কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৪ এ ০৬:৪১ PM
কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: মাঘ সাল: ১৪৩০ প্রকাশের তারিখ: ৩০-০১-২০২৪
প্রশ্নোত্তর
কৃষিবিদ আকলিমা খাতুন
নিরাপদ ফসল উৎপাদনের জন্য আপনার ফসলের ক্ষতিকারক পোকা ও রোগ দমনে সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনা অনুসরণ করুন।
জনাব মামুন মিয়া, উপজেলা : বদলগাছী, জেলা : নওগাঁ
প্রশ্ন : আলুর শুকনো পচা রোগ কিভাবে দমন করব?
উত্তর : ফিউজারিয়াম প্রজাতির ছত্রাকের আক্রমণে আলুর শুকনো পচা রোগ হয়। আলুর গায়ে কিছুটা গভীর কালো দাগ পড়ে ও ভেতরে গর্ত হয়ে যায়। প্রথম পচন ভিজা থাকলেও পরে তা শুকিয়ে শক্ত হয়ে যায়। আক্রান্ত অংশে গোলাকার ভাঁজ এবং কখনো কখনো ঘোলাটে সাদা ছত্রাক জালিকা দেখা যায়। এ রোগ দমন করার জন্য নি¤েœাক্ত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
আলু ভালভাবে বাছাই গ্রহণ করে সংরক্ষণ করতে হবে।
যথাযথভাবে কিউরিং করে আলু গুদামজাত করতে হবে।
ম্যানকোজেব গ্রুপের ডাইথেন এম-৪৫ দ্রবণ ০.২% দ্বারা বীজ আলু শোধন।
বস্তা, ঝুড়ি, গুদামঘর ইত্যাদি ৫% ফরমালিন দিয়ে শোধন করতে হবে।
জনাব মো: আমজাদ মিয়া, উপজেলা : হরিরামপুর, জেলা : মানিকগঞ্জ
প্রশ্ন : আদা গাছের পাতা হলুদ হয়ে গাছ আস্তে আস্তে নেতিয়ে পড়ছে এবং শুকিয়ে মারা যাচ্ছে। করণীয় কী?
উত্তর : এটি আদার কন্দ পচা বা রাইজম রট রোগ নামে পরিচিত, যা ছত্রাকের আক্রমণে হয়ে থাকে। কা-ের উপরের অংশে এ রোগ আক্রমণ করে। আক্রান্ত গাছের পাতা প্রথমে হলুদ হয়ে যায় কিন্তু গাছের পাতায় কোন দাগ থাকে না। পরবর্তীতে গাছ শুকিয়ে মারা যায়। আক্রান্ত গাছের কন্দ পচে যায় এবং পচা দুর্গন্ধ বের হয়। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত গাছে রাইজম ফ্লাই নামক পোকার আধিক্য দেখা যায়। এ রোগ আক্রান্ত হলে আক্রান্ত অংশ সংগ্রহ করে নষ্ট বা পুড়ে ফেলতে হবে। কাঁচা গোবর পানিতে গুলে কন্দ শোধন করে ছায়ায় শুকিয়ে ব্যবহার করতে হবে। ২ গ্রাম হারে রিডোমিল গোল্ড ম্যানকোজেব ৬৪% মেটালেক্সিল ৮% বা নোইন ৫০ ডব্লিউপি (কার্বেন্ডাজিম) বা ম্যানকোজেব ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে আধা ঘণ্টা শোধন করে ছায়ায় শুকিয়ে ব্যবহার করতে হবে। স্টেবল ব্লিচিং পাউডার প্রতি হেক্টরে (২৪৭ শতকে) ২০ কেজি হারে শেষ চাষের সময় জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। রোগ দেখা দেওয়া মাত্রই প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম কমপ্যানিয়ন (ম্যানকোজেব ৬৩%+ কার্বেন্ডাজিম ১২% বা নোইন ৫০ ডব্লিউপি (কার্বেন্ডাজিম) বা রিডোমিল গোল্ড (ম্যানকোজেব ৬৪%+ মেটালেক্সিল ৮% বা ডাইথেন এম-৪৫ (ম্যানকোজেব) বা ১% বর্দোমিক্সচার মিশিয়ে গাছের গোড়ায় স্প্রে করতে হবে।
জনাব বিপ্লব, উপজেলা : রানীশংকৈল, জেলা : ঠাকুরগাঁও
প্রশ্ন : মিষ্টি আলুর গাছে খর্বাকৃতির ও হলুদ রঙের হয়। পরে আক্রান্ত গাছ কালো কালো হয়ে যায়। গুদামজাত অবস্থায় টিউবারেও এ দাগ হয়। এই রোগ দমনে করণীয় কি?
উত্তর : রোগমুক্ত মিষ্টি আলুর লতা লাগাতে হবে। শস্যপর্যায় অবলম্বন করতে হবে। কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন (অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন+ থিরাম গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন- প্রোভ্যাক্স ২০০ উব্লিউপি) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে তার মধ্যে লতা ডুবিয়ে শোধন করে নিয়ে জমিতে লাগাতে হবে। সংরক্ষিত টিউবারকে এ রোগের আক্রমন হতে রক্ষা করতে টিউবারকে সংরক্ষণের পূর্বে ভালোভাবে কিউরিং করে নিতে হবে। এ রোগ কমানোর জন্য কাটা, ছেঁড়া ও থেঁতলানো টিউবার বেছে নিতে নিখুঁত টিউবার সংরক্ষণ করতে হবে।
জনাব সিয়াম, উপজেলা : নলছিটি, জেলা : ঝালকাঠি
প্রশ্ন : বার্লির পাতায় ছোট ছোট দাগ পড়ে । পরে বাড়তে থাকে এবং গাঢ় বাদামি থেকে কালো বর্ণ ধারণ করে। এই রোগ কেন হচ্ছে এবং দমনে করণীয় কী?
উত্তর : গাছের পরিত্যক্ত অংশ সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। প্রোপিকোনাজন গ্রুপের ঔষধ টিল্ট ২৫০ ইসি (.০৫%) ০.৫ মিলি হারে প্রতি লিটার পানিতে মিশিতে ১০-১২ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে। ভিটাভেক্স ২০০ প্রতি কেজি বীজে (২.৫-৩.০) গ্রাম মিশিয়ে বীজ শোধন করতে হবে।
জনাব রুবেল, উপজেলা : কুষ্টিয়া সদর, জেলা : কুষ্টিয়া
প্রশ্ন : লাউয়ের পাতার উপরের দিকে সাদা রঙের পাউডারের মতো দাগের সৃষ্টি হয়েছে। কী করণীয়?
উত্তর : লাউয়ের পাউডারি মিলডিউ রোগ (ড়রফরঁস ংঢ়ঢ়.) ছত্রাকজনিত রোগ। এ রোগের কারণে পাতার উপরের দিকে সাদা রঙের পাউডারের মতো দাগের সৃষ্টি হয় এবং পরে দাগগুলো বড় হয়ে সমস্ত পাতায় ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগের কারণে ফলের গুণগত মান কমে যায় এবং ফলন কমে যায়। আক্রমণ বেশি হলে পাতা হলুদ বা কালো হয়ে মারা যায়। আগাম বীজ বপন করতে হবে। রোগ প্রতিরোধী জাত ব্যবহার করতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে হেক্টর প্রতি ১৫ কেজি সালফার গুড়া ক্ষেতের গাছে ছিটিয়ে দিলে ভাল ফল পাওয়া যায়। সুষম সার প্রয়োগ করতে হবে। আক্রান্ত গাছের পরিত্যক্ত অংশ সংগ্রহ করে নষ্ট করতে হবে। ৭ দিন পর পর ৩ বার প্রোপিকোনাজল ০.৫ মিলি বা সালফার (রনভিট)-২ গ্রাম/প্রতিলিটার পানি মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। বীজবপনের আগে প্রতিলিটার পানিতে ২ গ্রাম ইপ্রোডিয়ন রোভরাল বা মেনকোজেব গ্রুপের ডাইথেন এম-৪৫, ছত্রাকনাশক মিশিয়ে বীজ শোধন করতে হবে।
জনাব সাগর আহমেদ, উপজেলা : পাটগ্রাম, জেলা : লালমনিরহাট
প্রশ্ন : মরিচের পাতা সাদা হয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে, কী করণীয়?
উত্তর : থ্রিপস পেকার আক্রমণে পাতা সাদা হয়ে কুঁকড়ে যায়। পোকা ও কীড়া পাতা ও কচি ডগার রস চুষে নেয়। আক্রান্ত গাছের পাতা নৌকার মতো উপরের দিকে গুটিয়ে যায়। আক্রান্ত ফুলের বোঁটা বাদামি রঙের হয়ে ঝরে পড়ে। প্রাথমিক অবস্থায় শুকনো ছাই প্রয়োগ করতে হবে। সাবানের পানি (১০ লিটার পানিতে ২০ গ্রাম) স্প্রে করা যেতে পারে। অতিরিক্ত আক্রমণ হলে প্রতি লিটার পানিতে ০.২৫ মিলি ইমিডাক্লোরপ্রিড (টিডো) বা আইসেপ্রোকার্ব (মিপসিন/সপসিন) ২ গ্রাম মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে ১০ দিন পর পর ৩ বার।
জনাব মারুফ, উপজেলা : হরিরামপুর, জেলা : মানিকগঞ্জ
প্রশ্ন : করলার পাতা ছোট হয়ে গুচ্ছ আকারে হয়ে গেছে। করণীয় কী?
উত্তর : এটি করলার মাইকোপ্লাজমাজনিত রোগ। আক্রান্ত গাছের পাতাগুলো গুচ্ছ আকারে দেখা যায়। গাছ বাড়ে না। ফুল ও ফল কমে যায়। বাহক পোকা হিসাবে জ্যাসিড পোকা দ্বারা এ রোগ ছড়ায়। এ রোগে আক্রান্ত গাছ দেখা মাত্র তুলে নষ্ট অথবা পুড়ে ফেলতে হবে। রোগমুক্ত গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। ক্ষেতের আশে পাশের আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। বাহক পোকা ধ্বংস করার জন্য বালাইনাশক ইমিডাক্লোরপ্রিড (টিডো, এডমায়ার) ১ মিলি প্রতিলিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে ১০ দিন পরপর ৩ বার।
জনাব আবদুল মান্নান, উপজেলা : লোহাগড়া, জেলা : নড়াইল,
প্রশ্ন : মসুর গাছের পাতায় সাদা ছত্রাকের জালিকা দেখা যাচ্ছে। জমির কোন কোন অংশে গাছ কালচে বাদামি রং ধারণ করেছে। এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?
উত্তর : স্টেমফাইলাম প্রজাতির ছত্রাক দ্বারা এ রোগ সৃষ্টি হয়। দূর থেকে আক্রান্ত ফসল আগুনে ঝলসানো মনে হয়। বীজ, বিকল্প পোষক, বায়ু প্রভৃতির মাধ্যমে এ রোগ বিস্তার লাভ করে। আক্রান্ত জমিতে ইপ্রোডিয়ন গ্রুপের রোভরাল-৫০ ডব্লিউ নামক ছত্রাকনাশক (০.২%) ১০ দিন অন্তর অন্তর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে। এছাড়া ফসলের পরিত্যক্ত অংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
জনাব মামুন, উপজেলা : মুক্তাগাছা, জেলা : ময়মনসিংহ
প্রশ্ন : কুল গাছে বিছাপোকা আক্রমণ করেছে। এখন কী করণীয়?
উত্তর : বিছা পোকা কুল গাছের একটি মারাত্মক পোকা। এ পোকার আক্রমণ বেশি হলে সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের রিপকর্ড ১ মিলি. প্রতি লিটার পানিতে অথবা ইবামেকটিন বেনজয়েট গ্রুপের প্রোক্লেম-১ গ্রাম/লি মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে ১০ দিন পরপর ৩ বার এবং গাছের গোড়া ও ডালপালা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
জনাব জামান, উপজেলা : শিবগঞ্জ, জেলা : বগুড়া
প্রশ্ন : রসুন গাছের গোড়া পচে যাচ্ছে। সমাধানের উপায় কী?
উত্তর : ঝপষবৎড়ঃরঁস ৎড়ষভংরর নামক ছত্রাকের আক্রমণে রসুন গাছের গোড়া পচে যায়। এ রোগের আক্রমণে কন্দের গোড়ায় ক্ষত সৃষ্টি হয় এবং পরে পচে যায়। এ রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানিতে কপার অক্সি ক্লোরাইড গ্রুপের ৪ গ্রাম সুলকক্স বা কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ২ গ্রাম ব্যভিস্টিন মিশিয়ে চারার গোড়ায় স্প্রে করতে হবে। এছাড়া আক্রান্ত চারা সংগ্রহ করে নষ্ট করতে হবে। আক্রান্ত জমিতে প্রতি বছর রসুন বা পেঁয়াজ চাষ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
জনাব মো: মামুন, উপজেলা : ঠাকুরগাঁও সদর, জেলা : ঠাকুরগাঁও
প্রশ্ন : ফুলকপির ফুল পচে কালো কালো হয়ে যাচ্ছে। কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর : এটি ফুলকপির কার্ড পচা রোগ। এটি দুই প্রজাতির ছত্রাক ফিউজারিয়াম ইকোইজিটি ও অলটারনারিয়া প্রজাতি এবং আরউইনিয়া কেরোটোভোরা নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। ছত্রাক দ্বারা আক্রমণের ফলে ফুলকপির কার্ডে প্রথমে বাদামি রঙের গোলাকার দাগ পড়ে। পরবর্তীতে দাগগুলো একত্র হয়ে বড় দাগের সৃষ্টি করে এবং কার্ড পচে যায়। আর ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত কার্ড খুব দ্রুত পচে যায়। বীজ বপনের আগে কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক এমকোজিম/অটোস্টিন/ নোইন ২-৩ গ্রাম/ কেজি হারে বীজ শোধন করে রোপণ করতে হবে। ইপ্রোডিয়ন গ্রুপের ছত্রাকনাশক (কিউরেট ৫০ ডব্লিউ পি/ ইভারাল ৫০ ডব্লিউপি) অথবা কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক (অটোস্টিন/নোইন ২) গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ২-৩ বার গাছে স্প্রে করতে হবে। এ ছাড়া ব্যাকটেরিয়াজনিত কারণে হলে বিসমার্থিওজল গ্রুপের ব্যাকটেরিয়ানাশক ব্যাকট্রল/থায়াজল/ব্যাকট্রোবান প্রতি লিটার পানিতে ৩-৪ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ৩ বার স্প্রে করতে হবে।
লেখক : তথ্য অফিসার (পিপি), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫। মোবাইল : ০১৯১৬৫৬৬২৬২; ই-মেইল :aklimadae@gmail.com