কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারী, ২০২৫ এ ০৬:৫১ PM

প্রশ্নোত্তর

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: মাঘ সাল: ১৪৩১ প্রকাশের তারিখ: ১২-০১-২০২৫

প্রশ্নোত্তর

কৃষিবিদ ড. আকলিমা খাতুন

নিরাপদ ফসল উৎপাদনের জন্য আপনার ফসলের ক্ষতিকারক পোকা ও রোগ দমনে সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনা অনুসরণ করুন।
জনাব আল আমিন, উপজেলা : পীরগঞ্জ, জেলা : রংপুর
প্রশ্ন : আম গাছে মুকুল-ফুল-গুটি এসেছে। মুকুলে পাউডারের গুঁড়ার মতো ছত্রাকের আক্রমণ হয়েছে এবং গুটি ঝরে যাচ্ছে। এ অবস্থায় করণীয় কী?
উত্তর : আমের গুটিতে ছত্রাকজনিত রোগ পাউডারি মিলডিউ এর আক্রমণ দেখা দিয়েছে। এর ফলে আক্রান্ত অংশে পাউডারের গুঁড়ার মতো এক প্রকার জিনিস দেখা যায়। এ রোগের ব্যাপক অবস্থায় আক্রন্ত অংশ সাদা পাউডারে মুকুল ঢেকে যায়। গুটি ঝরে পড়ে। পাউডারি মিলডিউ রোগের জন্য ফুল আসার আগে একবার এবং ফুল ধরার পর একবার সালফার জাতীয় ছত্রাকনাশক যেমন কুমুলাস ডিএফ, ম্যাকসালফার, থিওভিট, রনভিট ২ গ্রাম হারে প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
জনাব সবুজ আলম, উপজেলা : পাটগ্রাম, জেলা : লালমনিরহাট
প্রশ্ন : শিম গাছে জাব পোকার আক্রমণ। করণীয় কী?
উত্তর : জাব পোকা শিম গাছের ডগা, পাতা, কা-, ফুল ও ফলের রস চুষে খায়। আক্রান্ত গাছে ফুল ও ফল হয় না। আক্রমণ বেশি হলে ডগা মারা যায়। এ ক্ষেত্রে এ পোকার আক্রমণ এড়ানোর জন্য আগাম শিমের জাত বপন করতে হবে। আক্রমণ হয়ে গেলে জৈব বালাইনাশক বাইকা- ২ মিলি, অথবা সাবানের গুঁড়া ৫ গ্রাম, প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। রাসায়নিক দমন ব্যবস্থা হিসেবে ইমিডাক্লোরপিড জাতীয় কীটনাশক  (যেমন : এডমায়ার অথবা টিডো ১ মিলি/ লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। ১ সপ্তাহ পর পর ২-৩ বার।
জনাব মোরশেদ আলম, উপজেলা : তারাকান্দা, জেলা : ময়মনসিংহ
প্রশ্ন : আলু গাছের পাতা ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে এবং ছোট ছোট দাগ দেখা যাচ্ছে। দাগগুলো ধীরে ধীরে কাল হয়ে পাতা পচে যাচ্ছে। করণীয় কী?
উত্তর : এটি আলুর নাবী ধসা বা মড়ক রোগ নামে পরিচিত। এই রোগের আক্রমণে প্রথমে গাছের গোড়ার পাতায় দাগ দেখা যায়। সকাল বেলা পাতার নিচে সাদা পাউডারের মতো জীবাণু দেখা যায়। ঘন কুয়াশা ও মেঘলা আবহাওয়ায় এই রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে। এ রোগে আক্রান্ত আলুর গায়ে বাদামি থেকে কালচে দাগ পড়ে। আগাম আলু চাষ বা রোগ সহনশীল জাত চাষ করে এ রোগের মাত্রা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। আক্রান্ত জমিতে রোগ নিয়ন্ত্রণ না হওয়া পর্যন্ত সেচ প্রদান বন্ধ রাখতে হবে। নিজের বা পাশ্ববর্তী ক্ষেতে রোগ দেখা মাত্রই এক্রোবেট এম জেড (ম্যানকোজেব ৬০%+ডাইমেথোমর্ফ৯%) ২ গ্রাম/লিটার অথবা জ্যামপ্রো ডিএম (এমেটোকট্রাডিন ৩০%+ ডাইমেথোমর্ফ ২২.৫%) ২ মিলি/ লিটার পানিতে মিশিয়ে সাতদিন পর পর ২/৩ বার স্প্রে করতে হবে। যদি কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া দীর্ঘ সময় থাকে এবং রোগের মাত্রা ব্যাপক হয় তাহলে মেলোডি ডুও ৬৬.৮ ডব্লিউপি  (প্রোপিনেব ৭০%+ ইপ্রোভেলিকার্ব) ৪ গ্রাম+সিকিউর ৬০০ ডব্লিউজি (ম্যানকোজেব ৫০%+ ফেনামিডন ১০%) ১ গ্রাম / লিটার পানিতে মিশিয়ে পাঁচদিন অন্তর স্প্রে করে গাছ ভালভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে।
জনাব মো: সেলিম মিয়া, উপজেলা : পীরগঞ্জ, জেলা : রংপুর
প্রশ্ন : পোকা শালগম গাছের গোড়া মাটি বরাবর কেটে দিচ্ছে। কি করতে পারি?
উত্তর : এটি শালগমের কাটুই পোকা যা রাতের বেলা গাছের গোড়া কেটে দেয়। সকাল বেলা চারা মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। কেটে ফেলা চারার আশে পাশে মাটি খুড়ে পোকা বের করে মেরে ফেলতে হবে। কেরোসিন মিশ্রিত পানি সেচ দেয়া যেতে পারে। পাখি বসার জন্য ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে দিতে হবে। রাতে ক্ষেতের মাঝে মাঝে আবর্জনা জড়ো করে রাখলে তার নিচে কীড়া এসে জমা হবে। সকালে সেগুলোকে মেরে ফেলতে হবে। আক্রান্ত জমিতে ফিপ্রোনিল গ্রুপের কীটনাশক যেমন: রিজেন্ট ৩ জিআর ১০ কেজি/হেক্টর অথবা ক্লোরোপাইরিফস গ্রুপের কীটনাশক যেমন : পাইক্লোরেক্স ২০ ইসি ৩.৫ মিলি/লিটার পানিতে মিশিয়ে সাত থেকে দশদিন পর পর দুই থেকে তিনবার স্প্রে করে দিতে হবে।
জনাব সুমন, উপজেলা : কালীগঞ্জ, জেলা : লালমনিহাট
প্রশ্ন : পেঁয়াজের পাতা উপর থেকে মরে আসছে। করণীয় কী?
উত্তর : অষঃবৎহধৎরধ ঢ়ড়ৎৎর নামক ছত্রাকের আক্রমণে পেঁয়াজের পার্পল ব্লচ রোগ হয়। এ রোগের আক্রমণে পাতায় ও বীজকা-ে পানি ভেজা তামাটে, বাদামি বা হালকা বেগুনি রংয়ের দাগ দেখা যায়। আক্রান্ত পাতা উপর থেকে মরে আসে। এক সময় পাতা/গাছ ভেঙে যায়। এ রোগে আক্রান্ত পাতা ও বীজকা- ২.৫ গ্রাম হারে প্রতি কেজি বীজ শোধন করতে হবে। প্রোপিকোনাজল গ্রুপের টিল্ট  ০.৫ মিলি বা কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ব্যাভিস্টিন ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে  মিশিয়ে ১২ দিন পরপর ২ বার স্প্রে করতে হবে।
জনাব আবদুর রহমান, উপজেলা : দেবীগঞ্জ, জেলা : পঞ্চগড়
প্রশ্ন : বাঁধাকপির পাতায় দাগ দেখা যাচ্ছে। কি করতে হবে?
উত্তর : ঈবৎপড়ংঢ়ড়ৎধ ংঢ়. ছত্রাকের আক্রমণে বাঁধাকপির পাতায় দাগ দেখা যায়। এ রোগের আক্রমণে প্রথমে পাতায় হলুদ রংয়ের দাগ পড়ে এবং তা পরে কালো হয়ে যায। দাগগুলো একত্র হলে সম্পূর্ণ পাতাটি নষ্ট হয়। রোগের জীবাণু বাতাস দ্বারা ছড়ায়। ক্ষেত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। রোগাক্রান্ত পাতা তুলে নষ্ট করতে হবে। আক্রমণ দেখা দিলে ইপ্রোডিয়ন গ্রুপের রোভরাল ২ গ্রাম বা মেনকোজেব গ্রুপের ডাইথেন এম-৪৫ ২.৫গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে ১০-১২ দিন পর পর ২/৩ বার।
জনাব আবু বাকের, উপজেলা : রংপুর সদর, জেলা : রংপুর
প্রশ্ন : ভুট্টা গাছের কচি পাতার সবুজ অংশ কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়ে একই সারিতে ছোট ছোট গোলকার জালিকার ছিদ্র তৈরি করছে ফলে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে এবং আক্রান্ত গাছে ভেজা লাল বাদামি রঙের পোকার মল দেখা যাচ্ছে, এর প্রতিকার কী?
উত্তর : ভুট্টার ফল আর্মি ওয়ার্ম পোকার আক্রমণে ভুট্রা গাছের সাধারণত এই লক্ষণ দেখা যায়। ফল আর্মি ওয়ার্ম পোকা দলবদ্ধভাবে এক ফসল থেকে অন্য ফসলে আক্রমণ করে। এই পোকার কীড়া ভুট্টা গাছের কচি পাতা ও কচি মোচার ভিতরে ভুট্টার দানা খেয়ে ফেলে, ডিম থেকে কীড়া বের হওয়ার পরই দলবদ্ধভাবে কচি পাতার সবুজ অংশ কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়ে ছোট ছোট গোলাকার জালিকার ছিদ্র করে। পরবর্তীতে কীড়া বড় হওয়ার সাথে সাথে ভুট্টা গাছের ডগার ভিতর ঢুকে পড়ে ও ডগার ভেতর কচি পাতা খেয়ে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত করে, মোচা ধরা পর্যায়ে আক্রমণ করলে ভুট্টার কচি মোচা ছিদ্র করে ভিতরে প্রবেশ করে এবং ভুট্টার দানা খেয়ে ফলন কমিয়ে দেয়। আক্রান্ত গাছে ভেজা লাল বাদামি রঙের পোকার মল দেখা যায়, কীড়ার ৪র্থ থেকে ৬ষ্ঠ ধাপ অবস্থায় খাদ্য চাহিদা বেড়ে যায় এবং এক রাত্রের মধ্যে পুরো ফসল নষ্ট করে। এই পোকা দমনের জন্য প্রতিরোধ ও প্রতিকার দু’ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিরোধমূলক দমন ব্যবস্থা হিসেবে একই জমিতে বার বার ভুট্টা চাষ পরিহার করতে হবে, ভুট্টার সাথে আন্ত:ফসল হিসেবে শিম জাতীয় ফসল চাষ করতে হবে, ভুট্টার বীজ শোধন করে লাগাতে হবে, বিঘাপ্রতি ৫০ মিটার দূরে দূরে ৫টি ফাঁদ ব্যবহার করতে হবে। চারা গজানোর পর সপ্তাহে কমপক্ষে ১ দিন জমিতে পাতা খাওয়ার লক্ষণ বা পোকার মল দেখে আক্রান্ত গাছ শনাক্ত ও আক্রমণের মাত্রা নির্ণয় করতে হবে। প্রতিকারমূলক দমন ব্যবস্থা হিসেবে আক্রান্ত ফসলে প্লাবন সেচ দিতে হবে, আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে জৈব বালাইনাশক যেমন- স্পোডোপটেরা ফুজিপারডা নিউক্লিয়ার-১৬ লিটার পানিতে ৫ মিলিগ্রাম মিশিয়ে পড়ন্ত বিকেলে পাতার উপর ও নিচ ভিজিয়ে স্প্রে দিতে হবে ৫-৭ দিন পর পর ২-৩ বার।
জনাব সুমিত্রা বিশ্বাস, উপজেলা : কালীগঞ্জ, জেলা : ঝিনাইদাহ
প্রশ্ন : টমেটো গাছের উপরের অংশ কুঁকড়ে যাচ্ছে, পাতা মুড়িয়ে যাচ্ছে এবং গাছ আকৃতিতে ছোট হয়ে যাচ্ছে। এর প্রতিকার কী?
উত্তর : এটি টমেটোর এক ধরনের ভাইরাস রোগ। একে টমেটোর পাতা কোঁকড়ানো বা কার্লিটপ ভাইরাস বলা হয়। এই ভাইরাস লিফ হপার নামক পোকা দ্বারা ছড়ায়। এই ভাইরাসের আক্রমণে গাছের উপরের অংশ কুঁকড়ে যায়, পাতা মুড়িয়ে যায় ও চামড়ার মতো পুরু হয় এবং গাছ আকৃতিতে ছোট হয়। প্রতিকার হিসেবে আক্রান্ত গাছ দেখা মাত্র তুলে ধ্বংস করতে হবে। হলুদ আঠালো ফাঁদ ব্যবহার করতে হবে, রোগমুক্ত গাছ হতে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। ভাইরাসের বাহক পোকা দমনের জন্য ডাইমেথোয়েট গ্রুপের টাফগর ১০ লিটার পানিতে ২০ মিলি হারে মিশিয়ে ৫ শতাংশ জমিতে অথবা ইমিডাক্লোরপিড গ্রুপের কীটনাশক টিডো ২০ এসএল প্রতি ১০ লিটার পানিতে ৫ মিলি মিশিয়ে ৫ শতাংশ জমির গাছ সম্পূর্ণ গাছ ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে।
জনাব রুমেলা খাতুন, উপজেলা : ভাঙ্গা,  জেলা : ফরিদপুর
প্রশ্ন : চীনাবাদামের পাতার উপর হলদে রেখা বেষ্টিত বাদামি রঙের গোলাকার দাগ সৃষ্টি হয় এবং দাগগুলো ক্রমেই বড় হয়ে সমগ্র পাতায় ছড়িয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে পাতা ঝড়ে যাচ্ছে এর প্রতিকার কী?
উত্তর : এটি চীনাবাদামের টিক্কা রোগ নামে পরিচিত। এটি Cercorpora arachidicola নামক ছত্রাকের আক্রমণে হয়ে থাকে।  এ রোগের কারণে পাতার উপরে হলদে রেখা বেষ্টিত বাদামি রঙের গোলাকার দাগ সৃষ্টি হয়। দাগগুলো ক্রমেই বড় হয়ে গাঢ় বাদামি হতে কালচে বর্ণের হয় এবং ছড়িয়ে পড়ে শেষে ধীরে ধীরে পাতা ঝরে যায়। প্রতিকার হিসেবে রোগসহনশীল জাতের চাষ করতে হবে এবং ফসল কাটার পর আগাছা পুড়ে ফেলতে হবে। জমিতে রোগ দেখা দিলে কার্বোন্ডিজম গ্রুপের নোইন ৫০ ডব্লিউপি অথবা ম্যানকোজেব গ্রুপের ডাইথেন   এম  ৪৫ ২ গ্রাম/লিটার অথবা প্রপিকোনাজল ০.৫ মিলি/লিটার পানিতে মিশিয়ে ১২-১৫ দিন পর পর ২-৩ বার শেষ বিকেলে স্প্রে করতে হবে।  

লেখক : তথ্য অফিসার (উদ্ভিদ সংরক্ষণ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫। মোবাইল : ০১৯১৬৫৬৬২৬২; ই-মেইল : aklimadae@gmail.com

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন