কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ এ ০৬:১৯ PM

বিষমুক্ত চাষাবাদের জন্য চরাঞ্চল হতে পারে সম্ভাবনাময় এলাকা

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: পৌষ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৪-১২-২০২৫

বিষমুক্ত চাষাবাদের জন্য চরাঞ্চল হতে পারে সম্ভাবনাময় এলাকা
ড. মোছা: আমেনা খাতুন
পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, মেঘনা ও কর্ণফুলী বাংলাদেশের প্রধান নদ-নদী। এ ছাড়াও নদীর সংখ্যা প্রায় ৭০০, যে কারণে বাংলাদেশকে নদীমাতৃক দেশ বলা হয়। নদীপথে উদ্ভূত নতুন জমি যা প্রধান ভূমি থেকে পৃথক তাকে চর বলে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১৭০ মিলিয়নের ৪-৫% চরে বাস করে যা দেশের মোট ভূমি এলাকার প্রায় ৭২০০ কি.মি. জুড়ে রয়েছে। বাংলাদেশের চরগুলোকে যমুনা, পদ্মা, উচ্চ মেঘনা এবং নিম্ন মেঘনা নদী নামে চারটি উপঅঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি চর এলাকাই প্রায় অস্থায়ী, যার প্রতিটির দৈর্ঘ্য ০.৩৫ থেকে ৩.৫ কিমি.। বাংলাদেশের নদীমাতৃক এলাকাগুলোকে ‘দুর্ভিক্ষের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং প্রায়ই নদীর তীরে এবং চর দ্বীপগুলোকে প্রতি বছর নদীভাঙন এবং বন্যায় অনেক চর ডুবে যায়। কখনো কখনো নতুন চর জেগে ওঠে। 
চর এলাকার শস্যবিন্যাস মূলত মাটির গঠন (পলিমাটি), বৃষ্টিপাত, সেচের ব্যবস্থা, পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। চরের পলিমাটি সাধারণত বেশি উর্বর, সহজেই পানি এবং বাতাস সঞ্চালন করতে পারে। দীর্ঘ সময়ের জন্য পুষ্টি ধরে রাখতে পারে। পলিযুক্ত মাটিতে পানি এবং বাতাসের মধ্যে একটি ভালো ভারসাম্য থাকে যা শিকড়ের বৃদ্ধিকে সহজতর করে। এ মাটি গভীর, ভঙ্গুর, এবং সহজে কাজ করে, যা উদ্ভিদের বৃদ্ধির প্রধানত ফসল জন্মানোর জন্য ভাল। এটি গবাদিপশু ঘাস জন্মানোর জন্যও উপযুক্ত তাই উৎকৃষ্ট চারণ ভূমি বলা যায়। 
বন্যার পানি চলে যাওয়ার সাথে সাথে জমিতে পলিমাটি জমে তাই রাসায়নিক সার ও কীটনাশক লাগে না বললেই চলে। তাই চরের পলিমাটিতে তরমুজ, মিষ্টিকুমড়া, বাদাম, কালজিরা, মেথি, কাউন, তিসি, তিল, বেগুন, টমেটো, পেঁপে, শিম, মরিচ, করলা, শসা, লাউ, ডাল ও মসলাজাতীয়সহ বিভিন্ন সবজি অনেক ভালো ফলন হয়। কৃষকগণ নিজস্ব সংরক্ষিত বীজ চাষের জন্য ব্যবহার করেন। এসময় ফসলের জন্য রাসায়নিক সার ও বিষ লাগে না, উৎপাদন খরচও কম হয়। ফলে কৃষক নিজে বিষমুক্ত, সতেজ ও নিরাপদ খাদ্য পাচ্ছে, নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে অতিরিক্ত ফসল বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন। ভেজা পলিমাটিতে ভাদ্র মাসে মাষকলাই বীজ বপন করা হয় এবং পৌষ মাসে কর্তন করা হয়। তিল চাষের সাথে সাথী ফসল হিসেবে বাঙ্গি চাষ করেন আবার একই জমিতে মিশ্র ফসল চাষ করেন যেমন পেঁয়াজ, রসুন, ধনিয়া এবং এর আইলে রাঁধুনি মসলা। পুষ্টিকর, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে এবং বর্তমান খাদ্য সংকট মোকাবিলায় চাষাবাদের জন্য চরাঞ্চল হতে পারে সম্ভাবনাময় এলাকা। রাসায়নিক সার ও বিষমুক্ত চাষাবাদের জন্য মৌসুমভিত্তিক এসব ফসলের বহুমুখীকরণ এবং শস্যবিন্যাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চর এলাকায় পর্যাপ্ত চাষাবাদ ও পশুপালনের মাধ্যমে হতে পারে সবুজ বৈষ্টনী সম্বলিত বাসযোগ্য, টেকসই ভূমি।
চর এলাকায় সীমিত সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার জরুরি। চর এলাকার অন্যতম শস্যবিন্যাস হচ্ছে ভুট্টা-পাট-রোপা আমন, মরিচ-পাট-পতিত, সরিষা-বোরো-রোপা আমন, বোরো-পতিত-রোপা আমন, বাদাম-পতিত-পতিত, গম-পাট-রোপা আমন, আলু-বাদাম-রোপা আমন ইত্যাদি। যদিও অনেক শস্যবিন্যাস বিদ্যমান কিন্তু মূল সমস্যা হচ্ছে অকালবন্যা ও নদীভাঙন। চরের শস্যবিন্যাসে যেসব ফসল রয়েছে তাদের মধ্যে স্থানীয় জাতগুলোই বেশি ব্যবহার করা হয়। চরের জনগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবিকার জন্য কৃষি, মৎস্য, গবাদিপশু ও পাখি লালন-পালনের ওপর নির্ভরশীল। হাঁস, মুরগি ও ভেড়া চরাঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পরিবর্তনশীল জলবায়ুর সঙ্গে সহজে অভিযোজিত হতে সক্ষম। প্রচুর পরিমাণ চারণ ভূমি থাকায় চরে গড়ে ওঠে গরু-ছাগল পালনের খামার। কালো পলিমাটি চাষের জন্য ভালো, কিন্তু অত্যধিক কাদামাটি গাছের বৃদ্ধির জন্য মাটিকে খুব শক্ত করে তুলতে পারে, তাই পলি ব্যবহারকারী কৃষকদের বালু, পলি এবং কাদামাটির আনুপাতিক হার নিশ্চিত হয়ে ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো। 
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যসেবা, প্রাথমিক শিক্ষা এবং খাদ্য নিরাপত্তার মৌলিক মানবাধিকারের দাবিদার। চর নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, চরের প্রধান জীবিকা হলো কৃষি ও পশুপালন। চরের অধিবাসীর অধিকাংশই বেকার থাকায় অর্থনৈতিকভাবে তারা দুর্বল থাকে। তাই চরাঞ্চলের বন্যাপরবর্তী পলিমাটিতে চাষাবাদের জন্য গুরুত্বারোপ করা সময়ের দাবি।

লেখক : সহকারী পরিচালক, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা। মোবাইল ০১৭১৪৫১৭২৪৭ 

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন