কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ এ ১১:৪০ AM

বাংলাদেশে মৌমাছির প্রজাতিগত বৈচিত্র্য

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: ফাল্গুন সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৬-০২-২০২৬

বাংলাদেশে মৌমাছির প্রজাতিগত বৈচিত্র্য
মো. এলমুর রেজা১ ড. মো. আতাউর রহমান২
মৌমাছি এক ধরনের সামাজিক ও উপকারী পতঙ্গ। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এবং কৃষি ফসলের উৎপাদন (৮০-৮৫%) বৃদ্ধিতে মৌমাছির গুরুত্ব অপরিসীম। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ২০ হাজার মৌমাছি পাওয়া যায় এবং প্রতিটি দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ অনুযায়ী মৌমাছির প্রজাতিতে ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশ একটি নদীবিধৌত, উর্বর ও জলবায়ুতে বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ। যেখানে প্রচুর প্রাকৃতিক ফুল উৎপাদক গাছপালা রয়েছে। এই পরিবেশে বিভিন্ন প্রজাতির মৌমাছির বসবাস ও বংশবিস্তার ঘটে। বর্তমানে বাংলাদেশে স্থানীয় ও বিদেশি মিলিয়ে বেশ কয়েকটি প্রজাতির মৌমাছি পাওয়া যায়। যাদের প্রজাতিগত বৈচিত্র্য আমাদের পরিবেশ, কৃষি এবং অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশে বিদ্যমান মৌমাছির প্রজাতিগুলোর পরিচয়, বৈশিষ্ট্য, আবাসস্থল, গুরুত্ব এবং সংরক্ষণ প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করা হলো।
বাংলাদেশে মৌমাছির প্রজাতিসমূহ
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রধানত পাঁচটি মৌমাছি প্রজাতি পাওয়া যায়। এরা হলো :
এপিস ডরসাটা - বন্য মৌমাছি
এপিস ফ্লোরিয়া - ক্ষুদে মৌমাছি
এপিস সেরেনা - এশিয়া মহাদেশীয় মৌমাছি
এপিস মেলিফেরা - ইউরোপীয় মৌমাছি
ট্রাইগোনা প্রজাতি - পিপীলিকা মৌমাছি / হুলবিহীন মৌমাছি
এপিস ডরসাটা (বন্য মৌমাছি)
এই প্রজাতির মৌমাছি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আকারের প্রজাতি। এদের উৎপত্তি এশিয়া মহাদেশে। এরা হিং¯্র প্রকৃতির এবং খোলামেলা জায়গায় বসবাস করে সাধারণত গাছের ডালে, ঘরের কার্নিশে, উঁচু স্থানে, বনে, উঁচু গাছের ডালে বা পর্বতের খাদে এককভাবে বড় আকারের চাক তৈরি করে। এই মৌমাছিকে পোষ মানানো যায় না, এরা বন্য পরিবেশে বসবাস করে এবং বছরের নির্দিষ্ট মৌসুমে (মার্চ-জুন) বেশি মাত্রায় মধু সংগ্রহ করা হয়। বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলে এদের আধিক্য রয়েছে তবে অন্যান্য অঞ্চলেও এদেরকে দেখা যায়। এদের মধু সুস্বাদু এবং পুষ্টিগুণে ভরপুর হলেও, এদের থেকে মধু সংগ্রহ ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্টের ঝুঁকি থাকে।
এপিস ফ্লোরিয়া (ক্ষুদে মৌমাছি)
এদের উৎপত্তি এশিয়া মহাদেশে। এই প্রজাতির মৌমাছি আকারে ছোট এবং এরা গাছের ডালে ছোট ও খোলা চাক তৈরি করে। এদেরকে ক্ষুদে মাছি বলা হয়। শান্ত প্রকৃতির এবং ছায়াযুক্ত শুষ্ক জায়গায় এরা বসবাস করে। ঝোপ ঝাড়ে , পুরাতন বাক্স এবং আলমারিতে বসবাস করে থাকে। ক্ষুদে মৌমাছির জীবনচক্র তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত এবং এদের মধু উৎপাদন ক্ষমতাও সীমিত। তবে এদের প্রাকৃতিক উদ্ভিদে পরাগায়নে ভূমিকা রয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় গাছপালা সমৃদ্ধ পরিবেশে এদের বেশি দেখা যায়।
এপিস সেরেনা (এশিয়া মহাদেশীয় মৌমাছি)
বাংলাদেশে বাক্সে পালনযোগ্য দেশি মৌমাছি হিসেবে এপিস সেরেনা অন্যতম। এদের উৎপত্তি এশিয়া মহাদেশে। এরা শান্ত প্রকৃতির এবং ছায়াযুক্ত শুষ্ক জায়গায় বসবাস করে। মাটির গর্তে, পুরাতন বিল্ডিংয়ের ফাটলে, মাচার নিচে এবং আলমারিতে বসবাস করে থাকে। সহজেই পোষ মানানো সম্ভব। এদের মধু উৎপাদন ক্ষমতা মধ্যম মানের হলেও, রক্ষণাবেক্ষণ সহজ এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তুলনামূলক বেশি।
এপিস মেলিফেরা (ইউরোপীয় মৌমাছি)
এই প্রজাতিটি ইউরোপ এবং আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে আনা হয়েছে। এদের উৎপত্তি ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশে। বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে সফলভাবে চাষাবাদ করা হচ্ছে এই প্রজাতির মৌমাছি কারণ এদের মধু উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেশি (গড়ে প্রতি মৌবক্সে প্রায় ৫৩ কেজি/মৌসুম)। তবে এরা রোগপ্রবণ এবং দেশীয় জলবায়ুতে টিকে থাকতে কিছুটা অসুবিধায় পড়ে। তাই এদের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত খামারিদের দ্বারা পরিচর্যা ও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন হয়। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা এই প্রজাতির মৌমাছি ব্যবহার করে বাণিজ্যিক খামার পরিচালনা করছে।
ট্রাইগোনা প্রজাতি (পিপীলিকা মৌমাছি / হুলবিহীন মৌমাছি)
এরা খুবই ছোট এবং হুল না থাকায় হুল ফুটাতে পারে না, তাই ‘হুলবিহীন মৌমাছি’ নামে পরিচিত। এদের মধু পরিমাণে কম হলেও অত্যন্ত ঔষধিগুণসম্পন্ন এবং উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। ট্রাইগোনা মৌমাছি সাধারণত মাটির গর্ত, পুরাতন গাছ বা দেয়ালের ফাঁকে বাসা বাঁধে। এদের পালন এখনও সীমিত হলেও গবেষণা মাধ্যমে এদের সম্ভাবনা মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
পাঁচটি মৌমাছি প্রজাতির বাৎসরিক মধু উৎপাদন ক্ষমতা এবং উপযোগী এলাকা
মৌমাছির বর্ণনা :
া অঢ়রং ফড়ৎংধঃধ প্রজাতির মৌমাছি পুরোপুরি বন্য ও প্রাকৃতিক। একটি বড় চাক থেকে বছরে ২০-৪০ কেজি মধু পাওয়া যায়, তবে একাধিক চাক থাকলে মোট সংগ্রহ অনেক বেশি হতে পারে। এই প্রজাতি সুন্দরবনের বনাঞ্চলে বেশি দেখা যায়।
া অঢ়রং ভষড়ৎবধ ছোট প্রজাতি হওয়ায় এদের মধু সংগ্রহ সামান্য, তবে সহজে বাসা তৈরি করে এবং পরিবেশগত উপকার করে থাকে। বাড়ির পাশে গাছ বা ঝোপঝাড়যুক্ত এলাকায় সহজেই বাসা বাঁধে।
া অঢ়রং পবৎধহধ হলো দেশি প্রজাতি যাদের মধু উৎপাদন মাঝারি, তবে বাংলাদেশি জলবায়ুতে টিকে থাকার ক্ষমতা বেশি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো এবং চাষে সুবিধাজনক। গ্রামীণ এলাকায় সহজে পালনযোগ্য।
া অঢ়রং সবষষরভবৎধ প্রজাতি অধিক উৎপাদনক্ষম হলেও রক্ষণাবেক্ষণে যতেœর প্রয়োজন বেশি। এরা দেশের মধ্য ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে (যেখানে মৌসুমি ফুল ও ফসলের প্রাচুর্য রয়েছে) বেশি উপযোগী। সরিষা বা লিচু ফুল মৌসুমে এরা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় (মাইগ্রেটরি বক্স সিস্টেমে)।
া ঞৎরমড়হধ ংঢ়ঢ়. বা পিপীলিকা মৌমাছি বর্তমানে সীমিতভাবে পালন হচ্ছে। মধু উৎপাদন কম হলেও এদের মধু উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। এরা বাসা বানায় মাটির গর্ত, পুরনো গাছ বা দেয়ালে। পার্বত্য ও বনজ এলাকায় এদের বেশি পাওয়া যায়।
প্রজাতিগত বৈচিত্র্য ও কৃষি-পরিবেশে প্রভাব
া মৌমাছি শুধু মধু উৎপাদনের জন্যই গুরুত্ব¡পূর্ণ নয়; এরা পরিবেশ ও কৃষির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। মৌমাছির পরাগায়ন কার্যকলাপ ফসল উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে। যেমন: সরিষা, তরমুজ, বাঙ্গি, লিচু, পেয়ারা, টমেটো, কালিজিরা, ধনিয়া, মিষ্টিকুমড়া ইত্যাদি ফসলে মৌমাছির পরাগায়ন কার্যক্রম ফসলের গুণগত মান ও উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশে সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে মৌমাছি পরাগায়নের মাধ্যমে সরিষা ফসলে প্রায় ২৬.৪৩% উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে। এ ছাড়া মৌমাছি জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে, কারণ এরা বিভিন্ন গাছপালার পরাগ সংযোজনে সহায়তা করে, যা পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।
া বাংলাদেশে মৌমাছির প্রজাতিগত বৈচিত্র্য কৃষির জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। দেশি প্রজাতির মৌমাছি যেমন এপিস সেরেনা প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় সক্ষম এবং স্থানীয় ফুল-ফসলের সঙ্গে মানানসই। অপরদিকে, এপিস মেলিফেরা মধু উৎপাদনে অত্যন্ত কার্যকর হলেও পরিবেশ সংবেদনশীল। তাই দুই প্রজাতির মৌমাছির মধ্যে ভারসাম্য রেখে পালন এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা জরুরি।
সংরক্ষণ, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বাংলাদেশে মৌমাছির বৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন সচেতনতা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও পরিবেশবান্ধব নীতিমালা। বর্তমানে মৌমাছি সংরক্ষণের বড় বাধা হলো: বন উজাড়, কীটনাশক ব্যবহারে মৌমাছির মৃত্যু, জলবায়ু পরিবর্তন, এবং উপযুক্ত স্থান সংকট। কীটনাশক যেমন ক্লোথিয়ানিডিন, ইমিডাক্লোপ্রিড ইত্যাদি মৌমাছির জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করে। এছাড়া অজ্ঞতার কারণে মানুষ অনেক সময় মৌচাক ধ্বংস করে ফেলে, যা প্রাকৃতিক মৌ প্রজাতির জন্য হুমকি সৃষ্টি করে। সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইঝজও) মৌমাছি নিয়ে গবেষণা ২০১৯ সাল থেকে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বিদেশি প্রজাতির পাশাপাশি দেশি প্রজাতির মৌমাছির উন্নত জাত তৈরি, রোগ প্রতিরোধ গবেষণা ও খামারিদের প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি পেলে মৌমাছি পালন বাংলাদেশের কৃষি ও অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে।
ভবিষ্যতে মধু ও মৌচাষ পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি, শহরাঞ্চলে ছাদবাগান ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য মৌমাছি পালন সম্ভাবনাময়। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মৌমাছি সংক্রান্ত শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করলে তরুণ প্রজন্ম এই ক্ষেত্রে আগ্রহী হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশে মৌমাছির প্রজাতিগত বৈচিত্র্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ, যা আমাদের পরিবেশ, কৃষি এবং অর্থনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। দেশি ও বিদেশি প্রজাতির মৌমাছিগুলোর বৈচিত্র্য আমাদের মধু উৎপাদন, পরাগায়ন কার্যক্রম এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ভূমিকা রাখে। এই সম্পদকে টিকিয়ে রাখতে হলে মৌমাছির আবাসস্থল রক্ষা, পরিবেশবান্ধব কৃষি চর্চা এবং আধুনিক মৌচাষ প্রযুক্তির প্রসার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা এবং শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে মৌমাছির প্রজাতিগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়ন সম্ভব। একটি টেকসই পরিবেশ, খাদ্য নিরাপত্তা এবং দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে মৌমাছির গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

লেখক : ১ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ২পরিচালক (গবেষণা), বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী-৬৬২০, পাবনা। মোবাইল : ০১৭১৭৭৩৬২১২;

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন