কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২৪ এ ০৮:২৩ PM

ফসলের সংগ্রহোত্তর পরিচর্যা, ব্যবস্থাপনা ও মূল্য সংযোজনের গুরুত্ব

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: মাঘ সাল: ১৪৩০ প্রকাশের তারিখ: ৩১-০১-২০২৪

ফসলের সংগ্রহোত্তর পরিচর্যা, ব্যবস্থাপনা
ও মূল্য সংযোজনের গুরুত্ব
মো. হাফিজুল হক খান১ ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী২
কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। একবিংশ শতাব্দীর কৃষি বিশে^র বিস্ময় ও রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃত। উৎপাদিত কৃষিপণ্যের অনেক পণ্যই বিশে^ প্রথম স্থান হতে দশম স্থানের মধ্যে রয়েছে। কৃষিপণ্যের মধ্যে উদ্যানতাত্ত্বিক ফসল যেমন-ফলমূল ও শাকসবজি আমাদের শরীরের জন্য অপরিহার্য। শরীরের সুস্থতা ও শক্তি প্রদানের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচ্য। আমাদের শরীরকে ঠিক রাখতে বিভিন্ন খনিজ পদার্থ, খাদ্যপ্রাণ, শর্করা, ¯েœহ জাতীয় উপাদানসহ বিভিন্ন ফাইটোক্যামিক্যালস্ প্রতিনিয়ত প্রয়োজন হয়। ফলমূল ও শাকসবজি খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায়ও বিশে^ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতিসংঘের খাদ্য ও  কৃষি সংস্থার (এফএও/ডব্লিউএইচও, ২০১৪) সুপারিশ অনুযায়ী একজন মানুষের গড়ে প্রতিদিন ৪০০ গ্রাম ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু আমরা দৈনন্দিন প্রায় ২০৪ গ্রাম (২০৮ কিলোক্যালরি) পরিমাণ ফলমূল ও শাকসবজি (বিবিএস, ২০১৮) খেয়ে থাকি যা প্রায় অর্ধেক পরিমাণ। তন্মধ্যে আমরা শাকসবজি ১৬৭ গ্রাম ও বাকি অংশ ফলমূল থেকে পাই। দেশে বর্তমানে ৯০ প্রকার শাকসবজি ও ৬০ প্রকার ফলমূল এর অধিক পরিমাণে সারাবছর উৎপাদিত হচ্ছে। উৎপাদিত কৃষি পণ্যগুলো মূলত দুটি মৌসুম-গ্রীষ্মকাল (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর) ও শীতকাল (অক্টোবর-মার্চ) হয়ে থাকে। উল্লেখ্য যে, মোট উৎপাদনের প্রায় শতকরা ১ ভাগ ফলমূল ও শাকসবজি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে বিশে^র প্রায় ৪০টি দেশে আমাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিশেষ করে ফলমূল ও শাকসবজি রপ্তানি হচ্ছে। যাদের বেশির ভাগই মধ্যপ্রাচ্যের ৩টি দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত। এ ছাড়াও মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, ইতালিসহ অন্যান্য দেশে কিছু পরিমাণ রপ্তানি হচ্ছে।
ফলমূল ও শাকসবজিতে অধিক পরিমাণে পানি বিদ্যমান থাকে বিধায় খুবই পচনশীল পণ্য। ফসল কর্তন বা সংগ্রহের পর এর দ্রুত শ^সন চলতে থাকে এবং শরীরবৃত্তিয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়। আবার ফলমূল ও শাকসবজি তাদের প্রকৃতি অনুযায়ী ক্লাইমেকটেরিক ও নন-ক্লাইমেকটেরিক ধরনের। ফলে সংগ্রহ থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্ত যেকোন স্তরে একটু ক্ষত, চাপ খাওয়া বা যেকোনভাবে আঘাত প্রাপ্ত হওয়ার সাথে সাথে ক্লাইমেকটেরিক প্রকৃতির ফলমুল ও শাকসবজি থেকে প্রাকৃতিকভাবে ইথিলিন উৎপন্ন হয় ও শ^সন প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু হয়। এতে প্রচুর পরিমাণে শক্তির অপচয় হয়। এ দিক বিবেচনায় যথাযথ পরিচর্যা, যথাযথ পরিপক্বতা অনুসরণ করে ফসল সংগ্রহ করতে হবে। পাশাপাশি যথাযথ প্রয়োজন এভাবে মোড়কে রাখা, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, নূন্যতম তাপমাত্রা নির্ধারণ, শ^সন দ্রুত হ্রাস করতে শীতলীকরণের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা, যথাযথ উপায়ে স্থানান্তর করার ব্যবস্থাপনা একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ ও সংগ্রহোত্তর ক্ষতি হ্রাসের অন্যতম উপায়। মাঠ পর্যায়ের উৎপাদনকারী কৃষক, সম্প্রসারণকর্মী, উদ্যোক্তাদের এ বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফসলের পরিপক্বতার নিদের্শক বা নির্ণায়ক সম্পর্কে জ্ঞান থাকা, পানি দ্বারা শোধন করা, প্রাক-শীতলীকরণ, শুকানো, মোড়কজাত করা, নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ অত্যাবশ্যক। এতে ফসলের সংগ্রহোত্তর অপচয় যেমন কমবে তেমনি কৃষকের যথাযথ মূল্য পেতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সমগ্র বিশে^ই ফলমূল ও শাকসবজির সংগ্রহোত্তর অপচয় রোধে সময়োপযোগী প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রয়োগ করে ক্ষতির পরিমাণ কমাতে গবেষণা চলমান রয়েছে। আমাদের দেশে প্রতি বছর উৎপাদিত প্রায় ৯৩ মিলিয়ন টন কৃষিপণ্যে অপচয় হচ্ছে তা টাকার অঙ্কে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা (বিবিএস, ২০২২)। উল্লেখ্য যে, উন্নত দেশে এই ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কম হলেও উন্নয়নশীল দেশে প্রায় ১২-৪৫ ভাগ (দানাশস্য, ফলমূল, শাকসবজি ইত্যাদি) বা অধিক পরিমাণ। তবে ভরা মৌসুমে অনেক সময় এ অপচয়ের পরিমাণ অধিক হয়ে থাকে। ফসলের দাম অনেক সময় অতিমাত্রায় কমে যাওয়ায় কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পায় না বা মজুরি না উঠার ফলে কৃষিপণ্য তাদের জমিতে বা মাঠে তা রেখে আসে এমন নজিরও রয়েছে। ফলশ্রুতিতে কৃষি উৎপাদনে আগ্রহ ও মনোবল হারিয়ে ফেলে, অলাভজনক হওয়ায় পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় স্থানান্তর করে। অন্যদিকে বিবিএস ও জাতিসংঘের তথ্য মোতাবেক আমাদের দেশে প্রতি বছর ১.৪৫ কোটি টন খাবার নষ্ট হয়, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। এর মধ্যে ৩৭ লক্ষ টন মাঠ হতে রান্না করা পর্যন্ত নষ্ট হয়ে থাকে। কাজেই যথাযথ প্রক্রিয়ায় কৃষিপণ্য পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অপচয় কমাতে উন্নত প্রযুক্তির বিকল্প নেই।  
বর্তমানে বিশে^ কৃষির রূপান্তরের মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপন ও বাণিজ্যি প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কৃষিপণ্য সরাসরি ভোগ্যপণ্য ছাড়াও এখন কাঁচামাল তৈরির উৎস হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। ফলমুল ও শাকসবজি থেকে খাদ্য দ্রব্য তৈরির পাশাপাশি উচ্ছিষ্টাংশ থেকে বিভিন্ন দ্রব্যাদি তৈরি হচ্ছে। পেকটিন, স্টার্চ, ফুড গ্রেড কালার বা রং, ইথানল, ভিনেগার, সুগন্ধি, ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী ইত্যাদি যেমন তৈরি হচ্ছে তেমনি রেডি-টু-কুক, রেডি-টু-ইট, ফ্রেশ-কাট পণ্যসহ বহুবিধ খাদ্যসামগ্রী মানুষের প্রতিনিয়ত সহজলভ্য হচ্ছে। স্টিপিং পদ্ধতিতে কাঁচা ফলমুল ও শাকসবজি ৬ মাসের অধিক সময় সংরক্ষণ করা, পাল্প সংরক্ষণ করা, ভিনেগার দ্রবণে রেখে ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর, শসা ইত্যাদি পিকলিং এর মাধ্যমে সংরক্ষণ করা লাভজনক এবং বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। শীতকালে অধিক উৎপাদিত ফলমুল ও শাকসবজি কৃষক অনেক সময় কমমূল্যে বিক্রয় করে সেক্ষেত্রে প্রাথমিক পরিচর্যা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হলে বছরব্যাপী তা বিভিন্ন খাবারে যুক্ত করে খাওয়া সম্ভব। সতেজ সবজি ৩০-৪৫ সেকেন্ড বা ১ মিনিট গরম পানিতে শোধন বা স্যানিটাইজিং করতে হবে এবং পরে কিছুসময় স্বাভাবিক তাপামাত্রার পানিতে রাখতে হবে। অতঃপর প্রয়োজন অনুসারে লবণ, এসিটিক এসিড বা ভিনেগার, সংরক্ষক ইত্যাদি যুক্ত করে মোড়কজাত করলে গুণগতমান বজায় থাকে।
বর্তমানে কৃষিকে ব্যবসা হিসেবে তরুণ, যুবক ও মহিলারা উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্ত হচ্ছে। আবার বহুমুখী খাবারের চাহিদাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে অনেকেই ঘরে বসেই সামাজিক যোগাযোগ ই-প্লাটফর্ম যেমন-ফুড পান্ডা, ইফুড, চালডাল, হাংড়িনাকি ইত্যাদি ব্যবহার করে বিভিন্ন কৃষিজাত দ্রব্যাদি ও খাদ্যপণ্য ভোক্তাদের নিকট পৌঁছে দিচ্ছে। এতে করে কৃষিপণ্যের ব্যবসা দিন দিন বাড়ছে আবার মানুষের চাহিদাও বাড়ছে। এতে আত্ম কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে,        কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পারিবারিক আয়ও বাড়ছে। নিজের সুস্থতা বিবেচনায় ভোক্তা এখন পুষ্টি বিষয়ে সচেতন হচ্ছে। পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবারের চাহিদাও বাড়ছে। সর্বোপরি ফলমূল ও শাকসবজির পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনা পারিবারিক পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এতদ্সত্ত্বেও কৃষিপণ্য সংগ্রহ থেকে বিপণন পর্যন্ত প্রতি স্তরে রয়েছে বিরাট চ্যালেঞ্জ ও আবার রয়েছে সম্ভাবনা। উন্নত সংগ্রহোত্তর পরিচর্যার উপকরণ সহজলভ্য করা ও যথাযথ জ্ঞান থাকা, পরিপক্বতার লক্ষণসমূহ জানা, মোড়কজাত প্রযুক্তির সহজপ্রাপ্যতা ও যথাযথ মোড়কজাত প্রযুক্তির ব্যবহার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সরবরাহ করা, সংরক্ষণ তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতের ঘাটতি ফলমূল ও শাকসবজির গুণগতমাণ যেমন কমাবে তেমনি সংরক্ষণ সময়ও হ্রাস করবে।
একুই শতকের এ কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহার এখন সময়ের দাবি। ফলমূল ও শাকসবজির গুণগতমাণ ও সংরক্ষণ বাড়াতে মাইক্রোইমালশন প্রযুক্তির ব্যবহার (এডিবল ওয়াক্স কোটিং) প্রয়োজন যা উন্নত দেশ ব্যবহার করে। প্রয়োজনীয় গ্যাস বিনিময়ের মাধ্যমে সতেজ ফলমূল ও শাকসবজির গুণগতমান বজায় থাকে বা উন্নত করে ও সংরক্ষণ সময় বাড়াতে সাহায্য করবে নিঃসন্দেহে। আবার ন্যানো প্যাকেজিং এর ব্যবহার মোড়কজাতকরণে নবদিগন্তের সূচনা করবে যা কৃষিপণ্যের সতেজতা ও গুণগতমান বজায় রাখার নির্দেশক হিসেবে কাজ করবে। সর্বোপরি ফলমূল ও শাকসবজি সংগ্রহোত্তর উন্নত পরিচর্যা ও যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মূল্য সংযোজন হবে যা কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণে এগিয়ে নিবে নিঃসন্দেহে।

লেখক : ১মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধান, পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ,, ফোন: ০২-৪৯২৭০১৭৬। ২খাদ্য প্রযুক্তি বিষয়ক গবেষক ও উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ, ই-মেইল: ferdous613@gmail.com, মোবাইল: ০১৭১২২৭১১৬৩। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর-১৭০১।

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন