কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫ এ ০৫:৫৫ PM

বিশ্ব মৃত্তিকা দিবসের ভাবনা

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: অগ্রহায়ণ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৬-১১-২০২৫

বিশ্ব মৃত্তিকা দিবসের ভাবনা
ড. মোঃ নূরুল হুদা আল মামুন
মানুষের অস্তিত্ব ও সভ্যতার ভিত্তি হচ্ছে মৃত্তিকা। মাটির বুকেই জন্ম হয় খাদ্যের, জন্ম হয় গাছপালা, ফুল-ফল আর অগণিত প্রাণীর। কৃষি, পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থানের মূলস্তম্ভ এই মৃত্তিকাকে রক্ষা করার গুরুত্ব বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিতে প্রতিবছর ৫ ডিসেম্বর পালিত হয় বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস। এ বছর ২০২৫-এর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- ‘সুস্থ নগরের জন্য সুস্থ মাটি’। এ প্রতিপাদ্য শুধু একটি স্লোগান নয়, বরং মানব সমাজ ও  প্রকৃতির ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান।
মাটি, আমাদের পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। মাটি খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমই নয়, পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্যও বজায় রাখে। মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা অনেক সময় উপেক্ষিত হয়, যা ভবিষ্যতের জন্য আশঙ্কাজনক। কিন্তু অপরিকল্পিত মৃত্তিকা ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার, ইটের ভাটায় মাটির উপরিস্তর অপসারণ, অপরিকল্পিত নগরায়ন, বর্জ্য অব্যবস্থাপনা, বনভূমি নিধন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো কারণগুলো মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে বাধাগ্রস্ত করে।
আজকের পৃথিবী দ্রুত নগরমুখী। শহরকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে শিল্প, বসতি ও নানা অবকাঠামো। কিন্তু এই নগরায়নের কারণে প্রতিদিন অগণিত উর্বর মাটি কংক্রিটের নিচে চাপা পড়ছে। মাটি যখন কৃত্রিম আচ্ছাদনে ঢাকা পড়ে যায়, তখন তার স্বাভাবিক ক্ষমতা নষ্ট হয়। পানি শোষণ ও সংরক্ষণ ব্যাহত হয়, বাতাসে তাপমাত্রা বাড়ে, কার্বন চক্রে সমস্যা দেখা দেয় এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়। ফলে নগরে জলাবদ্ধতা, তাপদাহ, বায়ুদূষণ এমনকি খাদ্য নিরাপত্তার সংকটও দেখা দিতে পারে। নগরকে টেকসই করতে হলে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা অপরিহার্য। সুস্থ মৃত্তিকা নগরের জন্য প্রাকৃতিক ফিল্টারের মতো কাজ করে, পানি ধারণ ও পরিশোধন করে, কার্বন শোষণ করে এবং নগরবাসীর জন্য সবুজ পরিবেশ নিশ্চিত করে।
বাংলাদেশের নগরায়ন দ্রুতগতিতে ঘটছে। এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত কাঠামোর উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। জাতিসংঘের মতে, ২০০৮ সালের শেষদিকে বিশ্বের জনসংখ্যার অর্ধেক লোক শহুরে এলাকায় বাস করত। ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে যে, ২০৫০ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রায় ৬৪% এবং উন্নত বিশ্বের ৮৬% লোক নগরায়িত হবে। 
বাংলাদেশে, ঢাকা জেলা সবচেয়ে নগরায়িত এলাকা, যেখানে শহুরে জনগণের অনুপাত প্রায় ৯০%। অন্যান্য নগরায়িত জেলাগুলোর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও খুলনা উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে নগরায়ন জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। যদিও শহুরে জনগণের অনুপাত ২৫%, তবে নগরখাত থেকে            জিডিপিতে ৬৫% অবদান আসে। দেশ রূপান্তর পত্রিকার এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১৯৭৪ সালে শহুরে জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৯%, যা ২০২২ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ৩২% হয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে এই হার ৫৮.৪% হতে পারে। নগরায়নের ইতিবাচক প্রভাব থাকলেও এর বেশ কিছু নেতিবাচক দিক রয়েছে যেমন পরিবেশ দূষণ, যানজট, বস্তিবাসীর সংখ্যা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত চাপ এবং সয়েল সিলিং অন্যতম। নগরায়নের কারণে মাটির ওপরে কৃত্রিম স্তর চাপিয়ে দিলে মৃত্তিকা “শ্বাসরুদ্ধ” হয়ে পড়ে এবং মৃত্তিকা সব প্রাকৃতিক কার্যক্ষমতা হারায়।
নগরায়নের ফলে মৃত্তিকা নষ্ট বা “সিল” (ঝড়রষ ঝবধষরহম) হওয়ার প্রক্রিয়াটি হলো- শহরের রাস্তা, ভবন, পার্কিং, ফুটপাত ইত্যাদি নির্মাণের সময় মাটির ওপরে কংক্রিট, ডামার বা টাইলস বিছানো হয়। ফলে মাটির প্রাকৃতিক উন্মুক্ত পৃষ্ঠ আর থাকে না। উন্মুক্ত মাটি বৃষ্টির পানি শোষণ করে ভূগর্ভস্থ পানি স্তর পূরণ করে। কিন্তু সিল হয়ে গেলে পানি মাটিতে ঢুকতে পারে না। ফলে নগরে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ে। মাটির পৃষ্ঠ ঢাকা পড়লে বাতাস ও মাটির ভেতরের গ্যাসের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে মৃত্তিকার অণুজীব মারা যায়, মাটির জৈবিক গুণাগুণ নষ্ট হয়। মাটির অনুজীব ধ্বংস হলে মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট হয়। উন্মুক্ত মাটি, মাটির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। কিন্তু কংক্রিট বা ডামারের আস্তরণের কারণে মাটি সূর্যের তাপ শোষণ করতে পারে না, ফলে কংক্রিট সূর্যের তাপ শোষণ করে শহরে “হিট আইল্যান্ড” প্রভাব তৈরি করে। উন্মুক্ত মৃত্তিকা কার্বন ধরে রাখতে পারে। মৃত্তিকা কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে সহায়তা করে। যা বায়ুম-লের কার্বন নিঃসরণে ভূমিকা রাখে। কিন্তু মাটি সিল হলে সেই ক্ষমতা হারিয়ে যায়, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে প্রভাব বিস্তার করে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ে। একবার মাটি সিল হয়ে গেলে সেখানে গাছপালা জন্মাতে পারে না। ফলে মৃত্তিকার জৈব পদার্থ ও পুষ্টি উপাদান ধ্বংস হয়ে যায়। প্রকৃত পক্ষে, কৃষি ও বনভূমি হ্রাস ২০১৫-২০২৩ সালে বাংলাদেশে কৃষি জমির ব্যবহার কমে গেছে প্রায় ১ শতাংশ হারে (৫০.৪১% থেকে ৪৯.৪১%)। এভাবে কৃষি জমি প্রতি বছর অনাবাদি খাতে চলে যাচ্ছে। এর বেশির ভাগই নগরায়নের ফলে ংড়রষ ংবধষরহম (মাটিকে কংক্রিট বা পিচে ঢেকে ফেলা) হয়ে যাচ্ছে।
শহরের মাটি সংরক্ষণ করা আজকের দিনে খুবই জরুরি। কারণ দ্রুত নগরায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ আর শিল্পায়নের ফলে শহরের আবাদি জমি নষ্ট হচ্ছে ও ংড়রষ ংবধষরহম (মাটিকে কংক্রিট বা পিচে ঢেকে ফেলা) বেড়ে যাচ্ছে।
শহরের মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণের কিছু কার্যকর উপায় দেওয়া হলো :
পরিকল্পিত নগরায়ন : নগর পরিকল্পনায় খালি জায়গা, পার্ক, সবুজ বেল্ট রেখে মাটি খোলা রাখা। অবকাঠামো নির্মাণে আবাদি মাটি কম ব্যবহার করা। বিদ্যমান উন্মুক্ত পার্ক ও সবুজ এলাকা সংরক্ষণ করতে হবে।
মাটি ঢেকে না রাখা (ঝড়রষ ঝবধষরহম কমানো) : ভবন বা রাস্তা নির্মাণে (জলভেদ্য) ইট, কংক্রিট ব্লক, বা টাইলস ব্যবহার করা, যাতে পানি মাটিতে ঢুকতে পারে। পার্কিং লট, ফুটপাথ বা ড্রাইভওয়েতে কংক্রিটের বদলে ঘাস-কভার ব্লক ব্যবহার করা। পানি শোষণযোগ্য রাস্তা ও ফুটপাত ব্যবহার করতে হবে।
সবুজ এলাকা বৃদ্ধি : ছাদে বাগান  ও দেয়ালে বাগান  চালু করা। ব্যাপক আকারে নগর কৃষি উৎসাহিত করতে হবে। শহরে বৃক্ষরোপণ, কমিউনিটি গার্ডেন, পার্ক ও খেলার মাঠ সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
মাটির দূষণ রোধ : শিল্প ও বাসাবাড়ির বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা দরকার। সিসা, ভারী ধাতু বা রাসায়নিক বর্জ্য যাতে মাটিতে না মেশে তার ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করে মাটির দূষণ রোধ করতে হবে।
পুনঃব্যবহার ও পুনরুদ্ধার : ভরাট বা নির্মাণ কাজে কৃষিযোগ্য উর্বর মাটি ব্যবহার না করে বিকল্প উপাদান (বালি, নির্মাণ বর্জ্য) ব্যবহার করা যেতে পারে। শহরের যে মাটি ইতিমধ্যে দূষিত বা নষ্ট হয়েছে তা বায়ো-রেমেডিয়েশন যেমন- গাছ, মাইক্রোব বা জৈব পদার্থ দিয়ে পরিশোধন করে পুনরুদ্ধার করা।
বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ : রেইনওয়াটার হারভেস্টিং করে জমিতে পানি প্রবাহ ঘটালে মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকে। এতে ক্ষুদ্র প্রাণী ও অণুজীব সক্রিয় থাকে, যা মাটিকে স্বাস্থ্যকর রাখে।
জনসচেতনতা ও আইন প্রয়োগ : সরকারি নীতিমালায় আবাদি জমি সংরক্ষণ আইন বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। নগরবাসীর মধ্যে মাটি সংরক্ষণের গুরুত্ব নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
মৃত্তিকা হলো জীবনের মূলভিত্তি। মাটি আমাদের আবাসস্থল ও খাদ্যের উৎস। তাই মাটির পরিচর্যার গুরুত্ব অপরিসীম। কৃষক, বিজ্ঞানী, পরিবেশবাদী, পরিকল্পনাবিদ, নীতিনির্ধারক এবং বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষকে এই গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ রক্ষায় অবদান রাখতে হবে। শহর যদি সুস্থ, সুন্দর ও বাসযোগ্য রাখতে হয়, তবে তার প্রথম শর্ত হলো সুস্থ মৃত্তিকা। মনে রাখতে হবে, মাটিকে রক্ষা মানেই মানবসভ্যতাকে রক্ষা। মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উর্বর ভূমি রেখে যেতে হবে। তাই মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সুন্দর নগর গড়ে তুলতে হবে। 

লেখক : মৃত্তিকা বিজ্ঞানী, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, কেন্দ্রীয় গবেষণাগার, ঢাকা। মোবাইল: ০১৭১১-৪৬৯৫০৯, 

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন