কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ২৩ জানুয়ারী, ২০১৯ এ ১০:৫৫ AM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: পৌষ সাল: ১৪২৫ প্রকাশের তারিখ: ০১-০১-২০১৯
মুক্তা একটি দামি রত্ন। এটি শৌখিনতা এবং আভিজাত্যের প্রতীক। মুক্তার ব্যবহার প্রধানত অলংকার হিসেবে হলেও এর আরও অনেক ব্যবহার রয়েছে, যেমন- মুক্তা চূর্ণ বিভিন্ন ওষুধের দামি কাঁচামাল হিসেবে এবং প্রসাধনসামগ্রী তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। শৌখিন দ্রব্যাদি তৈরিসহ আরও নানা কাজে মুক্তার ব্যবহার রয়েছে। গোলাকার মুক্তার মতো ইমেজ মুক্তাও অলংকার এবং শৌখিন দ্রব্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ইমেজ মুক্তা তৈরিতে স্বল্প সময়ের প্রয়োজন হয় (৭-৮ মাস) এবং তৈরির কৌশলটি সহজ বলে যে কেউ সহজেই তা আয়ত্ব করতে পারে। বাংলাদেশের আবহাওয়া ইমেজ মুক্তা চাষের খুবই অনুকূল। উল্লেখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট “মুক্তা চাষ প্রযুক্তি উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ” প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন উপাদানে তৈরি ইমেজ মুক্তার উপর গবেষণা পরিচালনা করে ব্যপক সফলতা অর্জন করে।
ইমেজ মুক্তা কি?
মুক্তা হচ্ছে জীবন্ত ঝিনুকের দেহের ভিতর জৈবিক প্রক্রিয়ায় তৈরি এক ধরনের রত্ন। এই রত্নটি যখন ছবি বা ইমেজ আকারে তৈরি হয় তখন তাকে ইমেজ মুক্তা বলে। বিভিন্ন ধরনের ছাঁচ বা ইমেজকে ঝিনুকের ম্যান্টল টিস্যুর নিচে প্রতিস্থাপন করা হয়। প্রতিস্থাপিত ইমেজটির চারদিকে ঝিনুকের শরীর থেকে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ (নেকার) নিঃসৃত হয়ে জমা হয় এবং ধীরে ধীরে ইমেজ মুক্তা তৈরি হয়।
ইমেজ মুক্তার গুরুত্ব : ইমেজ মুক্তা অলংকার হিসেবে ব্যবহার করা যায়;
ডেকরেশন পিস হিসেবে ব্যবহার করা যায়;
ভ্যালু এডেড প্রোডাক্ট (মূল্য সংযোজিত পণ্য) হিসেবে ব্যবহার করা যায়;
স্বল্প সময়ে, স্বল্প পুঁজিতে এবং ক্ষুদ্রাকৃতির জলাশয়ে এ ধরনের মুক্তা চাষ সম্ভব;
মাছের সাথে একত্রে ইমেজ মুক্তা চাষ করে মাছ চাষি বাড়তি আয় করতে পারে;
বেকারত্ব দূরীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন এবং আর্থ সামাজিক উন্নয়নে ইমেজ মুক্তা চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিভিন্ন ধরনের ইমেজ মুক্তা : বিভিন্ন ধরনের উপাদান ইমেজ মুক্তার ইমেজ বা ছাঁচ তৈরিতে ব্যবহার করা যায়, যেমন- মোম, ঝিনুকের খোলস, প্লাস্টিক, স্টিল ইত্যাদি। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুক্তা গবেষণাগারে মোম এবং ঝিনুকের খোলসের তৈরি ইমেজ/ ছাঁচ দিয়ে আকর্ষণীয় ইমেজ মুক্তা উৎপাদন করা হয়েছে। ইমেজ বা ছাঁচ তৈরির সময় লক্ষ্য রাখতে হবে ছাঁচের তলা যেন উত্তল হয় এবং ছাঁচের ডিজাইন যেন স্পষ্ট হয়।
মোমের ইমেজ : মোম দিয়ে ইমেজ তৈরির ক্ষেত্রে প্রথমে একটি মৃত ঝিনুকের পরিষ্কার খোলসের ভেতরের দিক তেল দিয়ে পিচ্ছিল করা হয়। এরপর গলিত মোম ঐ খোলসে ঢেলে মোম জমাট বাঁধার পূর্বে খোলসটি ডানে বামে নেড়ে মোমের একটি পাতলা স্তর তৈরি করা হয়। এরপর একটি সূচের সাহায্যে মোমের স্তরের উপর মৃদুচাপ প্রয়োগ করে পছন্দমাফিক ডিজাইনের ইমেজ তৈরি করা হয়। তৈরিকৃত ইমেজটি এক মিনিট পরিষ্কার পানিতে ডুবিয়ে মোমের খসখসেভাব দূর করা হয়।
খোলসের ইমেজ : খোলসের ইমেজ বা ঝযবষষ ইমেজ তৈরির জন্য প্রথমে কিছু মৃত ঝিনুকের খোলস সংগ্রহ করা হয়। এগুলোকে ভালোভাবে পরিষ্কার করে রোদে শুকিয়ে নেওয়া হয়। এরপর শেলকাটিং মেশিনের সাহায্যে এই খোলসগুলোর বাইরের স্তরটি অর্থাৎ পেরিওস্ট্রাকাম স্তরটি ঘষে পরিষ্কার এবং মসৃণ করা হয়। অতঃপর কাটিং মেশিনের সাহায্যে খোলসটির অবতল অংশ আয়তাকার করে ব্লকাকারে কেটে নেওয়া হয়। এরপর ব্লকটির উপর পেন্সিল দিয়ে নির্দিষ্ট মাপের বিভিন্ন ধরনের ইমেজের চিত্র অঙ্কন করা হয়। অতঃপর মিনি গ্রাইন্ডার মেশিনের সাহায্যে অঙ্কিত ইমেজটি ছাঁচ আকারে কেটে নেওয়া হয়। পরিশেষে একই মেশিনের সাহায্যে ইমেজের ধারগুলো ঘষে মসৃণ করা হয়। এভাবে একটি খোলস ইমেজ বা ঝযবষষ ইমেজ তৈরি করা হয়। যা পরে জীবাণুমুক্ত করে জীবিত ঝিনুকে কাঙ্খিত মুক্তা পাওয়ার জন্য প্রবেশ করানো হয়।
ইমেজ মুক্তা উৎপাদনকারী ঝিনুক
সকল ঝিনুক মুক্তা উৎপাদন করতে পারে না। বিশেষ কিছু ঝিনুক আছে যেগুলো মুক্তা উৎপাদনে সক্ষম। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক পরিচালিত জরিপে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের স্বাদুপানিতে চার প্রজাতির ঝিনুক রয়েছে যেগুলো মুক্তা উৎপাদনে সক্ষম;
যেমন-
Lamellidens marginalis, L. corrianus,
L. phenchooganjensis, L. jenkinsianus
তন্মধ্যে Lamellidens marginalis এবং খ. L. corrianus ঝিনুকগুলো ইমেজ মুক্তা উৎপাদনে অধিক উপযোগী।
ইমেজ মুক্তা উৎপাদন কৌশল : ইমেজ মুক্তা উৎপাদনের কৌশলকে অপারেশন বলা হয়। নিম্নে ইমেজ মুক্তা উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপগুলো বর্ণনা করা হলো :
প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ঃ ড্রপার বোতল, অপারেশন তাক, ঝিনুক খোলার যন্ত্র, স্ট্যুপল, স্প্যাচুলা, ট্রে, ছিদ্রযুক্ত ট্রে
প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ঃ ইমেজ (মোমের ও শেল), ৭০% এ্যালকোহল, পটাস, বিশুদ্ধ পানি
ঝিনুক নির্বাচন ঃ সব আকৃতির ঝিনুক ইমেজ মুক্তা উৎপাদনের জন্য উপযোগী নয়। সাধারণত বড় আকৃতির সুস্থ সবল হলুদাভ ঝিনুক ইমেজ মুক্তা উৎপাদনের জন্য বিশেষ উপযোগী। গোলমুক্তা তৈরির জন্য সাধারণত অল্প বয়স্ক ঝিনুক নির্বাচন করা হয় কারণ এই ঝিনুকগুলোর নেকার নিঃসরণের হার বেশি থাকে। কিন্তু ইমেজ মুক্তা তৈরির জন্য বড় ঝিনুকের প্রয়োজন হয় বলে কিছুটা বয়স্ক ঝিনুক নির্বাচন করতে হয়, কারণ অল্প বয়সের ছোট ঝিনুকে ইমেজ বা ছাঁচের মতো একটা বড় বহিরাগত বস্তু প্রবেশ করালে ঝিনুক তা দেহ থেকে বের করে দেবে।
পুকুরে ঝিনুক ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ
অপারেশনকৃত ঝিনুক পুকুরে ফোল্ডার আকৃতির নেট ব্যাগে মজুদ করা হয়। নেট ফোল্ডার হচ্ছে এক বা একাধিক সারির পকেট বিশিষ্ট ফোল্ডার যা বাঁশ বা লোহার কাঠামো ও জাল দিয়ে তৈরি করা হয়। এই নেট ফোল্ডারগুলো পুকুরে দড়ির সাহায্যে নির্দিষ্ট গভীরতায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। ফোল্ডারের প্রতি পকেটে একটি করে ঝিনুকের অঙ্কীয় দিক ঊর্ধ্বমুখী করে স্থাপন করা হয়। নেট ফোল্ডারে ঝিনুকটির নড়াচড়া করার তেমন সুযোগ না থাকায় ঝিনুকের দেহের ভেতরের ইমেজটি বের হয়ে আসে না।
পুকুরে ঝিনুক স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ : বাঁশ, দড়ি, ফ্লট (ঋষড়ধঃ)/ভাসা
অপারেশন পূর্ববর্তী পরিচর্যা
প্রকৃতি থেকে ঝিনুক সংগ্রহ করে বাছাই করা হয়। এক্ষেত্রে ঝিনুকগুলো হলুদাভ, সুস্থ-সবল, ক্ষতমুক্ত এবং ৩-৩.৫ বছর বয়সের হতে হবে। বাছাইয়ের পর ঝিনুকগুলো কমপক্ষে একমাস পুকুরের তলদেশে রেখে প্রতিপালন করতে হবে। ঝিনুকগুলো অপারেশন উপযোগী করে তোলার জন্য নিম্নলিখিত মাত্রায় সার, গোবর এবং চুন প্রয়োগ করতে হবে।
সারণি১ ঃ সার ও চুন প্রয়োগের মাত্রা
এক মাস পর লালন পুকুর থেকে গবেষণাগারে এনে ঝিনুকগুলো অপারেশন উপযোগী কিনা তা পরীক্ষা করতে হবে। সুস্থ-সবল ম্যান্টলযুক্ত ঝিনুকগুলো অপারেশনের জন্য নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচিত ঝিনুকগুলো সিস্টার্নের পানিতে ৭ দিন না খাইয়ে রাখতে হবে এবং প্রতিদিন সকালে সিস্টার্নের পানি পরিবর্তন করে নতুন পানি দিতে হবে। এতে করে ঝিনুকের ভেতরের ময়লা এবং পাকস্থলীয় খাবার পরিষ্কার হয়ে বেরিয়ে যাবে। অষ্টম দিন সকালে অপারেশনের কমপক্ষে ২ ঘণ্টা আগে ঝিনুকগুলো সিস্টার্ন থেকে উঠিয়ে গবেষণাগারে এনে ছিদ্রযুক্ত ট্রেতে অঙ্কীয় দিকে নিম্নমুখী করে রাখতে হবে যেন ভেতরে কোনো পানি না থাকে।
অপারেশন পদ্ধতি : অপারেশনের জন্য ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি একটি ট্রেতে ৭০% অ্যালকোহলের সাহায্যে জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। অপারেশনকারীর হাত পটাশ মিশ্রিত পানি দিয়ে ও মোমের ইমেজগুলো বিশুদ্ধ পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। ট্রে থেকে পর্যায়ক্রমে একটি করে ঝিনুক নিয়ে অপারেশন তাকের উপর স্থাপন করে ঝিনুক খোলার যন্ত্র দিয়ে খোলস দুটি ৮ মি.মি. পরিমাণ খুলে স্ট্যুপল দিয়ে আটকে দিতে হবে। ভেতরে ময়লা থাকলে ড্রপার বোতলের সাহায্যে বিশুদ্ধ পানি দিয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে। পরবর্তীতে সতর্কতার সাথে স্প্যাচুলার সাহায্যে ঝিনুকের একপাশের খোলস থেকে ম্যান্টল পর্দা সামান্য পরিমাণ সরিয়ে ইমেজটি খোলস ও ম্যান্টলের মাঝ বরাবর প্রবেশ করিয়ে খোলসের অবতল অংশে প্রতিস্থাপন করতে হবে। এরপর স্প্যাচুলার সাহায্যে হালকা চাপ দিয়ে ম্যান্টলের ভেতরের বাতাস বের করে ইমেজটি সঠিক ভাবে সন্নিবেশ করতে হবে। অতঃপর সাবধানে স্ট্যুপল খুলে ঝিনুকটি ট্রেতে অঙ্কীয় দিক ঊর্ধ্বমুখী করে রাখতে হবে। অপারেশন শেষে ঝিনুকের খোলসের উপর নির্দিষ্ট সংখ্যা লিখে চিহ্নিত করে দিতে হবে।
অপারেশন পরবর্তী পরিচর্যা : অপারেশনের পর ঝিনুকগুলো সিস্টার্নে প্রথম ৭ দিন খাবার না দিয়ে নেট ফোল্ডারে ঝুলিয়ে রাখতে হবে। প্রতি ফোল্ডারে ৪টি করে ঝিনুক দিতে হবে। পরবর্তী ১৪ দিন বিকাল বেলা পুকুর থেকে প্লাংকটন সংগ্রহ করে সিস্টার্নে দিতে হবে। প্রতিদিন সকালবেলা সিস্টার্নের পানি পরিবর্তন করে দিতে হবে। সিস্টার্নে ২১ দিন পরিচর্যা করার পর অপারেশনকৃত ইমেজগুলো নেট ফোল্ডারসহ পুকুরের পানিতে রশিতে করে ঝুলিয়ে দিতে হবে। ১৫ দিন পর পর ঝিনুকগুলো চেক করতে হবে। ঝিনুকের গায়ে এবং নেট ফোল্ডারে ময়লা থাকলে পরিষ্কার করে দিতে হবে এবং পুকুরে পর্যাপ্ত প্লাংকটন আছে কিনা খেয়াল রাখতে হবে। প্রতি মাসে প্রয়োজনীয় মাত্রায় সার প্রয়োগ করতে হবে।
ইমেজ মুক্তার চাষ ব্যবস্থাপনা : অপারেশনকৃত ঝিনুক থেকে মুক্তা পাওয়ার জন্য ঝিনুকগুলোকে জলাশয়ে চাষ করতে হবে। মুক্তা উৎপাদন ও গুণগত মানের জন্য চাষ ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিম্নে মুক্তার চাষ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করা হলোঃ
পুকুর প্রস্তুতি : মুক্তা চাষের পুকুরে পর্যাপ্ত সূর্যালোক থাকা বাঞ্ছনীয়। সূর্যালোকের উপস্থিতিতে মুক্তার রং ভালো হয় এবং ঝিনুকের জন্য পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি হয়। পুকুরের আকার ৫০-৮০ শতাংশ বা এর চেয়ে বড় হলে ভালো, তবে এর চেয়ে ছোট পুকুরেও ইমেজ মুক্তা চাষ করা যাবে। পুকুরের গভীরতা ১.৫-২.০ মিটার হলে ভালো। নির্বাচিত পুকুরের পানি সরিয়ে তলদেশ ভালোভাবে রৌদ্রে শুকাতে হবে। এরপর শতকে এক কেজি হারে চুন ভালোভাবে পুকুরের মাটিতে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। পুকুরে ঝিনুকের প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রতি শতকে ১০০ গ্রাম ইউরিয়া, ১২৫ গ্রাম টিএসপি, এবং ৫ কেজি গোবর পানিতে ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে।
প্রাকৃতিক খাদ্য ঃ ঝিনুকের খাদ্য গ্রহণ মূলত পরোক্ষ। ফুলকার মাধ্যমে এরা পানিতে বিদ্যমান এলজি, ক্ষুদ্রাকার ফাইটোপ্লাংকটন, জুপ্লাংকটন, জৈব পদার্থ ইত্যাদি ছেঁকে খায়। তাই পুকুরে যথেষ্ঠ পরিমাণ প্রাকৃতিক খাদ্যের উপস্থিতির জন্য নিয়মমাফিক সার প্রয়োগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তা চাষের জন্য পানির উপযুক্ত রং হলো হলুদাভ সবুজ এবং স্বচ্ছতা ৩০-৩২ সে.মি.। জলাশয়ে ঝিনুকের প্রাকৃতিক খাদ্য প্রস্তুতির জন্য নিম্নক্তো ছক(সারণি-২) অনুযায়ী পাক্ষিক চুন ও সার প্রয়োগ করা উচিত।
ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে সাপ্তাহিক বা পাক্ষিকভাবেও সার প্রয়োগ করা যায়। সূর্যালোকিত দিনে সকালে পানিতে গুলানো সার পুকুরের চারদিকে সমানভাবে ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। বৃষ্টির সময় বা মেঘলা দিনে এবং শীতকালে পানির তাপমাত্রা খুব কমে গেলে সার প্রয়োগ করা উচিত নয়।
পুকুরে মাছ মজুদকরণ ঃ একজন মাছচাষি খুব সহজেই মাছের পুকুরে ইমেজ মুক্তা চাষ করে বাড়তি আয় করতে পারে। এক্ষেত্রে, তৃণভোজী মাছ যেমন, গ্রাস কার্প, বিগহেড কার্প, এশিয়ান কার্প ইত্যাদি ইমেজ মুক্তা চাষের পুকুরে চাষ করা যেতে পারে। যে সকল মাছ ঝিনুকের সাথে খাদ্যে প্রতিযোগিতা করবে যেমন-সিলভার কার্প, সেসব মাছ মুক্তা চাষের পুকুরে মজুদ না করাই ভালো। যদি একান্ত করতেই হয় তবে তা অল্প পরিমাণে। এছাড়া মধ্যস্তরে কিংবা নিচের স্তরে যে সব মাছ বিচরণ করে খাবার খায় যেমন- রুই, মৃগেল, কালিবাউস ইত্যাদি মাছও ইমেজ মুক্তার পুকুরে চাষ করা যেতে পারে। কিন্তু মাংসাশী মাছ যেমন- ব্ল্যাক কার্প, ইত্যাদি মুক্তা চাষের পুকুরে চাষ করা যাবে না।
পানি প্রবাহ ঃ পুকুরের পানিতে সামান্য প্রবাহ সৃষ্টি করা গেলে ঝিনুকের বৃদ্ধিসাধনে এবং মুক্তা উৎপাদনে সহায়ক হয়। তাই সম্ভব হলে প্যাডল হুইল বা হোস পাইপ ব্যবহার করে সামান্য প্রবাহের ব্যবস্থা করা যায়। মাসে একবার পুকুরের কিছু পরিমাণ পানি পরিবর্তন করলে ভালো হয়।
অপারেশনকৃত ঝিনুক মজুদকরণ ঃ ইমেজ প্রতিস্থাপনের ৩-৪ ঘণ্টার মধ্যে অপারেশনকৃত ঝিনুকগুলো অপারেশন পরবর্তী পরিচর্যার জন্য দ্রুত সিস্টার্নে স্থানান্তর করতে হবে। এতে ঝিনুকের বেঁচে থাকার হার, বৃদ্ধি, মুক্তাস্তর তৈরি দ্রুত হয়। অপারেশন পরবর্তী পরিচর্যা শেষে ঝিনুক পুকুরে মজুদ করতে হবে। সিস্টার্ন ও পুকুরে ঝিনুক সমূহের জন্য ঝিনুকের আকৃতির চেয়ে ছোট ফাসের নাইলন নেট দিয়ে প্রতিটি ৪০দ্ধ৩৫ বর্গ সে.মি. সাইজের নেট ফোল্ডার তৈরি করতে হবে। প্রতি ফোল্ডারে ৪ টি ঝিনুক রেখে ফোল্ডারগুলো রশির সাহায্যে পুকুরের পানিতে ঝুলিয়ে দিতে হবে। এভাবে প্রতি শতাংশে ৮০-১০০ টি ঝিনুক মজুদ করা যেতে পারে। প্রতি রশিতে দুটি ব্যাগের দূরত্ব ৪০-৪৫ সে.মি. এবং দুটি রশির দূরত্ব ১২০-১৫০ সে.মি. হলে ভালো হয়।
ঝিনুক মজুদ পরবর্তী পুকুর ব্যবস্থাপনা ঃ ইমেজ মুক্তা চাষের জন্য পানির সঠিক গুণাগুণ বাজার রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঝিনুকের খাদ্য গ্রহণ, বৃদ্ধি এবং নেকার নিঃসরণের ক্ষেত্রে পানির তাপমাত্রা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পানির অনুকূল তাপমাত্রায় ঝিনুক দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং নেকার দ্রুত নিঃসৃত হয়ে মুক্তা গঠিত হয়। মুক্তা চাষের জন্য পানির উপযুক্ত তাপমাত্রা ১৫ক্ক-৩০ক্ক সে.। তাই অপারেশনকৃত ঝিনুকগুলোকে এই তাপমাত্রার ভেতর রাখার জন্য বিভিন্ন ঋতুতে পানির তাপমাত্রার সাথে সামঞ্জস্য রেখে নেট ফোল্ডার ঝুলানোর গভীরতা কমাতে বা বাড়াতে হবে। শীতকালে ফোল্ডারগুলোকে ২০ সে.মি. গভীরতায় ঝুলাতে হবে। গ্রীষ্মকালে উপরিস্তরের পানির তাপমাত্রা বেশি থাকে বলে ৪০-৪৫ সে.মি. গভীরতায় ঝুলাতে হবে। পানির তাপমাত্রা খুব বেশি (৩২ক্ক সে. এর বেশি) বেড়ে গেলে পুকুরে ঝর্ণার মাধ্যমে অথবা নতুন পানি সরবরাহ করে পানির তাপমাত্রা সহনীয় করতে হবে। এছাড়া এই সংকটময় সময়ে ফোল্ডারগুলোকে তলদেশ থেকে মাত্র ১০ সে.মি. উপরে ঝুলিয়ে ঠাণ্ডা পরিবেশের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ঝিনুক জলাশয়ের উদ্ভিদকণা, ক্ষুদ্রপ্রাণিকণা ইত্যাদি ফুলকার সাহায্যে ছেঁকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। ইমেজ মুক্তা চাষের পুকুরে প্রয়োজনীয় পরিমাণ প্রাকৃতিক খাদ্য থাকা প্রয়োজন। পুকুরে পরিমাণমতো প্রাকৃতিক খাদ্য জন্মালে পানির রঙ হলুদাভ সবুজ এবং স্বচ্ছতা ৩০-৩২ সে.মি. হবে। পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্যের স্বল্পতা দেখা দিলে স্বচ্ছতা বেশি হয়। সেক্ষেত্রে দ্রুত পানিতে সার প্রয়োগ করতে হবে। পূর্বে ব্যবহৃত সারের পরিমাণের অর্ধেক হারে সার প্রয়োগ করতে হবে। অন্যদিকে স্বচ্ছতা ২৫ সে.মি. এর কম হলে বুঝতে হবে পুকুরটিতে প্রাকৃতিক খাদ্যের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অত্যাধিক। সেক্ষেত্রে নতুন স্বচ্ছ পানি সরবরাহ করতে হবে। প্রয়োজনে পুকুরের কিছু পরিমাণ পানি স্বচ্ছ পানি দিয়ে পরিবর্তন করতে হবে। এছাড়া পুকুরে প্রতি মাসে শতক প্রতি এক কেজি হারে চুন প্রয়োগ করতে হবে। ঝিনুক বর্ধনের জন্য ৭-৮ হচ্ছে উপযুক্ত pH, অম্লীয় (pH<6.5) এবং ক্ষারীয় (pH>8.5) উভয় ধরনের পানিই ঝিনুকের বর্ধন এবং মুক্তা তৈরির জন্য অনুকূল নয়।
পুকুরে অপারেশনকৃত ঝিনুক পর্যবেক্ষণ ঃ ইমেজ প্রতিস্থাপনের প্রথম মাসে অপারেশনকৃত ঝিনুকগুলো সাধারণত দুর্বল থাকে। তাই প্রতিস্থাপনের পর প্রথম মাসে নিয়মিত ঝিনুকগুলো পর্যবেক্ষণ করতে হবে। মৃত ঝিনুক কিংবা ইমেজ বের করে দেওয়া ঝিুনক সরিয়ে ফেলতে হবে। এছাড়া নিয়ম করে প্রতি মাসে একবার ঝিনুকগুলো পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এ সময় ঝিনুকগুলোকে পরিষ্কার করে দিতে হবে এবং খোলসের মুখে আটকে থাকা শ্যাওলা দূর করে দিতে হবে।
ইমেজ মুক্তা আহরণ ঃ হেমন্তের শেষে বা শীতের শুরুতে ইমেজ মুক্তা আহরণের উপযুক্ত সময়। আহরণের এক মাস পূর্বে ঝিনুকগুলোকে পানির উপরিতলের কাছাকাছি (১০ সে.মি. গভীরতায়) ঝুলিয়ে দিতে হবে। এতে করে ঝিনুকের দ্যুতি এবং রঙ উজ্জ্বল হয়। ব্যবহার উপযোগী ইমেজ মুক্তা তৈরি হতে ৭-৮ মাস সময় লাগে। আহরণের সময় ঝিনুকটির সংযোজনী পেশি ছুরি দিয়ে কেটে ঝিনুকটির দুটি খোলস খুলে ফেলতে হবে। এরপর ম্যান্টল পর্দাটি সরিয়ে ফেললে ইমেজ মুক্তাটি দেখা যাবে। খোলসসহ মুক্তাটি প্রথমে সামান্য লবণ পানি দিয়ে ধুয়ে এরপর স্বাভাবিক পানি দিয়ে ধুতে হবে। সবশেষে বাতাসে ইমেজ মুক্তা শুকিয়ে নিতে হবে।
ইমেজ মুক্তা আমাদের দেশে একটি নতুন সংযোজন। চমৎকার অলংকার তৈরি ছাড়াও শৌখিন দ্রব্য তৈরি, গৃহসজ্জায় এবং আরও নানাবিধভাবে ইমেজ মুক্তা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইমেজ ম্ক্তুার উৎপাদান কৌশল সহজ এবং উৎপাদনে সময় কম লাগে। এছাড়া উৎপাদন ব্যয়ও কম। এই প্রযুক্তিটি বাংলাদেশের আবহাওয়া উপযোগী। এটি একটি পরিবেশবান্ধব এবং নারীবান্ধব প্রযুক্তি। নারীরা সহজেই এই প্রযুক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে। এসব দিক বিবেচনা করে দেখা যায় যে, আমাদের দেশে ইমেজ মুক্তার এক বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।
ড. মোহসেনা বেগম তনু১ অরুণ চন্দ্র বর্মন২ মোহাম্মদ ফেরদৌস সিদ্দিকী৩ সোনিয়া স্কু৪ মো: নাজমুল হোসেন৫
১প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মোবা : ০১৭১১১১৫৩৩৩, ইমেইল :tanu@yahoo.com, ২,৩ ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা৪,৫বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বামগই, ময়মনসিংহ-২২০১