি ফল এবং এর চাহিদাও বেশি যা থেকে উৎপাদনকারী সহজেই লাভবান হতে পারে। আশার কথা আমাদের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক দেশব্যাপী হর্টিকালচার সেন্টারগুলোর মাধ্যমে উন্নত জাতের বেল-চারা ও কলম নাম মাত্র মূল্যে বিক্রয় ও বিতরণ; সেই সাথে কারিগরি সহযোগিতা দেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আসুন আমরা এই সুস্বাদু ফলটির চারা বাড়ির আশেপাশে লাগিয়ে সুযোগ থাকলে বাগান করে নিজেদের পুষ্টি চাহিদা নিজেরাই পূরণ করি এবং ফল উৎপাদনে দেশকে স্বনির্ভর করে গড়ে তুলি। আর যদি বেলতলায় কেউ যান তবে টুপি বা হেলমেট পরে যাওয়ারই পরামর্শ দেব। জানেন তো- সাবধানের মার নাই। তথ্যসূত্র ঃ
১। বেল গাছ- উপকারিতা, বৈশিষ্ট্য, চাষপদ্ধতি ও চিকিৎসায়....আজরাফ আরাফাত, ১৭ জুলাই, ২০২৫।
২। মুক্ত বিশ^কোষ এবং লেখকের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা।

লেখক : কটন ইউনিট অফিসার (অ:ব:), তুলা উন্নয়ন বোর্ড, মোবাইল: ০১৫৫২-৩৬২৯০১, বর্তমান ঠিকানা : ৩৯০/২ (এ-৬), জাফরাবাদ, পুলপাড়, মোহাম্মদপুর-১২০৭,

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন