কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ এ ১১:০৫ AM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: ফাল্গুন সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৬-০২-২০২৬
‘বুনো ফল স্বাদে অনন্য পুষ্টি গুণে মাশআল¬াহ’ফলসা
মোছা: মারজিয়া বেগম
ফলসা :(Falsa), Grewia asiatica টিলিয়েসী পরিবারভূক্ত বাংলাদেশের একটি অপ্রচলিত ফল। ফলসা শব্দটি উর্দুভাষা থেকে এসেছে। পাকিস্তান থেকে কম্পোডিয়া পর্যন্ত এর দেখা মেলে। অন্যান্য ক্রান্তীয় অঞ্চলেও এর ব্যাপক চাষ হয়। বাংলা, হিন্দি, মারাঠিসহ পৃথিবীর বহু ভাষাতে এটি ফলসা নামেই পরিচিত। ফলসা এর বাংলা হচ্ছে ‘ধামানি’। আদি নিবাস এশিয়ার দক্ষিণ পূর্বাঞ্চল। হিমালয়ের পাদদেশে ভালো জন্মে। ভারত এবং শ্রীলঙ্কায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়। গ্রামে এক সময় প্রচুর দেখা গেলেও ইদানিং বেশ দূর্লভ হয়ে উঠেছে ফলসা গাছ। প্রথম এ ফলটি পাওয়া যায় ভারতের বারানসীতে।
ফলসা গাছ মাঝারি আকারের পাতা ঝরা গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। গাছটা ছয় থেকে সাত মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়ে থাকে। পাতা খসখসে, ডিম্বাকৃতির, রোমশ, কিনারা খাঁজকাটা এবং বিপরীতভাবে বিন্যস্ত থাকে। পাতা পনেরো থেকে সতেরো সেমি. পর্যন্ত লম্বা হয় এবং দশ থেকে বার সেমি. পর্যন্ত চওড়া হয়। শীতকালে গাছের পাতা ঝরে যায়। ফুল ছোট, হলদে ও অল্প লোমযুক্ত। ফল ক্ষুদ্রাকৃতির এবং ফুল ফোটে (মার্চ থেকে এপ্রিল মাসে)। ফুলগুলো একসাথে বেশ কয়েকটি সাইজে সাজানো থাকে। প্রতিটি ফুল হলুদ রঙের পাঁচটি বড় বৃত্যাংশ এবং পাঁচটি ছোট পাপড়িযুক্ত। ফুলের ব্যাস প্রায় ২ সেটিমিটার। ফল মটরদানার মতো হয় এবং গোলাকার হয় এবং সর বর্ণের হয়। ফল পাকলে বেগুনি বা নীলাভ কালচে রং ধারণ করে। গাছের বাকল লম্বা, আঁশযুক্ত ও ধূসর বর্ণের। ফলটা (৫-১২) মিলিমিটার ব্যাস বিশিষ্ট হয়।
ফল ধরার সময় : শীতের শেষের দিকে ফুল ধরে এবং ফল ধরার পর ফল পাকে এপ্রিল-মে মাসে।
ফলসা ফলের পুষ্টিগুণ
শরীর ঠা-া রাখে : পুষ্টিগুণে ভরপুর এবং রসালো ফল। তাই শরীর ঠা-া রাখে; প্রদাহ কমায়: ফলসায় রয়েছে প্রদাহনাশক উপাদান; ভিটামিন সি: রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে;পটাশিয়াম: পটাশিয়াম থাকায় হার্ট ভাল থাকে; গ¬াসেমিক ইনডেক্স কম থাকায় ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য ভালো; প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ থাকে; গ্রীষ্মকালে এই ফল থেকে শরবত বা জুস তৈরি করা হয়, যা শরীর ঠা-া রাখে; হজমে সাহায্য করে; আয়রনের ঘাটতি বা রক্তস্বল্পতায় খুব ভাল কাজ করে কারণ ফলসা আয়রনের মাত্রা বৃদ্ধি করে; ক্লান্তি ও মাথা ঘোরার অনুভূতি কমাতে সাহায্য করে; এন্টিঅক্সিডেন্ট থাকে প্রচুর পরিমাণ; হাড়ের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে; এছাড়াও রয়েছে সাইট্রিক এসিড, আামিনো এসিড, ভিটামিন এ; রক্ত বিশুদ্ধকরণ করে, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে; গাছের পাতা অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে কাজ করে যা ত্বকের র্যাশ বা ফুসকুরি, অ্যাকজিমা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে; ব্রঙ্কাইসিস এবং শ্বাসকষ্ট দূর করতে সহায়তা করে এবং সর্দি কাশিতে ভালো ফল পাওয়া যায়।
পুষ্টি (প্রতি ১০০গ্রাম) পরিমাণ
ক্যালরি ৪০ কি. ক্যালোরি/৪০ শপধষ; কার্বোহাইড্রেট ১০ গ্রাম; ডাইটেরি ফাইবার ২ গ্রাম; ভটামিন সি মধ্যম মাত্রার; সুগার কম; পানি বেশি।
ফলসার আঞ্চলিক নাম : পেলা, গোটা, টকরোই ধামানি ইত্যাদি।
ফলসার জাতসমূহ : রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের ১২ বছর গবেষণা করে বারি ফলসা-১ নামে প্রথম এই জাতটি আবিষ্কার করে ২০২০ সালে।
বারি ফলসা-১ : গুল্ম, পাতাঝরা গাছ, ৫ মিটার লম্বা, ফল পাকতে শুরু করে মে-জুন মাসে। ফল ছোট, মটর দানার মতো। ১ মিমি. ব্যাস এবং ১০০ ফলের ওজন ৬৬ গ্রাম। কাঁচা অবস্থায় রং সবুজ এবং স্বাদে টক। পাকলে গাঢ় বেগুনি বা কালচে বাদামি বা কালো রঙের হয়। তখন স্বাদ টক-মিষ্টি ধরনের হয়। ভক্ষণযোগ্য অংশের পরিমাণ ৮৮% এবং টিএসএস ২৪%। ১০ পিপিএস জিবোরলিক এসিড স্প্রে করণে ফল ধারণ সংখা বৃদ্ধি পায়। ১-২টি বীজ থাকে। একটি বড় গাছ গড়ে ১৫-২০ কেজি ফলন দেয়। সংরক্ষণ কাল খুব কম ২-৩ দিন। এ জাতের উলে¬খযোগ্য বৈশিষ্ট হলো- পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয়। এছাড়াও কিছু স্থানীয় জাত আছে। গাছের উচ্চতা ও ফলের গুণাগুণের ভিত্তিতে কিছু উন্নত জাত নিুে দেয়া হলো-
মার প্রগতি; ডোয়ার্ক বা বামন জাত; টল বা লম্বা জাত; শরবতী; লোকাল বা স্থানীয় জাত।
ফলসার স্বাদ কেমন : এটি মূলত টক ও মিষ্টি স্বাদের একটি ফল যা জাম ও জেলির মতো।
ফলসা খাওয়ার পদ্ধতি
কাঁচা ফল : ধুয়ে সরাসরি খাওয়া যায় যা সবচেয়ে বেশি প্রচলিত উপায়; শরবত/জুস : চিনি/গুড়, পানি ও সামান্য লবণ দিয়ে শরবত হয়; ডেজার্ট ও অন্যান্য : জ্যাম, জেলি, স্মুদি, চাটনি এবং সস হিসাবেও ব্যবহার করা যায়।
জলবায়ু ও মাটি
ফলসা চাষের জমি উঁচু বা মাঝারি উঁচু (পিএইচ ৫.৫-৭.৫) হওয়া উচিত যেখানে পানি জমে না। উর্বর দো-আঁশ মাটি বেশি উপযুক্ত কিন্তু এটি বাংলাদশের যেকোনো মাটিতেই ভালো জন্মাতে পারে। গরম ও শুষ্ক সমভূমির জলবায়ু এবং অধিক বৃষ্টিতে আর্দ্র অঞ্চলে ভালো জন্মে।
বংশবিস্তার
ফলসার বংশবিস্তার বিভিন্ন পদ্ধতিতে হয়। যেমন- বীজ ও ও অঙ্গজ পদ্ধতি। সাধারণত প্রচলিত বংশবিস্তার বীজের মাধ্যমে বংশবিস্তার। বীজ দিয়ে বংশবিস্তার মাতৃ গাছের গুণাগুণ অক্ষুণœ থাকে না তাই জাতের বিশুদ্ধতা রক্ষার্থে অঙ্গজ পদ্ধতিতে বংশবিস্তার উত্তম। শিকড় সৃষ্টিকারী হরমোন (আইবিএম ২০০ পিপিএম) ব্যবহার করে কাটিং পদ্ধতি কলম উৎপাদনের সফলতার হার বৃদ্ধি পায়।
চারা রোপণের সময়
বর্ষা মৌসুমে জুন থেকে জুলাই মাসে চারা রোপণ করা যায়।
গর্ত তৈরি ও চারা রোপণ
মাঠে বর্গাকার পদ্ধতিতে ৩ মিটার দ্ধ ৩ মিটার দূরত্বে ১ মিটার দ্ধ ১ মিটার দ্ধ ১ মিটার গর্ত তৈরি করে গর্তের মধ্যে পচা গোবর ২০-৩০ কেজি, টিএসপি ৪০০-৫০০ গ্রাম এবং জিঙ্ক সালফেট ২০-২৫ গ্রাম প্রয়োগ করে গর্ত ভরাট করে দিতে হবে এবং পানি দিতে হবে। পরবর্তীতে ১৫-২০ দিন পর গর্তের মাটি ওলটপালট করে নিয়ে চারা রোপণ করতে হবে।
গাছে সার প্রয়োগ : গাছের বৃদ্ধির সাথে সাথে সার প্রয়োগের মাত্রা /পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে।
প্রতিটি গাছের সারের পরিমাণ নিম্নরূপ :
ফলের ভালো আকার এবং গুণগত মান পাওয়ার জন্য দস্তা এবং আয়রণ অনেক কার্যকর। সম্পূর্ণ সার দুই ভাগে ভাগ করে বর্ষার আগে মার্চ-এপ্রিল মাসে একবার এবং বর্ষার পরে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে আরও একবার প্রয়োগ করতে হবে। প্রতিবার সার দেয়ার পর প্রয়োজনে পানি সেচ দিতে হবে।
পানি সেচ ও নিষ্কাশন
মাটির আর্দ্রতার উপর নির্ভর করে দুইবার সেচ প্রদান করা হলে ফল ধরার পরিমাণ বেশি হয়। প্রথমবার ফুল ফোটার পর এবং দ্বিতীয়বার ফল ধরার পর প্রয়োজনে পানি সেচ দিতে হবে।
প্রুনিং
ফলসা গাছে প্রতি বছর অবশ্যই প্রুনিং করতে হবে। ফল সংগ্রহের পর আগস্ট মাসে গাছের উচ্চতা ৩ ফুট রেখে হার্ড প্রুনিং অর্থাৎ ডালপাল ছাঁটাই দিতে হবে। এতে নতুন ডালপালা তৈরি হবে যার প্রতিটি শীর্ষ থেকে মঞ্জুরিপত্র বের হবে। এতে গাছের আকৃতি ছোট থাকবে বিধায় ফল সংগ্রহ করা যেমন সহজ হবে তেমনি ফলনও বাড়বে। প্রুনিং করলে গাছের আকৃতি ছোট থাকে বিধায় ছাদ বাগানেও ব্যবহারযোগ্য। প্রুনিং না করলে গাছ ৫ থেকে ৭ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।
রোগ বালাই ও পোকামাকড়
সাধারণ ফলসা তেমন রোগ বালাই হয় না।
পাতায় ব্রাউন স্পট/বাদামি দাগ পড়া রোগ: ব্রাউন স্পট রোগটি সাধারণ জুলাই মাসের দিকে উদ্ভিদকে আক্রমণ করে। এ রোগে আক্রান্ত হলে প্রথমে পাতার ছোট ছোট ডিম্বাকৃতির দাগ পড়ে। পরে দাগগুলো আস্তে আস্তে বড় হয় এবং পাতাটি ঝলসে যায়। সমস্ত পাতা প্রায় ঝরে পড়ে। এ রোগের বিস্তার এড়াতে সমস্ত ঝরা পাতা সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। এ ছাড়া কার্বেডাজিম গ্রুপের ওষুধ যেমন নোইন ৫০ ডিবি¬উপি প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে দিয়ে ২-৩ বার ৭-১০ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে।
মিলিবাগ: মাঝে মাঝে ফলসা গাছে মিলিবাগের আক্রমণ দেখা যায়। মিলিবাগের আক্রমণ হলে আইসোপ্রাকার্ব গ্রুপের ওষুধ মিপসিন ৭৫ ডবি¬উপি বা সপসিন ৭৫ ডবি¬উপি প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ২-৩ বার ৭-১০ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে।
ফলন: এটি উচ্চফলনশীল ও নিয়মিত ফলদানকারী। কলমের চারা গাছ লাগানোর পর মাত্র ১৩ থেকে ১৫ মাসে ফল দিতে শুরু করে। কিন্তু বীজের গাছ ৩-৪ বছর সময় লাগে। একটি বড় গাছ বছরে গড়ে ১৫-২০ কেজি ফলন দেয়।
ফল ধরার সময় : ফলসা সাধারণত গ্রীষ্মের মাসগুলোতে সাধারণত মে-জুন মাসে সংগ্রহ করা হয়। জলবায়ু এবং জাতের উপর নির্ভর করে ফলের সময়কাল পরিবর্তিত হতে পারে। ফল একসাথে পরিপক্ব হয় না। তাই প্রতিটি গাছ থেকে প্রতিদিন পাকা ফল সংগ্রহ করা অপরিহার্য।
ফল সংরক্ষণকাল : ফলসা ফলের সংরক্ষণকাল মাত্র ২ দিন। তবে বন্ধ পাত্রে প্রায় এক বা দুই সপ্তাহ ফ্রিজে সংরক্ষণ করা যায়। তাই ফল সংগ্রহ করে অতি দ্রুত বাজারজাত করতে হবে।
বাংলাদেশে ফলসা ফলের দাম : স্থানীয় বাজার বা মৌসুম সরবরাহের উপর নির্ভর করে ফলসা ফলের দাম কেজি প্রতি ৩৫০-৫০০ টাকা।
আমরা ফলসাকে বুনো জাত হিসেবে জানি। তবে এটির অনেক পুষ্টিগুণের কথা চিন্তা করে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের আওতায় আনতে পারি যেন সারা দেশে চাষাবাদ করা যায়। এক্ষেত্রে উদ্যানতত্ত্ব বিভাগকে উদ্যোগ নিয়ে চারা বা বীজ সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে যেন সবাই এ ফসল সম্পর্কে জানতে পারে।
লেখক : অতিরিক্ত কৃষি অফিসার (এলআর), প্রশাসন ও অর্থ উইং, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা। (সংযুক্ত) কল সেন্টার অফিসার। মোবাইল : ০১৭১৬-৬৫৭৪৪৭,