কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২৫ এ ০৮:২৫ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: অগ্রহায়ণ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৬-১১-২০২৫
বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস ২০২৫
ড. বেগম সামিয়া সুলতানা
মৃত্তিকা পৃথিবীর প্রাণের অন্যতম ভিত্তি। এটি শুধু খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যম নয় বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, পানি শোষণ, কার্বন সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। বিশ্বব্যাপী মৃত্তিকার অবক্ষয় ও দূষণ এক জটিল সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মৃত্তিকার গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং এর সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতি বছর ৫ ডিসেম্বর বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস পালন করা হয়।
আন্তর্জাতিক মৃত্তিকা বিজ্ঞান ইউনিয়ন ৫ ডিসেম্বর বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস পালনের লক্ষ্যে ২০০২ সালে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে ৫ ডিসেম্বরকে বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। থাইল্যান্ডের প্রয়াত রাজা ভুমিবল আদুল্যাদেজের সম্মানে তারিখটি বেছে নেয়া হয়, যিনি এই মৃত্তিকা দিবসের স্বীকৃতি আদায়ের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
২০১৫ সালকে আন্তর্জাতিক মৃত্তিকা বর্ষ হিসেবে পালন করা হয়, যার পর থেকে প্রতি বছরই ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপাদ্য নিয়ে এই দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের প্রতিপাদ্য হলো: Healthy Soils for healthy cities’এর ভাবানুবাদ ‘সুস্থ নগরের জন্য সুস্থ মাটি’ আমাদের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ন, শিল্পায়ন, জনসংখ্যার চাপ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শহুরে মৃত্তিকার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। এ দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি নিশ্চয়তা, গ্রামীণ জীবিকা, এমনকি জাতীয় অর্থনীতির মেরুদ-ই হলো কৃষি। এই কৃষির প্রাণকেন্দ্র মৃত্তিকা। কিন্তু আমাদের এ মূল্যবান সম্পদ ক্রমেই চাপে পড়ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আবাদি জমি ক্রমশ কমে আসছে। শিল্পায়ন, নগরায়ন, রাস্তাঘাট নির্মাণের ফলে কৃষিজমি অন্য খাতে চলে যাচ্ছে।
মৃত্তিকা কেবল কৃষিজ উৎপাদনের ভিত্তি নয়, বরং এটি শহুরে জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সঠিক মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনা শহরের বর্জ্য শোষণ, বৃষ্টির পানি ধারণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, বৃক্ষরাজি ও সবুজায়ন রক্ষা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন, মাটি, পানি ও বায়ু দূষণ, অতিরিক্ত রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার ও বিভিন্ন বর্জ্য শহুরে মৃত্তিকার গুণাগুণ নষ্ট করছে।
বর্তমানে বিশ্বে জনসংখ্যা ক্রমাগত শহরমুখী হচ্ছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০% শহরে বসবাস করবে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দ্রুত নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে শহরগুলো সম্প্রসারিত হচ্ছে, কিন্তু শহুরে মৃত্তিকার স্বাস্থ্য রক্ষার দিকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।
বাংলাদেশের শহুরে মাটির গুণগত অবস্থা ইতোমধ্যেই নানাবিধ সমস্যার মুখোমুখি। শহুরে মৃত্তিকার একটি বড় সংকট হলো জৈব পদার্থের ঘাটতি। জৈব কার্বনের স্বল্পতার কারণে মৃত্তিকার গঠন দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং পুষ্টি ধরে রাখার ক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে।
এছাড়া, শিল্পাঞ্চলের আশপাশের মাটিতে সীসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিরাপদ সীমা অতিক্রম করছে। শহরের খোলা জমিগুলো ক্রমশ কংক্রিটে পরিণত হচ্ছে, যার ফলে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে এবং সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। মাটির প্রাকৃতিক পানি শোষণ ক্ষমতা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে একই সঙ্গে সবুজ এলাকা কমে যাওয়ায় শহরের তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে এবং নগরবাসীর জীবনযাত্রা ক্রমশ অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিল্পবর্জ্য, ভারী ধাতু, প্লাস্টিক এবং অন্যান্য অজৈব রাসায়নিক উপাদান দ্বারা সৃষ্ট দূষণ। শিল্পাঞ্চল, ট্যানারি এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে শহরের মৃত্তিকা বিষাক্ত হয়ে পড়ছে, যা শুধু মাটির উর্বরতাই নষ্ট করছে না, বরং তা খাদ্য নিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণের ফলে শহুরে মৃত্তিকার স্বাস্থ্য রক্ষা আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন সুসংহত পরিকল্পনা, নীতিগত সমর্থন এবং নাগরিক অংশগ্রহণ। শহরের মৃত্তিকা সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় ও সুপারিশ বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। যেমন: নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। নগর পরিকল্পনা ও অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে মৃত্তিকার স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। নির্মাণশিল্প, সড়ক সম্প্রসারণ, আবাসন প্রকল্পসহ সকল উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের পাশাপাশি মৃত্তিকার সক্ষমতা বিবেচনায় নিতে হবে। আবার সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। শহরবাসীর মধ্যে মৃত্তিকা দূষণ, নগর বাগান, ছাদ কৃষি এবং টেকসই কৃষি পদ্ধতি নিয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও প্রচারণা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে এ বিষয়ে জনমত গড়ে তোলা যেতে পারে। এক্ষেত্রে গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন শহুরে মৃত্তিকা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভারী ধাতু দূষণমুক্তকরণ, বায়োচার ব্যবহার, জৈবসার ও কম্পোস্ট প্রযুক্তির উন্নয়নসহ শহর উপযোগী মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে হবে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট SRDI ইতোমধ্যেই এ বিষয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এছাড়া, সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে শহুরে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করা যেতে পারে। নগর বর্জ্যের একটি বড় অংশ জৈব, যা কম্পোস্ট বা জৈবসারে রূপান্তর করা হলে শহরের মৃত্তিকার জৈব পদার্থের ঘাটতি পূরণ হবে। পাশাপাশি প্লাস্টিক ও ক্ষতিকর রাসায়নিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর নীতিমালা প্রয়োগ করতে হবে।
এই করণীয়সমূহ বাস্তবায়িত হলে শহরের মৃত্তিকা শুধু দূষণমুক্ত ও উর্বরই হবে না, বরং টেকসই নগর জীবনের ভিত্তি গড়ে তুলবে। শহরের প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রযুক্তি উদ্ভাবন একত্রে কাজ করলে আগামী দিনের নগর হবে প্রকৃতি ও মানুষের জন্য সমানভাবে সুস্থ, সবুজ ও টেকসই।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (SRDI) দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের মৃত্তিকা সম্পদ সংরক্ষণ ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে মৃত্তিকার স্বাস্থ্য সরাসরি সম্পর্কিত। শুধু গ্রামীণ কৃষিজমিতেই নয়, শহুরে অঞ্চলের মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনাও আজকের দিনে অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। তাই খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির জন্য আমাদের নগর কৃষিকে ঢেলে সাজাতে হবে। এক্ষেত্রে ছাদ কৃষি বা ছাদ বাগান একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাথে যৌথভাবে নগর কৃষি উৎপাদন সহায়ক (পাইলট) প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে SRDI ছাদ কৃষি বা ছাদ বাগান সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। নগর মৃত্তিকার গুণগত মান পর্যবেক্ষণও এই কার্যক্রমের একটি অংশ ছিল। পাশাপাশি নগরবাসীর মাঝে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে, যাতে শহরাঞ্চলেও টেকসই কৃষি চর্চা ও সবুজায়ন বৃদ্ধি পায়।
তবে শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নীতিগত ও সামাজিক উদ্যোগের। নগর পরিকল্পনায় মৃত্তিকা সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পার্ক, জলাভূমি ও খোলা মাঠ রক্ষা করতে হবে এবং সবুজ বেস্টনী গড়ে তুলতে হবে। শিল্পবর্জ্য ও রাসায়নিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর আইন প্রয়োগ জরুরি। নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন করে জৈব বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করতে হবে। পাশাপাশি ছাদ কৃষি, উল্লম্ব কৃষি ও নগর কৃষিকে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে শহরের মানুষ নিজেরাই মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় অংশ নিতে পারে।
সুস্থ মৃত্তিকা শুধু খাদ্য উৎপাদনের জন্যই নয়, শহরের সামগ্রিক টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। সুস্থ মাটি শহরের তাপমাত্রা কম রাখে, বৃষ্টির পানি ধারণ করে, দূষণ শোষণ করে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে এবং মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সবুজ পরিবেশ সৃষ্টি করে। তাই এবছরের বিশ্ব মৃত্তিকা দিবসের বার্তা আমাদের চোখ খুলে দেয়: শহর মানেই কংক্রিটের অরণ্য নয়; শহরকে প্রাণবন্ত রাখতে হলে মৃত্তিকাকে বাঁচাতে হবে।
আমাদের প্রত্যেককে মৃত্তিকা বাঁচানোর এই দায়িত্ব নিতে হবে-ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারক, গবেষক, নগর পরিকল্পনাবিদ, কৃষিজীবি ও কৃষি সম্প্রদায় সবাইকে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট ইতোমধ্যেই এই লক্ষ্য পূরণে কাজ করছে, তবে সমাজের সকল স্তরের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই ফলাফল সম্ভব নয়।
২০১৫ সাল থেকে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট দিবসটি পালন করে এবং ২০১৯ সাল থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এটি পালিত হয়ে আসছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন অন্যান্য দপ্তরসমূহ, বাংলাদেশ মৃত্তিকা বিজ্ঞান সমিতি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট এর সাথে দিবসটি পালনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে। এবছর ‘সুস্থ নগরের জন্য সুস্থ মাটি’-স্লোগানে দিবসটি পালিত হবে। ইতোমধ্যে দিবসটি পালনের জন্য মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট সামগ্রিক প্রস্তুতি নিয়েছে।
এই দিবসের অঙ্গীকার হোক- শহরের মৃত্তিকাকে জীবন্ত, উর্বর ও দূষণমুক্ত রাখা। সঠিক পরিকল্পনা, গবেষণা ও প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে আমরা যদি নগর মৃত্তিকার স্বাস্থ্য রক্ষা করতে পারি, তবে আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা রেখে যেতে পারব এক সবুজ, স্বাস্থ্যকর ও টেকসই নগর সভ্যতা।
লেখক : মহাপরিচালক, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, ফোন: ০২-৪১০২৫০৪১,