কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২২ এ ০৫:০০ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: মাঘ সাল: (নেই) প্রকাশের তারিখ: ১৮-০১-২০২২
প্রাকৃতিক চাষের চারটি মূলনীতি
মূল প্রবন্ধকার : মাসানোবু ফুকুওকা
রূপান্তর : মৃত্যুঞ্জয় রায়
জাপানি কৃষিবিদ, লেখক, দার্শনিক ও প্রাকৃতিক চাষের গুরু মাসানোবু ফুকুওকা তার ৯৫ বছর বয়সের জীবনের ৬৫টি বছর প্রাকৃতিক চাষাবাদ করে কাটিয়েছেন। ২০০৮ সালে তার মৃত্যু পর্যন্ত তিনি তা অব্যাহত রেখেছিলেন। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, প্রকৃতির সম্পদকে কাজে লাগিয়েই ভালো উৎপাদন করে ভালোভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব। প্রকৃতিনির্ভর সেই চাষাবাদের অভিজ্ঞতা ও তার সেই দীর্ঘ সংগ্রামের কথা, দর্শনের কথা তিনি লিখে রেখে গেছেন তার অসাধারণ `The One-Straw Revolution' বইয়ে। বইটি পঁচিশটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। প্রাকৃতিক চাষাবাদ নিয়ে তার `The Natural Way of Farming' ও The Road Back to Nature বই দুটিও সাড়া জাগিয়েছে। এসব বই ১৯৮৮ সালে তাকে এনে দিয়েছে এশিয়ার নোবেল ম্যাগসাসে পুরস্কারের সম্মান। এই নির্বাচিত অংশটুকু তার One-Straw Revolution বই থেকে কৃষিকথার পাঠকদের জন্য অনুবাদ করা হলো।
এই মাঠ দিয়ে সাবধানে চলুন। গঙ্গাফড়িং আর মথেরা১ ব্যাকুল হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। মৌমাছিরা ফুলে ফুলে গুণ গুণ করছে। গাছের পাতাগুলো সরালে দেখতে পাবেন শীতল ছায়ায় অসংখ্য পোকামাকড়, মাকড়সা, ব্যাঙ, টিকটিকি আর নানা ধরনের ছোট ছোট জীব জড়াজড়ি করে পড়ে আছে। ছুঁচো আর কেঁচো মাটির নিচে বাসা বেঁধেছে।
এটাই ধানক্ষেতের স্বাভাবিক ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিবেশ বা ইকোসিস্টেম। এখানে পোকামাকড় ও গাছপালারা একটা স্থায়ী পারস্পারিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। এখানে গাছগাছড়ার রোগের প্রাদুর্ভাব অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়- এটা যদি ঘটেও তো ফসলকে সেভাবেই রেখে দিন। অবশ্য এতে ক্ষেতের ফসলের ওপর কোন প্রভাব পড়ছে না।
এখন এক মুহূর্তের জন্য হলেও প্রতিবেশীর ক্ষেতের দিকে তাকান। আগাছানাশক ঔষধপত্র ব্যবহার ও লাঙ্গল দিয়ে চাষ করার ফলে সব আগাছা মরে গেছে। রাসায়নিক সার দেওয়ার ফলে মাটির জীব-অণুজীব মরে গেছে এবং জৈব পদার্থ ধ্বংস হয়ে গেছে, যেন মাটি পুড়ে গেছে। গরমকালে দেখবেন, কৃষকরা সব গ্যাসমুখোশ পরে এবং হাতে লম্বা লম্বা রাবারের দস্তানা পরে কাজ করছেন। দেড় হাজারেরও বেশি বছর ধরে ক্রমাগত এসব ক্ষেতে চাষ হয়ে আসছে। এখন মাত্র একটি প্রজম্নের শোষণভিত্তিক চাষের ফলে এসব ক্ষেত পতিত জমিতে পরিণত হচ্ছে।
চারটি মূলনীতি
প্রথম নীতি হলো, কোন চাষ নয়, অর্থাৎ লাঙ্গল দিয়ে মাঠের জমিকে উল্টে পাল্টে দেয়া নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কৃষকরা এটা ধারণা করে এসেছে ফসল ফলাতে গেলে, মাঠে লাঙ্গল দেয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু প্রাকৃতিক চাষের ক্ষেত্রে, মৌলিক পদ্ধতি হলো, চাষ না করা। গাছপালার শিকড়ের মাটিতে অনুপ্রবেশ ও মাটিতে থাকা জীবজন্তু দ্বারা প্রকৃতির নিয়মে নিজ থেকেই চাষ হয়।
দ্বিতীয় নীতি হলো- রাসায়নিক সারের কোন ব্যবহার নয়, এমন কি তৈরি করা জৈবসার বা কম্পোস্টও নয়।* মানুষ প্রকৃতির নিয়মে হস্তক্ষেপ করে, আর মানুষ যত চেষ্টা করুক না কেন, প্রকৃতিতে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়, তা মানুষ পূরণ করতে পারে না। মানুষের চাষের কাণ্ডজ্ঞানহীন পদ্ধতি মাটির প্রয়োজনীয় পুষ্টি নষ্ট করে দেয়- ফলে বছর বছর জমির উৎপাদিকাশক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। জমিকে এমনি ফেলে রাখলে, উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের সুশৃঙ্খলাবর্তনের সংগে সংগতি রেখে স্বাভাবিক নিয়মেই জমির উর্বরাশক্তি রক্ষিত হয়।
তৃতীয় নীতি হলো-মাঠে লাঙ্গল চালিয়ে অথবা আগাছানাশক ব্যবহার করে আগাছাকে নষ্ট করা চলবে না। আগাছাগুলো মাটিতে পুষ্টি তৈরি করে ও মাঠে থাকা জীবগোষ্ঠীর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে। মৌলনীতি হবে, আগাছাগুলোকে ধ্বংসের পরিবর্তে নিয়ন্ত্রণে রাখা। মূল ফসলের ফাঁকে ফাঁকে সাদা ক্লোভার লাগিয়ে আর খড় জমিতে বিছিয়ে ঢেকে দিয়ে ও সেচের পানি দিয়ে ক্ষেত ডুবিয়ে আমি কার্যকরভাবে আমার জমির আগাছা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি।
চতুর্থ নীতি হলো, রাসায়নিক দ্রব্যাদির ওপর নির্ভর না করা।** লাঙ্গল দিয়ে চাষ ও সার প্রয়োগের মতো অ-প্রাকৃতিক পদ্ধতি গ্রহণের ফলে যখন দুর্বল চারা গাছ গজায়, তখনই গাছে রোগ ও পোকার আক্রমণ দেখা দেয়, ফলে রোগ ও পোকামাকড়ের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে কৃষিতে এক বিরাট সমস্যা সৃষ্টি করে। প্রকৃতিতে ক্ষতিকর পোকামাকড় ও গাছের রোগ সব সময়ই রয়েছে। কিন্তু তাদের প্রকোপ এত প্রবল নয় যে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করতেই হবে। গাছে রোগ ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণের যুক্তিসংগত ব্যবস্থা হলো- সুস্থ পরিবেশে সবল ফসল জন্মানো।
চাষ বা কর্ষণ
জমিতে চাষ দিলে স্বাভাবিক পরিবেশ আমূল পাল্টে যায়। এ ধরনের কার্যকলাপের বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রজন্মের পর প্রজন্মের কৃষকদের কাছে দুঃস্বপ্ন হয়ে ধরা দেয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোন স্বাভাবিক জমিতে চাষ দিলে, লম্বা লম্বা ঘাস ও মোটা মোটা খুবই শক্ত আগাছা কখনও কখনও জমিটাকে ভরে ফেলে। এসব আগাছা মাটিতে শক্তভাবে শেকড় গাড়ে, তখন কৃষকের পক্ষে প্রতি বছর আগাছা উপড়ানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রায়ই এ ধরনের জমি শেষ পর্যন্ত পরিত্যক্ত হয়।
এ সব সমস্যা সমাধানের একমাত্র উচিত ব্যবস্থা হলো, প্রথম দিকে যেসব অ-প্রাকৃতিক ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে এরূপ অবস্থায় সৃষ্টি হয়ে থাকে, তা বন্ধ করে দেওয়া। কৃষককেই সেই ক্ষতি পূরণের দায় নিতে হবে যা তার দ্বারা হয়েছে। লাঙ্গল দ্বারা জমি চাষ বন্ধ করতে হবে। রাসায়নিক দ্রব্য প্রয়োগ না করে জমিতে খড় বিছিয়ে সাদা ক্লোভারের বীজ ছিটিয়ে দিতে হবে, এতে জমি আবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে ও এতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা হবে, এমনকি এর দ্বারা সমস্যা সৃষ্টিকারী আগাছাও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
সার
একবার পরিচিত মাটি বিশেষজ্ঞদের সাথে কথাবার্তার সময় তাদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘জমি এমনি ফেলে রাখলে, তার উর্বরতা বাড়ে, নাকি কমে যায়?’ সাধারণত তারা একটু থেমে এ ধরনের কিছু একটা বলতেন, ‘বেশ, তাহলে ব্যাপারটা একটু দেখা যাক...। এটি কমে যেতে পারে। না, না, আমরা বলছি না যে সবসময়ই তা ঘটবে। আপনি যদি একই জমিতে কোনো রাসায়নিক সার প্রয়োগ ছাড়া অনবরত ধান ফলাতে থাকেন, প্রতি সিকি একর থেকে যদি আপনি ৯ বুশেল (৫২৫ পাউন্ড) ধান পেয়ে সন্তুষ্ট থাকেন, তাহলে হয়তো এটা নাও ঘটতে পারে। সেক্ষেত্রে মাটির উর্বরতা না বাড়বে, না কমবে।’
বিশেষজ্ঞেরা শেষে আমাকে জমি চষে সেচ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি জানি, জমিকে না চষে ফেলে রেখে দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার উর্বরতা বাড়ে। বিভিন্ন গাছপালা ও প্রাণীরা মরে যাওয়ার পর সেগুলো মাটিতে জড়ো হয় এবং ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক অণুজীব দ্বারা সেগুলো পচে মাটিতে মিশে যায়। বৃষ্টি হলে তার পানির সাথে সেসব পুষ্টি উপাদান মিশে মাটির গভীরে চলে যায় যা মাটিতে থাকা বিভিন্ন অণুজীব, কেঁচো ও অন্যান্য ছোট ছোট জীবদের আহার জোগায়। ফসলের শিকড় মাটিতে ঢুকে মাটির নিচ থেকে এসব পুষ্টি টেনে আবার মাটির উপরে নিয়ে আসে।
আপনি যদি মাটির প্রাকৃতিক উর্বরা শক্তি সম্পর্কে কোনো ধারণা নিতে চান, তাহলে মাঝে মাঝে পাহাড়ের বনগুলো দেখতে চলে যান এবং বিশাল বিশাল বৃক্ষগুলোর তাকিয়ে ভাবুন, কে ওদের সার দিয়েছে, জমি চষে ওদের লাগিয়েছে? কোনো চাষ ও সার ছাড়াই বৃক্ষগুলো বিশাল আকৃতি ধারণ করেছে। জমির প্রাকৃতিক উর্বরা শক্তি মানুষের কল্পনারও অতীত।
প্রাকৃতিক বনভূমির আচ্ছাদন কেটে ফেলে দিন, এরপর সেখানে কয়েক বংশধর ধরে জাপানি লাল ঝাউ বা দেবদারু গাছ লাগান, দেখবেন, জমির উর্বরতা কমে গেছে, আর ভূমিক্ষয় দেখা দিয়েছে। আবার একটা রুক্ষ অনুর্বর পাহাড়কে বেছে নিন, আর তার লাল মাটিতে দেবদারু গাছ লাগান। মাটিতে ক্লোভার ও আলফা বীজ দিয়ে ঢেকে দিন তাহলে দেখবেন এসব সবুজ সার*** (মাটি ঢেকে রাখার আচ্ছাদন ফসল) ঐ রুক্ষ পাহাড়ের মাটিকে উর্বর করে ঝোপঝাড় গজিয়ে গেছে আর পাহাড়ের মাটিতে গাছপালার জন্মানো ও মরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এক পুনরুজ্জীবন আবর্তন চক্রের সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে মাটির উপরের চার ইঞ্চি পরিমাণ অংশ দশ বছরের কম সময়ের মধ্যেই যে উর্বর হয়ে পড়েছে, এ ধরনের দৃষ্টান্ত আছে।
কৃষিজ ফসলের ফলনের ক্ষেত্রেও তৈরি করা সারের ব্যবহার বন্ধ করা যেতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সবুজ সারের স্থায়ী আচ্ছাদন সৃষ্টি করে খড়-কুটো, ভুসি ইত্যাদি মাঠে বিছিয়ে দিলেই যথেষ্ট হব। জৈবসার ব্যবহার করে খড় পচাবার জন্য মাঠে আমার হাঁসগুলিকে ছেড়ে দিই। চারা অবস্থায় থাকার সময় হাঁসের বাচ্চাগুলোকে মাঠে ছেড়ে দেয়া হলে একই সাথে ধানগাছ ও হাঁস বেড়ে উঠবে। সিকি একর জমিতে প্রয়োজনীয় সার দশটা হাঁসই জোগান দিতে পারবে, আর তারা আগাছা নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করতে পারবে।
আমি কয়েক বছর ধরেই এভাবে আমার জমিতে হাঁস চড়তে দিয়েছে। কিন্তু মাঠের ভেতর দিয়ে একটা জাতীয় সড়ক তৈরি হওয়ায় তাদের রাস্তা পার করানো এবং মাঠ থেকে নিয়ে গিয়ে খাঁচার ফিরিয়ে আনা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাই তাদের মাঠে ব্যবহার করি। অন্যান্য ক্ষেত্রে এখনও হাঁস বা এ জাতীয় তৃণভোজী জীবকে খড়কুটো পচনের সাহায্যকারী হিসেবে ব্যবহারের বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে।
অতিরিক্ত সার ব্যবহারে নানা সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। একবার ঠিক ধানের চারা লাগানোর পরই আমি সদ্য রোপিত সোয়া একর জমি এক বছরের জন্য বর্গা নিই। জমি থেকে সব পানি বের করে দিই, আর রাসায়নিক সার না দিয়ে শুধু মুরগির সামান্য পরিমাণ বিষ্ঠা ক্ষেতে ব্যবহার করি। আমার জমির চার খণ্ডে যথারীতি ফসল ফললো। কিন্তু পঞ্চম খণ্ডে আমি আগে যাই করি না কেন খুব ঘনভাবে ধানের চারার বৃদ্ধি দেখা দিলো, আর চারাগুলোকে ব্লাস্ট রোগে আক্রমণ করল। জমিটার মালিককে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করায় সে বলল, শীতকালে সে ঐ জমিতে মুরগির বিষ্ঠা রেখে একটা স্তূপ বানিয়েছিল।***
কোনো কম্পোস্ট বা রাসায়নিক সার প্রয়োগ না করে শুধু খড়, সবুজ সার, হাঁস-মুরগির অল্প কিছু বিষ্ঠা ব্যবহার করেও ফসলের উচ্চফলন পাওয়া যেতে পারে। আমি এখন কয়েক দশক ধরে, প্রাকৃতিক চাষ পদ্ধতি ও জমিতে উর্বরতাশক্তি বৃদ্ধির বিষয়টি চুপ করে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছি। এই দেখার সময় আমি প্রকৃতির উর্বরাশক্তির বদৌলতে পেয়েছি প্রচুর সবজি, কমলালেবু, ধান আর শীতের শস্য।
আগাছা দমন
আগাছার ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে গেলে, নিচের বিশেষ বিষয়গুলো মনে রাখা দরকার:
জমিতে চাষের কাজ বন্ধ করলেই আগাছার সংখ্যাও দ্রুত কমে যাবে। তা ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট জমিতে আগাছাগুলোর মধ্যেও বৈচিত্র্য বা পরিবর্তন দেখা দেবে।
জমিতে একটা ফসল পাকা অবস্থায় সেখানে থাকতে থাকতেই তার ভেতরে পরের ফসলের বীজ ছিটিয়ে দিলে আগাছার বীজ গজানোর আগেই পরের ফসলের বীজ গজিয়ে যাবে। ধান কাটার পরপরই শীতের আগাছা গজিয়ে ওঠে, কিন্তুু ঐ সময়ের মধ্যেই শীতের ফসল মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। বার্লি আর রাই কাটার পরেই গ্রীষ্মের আগাছা গজায়- কিন্তু ততক্ষণে ধানের চারা প্রবলভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এমনভাবে বীজ বোনার সময় নির্ধারণ করবেন, যেন পরপর ফসলের মধ্যে আগাছা ওঠার আর অবকাশ না থাকে, এর ফলে আগাছার চাইতে ফসল বেড়ে ওঠার বেশ সুবিধা হয়।
ফসল কাটার ঠিক পরেই সারা ক্ষেত খড়কুটো বিছিয়ে ঢেকে দিলে, আগাছা জন্মানো অনেকটা থেমে যায়। বীজ বোনার সময় সেসব বীজের সাথে সাদা ক্লোভারের বীজ মিশিয়ে ছিটিয়ে দিলে তাও
আগাছা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে।
সাধারণত আগাছা দমনের জন্য জমি চাষ দেওয়া হয়। মাঠে চাষ দিলে জমির নিচের গভীরে আগাছার যে সব বীজ পড়ে এবং যাদের কোনভাবে গজিয়ে ওঠার সুযোগ থাকেনা, তারাও উপরে উঠে অঙ্কুরিত হওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়। উপরন্তু এ অবস্থায় যেসব আগাছা তাড়াতাড়ি গজিয়ে দ্রুত বাড়ে তাদেরও গজানোর সুযোগ মিলে যায়। কাজেই আপনারা বলতে পারেন- যে সব কৃষক মাটিতে চাষ দিয়ে আগাছা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন, তারা আক্ষরিক অর্থে নিজেদের দুভার্গ্যরে বীজই বপন করেন।
বালাই দমন
তাহলে আমরা বলতে পারি যে, এখনও এমন কিছু লোক আছেন, যারা ভাবেন যে রাসায়নিক ঔষধ ব্যবহার না করলে তাদের ফলের গাছ ও ক্ষেতের ফসল তাদের চোখের সামনেই শুকিয়ে মরে যাবে। কিন্তু সত্যিকার ব্যাপার হলো, এসব রাসায়নিক দ্রব্যাদি ব্যবহার করে মানুষ তার অজান্তেই সেই অবস্থায় সৃষ্টি করছে, যাতে তার অহেতুক আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিতে পারে।
সম্প্রতি জাপানিজ লালঝাউ গাছে বাকল খেকো এক ধরনের কেড়ি পোকার ব্যাপক প্রাদুর্ভাব ঘটে। বন বিভাগের কর্মীরা পাইন গাছের সেসব পোকার ক্ষতি রোধের জন্য হেলিকপ্টারযোগে আকাশ থেকে কীটনাশক ঔষধ ছিটিয়ে দিচ্ছেন। সাময়িক অবস্থায় এ ব্যবস্থা যে কার্যকরী তা আমি স্বীকার করছি। কিন্তু আমি এটাও জানি যে অন্য কোন উপায় নিশ্চয়ই আছে।
সাম্প্রতিকতম গবেষণায় দেখা গেছে, বাকল খেকো কেড়ী পোকার আবির্ভাব সরাসরি ঘটে না। প্রথমে এক ধরনের কৃমি লালঝাউ গাছে সংক্রমণ ঘটায়, কাণ্ডের মধ্যে জন্ম নেয় ও বংশবৃদ্ধি করে এবং গাছের পানি ও খাদ্য চলাচলের নালিকাগুলো বন্ধ করে দেয়। ফলে আক্রান্ত গাছ শুকিয়ে মরে যায়। মৃত সেসব গাছে পরে এসব কেড়ী পোকারা আক্রমণ করে। অবশ্য শুকিয়ে মরে যাওয়ার আসল কারণ এখনও পরিষ্কারভাবে জানা যায়নি।
লালঝাউ গাছের কাণ্ডের ভেতর এক ধরনের ছত্রাক থাকে। তা খেয়েই কৃমিরা বেঁচে থাকে। কেন গাছের ভেতরে এ ধরনের ছত্রাকের এভাবে দ্রুত বৃদ্ধি ও বিস্তার ঘটে? ছত্রাকগুলো কি কৃমিরা সেখানে থাকলেই আসে? নাকি ছত্রাক দেখা দেওয়ার পরেই কৃমির আর্বিভাব ঘটে? শেষ পর্যন্ত এই প্রশ্ন ওঠে, প্রথমে কাকে দেখা যায়- আগে ছত্রাক, পরে কৃমি, না আগে কৃমি, পরে ছত্রাক?
এ ছাড়া আরও এক ধরনের অতি ক্ষুদ্র অণুজীব আছে। এদের সম্বন্ধে খুব কমই জানা গেছে। এরা সব সময় ছত্রাকের সাথে অবস্থান করে এবং এরা ছত্রাকের জন্য বিষাক্ত। এভাবে কার্য-কারণ সূত্রে একটা থেকে অন্যটায় অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। তবে নিশ্চিতভাবে শুধু এটাই বলা যেতে পারে যে, লালঝাউ বা পাইন গাছগুলো অস্বাভাবিক সংখ্যায় শুকিয়ে যাচ্ছে।
লালঝাউ গাছের ঝলসা বা ব্লাইটে রোগের প্রকৃত কারণ যে কি, তা মানুষ জানতে পারেনি, আর রোগের এসব প্রতিষেধক ব্যবহারের চূড়ান্ত পরিণতিই বা কি? তাও মানুষ জানে না। অজানিত এই অবস্থায় অনধিকার চর্চা করতে গেলে, আগামী দিনে হঠাৎ এক মহা অনর্থপাতের বীজই বপন করতে হবে মাত্র। রাসায়নিক ঔষধ ইত্যাদি ছিটিয়ে বাকলের কেড়ী পোকা থেকে আশু ক্ষতি হ্রাস পাওয়ার কথা জেনে আমি খুশি হতে পারিনি। এ ধরনের সমস্যাবলীর সমাধানের জন্য কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক দ্রবাদির ব্যবহার সবচেয়ে ভুল পথ এবং ভবিষ্যতে এতে বৃহৎ থেকে বৃহত্তর সমস্যা দেখা দেবে।
পাদটীকা১- মথ: পতঙ্গজগতে লেপিডোপ্টেরা বর্গের এক ধরনের পোকা, দেখতে অনেকটা প্রজাপতির মতো হলেও প্রজাপতিদের মতো বিস্তৃত রঙিন পাখা নেই ও বসার সময় এদের পাখাগুলো প্রজাপতিদের মতো আকাশমুখী থাকে না, মাটির সমান্তরালে থাকে। অনেক মথের বাচ্চা বহু রকমের ফসল খেয়ে নষ্ট করে। যেমন ধানের মাজরা পোকা।
* সারের জন্য মি. ফুকুওকা তার জমিতে শুঁটি বা শিমগোত্রীয় তিন পাতাযুক্ত সাদা ক্লোভার উদ্ভিদের চাষ করেন। এসব উদ্ভিদ বায়ুমণ্ডল থেকে নাইট্রোজেন মাটিতে যোগ করে। এসব গাছ কেটে তিনি খড়ের মতো জমির উপরে বিছিয়ে দেন, এর সাথে দেন সামান্য পরিমাণে মুরগির বিষ্ঠা।
** মি. ফুকুওকা তার জমিতে কোনো প্রকার রাসায়নিক দ্রব্য প্রয়োগ করা ছাড়াই ফসল ফলান। কখনো কখনো তিনি বাগিচা ফসলের গাছে খোস পোকা বা স্কেল ইনসেক্ট দমনের জন্য মেশিনে ব্যবহৃত তেলের দ্রবণ প্রয়োগ করেন। তিনি তার ক্ষেতে কখনো দীর্ঘমেয়াদি অবশেষ ক্রিয়া রয়েছে বা তীব্র বিষাক্ত কোনো বালাইনাশক প্রয়োগ করেন না।
*** জমির উপরে ঢেকে রাখার ফসল যেমন ক্লোভার, ভেচ ও আলফাআলফা বিছিয়ে দিলে মাটির পুষ্টি ও ভৌত অবস্থা সমৃদ্ধ হয়।
লেখক : প্রকল্প পরিচালক, সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা কম্পোনেন্ট-২য় পর্যায় (আইএফএমসি-২) প্রকল্প, ডিএই, খামারবাড়ি, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭১৮২০৯১০৭, ই-মেইল : : kbdmrityur@yahoo.com