কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ১ এপ্রিল, ২০১৮ এ ০৭:০৯ AM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: চৈত্র সাল: ১৪২৪ প্রকাশের তারিখ: ০১-০৪-২০১৮
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্ব এবং মাননীয় কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, এমপি মহোদয়ের দক্ষ ব্যবস্থাপনায় দেশ আজ দানাজাতীয় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এখন আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো এ দেশের মানুষের জন্য পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন। সে ক্ষেত্রে তেলজাতীয় ফসল উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। তেলজাতীয় ফসলের মাঠে মৌ চাষ করলে একদিকে ফসলের পরাগায়ন বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ২০-৩০% বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে অত্যন্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার মধু উৎপাদিত হয়। মৌ চাষের প্রচলিত ধারণা মধু উৎপাদনের জন্য হলেও মধুর আয়ের চেয়ে ৭০-৮০ গুণ অধিক অর্থ আসে পরাগায়নের মাধ্যমে ফসলের ফলন বৃদ্ধিতে।
মৌমাছি একটি ক্ষুদ্র পতঙ্গ অথচ এর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্ময়কর। আমাদের দেশে ৪টি প্রজাতির (Apis florea, Apis cerama, Apis mellifera I Apis dorsata) মৌমাছি পাওয়া গেলেও বর্তমানে মৌ চাষে এপিস মেলিফেরা (Apis mellifera) প্রজাতির মৌমাছি ব্যবহার করা হচ্ছে। একটি মৌ বাক্স থেকে বছরে গড়ে প্রায় ২০ কেজি মধু উৎপাদিত হয়, যার বর্তমান বাজারমূল্য (৩০০ টাকা/কেজি) প্রায় ৬,০০০ টাকা। এছাড়া পরাগায়ন বৃদ্ধির মাধ্যমে ফসলের ফলন প্রায় ২০-৩০% বৃদ্ধি পায়। দেশে সরিষাসহ তেলজাতীয় ফসলের প্রায় ৬ লক্ষ হেক্টর আবাদি জমিতে হেক্টরপ্রতি একটি মৌ-বাক্স স্থাপন করলে প্রায় ১২,০০০ মেট্রিক টন মধু উৎপাদনসহ ফসলের ন্যূনতম ১০% ফলন বৃদ্ধি বিবেচনায় প্রায় ৭০,০০০ মেট্রিক টন অধিক তেলজাতীয় ফসল উৎপাদন সম্ভব।
মধু অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাবার হিসেবে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থসহ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় স্বীকৃত ও প্রমাণিত। মধুতে প্রায় ১৮১ ধরনের রাসায়নিক উপাদানসহ বিভিন্ন এনজাইম ও ভিটামিন রয়েছে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ পুষ্টির জোগান দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশে উৎপাদিত মধু ভারত ও জাপানসহ অন্যান্য দেশেও রফতানি হচ্ছে। এরই মধ্যে দেশে একাধিক মধু প্রক্রিয়াজাতকরণ প্লান্টও স্থাপিত হয়েছে।
বর্তমানে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৪-৫ হাজার মেট্রিক টন মধু উৎপাদিত হচ্ছে অথচ সম্ভাব্যতা প্রায় ৪০-৫০ হাজার মেট্রিক টন। দেশে বিসিকসহ আরও কিছু সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা ব্যবসায়িক ভিত্তিতে মৌ চাষ উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দেশের গ্রাম বাংলার সব শ্রেণীর কৃষক সমাজকে সম্পৃক্ত করে ফসলের ফলন ও মধুর উৎপাদন বৃদ্ধিসহ গ্রামীণ আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে মৌ চাষ সম্প্রসারণ কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ‘চাষি পর্যায়ে উন্নতমানের ডাল, তেল ও পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রকল্প-২য় পর্যায়’ এর মাধ্যমে ফসল ও মধুর উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সারা দেশে মৌ চাষ সম্প্রসারণ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। যার মধ্যে সংস্থার ৬০০ জন কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণ (টিওটি) ও ২,৫০,০০০ কৃষককে মৌ পালনের ওপর ওরিয়েন্টেশন প্রশিক্ষণ প্রদান উল্লেখযোগ্য। সমাপ্ত প্রায় প্রকল্পটির সফলতায়- এর পরবর্তীতে ‘কৃষক পর্যায়ে উন্নতমানের ডাল, তেল ও মসলা বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রকল্প-৩য় পর্যায়’ এর কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। যার মাধ্যমে মৌ পালন কার্যক্রমকে আরও ত্বরান্বিত করা হয়েছে। এ প্রকল্পের চলমান উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমগুলো হলো মাঠ পর্যায়ের ৯০০ জন কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণ (টিওটি) প্রদান, ৬০ জন কর্মকর্তাকে ৩ মাসের সার্টিফিকেট কোর্স প্রশিক্ষণ প্রদান, ইউনিয়নভিত্তিক ৪,৫০০টি কৃষক উদ্যোক্তা (এসএমই) তৈরি এবং কৃষক উদ্যোক্তদের মধ্যে ২০০টি মৌ বাক্স বিতরণ। প্রকল্পগুলোর কার্যক্রমের পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক রাজস্ব কার্যক্রমের আওতায় চাষিদের উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে মৌ চাষ সম্প্রসারণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। উল্লেখ্য, এ কার্যক্রমের আওতায় চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশব্যাপী সরিষা, কালিজিরা, ধনিয়া, পেঁয়াজ ও তিল ফসলের জমিতে প্রায় ১,০৯,২৬৫টি মৌ বাক্স স্থাপনের মাধ্যমে ফসলগুলোর ফলন ও মধুর উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মাঠ পর্যায়ে সংস্থাটির সম্প্রসারণ কর্মীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
ফসলের মাঠে মৌ পালন, অর্থ পুষ্টি বাড়বে ফলন
দেশব্যাপী মৌ চাষ ও মধুর উৎপাদন বৃদ্ধিকরণে সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় ও এর অধীনস্থ সংস্থাসমূহগুলোতে সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। এ সকল কর্মসূচির মধ্যে টেকসই মৌ চাষ পরিকল্পনা গ্রহণ, মৌ চাষ সম্প্রসারণে জনসাধারণকে মধুর চাষসহ মৌ ব্যবহারে উদ্বুদ্ধকরণ, মৌ চাষ সম্প্রসারণে প্রশিক্ষক, আগ্রহী চাষি, মধু উৎপাদকগণকে প্রশিক্ষণ প্রদান, মৌ চাষকে শিল্পে পরিণত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
এছাড়াও মধুর ভেজাল প্রতিরোধে ও গুণগত মান নিশ্চতকরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, মধু প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্ট স্থাপন, মৌ চাষের অভিজ্ঞতা বিনিময়, মৌ চাষের সরঞ্জাম স্বল্পমূল্যে সরবরাহ, মধু বাজারজাতকরণে সহায়তা এবং মৌ চাষকে স্থায়ী রূপ প্রদানে সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি কমিউনিটি সম্পৃক্ততা বৃদ্ধিকরণের মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক কার্যক্রম গ্রহণ করা দরকার। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সকল স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সমন্বয় সাধন ও আন্ত:সর্ম্পক গড়ে তোলার মাধ্যমে মৌ শিল্প আগামী দিনে আরো বেশি বিকশিত হবে। দেশব্যাপী ফসলের মাঠগুলোতে মৌ চাষ কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে ফসল ও মধুর উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষকসহ সব পর্যায়ের স্টেকহোল্ডারকে মৌ চাষে আরও উদ্বুদ্ধ করতে এবং আধুনিক কলাকৌশলগুলো সর্বস্তরের মানুষের কাছে তুলে ধরতে মৌ মেলার আয়োজনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।
কৃষিবিদ মোহাম্মদ মহসীন*
*মহাপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা