কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১৯ এ ১১:৫৬ AM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: অগ্রহায়ণ সাল: ১৪২৬ প্রকাশের তারিখ: ২৪-১১-২০১৯
সুস্থ সবল ও মেধাবী জাতি গঠনে প্রাণিজ আমিষ খুবই গুরুত্বপূর্ণ আর প্রাণিজ আমিষের অন্যতম উৎস মাংস। বাংলাদেশ এখন চাহিদাভিত্তিক মাংস উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। যদিও উন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের গড় মাংস গ্রহণের তুলনায় আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে আছি। বর্তমানে দেশে ৩৪.৬৮ লক্ষ ভেড়া রয়েছে, যা গবাদিপশুর সংখ্যানুপাতে তৃতীয়। আমাদের দেশে গরু ও ছাগলের মাংস খুবই জনপ্রিয়। মাংসের গুণগতমান যাচাইয়ে ভেড়ার মাংসও (বিশেষ করে ল্যাম্ব মিট) সমান বা অধিক গুরুত্বের দাবিদার। গুণগত মান ও স্বাদের ভিত্তিতে সারা বিশ্বে ল্যাম্বের মাংস খুবই জনপ্রিয়। ল্যাম্ব বলতে সাধারণত এক বছরের কম বয়সী হৃষ্টপুষ্ট বাড়ন্ত ভেড়াকে বুঝায় এবং এই ভেড়ার মাংসকেও ল্যাম্ব বলে, যা খুবই সুস্বাদু। গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশে যেসব ভেড়া মাংসের জন্য জবাই হয় তাদের গড় বয়স ১৬ মাস। যাদের বেশির ভাগই বয়স্ক এবং পাল থেকে বাদ দেয়া ভেড়া। ফলে এদের মাংসের গুণাগুণ এবং স্বাদ আশানুরূপ নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই মাংস ছাগলের মাংসের সাথে মিশিয়ে বিক্রি করা হয়। তাই উন্নত গুণাগুণ সম্পন্ন ভেড়ার মাংস উৎপাদন ও এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিকল্পে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ল্যাম্ব উৎপাদন ও বিপণন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের দেশে বর্তমানে দেশি ভেড়ার যে কারকাস বিক্রি হয় তার গড় ওজন প্রায় ৮ কেজি। এই ৮ কেজি কারকাস উৎপাদনে ভেড়া গড়ে ১ বছর ৬ মাস সময় নেয়। গবেষণায় দেখা গেছে পরিমিত খাদ্য, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনার ল্যাম্ব উৎপাদনের মাধ্যমে ৬-৭ মাসেই ৮ কেজি কারকাস উৎপাদন সম্ভব। যার মাধ্যমে ভেড়া হতে উৎপাদিত মোট মাংসের পরিমাণ দ্বিগুণ করা সম্ভব। সেদিক দিয়ে আমাদের দেশীয় ভেড়া খুবই সম্ভাবনাময় সম্পদ।
ল্যাম্ব (ভেড়ার মাংস) কেন খাবো?
আমিষের একটি সুস্থ ও নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে ল্যাম্ব বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। ল্যাম্বের গুণাগুণ নিম্নে তুলে ধরা হলো-
১. ল্যাম্ব নরম, রসালো, সুস্বাদু ও সহজে হজমযোগ্য।
২. ল্যাম্বে আমিষ ও শক্তি বেশি এবং ক্ষতিকারক চর্বি ও কোলস্টেরলের পরিমাণ কম।
৩. ল্যাম্বেসোডিয়াম, পটাশিয়াম, কপার ও ফসফরাসের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি, যা বাচ্চাদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি, টিস্যু পুনর্গঠন এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
৪. ল্যাম্বে উপস্থিত ভিটামিন-এ, ই এবং সি এন্টি অক্সিডেন্ট হিসেবে শিরা ও ধমনীতে কোলস্টেরল জমাট হতে বাধা প্রদান করে।
৫. ল্যাম্বে কনজুগেটেড লিনোলিক এসিড থাকে, যা স্তন ক্যান্সারের প্রতিরোধে লড়াই করে বলে গবেষণায় পাওয়া গেছে।
৬. মাংসে একটি এসিডের ফোলিক উৎস, যা নবজাত শিশুদের স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয়।
৭. অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে ল্যাম্ব বেশ উপকারী।
ল্যাম্ব উৎপাদনে বিবেচ্য বিষয়সমূহ
আমাদের দেশে সাধারণত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরাই ভেড়া পালন করে থাকে। বর্তমানে ভেড়ার বাণিজ্যিক খামারের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশি ভেড়ার খামারের প্রধান উৎপাদন হলো বাচ্চা বা ল্যাম্ব। ল্যাম্ব উৎপাদনের জন্য প্রধান বিবেচ্য বিষয়গুলো হলো- বাচ্চার জন্ম ওজন, ভেড়ীর দুধ উৎপাদন, বাচ্চার ওজন বৃদ্ধির হার অর্থাৎ সঠিক সময়ে সঠিক ওজন অর্জন। এ জন্য ভেড়ীর গর্ভকালীন খাদ্য ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা বিশেষ করে গর্ভাবস্থার শেষ দুই মাসের পুষ্টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সময়ে গর্ভস্থ বাচ্চার ওজন বৃদ্ধি ৮০% ঘটে। এই সময়ে অপর্যাপ্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে বাচ্চার জন্ম ওজন, পরবর্তী ওজন বৃদ্ধির হার এবং ভেড়ীর দুধ উৎপাদন কমে যায়, যা বাচ্চা মৃত্যুর অন্যতম কারণ। আবার বাচ্চা জন্মের পর মায়ের সুষম খাদ্যের ঘাটতি হলে বাচ্চার পরবর্তী ওজন বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, মায়ের দুধ উৎপাদন, সময়মতো গরম হওয়া ও গর্ভধারণ ব্যাহত হয়। ফলে খামার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই মানসম্মত ল্যাম্ব উৎপাদনে (মাংস) ভেড়ীর গর্ভাবস্থা হতে শুরু করে বাচ্চা জন্মের পর ও বাচ্চা জবাই উপযোগী হওয়া পর্যন্ত খাদ্য ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক খাদ্য ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনার সাথে সাথে উপযুক্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গুণগতমান সম্পন্ন ও নিরাপদ ল্যাম্ব (মাংস) উৎপাদন এখন সময়ের দাবি।
ল্যাম্ব উৎপাদনে স্থানীয় জাতের ভেড়া
আমাদের দেশে সাধারণত তিন ধরনের স্থানীয় জাতের ভেড়া পাওয়া যায়। তবে কিছু সংকর জাতের ভেড়াও রয়েছে। দেশে তিন ধরনের স্থানীয় জাতের ভেড়া রয়েছে। এগুলো হলো- বরেন্দ্র এলাকার ভেড়া, যমুনা নদী অববাহিকার ভেড়া, উপক‚লীয় অঞ্চলের ভেড়া। বিএলআরআই পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে এই তিন ধরনের ভেড়াই বাণিজ্যিক ল্যাম্ব উৎপাদনে উপযোগী। তবে উপক‚লীয় অঞ্চলের ভেড়া তুলনামূলকভাবে বেশি লাভজনক।
বরেন্দ্র এলাকার ভেড়া, যমুনা অববাহিকা এলাকার ভেড়া ও উপক‚লীয় অঞ্চলের ভেড়া। ল্যাম্ব উৎপাদনে বিএলআরআই দেশের প্রাণিসম্পদ বিষয়ক উচ্চতর গবেষণার একমাত্র জাতীয় প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)’ সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকেই প্রান্তিক পর্যায়ের প্রাণিসম্পদের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানের লক্ষ্যে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। মাঠ পর্যায়ের খামারিদের সমস্যা সমাধান ও প্রয়োজনীয়তার আলোকে লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য বিএলআরআই-এর নিজস্ব বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীবৃন্দের পাশাপাশি দেশ-বিদেশের স্বনামধন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও সংশ্লিষ্ট সংস্থার যৌথ উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বিএলআরআই আমাদের দেশি ভেড়া হতে লাভজনকভাবে ‘বাংলা ল্যাম্ব’ উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এই উদ্ভাবিত প্রযুক্তি দ্বারা খামারিপর্যায়ে ল্যাম্ব উৎপাদনের মাধ্যমে ভেড়ার মাংসের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিকল্পে ইতোমধ্যে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) অর্থায়নে ‘ঠধষরফধঃরড়হ মড়ড়ফ ঢ়ৎধপঃরপবং ড়ভ ড়হ ভধৎস ষধসন ঢ়ৎড়ফঁপঃরড়হ ংুংঃবস’ শীর্ষক একটি যৌথ প্রকল্প কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পটি বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুপালন অনুষদের অ্যানিমল সাইন্স বিভাগ, সোসাল প্রগ্রেস সার্ভিস (এসপিএস, এনজিও) এবং ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমল সাইন্স বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় যথাক্রমে উপক‚লীয় অঞ্চল, যমুনা অববাহিকা অঞ্চল ও বরেন্দ্র অঞ্চলে বাস্তবায়িত হচ্ছে। চলমান এই প্রকল্পের মাধ্যমে টেকসই ল্যাম্ব উৎপাদন প্রযুক্তি খামারি পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। যা নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ উৎপাদন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দেশের আর্থসামাজিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।
বিএলআরআই উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে লালন-পালন করলে একটি ল্যাম্ব ৬ মাস বয়সে প্রায় ১৫ কেজি, ৯ মাসে ২০ কেজি ও ১২ মাসে ২৪ কেজি ওজন হয়। আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে দেশি ল্যাম্বের ওজন ৬ মাস পর্যন্ত ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ে এর পর ওজন বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও তা ক্রমহ্রাসমান হারে বাড়ে। তবে ৬-৯ মাস যে কোনো বয়সেই জবাই করলে ল্যাম্ব উৎপাদন লাভজনক হয়।
বিভিন্ন বয়সে দেশি ভেড়া হতে উৎপাদিত বাংলা ল্যাম্বের পুষ্টিমান
উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতি কেজি বাংলা ল্যাম্ব (মাংস) উৎপাদনের জন্য বয়স বেঁধে (৬ হতে ৯ মাস বয়সী ল্যাম্ব) ২৮০ এবং ৪১০ টাকা খরচ হয়। বর্তমানে প্রতি কেজি ল্যাম্ব মাংসের বাজারমূল্য প্রায় ৬০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজি ল্যাম্ব উৎপাদনের মাধ্যমে একজন খামারি ১৯০-৩২০ টাকা পর্যন্ত মুনাফা অর্জন করতে পারে। অতএব, উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ল্যাম্ব উৎপাদনের মাধ্যমে লাভজনক ভেড়ার খামার পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করবে এবং গুণগত মানসম্পন্ন ও নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ সরবরাহে ভমিকা রাখবে।
ড. ছাদেক আহমেদ
ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট, সাভার, ঢাকা, মোবা :০১৭১২১৮৯২১২, ই-মেইল : Sadek_11@yahoo.com