কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫ এ ০৭:৩৫ PM

পাটশাক ও সবজি মেস্তা : পুষ্টিকর ও ঔষধি গুণে ভরপুর সহজলভ্য খাদ্য

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: কার্ত্তিক সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৫-১০-২০২৫

পাটশাক ও সবজি মেস্তা : পুষ্টিকর ও ঔষধি গুণে ভরপুর সহজলভ্য খাদ্য
ড. এ. টি. এম. মোরশেদ আলম
বাংলাদেশ বিশে^র অন্যতম জনবহুল রাষ্ট্র। দেশের এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ করতে হলে খাদ্য পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করাও একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অত্যাবশ্যকীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য। মানুষের শরীরকে সুস্থ, সবল, পরিপুষ্ট ও কর্মক্ষম রাখার জন্য প্রয়োজন খাদ্য পুষ্টি। আমরা দৈনন্দিন যেসব খাদ্য গ্রহণ করি সেগুলোই পুষ্টির মূল উৎস। যেসব খাদ্য গ্রহণ করলে দেহে তাপ ও শক্তি উৎপন্ন হয়, দেহের বৃদ্ধি সাধন ও ক্ষয়পূরণ হয় এবং দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় সেগুলোকে আমরা সুষম খাদ্য বলে থাকি। কাজেই আমাদের পুষ্টি চাহিদার বিবেচনায় প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় অবশ্যই সঠিক পরিমাণে ১) শক্তিদায়ক ২) শরীর বৃদ্ধিকারক ও ক্ষয়পূরক এবং ৩) রোগ প্রতিরোধকারক খাদ্যদ্রব্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। রোগ প্রতিরোধক খাবার হিসেবে আমরা বিভিন্ন প্রকার শাকসবজি ও ফলমূল খেয়ে থাকি যেসব খাবার আমাদের দেহে ভিটামিন ও খনিজ লবণ সরবরাহ করে থাকে। এই ভিটামিন ও খনিজ লবণ বিভিন্ন ধরনের রোগের বিরুদ্ধে আমাদের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে এবং দেহকে রোগমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। বিজেআরআই কর্তৃক উদ্ভাবিত পাটশাক ও সবজি মেস্তা নানা প্রকার পুষ্টি ও ঔষধি গুণে ভরপুর খাদ্যের দুইটি সহজলভ্য টেকসই উৎস।
বিজেআরআই কর্তৃক উদ্ভাবিত পুষ্টিসমৃদ্ধ পাটশাক : পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের দৈনিক কমপক্ষে ৩০০ গ্রাম শাকসবজি খাওয়া প্রয়োজন। কারণ শাকসবজিতে মানব দেহের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ভিটামিন, খনিজ লবণ ও আঁশ রয়েছে। এসব শাকসবজি কেবল শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় না, বরং ভক্ষণকৃত খাদ্যকে হজম, পরিপাক ও বিপাকে সহায়তা করে এবং খাবারে রুচি বৃদ্ধি ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শাকসবজির এসব গুণাগুণ বিবেচনা করে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) শাক হিসেবে ব্যবহারের জন্য পাটের তিনটি জাত উদ্ভাবন করেছে। জাতগুলো বিজেআরআই দেশি পাটশাক ১, বিজেআরআই দেশি পাটশাক ২ ও বিজেআরআই দেশি পাটশাক ৩। পাটশাক সাধারণত ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর মাসের শেষ (ফাল্গুন মাস থেকে মধ্য কার্তিক) পর্যন্ত বপন করা যায়। তবে মার্চ থেকে জুলাই এর শেষ (মধ্য ফাল্গুন থেকে মধ্য শ্রাবণ) পর্যন্ত সময়ে বপন করলে অধিক ফলন পাওয়া যায়। বিজেআরআই দেশি পাটশাক ১, ২ ও ৩-এর পাতার গড় ফলন প্রতি হেক্টরে প্রায় ৩.০০-৩.৫০ টন।
বিজেআরআই কর্তৃক উদ্ভাবিত পাটশাকের ঔষধি গুণাগুণ
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা এবং মধ্য-পূর্ব এশিয়াতে পাট পাতা ঔষধি হিসেবেও দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পাটশাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, ক্যারোটিন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম ও আঁশ থাকায় এবং পাটশাকের পাতায় ফাইটল ও মনোগ্যালাকটোসিল ডাইঅ্যাসাইল গ্লিসারল বিদ্যমান বিধায় পাটশাক ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়তা করে। পাট পাতার রস অম্লনাশক, বাত নিরোধক, ক্ষুধা বৃদ্ধিকারক, আমাশয়, উদারাময় ও অম্লরোগের মহৌষধ। তা ছাড়া ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও আলসার প্রতিরোধ, লিভারের ক্ষয়রোগ, রক্তচাপ এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করার মতো অনেক গুণাবলি রয়েছে পাট পাতায়। সুতরাং, দেখা যাচ্ছে পাটশাক বহু পুষ্টিগুণ ও বিভিন্ন ঔষধিগুণে ভরপুর।
বিজেআরআই মেস্তা ২ বা সবজি মেস্তা-১ : বিজেআরআই মেস্তা ২ বা সবজি মেস্তা-১ স্থানীয়ভাবে চুকুর নামে পরিচিত। সবজি মেস্তার-১ এর কা- তামাটে বর্ণের এবং শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট। পাতা আঙুল আকৃতির (খ-িত), হালকা সবুজ, মসৃণ এবং স্বাদে টক। বৈশাখের প্রথম থেকে শ্রাবণের শেষ সময় (১৫ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন) পর্যন্ত সবজি মেস্তার বীজ বপন করা যায়। বীজ বপনের ৬০ দিন পর থেকে পাতা এবং ফল আসার পর থেকে বৃতি সংগ্রহ করা যায়। বৃতির ফলন ২.০০-২.৫০ টন/হেক্টর বা ৭.৫০-৯.০০ মন/বিঘা। পাতার ফলন ৬.০০-৭.০০ টন/হেক্টর বা ২২.০০-২৬.০০ মন/বিঘা।
বিজেআরআই কর্তৃক উদ্ভাবিত সবজি মেস্তার ঔষধি গুণাগুণ
খরাসহনশীল ও নেমাটোড প্রতিরোধী মেস্তার এ জাতটি উঁচু, মাঝারি উঁচু জমিতে এবং বাড়ির আঙ্গিনায় চাষ করা যায়। ফল থেকে বৃতি  সংগ্রহ করে খাওয়া যায় এবং এর বীজ থেকে ২০% ভোজ্যতেল পাওয়া যায়। সবজি মেস্তার পাতা ও ফলের মাংসল বৃতি (শাঁস) টক এবং সুস্বাদু। তাই রান্না করে তরকারি হিসেবে খাওয়া যায়। তাছাড়া এর মাংসল বৃতি থেকে কনফেকশনারি খাদ্যসামগ্রী যেমন- জ্যাম, জেলি, জুস, আচার, চা সদৃশ পানীয় ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। মেস্তার ক্যালিক্স বা বৃতি দিয়ে তৈরি চা সদৃশ পানীয় নিয়মিত পান করলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে। এ ছাড়াও এ পানীয় হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় ও শরীরের ওজন কমাতে সাহায্য করে। প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ এ পানীয় মেয়েদের মাসিক পিরিয়ডের ব্যথা প্রশমন করে। গবেষণায় দেখা গেছে মেস্তার ক্যালিক্স দিয়ে তৈরি এ পানীয় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ যা ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে সক্ষম।
পাটশাক ও সবজি মেস্তা বহু পুষ্টিগুণ ও বিভিন্ন ঔষধিগুণে ভরপুর, যা সহজে চাষাবাদ করা যায়। এমতাবস্থায় পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ ও শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় পাটের শাক ও সবজি মেস্তা বা চুকুর অত্যাবশ্যকীয় করা একান্ত প্রয়োজন।

লেখক : মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট , মানিক মিয়া এভিনিউ, ঢাকা-১২০৭, মোবাইল : ০১৭৪০-৫৫৯১৫৫, 

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন