কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২৩ এ ০৮:৫৩ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: অগ্রহায়ণ সাল: ১৪৩০ প্রকাশের তারিখ: ১৬-১১-২০২৩
প্রশ্নোত্তর
কৃষিবিদ আকলিমা খাতুন
নিরাপদ ফসল উৎপাদনের জন্য আপনার ফসলের ক্ষতিকারক পোকা ও রোগ দমনে সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনা অনুসরণ করুন।
মো: দুলাল, উপজেলা : শিবগঞ্জ, জেলা : বগুড়া।
প্রশ্ন : লাউয়ের গাছের কা- ফেটে আঠা বের হচ্ছে। কী করণীয়?
উত্তর : গাছের কা- ফেটে আঠা বের হওয়া এ রোগকে গ্যামোসিস বা আঠাঝরা রোগ বলে। এ রোগে আস্তে আস্তে গাছ নষ্ট হয়ে যায়। এ রোগ দমনে আক্রান্ত গাছ তুলে নষ্ট বা পুড়ে ফেলতে হবে। আক্রান্ত কা-ে বর্দোপেস্ট (১০০ গ্রাম তুঁত+১০০ গ্রাম চুন+১ লিটার পানি) লাগাতে হবে এবং ১% বর্দোমিকচার বা (কপার অক্সিক্লোরাইড) ক্রপের যে কোন ছত্রাকনাশক (সানভিট) (০.৪%) রোগাক্রান্ত লাউগাছে সঠিক নিয়মে ৭ দিন পরপর ৩ বার স্প্রে করতে পারেন।
সবুজ চন্দ্র, উপজেলা : ফুলবাড়ি, জেলা : কুড়িগ্রাম।
প্রশ্ন : মুলার পাতায় দাগ দেখা যাচ্ছে। কি করণীয়?
উত্তর : মুলার পাতায় দাগ রোগ দেখা যায় অষঃবৎহধৎরধ নৎধংংরপধব ছত্রাকের কারণে। ছোট ছোট বাদামি দাগ পাতায় ছড়িয়ে পড়ে। অবশেষে আক্রান্ত পাতা শুকিয়ে যায়। আক্রান্ত পাতা সংগ্রহ করে পুড়ে ফেলতে হবে। রোগের আক্রমণ দেখা দিলে ইপ্রোভিয়ন গ্রুপের ইভারাল/ রোভরাল ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭ দিন পরপর ৩ বার স্প্রে করতে হবে।
শামীম মিয়া, উপজেলা : মিঠাপুকুর, জেলা : রংপুর।
প্রশ্ন : টমেটোর পাতা কোঁকড়ায়ে যাচ্ছে। কি করণীয়?
উত্তর : সাদা মাছি দ্বারা এ রোগের ভাইরাস ছড়ায়। পাতার গায়ে ঢেউয়ের মতো ভাজের সৃষ্টি হয় ও পাতা ভীষণভাবে কোঁকড়ায়ে যায়। আক্রমণ বেশি হলে পাতা মরে যায়। এ রোগের প্রতিকারে আক্রান্ত গাছ তুলে ধ্বংস করতে হবে। ভাইরাসের বাহক পোকা দমনের জন্য ডায়মেথোয়েট, ইমিডাক্লোরাপিড (০.২৫ মিলি/লি:) যে কোন একটি কীটনাশক ১০ দিন পরপর ৩ বার স্প্রে করতে হবে।
মতিউর রহমান, উপজেলা : মোহনপুর, জেলা : রাজশাহী।
প্রশ্ন : পালং শাকের সার প্রয়োগ ও বীজ বপনের হার সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর : সারের নাম ও শতক প্রতি পরিমাণ : গোবর- ৪০ কেজি, ইউরিয়া- ১ কেজি, টিএসপি- ৫০০ গ্রাম, এমপি- ৫০০ গ্রাম ইউরিয়া ছাড়া সব সার জমির শেষ চাষের সময় প্রয়োগ করতে হয়। তবে গোবর জমি তৈরির প্রথম দিকে প্রয়োগ করাই উত্তম। ইউরিয়া সার চারা গজানোর ৮-১০ দিন পর থেকে ১০-১২ দিন পর পর ২-৩ কিস্তিতে উপরিপ্রয়োগ করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। বীজ বপনের সময় আগস্ট ১৫ অক্টোবর ১৫।
বীজ বপনের হার প্রতি আল ৩৫-৪০ গ্রাম, প্রতি শতকে ১১৭ গ্রাম, প্রতি একরে ৯-১১ কেজি, প্রতি হেক্টরে ২৫-৩০ কেজি।
মো: শুভ, উপজেলা : জয়পুরহাট সদর, জেলা : জয়পুরহাট।
প্রশ্ন : পোকা ধানের শীষ কেটে দিচ্ছে। কি করতে পারি?
উত্তর : ধানের শীষ আসার পর ধানের শীষ কাটা লেদাপোকার (বৈজ্ঞানিক নাম : গুঃযরসধ ংবঢ়ধৎধঃধ) কীড়া শীষ কেটে ক্ষতি করে। মেঘলা আবহাওয়ায় এ পোকার বংশ বৃদ্ধি বেশি হয়। পোকা দমনের জন্য ক্ষেত পরিষ্কার রাখতে হবে। ধান কাটার পর নাড়া পুড়ে ফেলে ও জমি চাষ দিতে ফেলে রাখতে হবে। আক্রান্ত ক্ষেত থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফসল সংগ্রহ করতে হবে। ক্ষেতে অধিকাংশ গাছে প্রতি বর্গমিটারে গড়ে অন্তত একটি করে কীড়ার উপস্থিতি থাকলে বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে প্রতিলিটার পানিতে ২ গ্রাম কারবারিল গ্রুপের সেভিন), ২ মিলি. ক্লোরপাইরিফস গ্রুপের (মর্টার ৪৮ ইসি) যে কোন একটি বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে। ১০ দিন পর পর ৩ বার স্প্রে করতে হবে।
মো: রাকিব মিয়া, উপজেলা : জামালপুর সদর, জেলা : জামালপুর
প্রশ্ন : বোরো ধানের বীজতলার চারা হলুদ হয়ে যাচ্ছে। করণীয় কি?
উত্তর : চারা হলুদ হয়ে গেলে প্রতি শতক বীজতলায় ২৮০ গ্রাম ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া সার প্রয়োগের পর চারা সবুজ না হলে প্রতি শতক বীজতলায় ৪০০ গ্রাম হারে জিপসাম সার প্রয়োগ করতে হবে। অতিরিক্ত ঠা-ার সময় বীজতলাকে স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢেকে রাখতে হবে।
মো: আবু সাইদ, উপজেলা : খানসামা, জেলা : দিনাজপুর।
প্রশ্ন : সরিষা গাছের পাতার নিচে পাউডারের মতো দেখা যাচ্ছে এবং পাতার উপরের অংশ হলুদ হয়ে যাচ্ছে। কি করব?
উত্তর : এটি ডাউনি মিলডিউ রোগ নামে পরিচিত। এই রোগ দেখা দেয়া মাত্র ম্যানকোজেব গ্রুপের ডাইথেন এম-৪৫ প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে ম্যানকোজেব+ মেটালঅক্সিল এই গ্রুপের রিডোমিল এমজেড ৭২, ৭-১০ দিন অন্তর ৩ বার পুরো গাছে স্প্রে করতে হবে। এ ছাড়া সুষম সার সঠিক পরিমাণে সঠিক সময়ে ব্যবহার করতে হবে। আক্রান্ত ক্ষেতে প্রতি বছর সরিষার চাষ না করে পর্যায়ক্রমে ফসল চাষ করা উচিত। এছাড়া বীজ বপনের পূর্বে বীজ শোধন (ভিটাভেক্স-২.৫ গ্রাম বা ২ গ্রাম ব্যাভিস্টিন প্রতি কেজি বীজ) করে নিলে এই রোগের প্রকোপ অনেকাংশে রোধ সম্ভব।
অনুপ কুমার, উপজেলা : লালপুর, জেলা : নাটোর।
প্রশ্ন : মরিচ গাছের কচি পাতা ও ডগার রস পোকা শুষে খেয়ে ফেলছে এবং গাছকে দুর্বল করে দিচ্ছে। প্রতিকার কি?
উত্তর : থ্রিপস পোকার আক্রমণে এই লক্ষণ দেখা যায়। পাতা শুকিয়ে যায় এবং গাছ দুর্বল হয়ে পরে। কুঁকড়ানো পাতা কুঁকড়ানো এড়াতে হলুদ রঙের ফাঁদ ব্যবহার করা যেতে পারে। করণীয় হিসেবে আগাম বীজবপন, সুষম সার ব্যবহার রোগের প্রাথমিক অবস্থায় গাছে ছাই ছিটিয়ে দেয়া গুরুত্বপূর্ণ। জৈব বালাইনাশক হিসেবে ১ কেজি আধা ভাঙা নিম বীজ ২০ লিটার পানিতে ২৪ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে উক্ত পানি পাতার উপরের দিকে স্প্রে করতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে ফিপ্রোনিল গ্রুপের (রিজেন্ট/এসেনড) গ্রুপের ডাইমেথয়েট (বিস্টারসোয়েট/ টাফগর) ১০ লিটার পানিতে ২০ মিলি হারে বা ১০ দিন পরপর ৩ বার স্প্রে করে এসব পোকা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। স্প্রে করার পর ১৫ দিনের মধ্যে সেই মরিচ তুলে খাবেন না/বিক্রি করবেন না।
আব্দুল আলীম, উপজেলা : মনিরামপুর, জেলা : যশোর
প্রশ্ন : শসা গাছের কচি ফল ও ডগা পোকার কীড়া ছিদ্র করে ফেলছে। এখন কি করব?
উত্তর : শসা ও খিরার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতিকারক পোকা ফলের মাছি পোকা। এ পোকা প্রথমে ফলের মধ্যে প্রথমে ডিম পাড়ে। পরবর্তীতে ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে ফলের ভিতর খেয়ে নষ্ট করে ফেলে। আগাম বীজ বপন, সুষম সার ব্যবহার এবং ক্ষেত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রেখে এই পোকার হাত থেকে ফসল রক্ষা করা অনেকাংশে সম্ভব। আক্রান্ত ডগা ও ফল সংগ্রহ করে নষ্ট করতে হবে। সেক্সফেরোমেন ফাঁদ স্থাপন করতে হবে। ফেরোমেনের গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে পুরুষ মাছি পোকা প্লাস্টিক পাত্রের ভেতরে প্রবেশ করে ও সাবান পানিতে পরে মারা যায়। জৈব বালাইনাশক যেমন: নিমবিসিডিন ৩ মিলি./লিটার হারে পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। শতকরা ১০ ভাগের বেশি ক্ষতি হলে যে কোন বালাইনাশক যেমন সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের (রিপকর্ড ১ মি.লি)/ ১ লি. ডেল্টামেথ্রিন গ্রুপের (ডেসিস ০.৫ মিলি) ৩ লিটার হারে পানিতে মিশিয়ে ১০ দিন পরপর ৩ বার স্প্রে করতে হবে।
মো: জালাল উদ্দিন, উপজেলা : আমতলী, জেলা : বরগুনা
প্রশ্ন : বাঁধাকপি গাছের গোড়া পোকা কেটে দেয়, এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কি?
উত্তর : কাটুই পোকা বা ঈঁঃ ড়িৎস এর আক্রমণে এ সমস্যা হয়ে থাকে। প্রতি লিটার পানিতে ক্লোরপাইরিফস গ্রুপের কীটনাশক (ডার্সবান/ লার্ভিন-২) গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে ১.৫ মিলি ১০ দিন পরপর ৩ বার মিশিয়ে গাছের গোড়ায় বিকালে স্প্রে করতে হবে। জমি চাষ দিয়ে মাটি উলট-পালট করে পোকা নষ্ট করতে হবে। জমিতে গভীর সেচ দিয়ে পোকা নষ্ট করতে হবে। বিষটোপ তৈরির জন্য এক কেজি চাউলের কুঁড়া বা গমের ভুসির সাথে ২০ গ্রাম পাদান অথবা কারবারিন গ্রুপের সেভিন কীটনাশক পানি বা চিটাগুড়ের সাথে মিশিয়ে তৈরি করতে হবে।
মো: আল আমিন, উপজেলা : শেরপুর সদর, জেলা : শেরপুর
প্রশ্ন : গম ফসল চাষের জন্য কতবার সেচের প্রয়োজন হয়?
উত্তর : গমে মাটির প্রকারভেদে সাধারণত ২-৩টি সেচের প্রয়োজন হয়। প্রথম সেচ চারার তিন পাতার সময় (বপনের ১৭ থেকে ২১ দিন পরে), দ্বিতীয় সেচ গমের শীষ বের হওয়ার সময় (বপনের ৫৫ থেকে ৬০ দিন পর) এবং তৃতীয় সেচ দানা গঠনের সময় (বপনের ৭৫ থেকে ৮০ দিন পর) দিতে হবে। গমক্ষেতে ধানের মতো ঢালাও সেচ দিতে হবে না। নালা বা ফিতা পাইপের মাধ্যমে সেচের পানি ছিটিয়ে দিতে হবে। সঠিক সেচ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফলন ৫৮% পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব। বপনের ২৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে ১ম সেচের পর একটি নিড়ানি দিলে ফলন প্রায় ১০ থেকে ১২ ভাগ বৃদ্ধি পায়।
মো: পারভেজ হোসাইন, উপজেলা: চারঘাট, জেলা : রাজশাহী
প্রশ্ন : মসুরে গোড়া পচা রোগের আক্রমণ হয়েছে? করণীয় কী?
উত্তর : এ রোগের জীবাণু স্কেলেরোসিয়াম রলফসি নামক এক প্রকার ছত্রাক। গাছ আক্রান্ত হলে পাতা ক্রমান্বয়ে হলদে রং ধারণ করে। আক্রান্ত গাছ ঢলে পড়ে ও শুকিয়ে যায়। মাটি ভিজা থাকলে গাছের গোড়ায় ছত্রাকের সাদা মাইসেলিয়াম ও সরিষার দানার ন্যায় স্কেলেরোসিয়াম গুটি দেখা যায়। এ জীবাণু গাছের অবশিষ্টাংশে বিকল্প পোষক ও মাটিতে বেঁচে থাকে এবং পরবর্তী বছরে ফসলে আক্রমণ করে। তাই ফসলের পরিত্যক্ত অংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে এবং অধিক পরিমাণে জৈবসার ব্যবহার করতে হবে। বীজ লাগানোর আগে ভিটাভেক্স ২০০ (০.২৫%) হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করে নিতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে কার্বেন্ডাজিম জাতীয় ছত্রাকনাশক যেমন নোইন ৫০ ডব্লিউপি অথবা (এমকোজিম ৫০ ডব্লিউপি) প্রতি ১০ লিটার পানিতে ১০ গ্রাম মিশিয়ে ৫ শতক জমিতে ৭ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।
মো: রবিউল আলম, উপজেলা : ধুনট, জেলা : বগুড়া
প্রশ্ন : আলুর পাতায় এলোমেলো গোলাকার দাগ দেখা যাচ্ছে যা, কালো রং হয়ে যাচ্ছে এবং পাতা পচে যাচ্ছে। কী করতে পারি?
উত্তর : এ রোগ প্রতিরোধে আগাম আলুর চাষ অর্থাৎ ১৫ নভেম্বরের মধ্যে আলু রোপণ করা যেতে পারে। রোগসহনশীল জাত যেমন বারি আলু ৪৬, বারি আলু ৫৩ আলু চাষ করা যেতে পারে। নিম্ন তাপমাত্রায়, কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া ও বৃষ্টির পূর্বাভাস পাওয়ার সাথে সাথে রোগ প্রতিরোধের জন্য ৭ থেকে ১০ দিন অন্তর অন্তর ৩ বার ম্যানকোজেব গ্রুপের অনুমোদিত ছত্রাকনাশক যেমন ডায়থেন এম-৪৫ বা পেনকোজেব ৮০ ডব্লিউপি প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করে গাছ ভালভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে। রোগ দেখা দেয়ার পর আক্রান্ত জমিতে রোগ নিয়ন্ত্রণ না হওয়া পর্যন্ত সেচ প্রদান বন্ধ রাখতে হবে। রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি হলে ৩ থেকে ৪ দিন অন্তর ছত্রাকনাশকের মিশ্রণ স্প্রে করতে হবে। ছত্রাকনাশক অবশ্যই পাতার উপরে ও নিচে ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে।
লেখক : তথ্য অফিসার (পিপি), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫। মোবাইল : ০১৯১৬৫৬৬২৬২; ই-মেইল : aklimadae@gmail.com