কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৫ এ ১১:২০ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: ভাদ্র সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৭-০৮-২০২৫
প্রশ্নোত্তর
নিরাপদ ফসল উৎপাদনের জন্য আপনার ফসলের ক্ষতিকারক পোকা ও রোগ দমনে সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনা অনুসরণ করুন।
জনাব সুমন বেপারী, উপজেলা: আত্রাই, জেলা: নওগাঁ
প্রশ্ন : আখের কা- শুকিয়ে আখ মারা যাচ্ছে এবং আখ লম্বালম্বিভাবে চিড়লে লাল রঙের ছাপ দেখা যায়। করণীয় কী?
উত্তর : এটি আখের লাল পচা রোগ। ঈড়ষষবঃড়ঃৎরপযঁস ভধষপধঃঁস নামক ছত্রাকের কারণে এ রোগ দেখা দেয়। এ রোগে আক্রান্ত হলে কা- পচে যায় এবং পচা অংশ হতে দুর্গন্ধ বের হয়। আক্রান্ত আখ লম্বালম্বিভাবে চিড়লে লাল রঙের মাঝে আড়াআড়ি সাদা ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়। কচি কুশি হলে কুশির মড়ক দেখা যায়।
প্রতিকার : অনুমোদিত ও রোগ প্রতিরোধী জাত চাষ করতে হবে। মুড়ি আখের চাষ না করা। আখের জমিতে পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা করা এবং বীজ বপনের পূর্বে ব্যাভিস্টিন নামক ছত্রাকনাশক দ্বারা বীজ শোধন করতে হবে। ফসল কাটার পর ক্ষেতের অবশিষ্টাংশ পুড়িয়ে নষ্ট করা।
জনাব সবুজ আলী, উপজেলা : আমতনী জেলা : বরগুনা
প্রশ্ন : আমার পাট গাছে এক ধরনের পোকার আক্রমণ হয়েছে। পোকাগুলো পাতার সবুজ অংশ খেয়ে ঝাঝরা করে দিচ্ছে। কোন কোন গাছকে ডাটা সার করে ফেলছে। করণীয় কী?
উত্তর : এটি পার্টের বিছা পোকার আক্রমণে এমনটি হয়ে থাকে। পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী মথ পাতায় ডিম পাড়ে এবং ডিম ফুটে প্রথম দিকে কীড়া পাতার নিচে দলবদ্ধ অবস্থায় থাকে। এই পোকার আক্রমণ দেখা দিলে ডিমের গাদাসহ পাতা সংগ্রহ করে নষ্ট করতে হবে। দলবদ্ধ কীড়াসহ পাতা সংগ্রহ করে নষ্ট করতে হবে। কেরোসিন মিশ্রিত পানিতে দড়ি ভিজিয়ে সে দড়ি দিয়ে ক্ষেতে টানা দিলে পোকার আক্রমণ কিছুটা কমানো যাবে। এ ছাড়াও আক্রমণ বেশি হলে প্রতি লিটার পানিতে কার্বারিল গ্রুপের কীটনাশক সেভিন ২ গ্রাম, সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক রিপকর্ড ১ মিলি, ক্যারাটে-১ মিলি, ডায়াজিনন ২ মিলি, প্লাটিনাম/নাইজ ১ গ্রাম, প্রোক্লেন-১ গ্রাম, পেনসিল/সানকো-১ গ্রাম, যে কোন বালাইনাশক ব্যবহার করতে পারেন।
জনাব নবীন কুমার উপজেলা : পাবনা সদর, জেলা : পাবনা।
প্রশ্ন : আমার লাউ গাছে ও পাতায় সাদা পাউডারের মতো আবরণ দেখা যাচ্ছে। আক্রমণ বেশি হলে পাতা হলুদ ও কালো হয়ে মারা যাচ্ছে। করণীয় কী?
উত্তর : প্রতি লাউ এর পাউডারী রোগ উরফরঁস ড়ঢ়ঢ় নামক ছত্রাকের আক্রমণে হয়ে থাকে। আক্রমণ দেখা দিলে হেক্টরপ্রতি ১৫ কেজি সালফার গুঁড়া ক্ষেতের গাছে ছিটিয়ে দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়। আক্রান্ত গাছের পরিত্যক্ত অংশ সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলতে হবে। এ ছাড়াও প্রোপিকোনাজল গ্রুপের ছত্রাক টিল্ট ২৫০ ইসি, সালফার (রনভিট)-২গ্রাম/প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। এ ছাড়াও এই প্রতিরোধের জন্য আগাম বীজ বনন, রোগ প্রতিরোধ জাত ও সুষম সার ব্যবহার করতে হবে।
জনাব মনিরুল ইসলাম, উপজেলা : শিবালয়, জেলা : মানিকগঞ্জ
প্রশ্ন : পটল গাছের কা- থেকে কষ বা আঠা ঝরে। করণীয় কী ?
উত্তর : এটি পটলের গ্যামোসিস রোগ, উরফুসবষষধ নৎধহরধপ নামক ছত্রাকের কারণে এ রোগ হয়। আক্রান্ত গাছের কান্ড থেকে কষ বা আঠা ঝরে এবং বাকল ফেটে কষ পড়ে। আস্তে আস্তে গাছ নষ্ট হয়ে যায়। এ রোগ প্রতিরোধ করার জন্য আক্রান্ত গাছ তুলে নষ্ট বা পুড়ে ফেলতে হবে। রোগমুক্ত গাছ থেকে কাটিং সংগ্রহ করতে হবে। কাটিং ছত্রাকনাশক দ্বারা শোধন করে রোপণ করতে হবে। আক্রান্ত কা-ে বর্দো পেস্ট (১০০ গ্রাম তুঁত + ১০০ গ্রাম চুন + ১ লিটার পানি লাগাতে হবে এবং ১% বর্দোমিকচার কার্বালিক বা কপার অক্সিক্লোবাইড সানভিট ৪ গ্রাম স্প্রে করতে হবে। এ ছাড়া ২০% ক্রিসোট তেল বা কার্বালিক এসিড (৫০% কার্বলিক + ৫০% পানি) দ্বারা প্রলেপ দিতে হবে। প্রতি লিটার পানিতে মেনকোজেব + মেটালেক্সিল গ্রুপের রিডোমিল্ড গোল্ড ২ গ্রাম অথবা ফেনামিডন + মেনকোজেব গ্রুপের সিকিউর ১ গ্রাম ৭-১০ দিন পর পর ২-৩বার স্প্রে করতে হবে।
জনাব জুয়েল খান, জেলা : কুড়িগ্রাম, উলিপুর : উলিপুর
প্রশ্ন : বিনা চাষে মাষকলাই চাষ সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর : হাওর বা চর এলাকায় বিনা চাষে মাষকলাই করে ভালো উৎপাদন পাওয়া যায়। ৮০-৮৫ দিনে মাষকলাই ঘরে তোলা যায় এবং হেক্টর প্রতি ১৫০০ কেজির মতো ফলন পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে বারি মাস-৩ জাতের মাষকলাই ব্যবহার করতে হবে। নদী তীরবর্তী এলাকায় যে সব জমিতে ভাদ্র মাসের শেষে পানি নেমে যায়, সে সব জমিতে এটি চাষ করে সহজেই বোরো ধান আবাদ করা যায়। ছিটিয়ে বপন করলে হেক্টর প্রতি ৪০ কেজি মতো বীজ লাগে। বিঘাপ্রতি ইউরিয়া লাগবে ৫-৬ কেজি, টিএমপি ১০-১৩ কেজি, এমওপি ৫-৬ কেজি, জিপসাম ৭-৮ কেজি, বোরন ১-৫ কেজি। সব সার জমিতে বীজ বপনের আগে প্রয়োগ করতে হবে। বারি মাস-৩ জাতটি হলদে মোজাইক রোগ প্রতিরোধী। স্থানীয় জাতের চেয়ে এই বীজের আকার বড় হয়। এতে আমিষের পরিমাণ২১-২৪ শতাংশ।
জনাব অন্তর মন্ডল, উপজেলা : হরিণাকু-, জেলা : ঝিনাইদহ
প্রশ্ন : আমার ধানের গাছে পোকা পাতার সবুজ অংশ খেয়ে ফেলছে, পরে পাতা সাদা হয়ে খড়ের রং ধারণ করছে। এর প্রতিকার সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর : ধানের পামরী পোকা ধানের পাতার সুবজ অংশ খেয়ে ফেলে, ফলে পাতা সাদা হয়ে খরের রং ধারণ করে। পূর্ণ বয়স্ক ও কীড়া উভয় অবস্থায় এ পোকা ধানের ক্ষতি করতে পারে। এর প্রতিকার হিসেবে হাতজাল দিয়ে পোকা মেরে ফেলতে হবে, আক্রান্ত ক্ষেতের পাতার উপর থেকে- ৩-৪ সেমি. কেটে পাতাগুলো নষ্ট করতে হবে। ক্ষেতের অধিকাংশ পাতা প্রায় ৩৫% ক্ষতিগ্রস্ত হলে রাসায়নিক দমন ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে ভাইমেথয়েট গ্রুপের টাফগর ১-২ মিলি ১ লিটার পানিতে অথবা কারটাপ গ্রুপের ব্রাভো ৫০ এসপি ৬ গ্রাম হারে প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা যেতে পারে।
জনাব তাজুল ইসলাম, উপজেলা : বিরল জেলা : দিনাজপুর।
প্রশ্ন : টমেটো চাষের সার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর : শতকপ্রতি পচা গোবর/কম্পোস্ট ৪০ কেজি, ইউরিয়া ১.২০ কেজি, টিএসপি ৮১০ গ্রাম, এমওপি/পটাশ ৯৭০ গ্রাম প্রয়োগ করতে হবে। সমুদয় গোবর, টিএসপি ও ৩৬০ গ্রাম পটাশ সার জমি তৈরির আগে শেষ চাষের সময় মাটিতে প্রয়োগ করতে হবে। চারা রোপণের ১০ দিন পর ১ম বার ৪০০ গ্রাম করে ইউরিয়া, ২৫ দিন পর ২য় বার এবং ৪০ দিন পর তৃতীয় বারে যথাক্রমে ৪০০ গ্রাম করে ইউরিয়া এবং ২৮০ গ্রাম ও ২৪০ গ্রাম পটাশ সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে।
জনাব হাবিবুর রহমান উপজেলা : ধুনট জেলা : বগুড়া
প্রশ্ন : মরিচের চারার গোড়ায় পচন দেখা যাচ্ছে, কী করণীয়?
উত্তর : চারা অবস্থায় ছত্রাক দ্বারা এই রোগ ঘটে থাকে। বীজ বপনের পর পরই বীজ পচে যেতে পারে অথবা চারা মাটি থেকে উঠার পর চারা গাছ ফ্যাকাশে, লিকলিকে ও ও দুর্বল দুর্বল হয়। কচি চারার গোড়ায় পানিভেজা দাগ পড়ে ও চারা ঢলে পড়ে মারা যায়। এই রোগ দমন করতে হলে মরিচ বীজ কাবক্সিন + থিরাম গ্রুপের প্রোভেক্স দ্বারা শোধন করে বপন করতে হবে। আক্রান্ত অবস্থায় কাবেন্ডাজিম অটোস্টিন বা নোইন প্রতি লিটার ২ গ্রা, হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
জনাব আমজাদ মিয়া উপজেলা : পলাশবাড়ি তেলা : গাইবান্ধা
প্রশ্ন : ধুন্দলের ফল মাছি পোকার আক্রমণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। করণীয় কি?
উত্তর : ফলের নিচের দিকে স্ত্রী মাছি ডিম পাড়ে এবং সেখান থেকে পানির মতো তরল পদার্থ বেড়িয়ে আসে যা শুকিয়ে বাদামি রং ধারণ করে। ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে ফলের শাস খেতে শুরু করে এবং ফল বিকৃত হয়ে যায় এবং হলুদ হয়ে পচে ঝরে যায়। এই রোগে আক্রান্ত হলে আক্রান্ত ফল বা ফুল সংগ্রহ করে পুড়ে ফেলতে হবে। প্রথম ফুল আসা মাত্র কুমড়াজাতীয় ফসলের ফেরোমন ফাঁদ স্থাপন করতে হবে। প্রতি দশ শতাংশের জন্য ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার হয় ৩টি করে। আম বা খেজুরের রসে সামান্য বিষ মিশিয়ে তা বোতলে রেখে জানালা কেটে দিয়ে ক্ষেতের মাঝে স্থাপন করা যেতে পারে। পাকা মিষ্টি কুমড়া বা কুমড়া জাতীয় ফল ১০০ গ্লাম কুচি কুচি করে কেটে তাতে সামান্য বিষ যেমন সপসিন (আইসোপ্রোকার্ব) ০.২৫ গ্লাম মিশিয়ে। বিষটোপ তৈরি করে মাটির পাত্রে করে ক্ষেতের মাঝে মাঝে স্থাপন করতে হবে। এ ছাড়া সাইপারমেথ্রিন গ্রুপে কীটনাশক ১ মি.লি হারে পানিতে মিশিয়ে সাত থেকে দশদিন পর পর স্প্রে করে দিতে হবে।
জনাব রেজাউল করিম উপজেলা : রায়পুরা জেলা : নরসিংদী
প্রশ্ন : ধান গাছের ডিগপাতার খোলে অসংখ্য বাদামি দাগ দেখা যাচ্ছে এবং আস্তে আস্তে দাগগুলো সমস্ত খোলে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতিকার কী
উত্তর : এটি একটি ছত্রাকজনিত রোগ এবং ধানের খোলপচা রোগ নামে পরিচিত। এই রোগ সাধারণত ধানগাছের ডিগপাতার খোলে হয়। প্রথমে খোলে ছোট ছোট নানা আকারের বাদামি দাগ হয়। দাগগুলো আস্তে আস্তে বেড়ে একত্রে মিশে সমস্থ খোলেই ছড়িয়ে পড়ে। এই অবস্থায় যদি শীষ বের হয় তাহলে ধান চিটা ও অপুষ্ট হয়। অনেক সময় শীষ অর্ধেক বের হতে পারে বা একেবারেই পারে না। প্রতিকার হিসেবে রোগ প্রতিরোথ সম্পন্ন জাত ব্যবহার করতে হবে এবং সুষম মাত্রার সার প্রয়োগ করতে হবে। রোগ দেখা দিলে জমির পানি শুকিয়ে কয়েকদিন পর আবার সেচ দিতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে টিল্ট ২৫০ গ্রাম ইসি (প্রোপিকোনাজল) অথবা নাটিভো (ট্রাইসাইক্রোজেন) ১০ লিটার পানিতে ৫ মিলি মিশিয়ে সাত থেকে দশদিন পর পর স্প্রে করতে হবে।
লেখক : তথ্য অফিসার (কৃষি), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫। মোবাইল : ০১৯১৬৭৪১১৯৩;