প্রশ্নোত্তর
কৃষিবিদ ড. আকলিমা খাতুন
নিরাপদ ফসল উৎপাদনের জন্য আপনার ফসলের ক্ষতিকারক পোকা ও রোগ দমনে সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনা অনুসরণ করুন।
জনাব ফেরদৌস হাসান, উপজেলা : ডুমুরিয়া, জেলা : খুলনা।
প্রশ্ন : কলমি শাকের গাছের পাতার নিচে শক্ত সাদা পাউডারের মতো দেখা যাচ্ছে এবং পাতার উপরের অংশ হলুদ হয়ে যাচ্ছে এর প্রতিকার কী?
উত্তর : এটি কলমি শাকের সাদা মরিচা রোগ নামে পরিচিত। এটি মাটিবাহিত রোগ বিধায় মাটি, আক্রান্ত চারা ও বীজের মাধ্যমে এটি বিস্তার লাভ করে। এ রোগে আক্রান্ত শাকের গাছের পাতার নিচে শক্ত সাদা পাউডারের মতো দেখা যায় এবং পাতার উপরের অংশ হলুদ হয়ে যায়। প্রতিকার হিসেবে জমিতে সুষম সার ব্যবহার করতে হবে। আগাম বীজ বপন করতে হবে, বীজতলায় হেক্টরপ্রতি ২.০ টন ট্রাইকোকম্পোস্ট ব্যবহার করতে হবে। প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে কপার হাইড্রোক্সাইড গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন চ্যাম্পিয়ন বা উইন বা জিবান মিশিয়ে স্প্রে করলে প্রতিকার পাওয়া যাবে।
জনাব জোবেদা আক্তার, উপজেলা : পলাশ, জেলা : নরসিংদী
প্রশ্ন : পেঁপে গাছের পাতা প্রথমে হলদে এবং পরে বাদামি রং ধারণ করে শুকিয়ে যাচ্ছে এবং আস্তে আস্তে সম্পূর্ণ গাছটি মারা যায়, প্রতিকার কী?
উত্তর : এটি চুঃযরঁস ধঢ়যধৎরফবৎসধঃঁস নামক ছত্রাকের আক্রমণে হয়। একে পেঁপের ঢলে পড়া রোগ ও বলা হয়। এ রোগে প্রচুর চারা গাছ মারা যায়। তবে এ রোগের জীবাণুর আক্রমণে বর্ষা মৌসুমে কা- পচা রোগও হয়। আক্রান্ত গাছের পাতা প্রথমে হলুদ পরে বাদামি রং ধারণ করে গাছের শাখা প্রশাখা আগা হতে শুকিয়ে যেতে শুরু করে এবং সম্পূর্ণ গাছটি মারা যায়। প্রতিকার হিসেবে গাছের গোড়ায় পানি নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থা করতে হবে। বীজতলার মাটি ৫% ফরমালডিহাইড দ্বারা জীবাণুমুক্ত করতে হবে। রোগাক্রান্ত চারা গাছ মাটি হতে উঠিয়ে পুড়ে ফেলতে হবে। মেটালেক্সিল ম্যানকোজেব গ্রুপের রিডোমিল গোল্ড ২ গ্রাম হারে প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর গাছের গোড়ার চারি পার্শ্বের মাটিতে প্রয়োগ করলে এ রোগ হতে প্রতিকার পাওয়া যাবে।
জনাব মো: আলম খান, উপজেলা : গফরগাঁও, জেলা : ময়মনসিংহ
প্রশ্ন : শিম গাছের পাতা হলুদ হয়ে গেছে, গাছের কচি পাতা ও ডগা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। পাতার ওপর কালো কালো ছত্রাক দেখা যাচ্ছে এবং কোনো কোনো গাছ মারাও যাচ্ছে এর প্রতিকার কী?
উত্তর : এটি শিম গাছে জাবপোকা আক্রমণের লক্ষণ। জাবপোকা অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও প্রাপ্ত বয়স্ক উভয় অবস্থাতেই গাছের নতুন ডগা, পাতা, ফুল ও ফল হতে রস চুষে খায়। গাছের পাতা হলদে হয়ে যায় এবং গাছের কচি পাতা ও ডগার রস চুষে খাওয়ার কারণে গাছ দুর্বল হয়ে যায়। আক্রমণ বেশি হলে গাছে শুটিমোল্ড ছত্রাকের উপস্থিতি হয় এবং গাছ মারা যায়। প্রতিকার হিসেবে জমিতে সুষম সার ব্যবহার করতে হবে এবং অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার প্রয়োগ বন্ধ করতে হবে। হাত দ্বারা আক্রান্ত পাতা, ডগা, ফুল, ফলসহ পোকা সংগ্রহ করে মেরে ফেলতে হবে। জমিতে পরভোজ পোকা, যেমন-লেডি বার্ড বিটল লালন করতে হবে। নিমবীজের শাঁস পিষে পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করে এদের দমন করা যায়। ২৫ মিলি তরল সাবান (ডিটারজেন্ট) প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করলে দমন করা যায়। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে এব্যামেকটিন (১%)+ এসিটামিপ্রিড (৩%) গ্রুপের বেকটিন ৪ ইসি বা রিং টোন ৪ ইসি ০.৫ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে বা ইমিডাক্লোরপ্রিড গ্রুপের এডমেয়ার ০.৫ মিলি হারে প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে শেষ বিকেলে স্প্রে করতে হবে।
জনাব মিঠুন দাস, উপজেলা : উজিরপুর, জেলা : বরিশাল।
প্রশ্ন : ডালিম গাছের পাতায় দাগ দেখা যাচ্ছে এবং কচি ফল কালো হয়ে শুকিয়ে ফেটে ঝরে পড়ছে, প্রতিকার কী?
উত্তর : এটি ডালিমের এনথ্রাকনোজ রোগ। এটি ছত্রাকজনিত রোগ। এ রোগে ডালিমের কচি পাতায় অনিয়মিত দাগ দেখা যায় এবং কচি ফল আক্রান্ত হলে শুকিয়ে ফেটে যায় এবং কখনও কখনও ঝরে যায়। প্রতিকার হিসেবে সময়মতো প্রুনিং করে গাছ ও বাগান পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। গাছের নিচে ঝরে পড়া পাতা ও ফল অপসারণ করতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের অটোস্টিন ৫০ ডব্লিউডিজি (২ গ্রাম/লিটার) বা নোইন ৫০ ডব্লিউপি (১-২ গ্রাম/লিটার) অথবা ম্যানকোজেব গ্রুপের ডায়থেন এম-৪৫ (২ গ্রাম/লিটার) মিশিয়ে ১৫ দিন পর পর ৩-৪ বার স্প্রে করলে প্রতিকার পাওয়া যায়।
জনাব জাহিদুল ইসলাম, উপজেলা : গোবিন্দগঞ্জ, জেলা : গাইবান্ধা
প্রশ্ন : ধান গাছের পাতার সবুজ অংশ খেয়ে পাতা সাদা করে ফেলছে। কী করণীয়?
উত্তর : ধানের পামরী পোকার আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত পাতায় শিরার সমান্তরালে লম্বালম্বি দাগ পড়ে। পূর্ণ বয়স্ক ও কীড়া ধানের পাতার ক্ষতি করে। কীড়াগুলো পাতার দুই পর্দার মাঝে সুড়ঙ্গ করে সবুজ অংশ খাওয়ার ফলে পাতা সাদা হয়ে খড়ের রং ধারণ করে। পামরী পোকার আক্রমণ দেখা দিলে হাতজাল দিয়ে পোকা ধরে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। আক্রান্ত ক্ষেতের পাতা উপর থেকে ৩-৪ সেমি. কেটে ধ্বংস করতে হবে। শতকরা ৩৫ ভাগ পাতার ক্ষতি হলে অনুমোদিত কীটনাশক যেমন ডাইমেথোয়েট গ্রুপের রগর হেক্টর প্রতি ১.১২ লি: অথবা ফেনিট্রোথিয়ন গ্রুপের এডথিয়ন ১.১২ লি: ব্যবহার করতে হবে।
জনাব খালেক, উপজেলা : ত্রিশাল, জেলা : ময়মনসিংহ
প্রশ্ন : ডাঁটার কা-ে ক্ষত দেখা যাচ্ছে। কী করতে হবে?
উত্তর : ডাঁটার অ্যানথ্রাকনোজের কারণে কা-ে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। যা পরে কা-কে চারিদিকে ঘিরে ফেলে। ঈড়ষষবঃড়ঃৎরপযঁস ংঢ়. নামক ছত্রাকের আক্রমণে ডাঁটায় এ রোগ দেখা দেয়। এ রোগ থেকে রক্ষা পেতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ করতে হবে। কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ব্যাভিস্টিন ২ গ্রাম দিয়ে প্রতি কেজি বীজ শোধন করতে হবে। রোগের আক্রমণ দেখা দিলে প্রোপিকোনাজল গ্রুপের টিল্ট ২৫০ ইসি ০.৫ মিলি বা কার্বেনডাজিম গ্রুপের ব্যাভিস্টিন ১ গ্রাম প্রতিলিটার পানিতে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।
জনাব আফজাল, উপজেলা : তারাকান্দা, জেলা : ময়মনসিংহ
প্রশ্ন : বাঁধাকপির আগাম জাত ও সার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর : বাঁধাকপির আগাম জাতের মধ্যে রয়েছে বারি বাঁধাকপি-১ (প্রভাতী), বারি বাঁধাকপি-২ (অগ্রদূত), সুপার গ্রিন এফ-১ ইত্যাদি। সার ব্যবস্থাপনা : বাঁধাকপির জন্য শতকপ্রতি ১২৫ কেজি গোবার, ইউরিয়া ১ কেজি, টিএসপি ৮০০ গ্রাম, এমওপি ৬৫০ গ্রাম সার দিতে হবে। জমি তৈরির সময় সম্পূর্ণ গোবর ও টিএসপি সার প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া ও এমওপি সার ২ কিস্তিতে চারা রোপণের ২০-২৫ দিন পর একবার এবং ৩০-৪০ দিন পর আর একবার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে।
জনাব মহিউদ্দীন, উপজেলা : হরিণাকুন্ডু, জেলা : ঝিনাইদহ
প্রশ্ন : কলাগাছ লাগানোর সময় এবং সার প্রয়োগ পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর : কলার চারা বছরে ৩ মৌসুমে রোপণ করা যায়। প্রথম রোপণ : আশ্বিন-কার্তিক (মধ্য-সেপ্টেম্বর থেকে মধ্য-নভেম্বর)। দ্বিতীয় রোপণ : মাঘ-ফাল্গুন (মধ্য জানুয়ারি থেকে মধ্য-মার্চ)। তৃতীয় রোপণ : চৈত্র-বৈশাখ (মধ্য মার্চ থেকে মধ্য মে)।
সারের নাম সারের পরিমাণ (গর্ত)
গোবর ১৫-২০ কেজি
টিএসপি ২৫০-৪০০ গ্রাম
এমওপি ২৫০-৩০০ গ্রাম
ইউরিয়া ৫০০-৬৫০ গ্রাম
সারের ৫০% গোবর জমি তৈরির সময় এবং বাকি ৫০% গর্তে দিতে হবে। অর্ধেক টিএসপি গর্তে দিতে হবে। রোপণের দেড় মাস থেকে দুই মাস পর ২৫% ইউরিয়া, ৫০% এমওপি ও বাকি টিএসপি জমিতে ছিটিয়ে ভালভাবে কুপিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। এর দুই মাস পর গাছপ্রতি বাকি ৫০% এমওপি ও ৫০% ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হবে। ফুল আসার সময় অবশিষ্ট ২৫% ইউরিয়া জমিতে ছিটিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।
জনাব রাকিব মিয়া, উপজেলা : ঘাটাইল, জেলা : টাঙ্গাইল
প্রশ্ন : মাষকলাই চাষের চাষপদ্ধতি ও সার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর : মাষকলাই ডালে প্রচুর পরিমাণ খাদ্য শক্তি ও প্রোটিন আছে। বেলে দো-আঁশ ও পলি দো-আঁশ মাটি, মাঝারি উঁচু এবং সুনিষ্কাশিত জমি মাষকলাই চাষের উপযোগী। মাটির প্রকারভেদে ৪-৬টি চাষ ও মই দিতে হবে। প্রথম চাষ গভীর হতে হবে এতে সেচ ও নিষ্কাশন সুবিধাজনক, পরিচর্যা সহজ এবং সেচের পানির অপচয় কম হয়। সরাসরি বীজ বুনলে লাইন থেকে লাইন ১২ ইঞ্চি এবং চারা থেকে চারা ৪ ইঞ্চি দূরে লাগাতে হবে। প্রতি শতকে ১৫০ গ্রাম বীজ লাগে। সার ব্যবস্থাপনা : প্রতি শতকে ৩৫ কেজি পচা গোবর অথবা কম্পোস্ট সার, ইউরিয়া ১৪০ গ্রাম, টিএসপি ৩৫০ গ্রাম এবং এমপি ১৫০ গ্রাম প্রয়োগ করতে হবে। সার শেষ চাষের সময় প্রয়োগ করতে হবে।
জনাব হবিবর রহমান, উপজেলা : ধামইরহাট, জেলা : নওগাঁ
প্রশ্ন : লেদাপোকা রোপা আমন ধানের শীষ কেটে দেয়। করণীয় কী?
উত্তর : ধানের শীষ কাটা লেদাপোকা ধানের শীষ কেটে ক্ষতি সাধন করে। এক্ষেত্রে আক্রান্ত জমিতে সেচ দিতে হবে। আধা পাকা ধান বাঁশ দিয়ে হেলিয়ে দিলে ক্ষতির পরিমাণ কম হয়। প্রতি বর্গমিটারে যদি গড়ে ১টি কীড়ার উপস্থিতি পাওয়া যায় তাহলে কার্বারিল গ্রুপের কীটনাশক যেমন ভিটাব্রিল ২৭ গ্রাম প্রতি ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতক জমির জন্য এ হারে প্রয়োগ করতে হবে। ৮০% ধান পাকার পর ধান জমিতে ফেলে না রেখে কেটে ফেলতে হবে। ফসল কাটার পর আক্রান্ত জমি ও তার আশে পাশের জমির নাড়া পুড়িয়ে ফেলতে হবে। ধান লাগানের পর পাখি বসার জন্য ডালপালা পুঁতে দিয়েও এদের সংখ্যা কমানো যায়।
লেখক : তথ্য অফিসার (উদ্ভিদ সংরক্ষণ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫। মোবাইল : ০১৯১৬৫৬৬২৬২; ই-মেইল : aklimadae@gmail.com