কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ১০ মার্চ, ২০২২ এ ০৫:০৭ PM

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা সাফল্য এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: চৈত্র সাল: ১৪২৮ প্রকাশের তারিখ: ১০-০৩-২০২২

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা 
সাফল্য এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা 
কৃষিবিদ মোঃ রফিকুল ইসলাম১ ড. এ. টি. এম. মোরশেদ আলম২
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) দেশের অন্যতম প্রাচীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ১৯০৪ সালে স্যার আর.এস. ফিনলোর নেতৃত্বে ঢাকায় প্রথম পাটের গবেষণা শুরু হয়। অতঃপর ১৯৩৬ সালে ইন্ডিয়ান সেন্ট্রাল জুট কমিটির (ওঈঔঈ) আওতায় ঢাকায় জুট এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ দেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পাটের গবেষণা শুরু হয়। ১৯৫১ সালে ইন্ডিয়ান সেন্ট্রাল জুট কমিটির (ওঈঔঈ) স্থলে পাকিস্তান সেন্ট্রাল জুট কমিটি (চঈঔঈ)  গঠিত হয় এবং বর্তমান স্থানে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপিত হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৪ সালে অ্যাক্টের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই)। বর্তমানে বিজেআরআই তিনটি ধারায় গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে : (১) পাটের কৃষি তথা পাট ও পাটজাতীয় আঁশ ফসলের উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা এবং বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ সংক্রান্ত গবেষণা; (২) পাটের কারিগরি তথা মূল্য সংযোজিত বহুমুখী নতুন নতুন পাট পণ্য উদ্ভাবন এবং প্রচলিত পাট পণ্যের মানোন্নয়ন সংক্রান্ত গবেষণা এবং (৩) পাটের টেক্সটাইল অর্থাৎ পাট এবং তুলা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম আঁশের সংমিশ্রণে পাটজাত টেক্সটাইল পণ্য উৎপাদন সংক্রান্ত গবেষণা এবং বাজারজাতকরণ ব্যবস্থাপনা। 

বর্তমানে বিজেআরআই এর কৃষি গবেষণায় ৬টি, কারিগরি গবেষণায় ৫টি, জুট টেক্সটাইল গবেষণায় ১টি এবং পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও যোগাযোগ উইং-এ ১টিসহ মোট ১৩টি বিভাগ রয়েছে। এ ছাড়াও কৃষকদের সময় উপযোগী চাহিদা ও প্রয়োজন মোতাবেক পাটের অঞ্চল ভিত্তিক কৃষি গবেষণার জন্য মানিকগঞ্জে পাটের কেন্দ্রীয় কৃষি পরীক্ষণ স্টেশন এবং রংপুর, ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ ও চান্দিনায় (কুমিল্লা) চারটি আঞ্চলিক পাট গবেষণা কেন্দ্র এবং তারাবো (নারায়ণগঞ্জ), মনিরামপুর (যশোর) ও কলাপাড়ায় (পটুয়াখালী) তিনটি পাট গবেষণা উপকেন্দ্র এবং নশিপুরে (দিনাজপুর) একটি পাট বীজ উৎপাদন ও গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। উল্লেখ্য যে, পাট, কেনাফ ও মেস্তা ফসলের দেশী-বিদেশী বীজ সংরক্ষণ ও উন্নত জাত উদ্ভাবনে গবেষণা কাজে ব্যবহারের জন্য বিজেআরআইতে একটি জিন ব্যাংক রয়েছে। এ জিন ব্যাংকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত পাট ও সমগোত্রীয় আঁশ ফসলের প্রায় ৬০০০-এর অধিক জার্মপ্লাজম সংরক্ষিত আছে। সম্প্রতি বিজেআরআই           কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন “পাট বিষয়ক মৌলিক ও ফলিত গবেষণা” প্রকল্পের অর্থায়নে গবেষণার মাধ্যমে জীব প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশি ও তোষা পাট এবং ধৈঞ্চার জিনোম সিকুয়েন্স উন্মোচন করে গবেষণার উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করা হয়েছে, যা  বিশ্বে বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে। 
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট এর রূপকল্প, অভিলক্ষ্য এবং কার‌্যাবলী 
রূপকল্প : পাটের গবেষণা ও উন্নয়নে উৎকর্ষ অর্জন। 

অভিলক্ষ্য : পাটের কৃষি ও কারিগরি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও হস্তান্তরের মাধ্যমে কৃষক ও পাট সংশ্লিষ্ট উপকারভোগীদের উপার্জন বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন এবং পরিবেশ রক্ষা করা।  
উদ্দেশ্য ও কার‌্যাবলী : পাট ও সমশ্রেণির আঁশ ফসলের কৃষি, কারিগরি ও অর্থনৈতিক গবেষণা নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন ও পরিচালনা এবং আঁশজাত ফসল উৎপাদন এবং গবেষণার ফলাফল সম্প্রসারণ; উন্নতমানের কৌলিতাত্ত্বিক বিশুদ্ধতা বজায় রেখে পাট বীজ উৎপাদন, পরীক্ষণ, সরবরাহ, পরিচালন এবং সীমিত আকারে উন্নতমানের পাটবীজ উৎপাদন ও সংগ্রহ এবং বোর্ড কর্তৃক নির্বাচিত চাষি, স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান এবং অনুমোদিত এজেন্সির নিকট বিতরণ করা; পাট ও সমশ্রেণির আঁশ ফসল, পাটজাত পণ্য ও আনুষঙ্গিক বিষয়ে গবেষণার লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন; পাটের সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত নুতন জাতের পাট প্রদর্শন (উবসড়হংঃৎধঃরড়হ) এবং উক্ত জাতের পাট চাষাবাদের জন্য  কৃষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ; প্রবন্ধ (সড়হড়মৎধঢ়য), বুলেটিন এবং পাট গবেষণা সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনা প্রকাশ ও প্রচার; পাট ও সমশ্রেণির আঁশ ফসল চাষের উন্নত পদ্ধতি সম্পর্কে ইনস্টিটিউটের কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ প্রদানসহ পাট সংক্রান্ত কারিগরি গবেষণার ফলাফল ও উহার ব্যবহার সম্পর্কে পাট ও পাটপণ্য উৎপাদন সংশ্লিষ্ট সুফলভোগীদের প্রশিক্ষণ প্রদান; জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সংগঠনসমূহের সহযোগিতায় গবেষণা কর্মসূচি গ্রহণ করা। 
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের উল্লেখযোগ্য সাফল্য

উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন :  বিজেআরআই প্রতিষ্ঠার পর থেকে মোট ৫৩টি পাট ও পাটজাতীয় আঁশ ফসলের উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন ও অবমুক্ত করা হয়েছে। তন্মধ্যে বর্তমানে ২৪টি (১১টি দেশি পাট, ৮টি তোষা পাট, ৩টি কেনাফ ও ২টি মেস্তা) উন্নত জাত বর্তমানে কৃষকপর্যায়ে চাষাবাদের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশকৃত এই ২৪টি উচ্চফলনশীল জাতের মধ্যে বর্তমান সরকারের সময়কালে ১৩টি জাত (দেশি পাটের-৬টি, তোষা পাটের-৩টি, কেনাফের-২টি এবং মেস্তার-২টি) উদ্ভাবিত হয়েছে। 

পাটের জীবন রহস্য (এবহড়সব ংবয়ঁবহপরহম) উন্মোচন : পাট বিষয়ক মৌলিক ও ফলিত গবেষণার সঙ্গে জড়িত বিজ্ঞানীরা ২০১০ সালে তোষা পাটের, ২০১২ সালে পাটসহ পাঁচশতাধিক ফসলের ক্ষতিকারক ছত্রাক গধপৎড়ঢ়যড়সরহধ চযধংবড়ষরহধ এবং ২০১৩ সালে দেশি পাটের জিনোম সিকুয়েন্স উন্মোচন করেছেন। (এ ছাড়া জিনোম গবেষণায় জড়িত বিজ্ঞানীরা ২০১৮ সালে ধৈঞ্চার (ঝবংনধহরধ নরংঢ়রহড়ংধ) জীবন নকশা উন্মোচন অর্থাৎ জিনোম সিকুয়েন্সিং সম্পন্ন করিয়া ইহার জিনসমূহ শনাক্ত করিতে সক্ষম হয়েছেন। ধৈঞ্চার জিনোম গবেষণার মূল লক্ষ্য হচ্ছে বিভিন্ন ফসল উৎপাদনে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমানো। বায়ুম-লে থাকা ৭৬ ভাগ নাইট্রোজেন প্রচলিত ফসল সরাসরি গ্রহণ করতে পারে না। কিন্তু দেশে প্রাচীনকাল হইতে সবুজ সার হিসাবে ব্যবহৃত ধৈঞ্চার শিকড় ও কা-ে এক ধরনের নডিউল বা গুটি তৈরি হয় যাতে বসবাসকারী ব্যাকটেরিয়া বায়ুম-লের নাইট্রোজেন সঞ্চয়পূর্বক গাছকে সরবরাহ করে। ধৈঞ্চার এই বৈশিষ্ট্য অন্যান্য ফসলে প্রয়োগের লক্ষ্যে ধৈঞ্চার জিনোম সিক্যুয়েন্স গবেষণা কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের কৃষি উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য পূরণে এবং রাসায়নিক সার এবং কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এ গবেষণা অবদান রাখতে পারবে বলে আশা করা যায়)। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে আর্বিভূত করোনা ভাইরাসের ৭টি স্ট্রেইনের জিনোম তথ্য উন্মোচন করা হয়েছে যা ভেক্সিন তৈরি এবং ড্রাগ ডিজাইনে ব্যবহার করা যাবে।

লবণাক্ততাসহিষ্ণু পাট জাতের সম্প্রসারণ : বিজেআরআই উদ্ভাবিত ‘বিজেআরআই দেশি পাট-৮’ কে দক্ষিণাঞ্চলের ৬টি জেলার ৬টি উপজেলায় গত ৪ বছর চাষাবাদে কৃষক ব্যাপক সফলতা পেয়েছে। ফলে উপকূলীয় এলাকার বিস্তর এক ফসলি জমিতে ২টি ফসল আবাদ করা যাবে। এতে ওই এলাকার কৃষক অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে।

প্রযুক্তি উদ্ভাবন : বিগত তেরো বছরে ৭৫টি কৃষি প্রযুক্তি এবং ৪০টি শিল্প প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। পাটভিত্তিক চার ফসলি শস্যবিন্যাস (আলু-পাটশাক-পাট-রোপা আমন) প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে যা ব্যবহার করে কৃষক অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। সম্প্রতি লবণাক্ততাসহিষ্ণু পাটের জাত ‘বিজেআরআই দেশি পাট-১০’ উদ্ভাবন করা হয়েছে। চাহিদাভিত্তিক পাট পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে কম লিগনিন যুক্ত পাট জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে ল্যাবরেটরি ও মাঠপর্যায়ে গবেষণা কাজ অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া স্বল্পমূল্যের হালকা পাটের শপিং ব্যাগ,প্রাকৃতিক উৎস হতে রং আহরণ করে পাটপণ্য রঞ্জন পদ্ধতি, পাটজাত শোষক তুলা, অগ্নিরোধী পাটবস্ত্র ইত্যাদিসহ ৬টি নতুন পাট পণ্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন করা হয়েছে। উদ্ভাবিত প্রযুক্তিসমূহ সম্প্রসারিত হলে পাটের ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে। জেটিপিডিসি উইং এর মাধ্যমে এ পর্যন্ত কটন কাউন্টের ১০, ১২, ১৫, ১৬, ২০, ২২ কাউন্ট পর্যন্ত মিহি সুতা উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়েছে, যা দিয়ে বিভিন্ন ধরনের কাপড় যেমন- শার্টের কাপড়, স্যুটের কাপড়, পাঞ্জাবির কাপড় এবং অন্যান্য পণ্য তৈরি করা হচ্ছে। 
প্রযুক্তি হস্তান্তর : পাট আঁশ ও বীজ উৎপাদন, রিবন রেটিং পদ্ধতি ও অন্যান্য কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণের জন্য ৩০৩৫০ (ত্রিশ হাজার তিনশত পঞ্চাশ) জন পাটচাষি, ৭৫৫০ জন কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী, ১২০০ জন কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাকে এবং এছাড়া মানসম্পন্ন পাটপণ্য উৎপাদন, রঞ্জন, ডিজাইন ইত্যাদি প্রযুক্তি সম্প্রসারণের জন্য ৩০০০ (তিন হাজার) জন পাটপণ্য উৎপাদন কর্মী এবং ৩০০ জন উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।
উন্নয়ন কর্মকা- বাস্তবায়ন : জিনোম গবেষণার জন্য বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউ কর্তৃক বাস্তবায়িত ‘পাট বিষয়ক মৌলিক ও ফলিত গবেষণা’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি অত্যাধুনিক বায়োটেকনোলজি ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়েছে। উক্ত ল্যাবরেটরিতে জিনোম গবেষণার উপযুক্ত জনশক্তি উন্নয়ন ও ডাটাবেইজ ইতোমধ্যে সমৃদ্ধ করা হয়েছে। এই ল্যাবরেটরিতে পাট ছাড়াও অন্যান্য ফসলের জিনোমভিত্তিক গবেষণা কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে এবং এর সুফল কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারিত হইলে বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। 
পাট, কেনাফ ও মেস্তার প্রজনন বীজ এবং মানঘোষিত বীজ (ঞখঝ) উৎপাদন ও বিতরণ : বিগত তেরো বছরে পাট, কেনাফ ও মেস্তার ২১,৮৫০ কেজি প্রজনন বীজ উৎপাদন এবং বিএডিসিসহ অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিতরণ করা হয়েছে এবং গত ১৩ বছরে প্রায় ৮৫ টন মানঘোষিত বীজ (ঞখঝ) উৎপাদন করিয়া  কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। এই কার্যক্রম দেশের পাট বীজের ঘাটতি মোকাবিলায় ভূমিকা পালন করেছে।
পাটের কৃষি প্রযুক্তি এবং বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন প্রযুক্তি হস্তান্তরের লক্ষ্যে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর : পাটের বহুমুখী ব্যবহার সংক্রান্ত প্রযুক্তি এবং পাটের কৃষি প্রযুক্তি হস্তান্তরের লক্ষ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও এবং শিল্পোদ্যোক্তাদের সাথে ৯টি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে যা বাণিজ্যিকভাবে পাটপণ্য উৎপাদনে এবং পাটের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করিয়া পরিবেশ উন্নয়ন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ভূমিকা রাখবে।
কৃষককে সহায়তা প্রদানকারী অন্যান্য কার্যক্রম

বিগত ১৩ বছরে সারা দেশে ৬২৬টি জুট ব্লক প্রদর্শনীর মাধ্যমে নতুন উদ্ভাবিত জাতসমূহের মাঠ পর্যায়ে উৎপাদনশীলতা এবং  কৃষক পর্যায়ে পরিচিতি এবং সম্প্রসারণের জন্য কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। বিজেআরআই কর্তৃক উদ্ভাবিত পাট ও সমজাতীয় আঁশ ফসলের নতুন জাতসমূহকে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত বিজেআরআই এর আঞ্চলিক ও উপকেন্দ্রের মাধ্যমে বিগত ১৩ বছরে ২৬৩৩৩টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপন উপলক্ষ্যে বিজেআরআই-এর বিভিন্ন আঞ্চলিক ও উপকেন্দ্রের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাট চাষিদের মাঝে ১৯৯০ কেজি বীজ বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। 

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের ভিশন-২০২১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

পাটের কৃষি গবেষণায় : পরিবর্তিত জলবায়ু ও কৃষি ব্যবস্থার আলোকে গবেষণা পরিচালনা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন; প্রচলিত ও জীবপ্রযুক্তির মাধ্যমে স্বল্পজীবন কালে সম্পন্ন, প্রতিকূল (বায়োটিক ও এ্যবায়োটিক) পরিবেশ উপযোগী, অধিক ফলন ও মানসম্পন্ন জাত উদ্ভাবন; পাট, কেনাফ ও মেস্তা জাতীয় ফসলের উৎপাদন ব্যবস্থাপনার গবেষণা, বীজ সংক্রান্ত গবেষণা পরিচালনা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ; জিনব্যাংকে সংরক্ষিত জার্মপ্লাজমসমূহের অংগসংস্থানিক এবং মলিকুলার বৈশিষ্ট্যায়ন, ডকুমেন্টেশন ও ব্যবস্থাপনা। দেশের চাহিদামাফিক প্রজনন বীজ উৎপাদন এবং দেশের  পাট বীজ ঘাটতি মোকাবিলায় সীমিতপর্যায়ে পাট বীজ উৎপাদন ও কৃষকদের মাঝে বিতরন। দেশের সমগ্র পাট চাষকৃত এলাকায় উদ্ভাবিত প্রযুক্তি সম্প্রসারণের জন্য প্রশিক্ষণ আয়োজন, নুতন কেন্দ্র স্থাপন ও অপ্রচলিত এলাকায় পাট চাষ সম্প্রসারণ করা। 

পাটের কারিগরি গবেষণার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা : বর্তমান চাহিদার প্রেক্ষিতে নব নব বহুমুখী পাট জাতীয় পণ্য উৎপাদনের প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং উদ্ভাবিত প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণে সহায়তা প্রদান; প্রচলিত পাট পণ্যের মান উন্নয়ন এবং পাট পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া সহজীকরণের জন্য জুট মিলসমূহের যন্ত্রপাতির মান উন্নয়ন সংক্রান্ত প্রযুক্তি উদ্ভাবন; পাটের সূক্ষ¥ বা চিকন সুতা উৎপাদনের প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং প্রচলিত বহুমুখী পাট জাত পণ্যের মান উন্নয়নপূর্বক উৎপাদন খরচ হ্রাস। পাট আঁশ, পাট সুতা এবং পাটের কাপড়ের রঙ রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা। জুটস্পিনিং পদ্ধতিতে অর্থাৎ শুধু জুট প্রসেসিং মেশিন ব্যবহার করে পাট ও উল (ভেড়ার পশম) মিশ্রিত সুতা তৈরি করে ব্যাপকভাবে শীতবস্ত্র (কম্বল) ও অন্যান্য পাটপণ্য উৎপাদন করা। হালকা এবং স্বল্পমূল্যের জুট কম্পোজিট উদ্ভাবন এবং বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল ও আসবাবপত্রের কাঁচামাল হিসাবে এর বাণিজ্যিক ব্যবহারের প্রযুক্তি উদ্ভাবন। প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করে পাট ও পাট বস্ত্র রঞ্জিত করে মূল্য সংযোজিত পাটজাত পণ্য উৎপাদনের পদ্ধতি উদ্ভাবন করা। 
জেটিপিডিসি উইংয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা : পাটের সাথে তুলা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম আঁশের সংমিশ্রণে টেক্সটাইল পণ্য উৎপাদনের উপযোগী সুতা উদ্ভাবন এবং উদ্ভাবিত প্রযুক্তি দ্বারা তৈরি প্রোডাক্টের বাণিজ্যিকীকরণে সহায়তা প্রদান; আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক টেস্টিং ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠাকরণ; যন্ত্রপাতির আধুনিকায়ন এবং উন্নতকরণ করা।

বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাজারে পাটের মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে এবং কৃষকরা পাটের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে। ফলে কৃষক আবার পাট চাষে উৎসাহিত হচ্ছে এবং আবাদি জমির পরিমাণ ও ফলন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাট আগামীতে ব্যবহারিক ও পরিবেশ রক্ষায় বহুল ব্যবহারের মাধ্যমে ডায়মন্ড তন্তু হিসেবে বিশ্বে সমাদৃত হবে বলে বিজেআরআই বিশ্বাস করে। 

লেখক : ১মহাপরিচালক, বিজেআরআই, ২মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও যোগাযোগ বিভাগ বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭৪০৫৫৯১৫৫, ই-মেইল :morshedbjri@gmail.com 

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন