কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২২ এ ০৭:৫০ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: ফাল্গুন সাল: ১৪২৮ প্রকাশের তারিখ: ০৯-০২-২০২২
বরেন্দ ও খরাপ্রবন এলাকায় বসতবাড়ির পুকুরে সমন্বিত মৎস্য চাষ
ড. মোহাঃ সাইনার আলম
বাংলাদেশ বিশ্বে একটি নেতৃস্থানীয় মৎস্য উৎপাদনশীল দেশ। বিশেষত বিগত দুই দশকে মৎস্য উৎপাদনে লক্ষণীয় অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে রুইজাতীয় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া, কৈ, শিং-মাগুর ও পাবদা-গুলশা মাছের উৎপাদনে এক নীরব বিপ্লব সাধিত হয়েছে। দেশে পুকুর-দীঘিতে হেক্টর প্রতি বার্ষিক গড় উৎপাদন ৫.০ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু বরেন্দ্র অঞ্চলটি একটি অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাদপদ ও পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে পরিগণিত হওয়ায় মাছচাষের ঈপ্সিত সম্প্রসারণ হয়নি বলেই এসব এলাকার পুকুরের উৎপাদনশীলতায় প্রতীয়মান হয়। এ এলাকায় হেক্টর প্রতি বার্ষিক গড় উৎপাদন ৪.০ মেট্রিক টন। তবে পুকুর-দীঘিতে সমৃদ্ধ বরেন্দ্র এলাকায় লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে হেক্টরপ্রতি মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে পারিবারিক পুষ্টিচাহিদা পূরণ ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। মৎস্যচাষে ঈপ্সিত উন্নয়নে সরকার গৃহীত অন্যান্য পদক্ষেপের পাশাপাশি বসতবাড়ির পুকুরে সমন্বিত মাছ চাষ সম্প্রসারণ হতে পারে একটি লাগসই প্রযুক্তি।
বরেন্দ্র এলাকায় অধিকাংশ চাষির বাড়ির আশেপাশে এবং রাস্তার ধারে অসংখ্য ছোট-বড় পুকুর-ডোবা রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায় বরেন্দ্র এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশ পুকুর বসতবাড়ির পাশে অবস্থিত। এ সব মৌসুমী পুকুর-ডোবা বা জলাশয়ে বছরে গড়ে ৫-৭ মাস পানি থাকে এবং গড় গভীরতা ৪-৬ ফুট। বসতবাড়ি সংলগ্ন অধিকাংশ পুকুরের উৎপত্তি মূলত বাড়ি তৈরির উদ্দেশ্যে সৃষ্ট গর্ত থেকে। তা ছাড়া খরা প্রবণ এলাকা হওয়ায় এতদাঞ্চলের অধিকাংশ পরিবার এসব পুকুর-ডোবার পানি গৃহস্থালির বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে থাকে। বিগত দুই দশকে মৎস্য অধিদপ্তরাধীন বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও কর্মসূচির মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন ও সম্প্রসারণমূলক কার্যক্রম গ্রহণের ফলে বর্তমানে অধিকাংশ জলাশয়ে মাছচাষ অগ্রসরমান রয়েছে।
পারিবারিক বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদের (যেমন- পুকুর-ডোবা, শস্য ক্ষেত, শাকসবজির ক্ষেত, গবাদি পশু-পাখি, ফলমূল ও বনজ গাছ, ইত্যাদি) সমন্বয় ঘটিয়ে বসতবাড়ি সংলগ্ন ছোট-বড় পুকুরে কার্পজাতীয় মাছ ও অধিক পুষ্টিগুণ সম্পন্ন ছোট মাছের মিশ্রচাষ করা যায়। এর ফলে পারিবারিক স¤পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয়, তুলনামূলকভাবে কম খরচে মাছ উৎপাদন করা যায় এবং পুকুর ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণে পরিবারের সকল কর্মক্ষম সদস্যগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। সমন্বিত ও পরিবেশবান্ধব মৎস্যচাষ ব্যবস্থাপনা দেশীয় ছোট মাছের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অনন্য ভূমিকা রাখে।
বরেন্দ্র ও খরা প্রবণ এলাকায় দেশীয় প্রজাতির ছোট মাছ ও দ্রুত বর্ধনশীল জাতের চাষ ব্যবস্থাপনা বেশ উপযোগী ও লাগসই প্রযুক্তি হিসেবে ইতোমধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। কম বিনিয়োগ ও স্বল্প সময়ে ফলাফল প্রাপ্তি এসব প্রযুক্তি সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। বসতবাড়ির পুকুরে কার্পের সাথেও দেশীয় ছোট মাছ চাষ করা যায়। এসব এলাকার জন্য লাগসই মাছ চাষ পদ্ধতিসমূহ হলো- কার্পজাতীয় মাছের মিশ্রচাষ; কার্প ও ছোট মাছের মিশ্রচাষ ; দেশীয় প্রজাতির ছোট মাছের চাষ (শিং-মাগুর, গুলশা-টেংরা, পাবদা, গলদা চিংড়ি, মলা-ঢেলা, ইত্যাদি); দ্রুত বর্ধনশীল তেলাপিয়া, কার্পিও, সরপুঁটি ও বাটা মাছের চাষ ; পাঙ্গাশ ও কৈ মাছের চাষ; কার্প জাতীয় মাছের পোনা উৎপাদন; বসতবাড়ির পুকুরে সমন্বিত মাছ চাষ ইত্যাদি।
ছোট মাছের বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে মলা, ঢেলা, দারকিনা, ইত্যাদি মাছে অধিক পরিমাণে অনুপুষ্টি বিদ্যমান। ছোট মাছের মাথা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও হাড় ক্যালসিয়াম, ভিটামিন এ, আয়রন ও জিঙ্ক সমৃদ্ধ এবং মাছের পুরোটা খাওয়া হয় বিধায় অনুপুষ্টি বেশি পাওয়া যায়। বসতবাড়ির পুকুরে কার্প-ছোট মাছের মিশ্রচাষে ৫-৭ মাসে প্রতি শতাংশে ১৪-২০ কেজি মাছ পাওয়া সম্ভব। পারিবারিক চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত মাছ বিক্রি করে পারিবারিক আয় বৃদ্ধি করা যায়। মনে রাখবেন, মাছ চাষের ক্ষেত্রে একটি আদর্শ পুকুরের বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো- আয়তকার পুকুর, পানির বর্ণ সবুজাভ বা বাদামি সবুজ, দো-আঁশ বা বেলে দো-আঁশ মাটি ও গভীরতা ৪-৬ ফুট। পর্যাপ্ত সূর্যালোক নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে পুকুর পাড়ে কোন গাছপালা না থাকাই উত্তম।
মাছের মিশ্রচাষ তথা সব ধরনের মাছচাষের ক্ষেত্রে মূল কার্যক্রমসমূহ মূলত তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত; যেমন: মুজদ-পূর্ব ব্যবস্থাপনা, মজুদকালীন ব্যবস্থাপনা ও মজুদ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা। পুকুর প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থাপনাই হলো মজুদ-পূর্ব ব্যবস্থাপনা। এতে মূলকাজ ৭টি। পুকুরের পাড় ও তলা মেরামত এবং তলা সমতলকরণ; ঝোপ-জঙ্গল ও জলজ আগাছা দমন; রাক্ষুসে ও অচাষকৃত মাছ দূরীকরণ; পুকুরে পানি প্রবেশ করানোর মাধ্যমে গভীরতা বাড়ানো; পুকুর প্রস্তুতকালীন চুন প্রয়োগ ও সার প্রয়োগ; পুকুরের প্রাকৃতিক খাদ্য পরীক্ষা; পানির উপযুক্ততা পরীক্ষা।
ভালো পোনা ভালো উৎপাদনের চাবিকাঠি। মজুদকালীন ব্যবস্থাপনায় পোনা মজুদের সময় সাধারণভাবে ৬টি ধাপ অনুসরণ করা হয়: পুকুরে চাষযোগ্য পোনার জাত নির্বাচন; ভাল ও খারাপ পোনা চেনা; মজুদ ঘনত্ব নির্ধারণ; পোনা পরিবহন; পোনা অভ্যস্থকরণ ও মজুদ; পোনা বেঁচে থাকার হার পর্যবেক্ষণ। মজুদ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনার ওপর মাছের উৎপাদন বহুলাংশে নির্ভরশীল। মৎস্যচাষ ব্যবস্থাপনায় চাষকালীন সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগ; মজুদ পরবর্তী সার প্রয়োগ; মজুদ পরবর্তী চুন প্রয়োগ; পানির গুণাগুণ পরীক্ষা ও গুণগতমান সংরক্ষণ; নমুনায়ন, মাছ আহরণ, বাজারজাতকরণ ও পুনঃমজুদ এসব পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে।
মাছের উৎপাদন ব্যবস্থায় সকল স্তরে উত্তম চাষ ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করতে হবে। বাড়ি বা খামারে তৈরি নিরাপদ খাদ্য ব্যবহারে অগ্রাধিকার দিতে হবে। মাছের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য পুকুরে বিদ্যমান প্রাকৃতিক খাদ্যের পাশাপাশি সাধারণভাবে চালের কুড়া, গমের ভুষি, ভুট্টা চুর্ণ, সরিষার খৈল, ফিশমিল, খুদিপানা ইত্যাদি মাছের সম্পূরক খাদ্য হিসেবে সরবরাহ করা হয়। এছাড়াও বাজারে প্যাকেটজাত পিলেট বা দানাদার স¤পূরক খাদ্য পাওয়া যায়। গ্রাসকার্প ও সরপুঁটির খাদ্য হিসেবে পুকুরে নিয়মিত খুদিপানা, কুঁটিপানা, নরম ঘাস, কলাপাতা, পেঁপে পাতা, আলুর পাতা, সজনে পাতা, নেপিয়ার ঘাস, শীতকালীন শাকসবজি ইত্যাদি দিতে হবে। মলা মাছের খাদ্য হিসেবে মিহি চালের কুড়া (অটো রাইস পলিশ) শুকনো অবস্থায় পানির উপরে ছিটিয়ে দিতে হবে। পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্যের পরিমাণ ঠিক রাখার জন্য নিয়মিত সার প্রয়োগ করতে হয়। পানির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য কোন অবস্থাতেই পুকুরে কাঁচা গোবর বা হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা ব্যবহার করা যাবে না। গোবর অন্তত ৭ দিন গর্তে রেখে বায়বীয় পচনের পর কম্পোস্ট সার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। পচানোর সময় এর সাথে সামান্য পরিমাণ চুন মেশানো যেতে পারে। এ ছাড়াও মাছ চাষকালীন সময়ে পুকুরে বিভিন্ন কারণে মাছ রোগাক্রান্ত হতে পারে যেমন- খাদ্য ও পুষ্টির অভাব, দূষিত পরিবেশ এবং পরজীবী ও রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর সংক্রমণ। মনে রাখবেন রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। মাছের রোগ প্রতিরোধের জন্য সুষম খাদ্য প্রয়োগ, জৈবসার কম দেয়া এবং শীতের শুরুতে প্রতি শতাংশে অবস্থাভেদে ৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম হারে চুন প্রয়োগ করতে হবে। সচারচর দেখা যায় বসতবাড়ির আশপাশের পরিত্যক্ত পুকুর-ডোবা মশা-মাছি, সাপ-ব্যাঙ, কীটপতঙ্গ ও ক্ষতিকর প্রাণির উপযুক্ত আবাসস্থল এবং যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগব্যাধি ছড়াতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এসব পুকুর-ডোবা বিজ্ঞানভিত্তিক মাছচাষের আওতায় আনা হলে মশা-মাছি ও রোগ-জীবাণুর উপদ্রব বহুলাংশে হ্রাস পাবে।
সরকারের উন্নয়ন দর্শন বাস্তবায়নের মাধ্যমে মৎস্য সেক্টরে অর্জিতব্য প্রধান লক্ষ্যসমূহের মধ্যে মৎস্যচাষে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আয় বৃদ্ধির বিষয়টি সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। মৎস্যখাতে নারীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে বসতবাড়ি সংলগ্ন পুকুরে মাছ ও চিংড়ি চাষ, পোনা প্রতিপালন, মৎস্য আহরণ, খুচরা বিক্রয়, মাছ শুটকীকরণ, মৎস্য খাদ্য প্রস্তুতকরণ, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ইত্যাদি অন্যতম। এ ছাড়া জাল বুনন, মাছ ধরার ফাঁদ তৈরি, মাছ চাষে উদ্বুদ্ধকরণ ও গণসচেতনতা সৃষ্টি, ইত্যাদি ক্ষেত্রেও নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। মৎস্যচাষের মত আয় বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণে অগ্রাধিকার প্রদানের ফলে মাছের উৎপাদন বাড়ার সাথে সাথে পারিবারিক পুষ্টি চাহিদাপূরণ ও আয় বৃদ্ধি অনেকাংশেই নিশ্চিত হচ্ছে। সরকারের উন্নয়ন প্রচেষ্টার মূল স্রোতধারায় নারীদের সম্পৃক্তকরণের লক্ষ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মৎস্যচাষ বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে সমাজের সুবিধা-বঞ্চিত, বিশেষ করে দরিদ্র ও দুঃস্থ নারীদের, যাদের পুকুর/ডোবা আছে বা মাছ চাষ করার জন্য অনুরূপ কোন উৎসে অংশগ্রহণের সুযোগ আছে। উন্নয়ন প্রকল্পাধীন এলাকায় পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, পুকুরে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে চাষিদের মাছ খাওয়ার পরিমাণ বেড়েছে ২৮ শতাংশ, যেখানে পুরুষ মৎস্যচাষির (২৭%) চেয়ে নারী মৎস্যচাষির (৩৯%) বেলায় মাছ খাওয়ার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য বেশি হয়েছে।
পরিশেষে জীবনধারণের জন্য আমিষের গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের আপামর জনগোষ্ঠীর আমিষের চাহিদা পূরণে মাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানে প্রাণিজ আমিষের মধ্যে মাছ থেকেই সবচেয়ে বেশি পরিমাণ আমিষ পাওয়া যায়। বসতবাড়িতে মাছ ও শাকসবজির সমন্বিত চাষ ব্যবস্থাপনা প্রবর্তনের মাধ্যমে পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা মেটানো সম্ভব। খরাপ্রবণ এলাকার আপামর জনগোষ্ঠীর পুষ্টি চাহিদা পূরণে অন্যতম ও সহজ উপায় হতে পারে পর্যাপ্ত পরিমাণে মাছ ও বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির উৎপাদন ও গ্রহণ। এ সমন্বিত চাষ ব্যবস্থাপনায় হতে পারে পারিবারিক পুষ্টি সমস্যা সমাধান নিরসনে টেকসই ও উত্তম পন্থা।
লেখক : উপপরিচালক, মৎস্য অধিদপ্তর, রংপুর বিভাগ, রংপুর। মোবাইল : ০১৭১৬৭৩০৬৬৬, ই-মেইল :sainardof@yahoo.com