কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ এ ০২:২৫ PM

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত বিজেআরআই মেস্তা-২ (সবজি মেস্তা-১)

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: ফাল্গুন সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-০২-২০২৬

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত বিজেআরআই মেস্তা-২ (সবজি মেস্তা-১)
কৃষিবিদ ড. এ টি এম মোরশেদ আলম
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের একটি প্রাচীনতম গবেষণা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত পাট ও পাটজাতীয় আঁশ ফসলের ৫৭টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। এসব উচ্চফলনশীল জাতের মধ্যে বিগত ১৩ বছরে প্রায় ১৪টি নতুন জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। এসব উচ্চফলনশীল পাট ও পাটজাতীয় আঁশ ফসলের জাত চাষাবাদ করে কৃষক বেশ লাভবান হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে আমি আজ মেস্তা ফসল চাষাবাদকারী একজন কৃষক/উদ্যোক্তার সাফল্যের গল্প কৃষিকথার সম্মানিত পাঠকগণের নিকট উপস্থাপন করছি।
কৃষকের নাম : মোঃ শহিদুল ইসলাম, ঠিকানা : গ্রাম-কাঁঠাল বাড়ীয়া, ডাকঘর- লক্ষ্মীপুর হাট
উপজেলা- নাটোর সদর, জেলা-নাটোর, কৃষকের মোবাইল ফোন নম্বর-০১৭৪০-৬৪৩৬২৩
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ২০৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নাটোরের সদর উপজেলা। এ উপজেলার কাঁঠালবাড়ীয়া গ্রামের সফল কৃষক মোঃ শহিদুল ইসলাম। যদিও তিনি পাট চাষাবাদের সাথে পূর্বেই পরিচিত ছিলেন কিন্তু, সম্ভাবনাময় ফসল মেস্তার চাষাবাদের বিষয়ে তার খুব একটা ধারণা ছিল না। তিনি মূলত ঔষধি গাছ-পালা চাষাবাদ করতেন। সেই সূত্র ধরে পিকেএসএফের একজন কর্মকর্তা সর্বপ্রথম তাকে বিজেআরআই কর্তৃক উদ্ভাবিত বিজেআরআই মেস্তা ২ (সবজি মেস্তা-১) চাষাবাদেও পরামর্শ দেন। অতঃপর, তিনি ২০১৭-২০১৮ ইং অর্থবছরে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের আঞ্চলিক কেন্দ্র রংপুরের সাথে যোগাযোগ করেন এবং সেখান থেকে বিজেআরআই কর্তৃক উদ্ভাবিত বিজেআরআই মেস্তা-২ (সবজি মেস্তা-১) এর ১ কেজি বীজ সংগ্রহ করেন। সংগৃহীত বীজ তিনি এক বিঘা (৩৩ শতক) জমিতে সারিতে বপন করেন। এ প্রসঙ্গে মোঃ শহিদুল ইসলাম বলেন ‘আমি এবং আমার পরিবার গত ২০ বছর যাবত ওষুধি গাছের চাষাবাদ করছি এবং আমি বা আমার পিতা কখনও মেস্তার এমন ফলন বা এমন চাহিদা দেখতে পাইনি’।
গত বছর মোঃ শহিদুল ইসলাম তিন একর জমিতে মেস্তার চাষ করেন। তিন একর অর্থাৎ ৯ বিঘা জমি থেকে জনাব শহিদুল ইসলাম ১০০০ কেজি শুকনা ক্যালিক্স পেয়েছেন অর্থাৎ বিঘাপ্রতি গড় ফলন হয়েছে প্রায় ১১১ কেজি। এ ক্ষেত্রে বিঘাপ্রতি মোট উৎপাদন খরচ হয়েছে প্রায় ৫০,০০০/- টাকা। গত বছর ১০০০ কেজি শুকনা ক্যালিক্স বিক্রয় করেছেন প্রায় ১৩,৫০,০০০/- টাকা। ৩ একর বা ৯ বিঘা জমিতে মেস্তার চাষাবাদে খরচ হয়েছে ৪, ৫০,০০০/- টাকা এবং আয় করেছেন ১৩, ৫০, ০০০/- টাকা। সুতরাং, ৩ একর বা ৯ বিঘা জমির উৎপাদিত ১০০০ কেজি শুকনা ক্যালিক্স থেকে তিনি প্রকৃত লাভ করেছেন প্রায় ৯,০০,০০০/- টাকা অর্থাৎ বিঘাপ্রতি তার নেট লাভ হয়েছে ১,০০,০০০/- টাকা।
উল্লেখ্য, গত ৭ই জানুয়ারি, ২০২৫ খ্রি. তারিখে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাগণের সমন্বয়ে গঠিত একদল গবেষকের সদস্য হিসেবে আমিও নাটোরের সেই কাঁঠালবাড়ীয়া ঔষধি গ্রাম সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। পরিদর্শনকালে মেস্তার ক্যালিক্স উৎপাদনকারী সফল কৃষক মোঃ শহিদুল ইসলামের ছোট্ট পরিসরে গড়ে তোলা মেস্তার ক্যালিক্স এবং ক্যালিক্স থেকে উৎপাদিত রোজেলা চা-এর উৎপাদন কারখানা প্রত্যক্ষ করেছি। ঐদিন সেখানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল স্থানীয় কৃষকদের নিয়ে উচ্চফলনশীল জাতের বিজেআরআই মেস্তা ২ (সবজি মেস্তা-১)-এর ওপর একটি মাঠ দিবস ও কৃষক সমাবেশ। অনুষ্ঠিত কৃষক সমাবেশে বক্তব্য রাখার সময় মেস্তার গুণাগুণ উল্লেখ করতে গিয়ে শহিদুল ইসলাম বলেন, মেস্তার এই ক্যালিক্স দিয়ে চা সদৃশ পানীয় ছাড়াও আচার, জ্যাম, জেলী, চাটনি, জুস, বার ইত্যাদি তৈরি করা সম্ভব। রোজেলা ড্রিংক্স যেমন মূল্যবান তেমনি পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ। গবেষণায় দেখা গেছে এ পানীয় পানে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে। এ ছাড়াও হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়, শরীরে ওজন কমাতে সাহায্য করে। এ পানীয় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ যা ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে সক্ষম। প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি সমৃদ্ধ রোজেলা ড্রিংক্স পিরিয়ডের ব্যথা প্রশমন করে।
আমাদের দেশে এ পানীয় নতুন হওয়ায় মানুষের কাছে এর পরিচিতি কম। ফলে এর বাজারজাতকরণে শহিদুল ইসলাম একটু প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, সরকারি সহযোগিতা পেলে এবং গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকা থাকলে খুব শিগগিরই এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারবেন। পাট ও পাটজাতীয় আঁশ ফসলের একজন গবেষক হিসেবে আমি আশাবাদী যে, ভবিষ্যতে দেশের চাহিদা মিটিয়ে রোজেলা ড্রিংক্স তৈরির উপকরণ একদিন বিদেশেও রপ্তানি হবে এবং বাংলাদেশ এ খাত থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হবে। পরিশেষে শহিদুল ইসলাম উল্লেখ করেন, রোজেলা ড্রিংক্স নিয়ে অল্প কিছুদিন কাজ করেই তিনি বেশ সফলতা পেয়েছেন। তাই, বিজেআরআই কর্তৃক উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল জাতের বিজেআরআই মেস্তা-২ (সবজি মেস্তা-১) চাষাবাদে এ অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য তিনি বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

লেখক : মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, মানিক মিয়া এভিনিউ, ঢাকা-১২০৭, মোবাইল : ০১৭৪০-৫৫৯১৫৫।

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন