প্রশ্নোত্তর
ড. আকলিমা খাতুন
নিরাপদ ফসল উৎপাদনের জন্য আপনার ফসলের ক্ষতিকারক পোকা ও রোগ দমনে সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনা অনুসরণ করুন।
জনাব বেলাল আহমেদ, উপজেলা : কুড়িগ্রাম সদর, জেলা : কুড়িগ্রাম
প্রশ্ন : আমার মিষ্টি আলুর গাছ ঢলে পড়ছে এবং ধীরে ধীরে শুকিয়ে মারা যাচ্ছে, এর প্রতিকার কী?
উত্তর :এটি Fusarium sp ছাত্রকজনিত মিষ্টি আলুর ঢলে পোড়া রোগ। এ রোগে আলুর লতা ঢলে পড়ে। আলুর লতার ভেতরের রসবাহী নালীগুলো আটকিয়ে গাছের রস সরবরাহ বন্ধ হয়, পরবর্তীতে গাছ শুকিয়ে মারা যায়। প্রতিকার হিসেবে আক্রান্ত গাছ নষ্ট বা পুড়ে ফেলতে হবে। কার্বোন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক অটোস্টিন ৫০ ডব্লিউডিজি ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে লতা শোধন করতে হবে। এছাড়াও কার্বেন্তাজিম গ্রুপের গোল্ডাজিম ৫০০ এসসি ১ মিলি. প্রতি লিটার পানিতে অথবা নোইন ৫০ ডব্লিউপি ১-২ গ্রাম/লিটার পানিতে মিশিয়ে গাছের গোড়ায় স্প্রে করতে হবে।
জনাব কবির আহমেদ, উপজেলা : বেতাগী, জেলা : বরগুনা
প্রশ্ন : আমার করলা গাছের পাতায় সাদা সাদা পাউডারের মতো দেখা যাচ্ছে, এর প্রতিকার কী?
উত্তর : এটি Colletotrichum sp নামক ছত্রাকের আক্রমণে হয়। রোগের নাম পাউডারি মিলডিউ নামে পরিচিত। আক্রমণ বেশি হলে পাতা নষ্ট হয়ে যায় এবং ফুল-ফলও কম হয়। প্রতিকার হিসেবে প্রোপিকোনাজল গ্রুপের ছত্রাক নাশক টিল্ট ২৫০ ইসি ০.৫ মিলি. অথবা সালফার ৮০% (থিয়োভিট) ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০-১২ দিন পরপর ২-৩ বার শেষ বিকেলে স্প্রে করতে হবে। এ ছাড়াও গাছের পরিত্যক্ত অংশ সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলতে হবে।
জনাব মিজানুর রহমান, উপজেলা : গাইবান্ধা সদর জেলা : গাইবান্ধা
প্রশ্ন : পটলের সার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জাততে চাই?
উত্তর :
সারের নাম সারের পরিমান (প্রতি শতকের জন্য)
গোবর বা কম্পোস্ট ৪০ কেজি
ইউরিয়া ১.২ কেজি
টিএসপি ৮২০ গ্রাম
এমওপি ৬১০ গ্রাম
জিপসাম ২৪০ গ্রাম
ইউরিয়া ছাড়া অবশিষ্ট সকল সার জমি তৈরির সময় অর্ধেক এবং মাদায় অর্ধেক পরিমানে ব্যবহার করতে হবে। ইউরিয়া সার চারা গজানোর ২০দিন পরপর সমান তিন কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। পটলের জমিতে মাচা না দিলে ইউরিয়া সার দেয়া অসুবিধাজনক। সেক্ষেত্রে অর্ধেক ইউরিয়া বেডে এবং বাকী অর্ধেক ইউরিয় চারা গজানোর ৩০দিন পর গাছের গোড়ার চারপাশে মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে।
জনাব শামীম, উপজেলা : ফুলবাড়ি জেলা : দিনাজপুর
প্রশ্ন : শসা গাছের পাতা ও ফলে কালো পচা দাগ দেখা যাচ্ছে, কী করণীয়?
উত্তর : Pythium aphanidermatum. নামক ছত্রাক দ্বারা শসার এনথ্রাকনোজ রোগ হয়। এর ফলে গাছের পাতা ও ফলে কালো কালো পচা দাগ দেখা যায়। এ দাগ গুলো ক্রমশঃবড় হয়ে আক্রান্ত অংশটি পচিয়ে ফসলের ক্ষতি করে। আক্রান্ত গাছ দেখামাত্র তুলে নষ্ট করতে হবে। রোগমুক্ত গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। বীজ বপনের আগে বীজ শোধন করতে হবে (কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের নোইন ২ম /প্রতি কেজি বীজ)। রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানিতে কার্বেনডাজিম গ্রুপের নোইন ১ গ্রাম বা প্রোপিকোনাজল গ্রুপের টিল্ট ০.৫ মিলি ৭দিন পরপর ২-৩ বারে স্প্রে করতে হবে।
জনাব মো. হারুন অর রশীদ, উপজেলা : বীরগঞ্জ, জেলা : দিনাজপুর
প্রশ্ন : রক মেলন গাছের পাতায় এবং কা-ে কালো দাগ দেখা যাচ্ছে, করণীয় কী?
উত্তর : এটি রকমেলন বা সাম্মামের এ্যানথ্রাকনোজ রোগ। ঈড়ষষবঃড়ঃৎরপযঁস ংঢ় নামক ছত্রাকের আক্রমনে এ রোগ দেখা দেয়। প্রথমে পাতায় বাদমি থেকে কালো দাগ দেখা যায় এবং ধীরে ধীরে কা-, ফলের বোঁটা এবং ফলেও এ রোগ দেখা যায়। এর ফলে গাছ এবং ফলসমূহের ক্ষতি হয়। আগাছা যুক্ত জমিতে এ রোগ বেশি হয়। তাই জমি পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। রোগাক্রান্ত পরিত্যাক্ত অংশ সংগ্রহ করে নষ্ট করতে হবে। রোগের আক্রমন দেখা দিলে প্রপিকোনাজল গ্রুপের ছত্রাকনাশক টিল্ট প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি বা ম্যানকোজেব গ্রুপের ছত্রাক নাশক ডাইথেন এম-৪৫ বা ইন্ডোফিল এম ৪৫ প্রতি লিটার পানিতে ২.৫ গ্রাম মিশিয়ে ৭-১০ দিন পরপর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।
জনাব মো. ফজলু মিয়, উপজেলা : ত্রিশাল জেলা : ময়মনসিংহ
প্রশ্ন : কদবেল গাছের সার ব্যবস্থাপনা সম্পর্তে জানতে চাই?
উত্তর : গাছের যথাযথা বৃদ্ধি ও কাক্সিক্ষত ফলনের জন্য সার প্রয়োগ করা আবশ্যক। গাছের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে সারের পরিমাণও বাড়াতে হবে। বিভিন্ন গাছের জন্য প্রয়োজনীয় সারের পরিমাণ নি¤েœাক্ত ছকে দেওয়া হলো-
উল্লেখিত সার সামন তিন (০৩) কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। প্রথম কিস্তি বর্ষার প্রারম্ভে (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ), ২য় কিস্তি বর্ষার শেষে (ফল আহরণের পর) এবং ৩য় কিস্তি শীতের শেষে (মাঘ-ফাল্গুন) প্রয়োগ করতে হবে। সার গুলো একত্রে মিশিয়ে গাছের চার দিকে (গোড়া থেকে ০.৫-১.০ মিটার জায়গা ছেড়ে দিয়ে) ছিটিয়ে দিতে হবে। এরপর সার ছিটানো জায়গার মাটি কুপিয়ে সার গুলো মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। মাটিতে প্রয়োজনীয় রস না থাকলে সার প্রয়োগের পর অবশ্যই সেচ দিতে হবে।
প্রশ্নোত্তর
ড. আকলিমা খাতুন
জনাব যাকারিয়া, উপজেলা : ভেড়ামারা, জেলা : কুষ্টিয়া
প্রশ্ন : আদার কন্দ পচে যাচ্ছে। গাছের পাতা হলুদ হয়ে গাছ মারা যাচ্ছে। করণীয় কি?
উত্তর : এটি আদার ক্ষতিকারক ছাত্রাক জনিত রোগ। চুঃযরঁস ধঢ়যধহরফবৎসধঃঁস নামক ছত্রাকের কারণে এ রোগ হয়। এ রোগের ফলে কান্ডের উপরের অংশ পচে যায়। কন্দ পচে যায় এবং গাছ হলুদ থেকে লালচে হয়ে মারা যায়। এ রোগ প্রতিরোধে আক্রান্ত অংশ সংগ্রহ করে নষ্ট বা পুড়ে ফেলতে হবে। রোগমুক্ত গাছ থেকে কন্দ সংগ্রহ করতে হবে। রোগ প্রতিরোধক জাত ব্যবহার করতে হবে। এ ছাড়া কন্দ শোধন করা যায় বিভিন্ন উপায়ে। যেমন-কাঁচা গোবর পানিতে গুলে কন্দ শোধন করে ছায়ায় শুকিয়ে ব্যবহার করা যায়। কন্দ শোধন করার আরেকটি উপায় হচ্ছে ২ গ্রাম কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের আটোস্টিন বা নোইন বা মেনকোজেব ৩ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে আধা ঘন্টা শোধন করে ছায়ার শুকিয়ে নেওয়া। রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম কার্বোন্ডাজিম+মেনকোজেব গ্রুপের কমপ্যানিয়ন বা অটোস্টিন/নোইন বা কপার অক্সিক্লোরাইড গ্রুপের ৪ গ্রাম সানভিট বা ২% বর্দোমিকচার মিশিয়ে গাছের গোড়ায় স্প্রে করতে হবে।
জনাব হেমায়েত উদ্দীন, উপজেলা : হাটহাজারী, জেলা : চট্টগ্রাম
প্রশ্ন : পোকার কীড়া ঢেঁড়সের কচি ফল ও ডগা ছিদ্র করে ও ভিতরে কুরে কুরে খায়। সাথে ফুলের কুড়িও খাচ্ছে। করণীয় কি?
উত্তর : এটি ঢেঁড়সের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা। এ পোকা ঢেঁড়স গাছের কচি ফল ও ডগা ছিদ্র করে দেয়। ভিতরে কুরে কুরে খায়। কখনো কখনো ফুলের কুড়িও খেয়ে ফেলে। এ পোকা দমনে সপ্তাহে অন্তত একবার মরা বা নেতিয়ে পড়া ডগা, আকান্ত ফুল ও ফল সংগ্রহ করে কমপক্ষে এক হাত গভীর গর্ত করে পুতে ফেলতে হবে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ করে পোকার কীড়া বা পুত্তলি ধ্বংস করে ফেলতে হবে। বিকল্প পোষক গাছ যেমন তুলার আবাদ ঢেঁড়শের জমির কাছাকাছি করা যাবে না। চারা রোপণের ১৫ দিন পর থেকে ক্ষেত ঘন ঘন পর্যবেক্ষণ করতে হবে। আক্রমন দেখা দিলে জৈব বালাইনাশক ব্যবহার যেমন নিববিসিডিন ২ মিলি/লিটার পানিতে স্প্রে করতে হবে। আক্রমন তীব্র হলে অর্থাৎ শতকরা ১০ ভাগের বেশি ক্ষতি হলে যে কোন একটি বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে। যেমন সাইপারমেথ্রিন (রিপকর্ড/সাইমুন) ১ মিলি., প্রোফেনফোস+ সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের সবিক্রণ-২ মিলি., ক্লোরান ট্রানিলিপ্রোল+থায়ামেথোক্রাম গ্রুপের ভলিয়াম ফ্লেক্সি-০.৫ মিলি., এবামেকটিন বেনজয়েট ১ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
জনাব ফারুক আলী, উপজেলা : আত্রাই, জেলা : নওগাঁ
প্রশ্ন : আমার ধান গাছের পাতা পোকা মুড়িয়ে খেয়ে ফেলছে এবং পাতায় সাদা দাগ দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় করণীয় কি?
উত্তর : ধানের পাতা মোড়ানো পোকার আক্রমনে এই ধরনের লক্ষণ দেখা যায়। এই পোকা পাতা লম্বালম্বি ভাবে মুড়িয়ে পাতার সবুজ অংশ খেয়ে ফেলে, ফলে পাতায় সাদা লম্বা দাগ দেখা যায়। খুব বেশী ক্ষতি করলে পাতাগুলো পুড়ে যাওয়ার মত দেখায়। পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী পোকা পাতার মধ্য শিরার কাছে ডিম পাড়ে। কীড়াগুলো পাতার সবুজ অংশ খায় এবং বড় হবার সাথে সাথে তার পাতা লম্বালম্বিভাবে মুুড়িয়ে একটা নলের মত করে ফেলে। প্রাথমিক অবস্থায় পোকার ডিম বা কীড়াসহ পাতা সংগ্রহ করে ধ্বংস করতে হবে। আলোক ফাঁদের সাহায্যে পূর্ণবয়স্ক মথ ধরে মেরে ফেলতে হবে। জমিতে ডালপালা পুঁতে পোকাখেকো পাখির সাহায্যে পূর্ণ বয়স্ক মথ দমন করতে হবে। শতকরা ১৫ ভাগ পাতার ক্ষতি হলে অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। যেমন : কারবারিল গ্রুপের কীটনাশক সেভিন ৮৫ এসপি ১.৭ কেজি/হেক্টর, ডাইমেথয়েট গ্রুপের যেমন : টাফগর ৪০ ইসি ১.০ লিটার/হেক্টর অথবা ক্লোরোপাইরিফস গ্রুপের কীটনাশক যেমন : ডারসবান ২০ ইসি বা পাইক্লোরেক্স ২০ ইসি ২মিলি./লিটার হারে পানিতে মিশিয়ে সাত থেকে দশদিন পরপর ২ থেকে ৩ বার স্প্রে করে দিতে হবে।
লেখক : তথ্য অফিসার (উদ্ভিদ সংরক্ষণ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫। মোবাইল : ০১৯১৬৫৬৬২৬২; ই-মেইল : aklimadae@gmail.com