কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৩ এ ০৯:২৮ PM

পরিবেশ সুরক্ষায় তালগাছ

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: ভাদ্র সাল: ১৪৩০ প্রকাশের তারিখ: ১৭-০৮-২০২৩

পরিবেশ সুরক্ষায়
তালগাছ
মৃত্যুঞ্জয় রায়
তালগাছ পরিবেশ সংকটে প্রকৃতির এক অনন্য উপহার। জলবায়ু পরিবর্তনে একদিকে যেমন খরায় পুড়ছে মাটি, সংকটে পড়েছে মাটির নিচে থাকা পানিস্তর, বাড়ছে শৈত্যপ্রবাহ, বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো বজ্রপাতের দুর্যোগ। সব দুর্যোগ মোকাবেলা করে ঠায় এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার সেই তালগাছ। পাখিরা তা জানে, অথচ মানুষ জানে না। বাবুই বাসা বাঁধে তালগাছে, বাদুড় ঝোলে তালগাছে, শকুন ও ঈগল আশ্রয় নেয় তালগাছে। সারাদিন মাঠে চড়ে বেড়ানো ময়ূরও রাতে ঘুমায় তালগাছের মাথায়। টিয়াপাখি ডিম পাড়ে তালগাছের উপরে। এজন্য কোনো কোনো দেশে তালগাছকে মনে করা হয় শক্তির প্রতীক হিসেবে। ধারণা করা হয় তালগাছ বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন একটি সপুষ্পক উদ্ভিদ যার কাছ থেকে আমরা পাই কাঁচা ও পাকা ফল, কাঠ, পাতা, রস, মোম ইত্যাদি।  
শতবর্ষী তাল
‘এক পুরুষে রোপে তাল/ অন্য পুরুষি করে পাল। তারপর যে সে খাবে/ তিন পুরুষে ফল পাবে।’ খনার এ বচনটি মোটেই মিথ্যে নয়। একটা তালগাছ বাঁচে একশো বছরেরও বেশি আর লম্বা হয় প্রায় একশো ফুট। লাগানোর পর সে গাছে তাল ধরতে সময় লাগে প্রায় বিশ বছর। অনেকে এজন্য তালগাছ লাগিয়ে তার ফল খেয়ে যেতে পারে না। একটা তালগাছে পঁচিশ থেকে চল্লিশটা পাতা থাকে। এতো বড় পাতা খুব কম গাছের থাকে। একটা গাছে বছরে ছয় থেকে বারোটা কাঁদিতে তিনশোটা পর্যন্ত তাল ধরে। পুরুষ গাছে ফল ধরে না, পুরুষ ফুলের জটা হয়। জটা কেটে রস নামানো হয়। মেয়ে গাছে ফল ধরে। নভেম্বর-ডিসেম্বরে তালগাছে ফুল ফোটে ও রস হয়। দেড় থেকে দু মাস ধরে পুরুষ পুষ্পমঞ্জরিতে ফুল ফুটতে থাকে। মার্চ-এপ্রিলে তালের রস নামে। এপ্রিল-মে মাসে কচি তালের শাঁস হয় ও আগস্ট-সেপ্টেম্বরে তাল পাকে। অক্টোবর-নভেম্বরে তালের আটি থেকে গ্যাঁজ হয় ও ভেতরে ফোঁপা হয়।
তালগাছকে বলা হয় কল্পবৃক্ষ অর্থাৎ এ গাছের কাছে বেঁচে থাকার জন্য যা চাওয়া হয় তাই পাওয়া যায়। এ গাছ থেকে পাওয়া যায় রস, গুড়, চিনি, তালমিশ্রি, তালশাঁস, তাল ফল, তাল ফোঁপা, নারিকেলের মতো বীজের শাঁস থেকে তেল ইতাদি খাদ্য। এমনকি তালের আটি থেকে সদ্য গজানো অংকুর বা গ্যাঁজ সিদ্ধ করে খাওয়া যায় যা পুষ্টিকর। পাকা ফলের আঁশ পাওয়া যায় রেয়নের মতো সুতা যা দিয়ে তৈরি করা যায় বস্ত্র, বাসস্থান নির্মাণের জন্য তালকাঠের চেয়ে শক্ত কাঠ আর কি আছে! তালগাছের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। যে যুগে কাগজ আবিষ্কার হয়নি, সে যুগে তালপাতা ব্যবহৃত হতো লেখার জন্য। এখনো অনেক জাদুঘরে তালপাতার পুঁথি দেখা যায়। অর্থাৎ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা- মানুষের এই পাঁচটি মৌলিক চাহিদার সবই পূরণ করতে পারে তালগাছ। তালগাছের বিভিন্ন অংশ থেকে তৈরি কারুপণ্য যেমন হাতপাখা, টুপি, ব্যাগ, বর্ষাতি, মাথাল, ঝুড়ি উপার্জনের উৎস। তালের রস আফ্রিকায় মদ ও বিয়ার তৈরির অন্যতম উপকরণ। একটি গাছ থেকে বছরে প্রায় দেড়শো লিটার রস পাওয়া যায়।
বজ্রযোগী তাল
তালগাছ যেন এক বজ্রযোগী, মানুষ ও প্রাণীকে বজ্রপাত থেকে রক্ষা করে চলেছে সেই অনাদিকাল থেকে। যেসব এলাকায় লম্বা লম্বা তালগাছ বেশি, সেখানে বজ্রপাতে মৃত্যু হার কম। সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অন্যান্য দুর্যোগের সাথে বজ্রপাতও এক দুর্যোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফাঁকা মাঠে কাজ করতে থাকা অনেক কৃষক বজ্রপাতে প্রাণ হারাচ্ছেন। যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত এক সংবাদে জানা যায়, বিগত এক দশকে (২০১০-২০১৯) বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছে ২৫৭১ জন, এর প্রায় ৮০ শতাংশ গ্রামের মানুষ ও ৮৪ শতাংশ পুরুষ। চলন বিল ও হাওরে তাই অনেকেই আর কৃষি কাজ করতে যেতে চাইছেন না। ২০১৬ সালে দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সরকার সে বছর ১৭ মে বাংলাদেশের জাতীয় দুর্যোগের তালিকায় বজ্রপাতকে অন্তর্ভুক্ত করে। সরকার বজ্র নিরোধক হিসেবে তালগাছ লাগানোর ওপর জোর দিয়েছে। বিশেষ করে বিল বা খোলা স্থানের মধ্য দিয়ে যেসব রাস্তা গিয়েছে তার দুইপাশে এবং জমির আইলে তালগাছ লাগানোর পরিকল্পনা নেয়া দরকার।
খনার বচনে ‘কুয়ো হয় আমের ভয়/তাল তেঁতুলের কিবা ভয়!’ অর্থাৎ কুয়াশায় আমের মুকুল নষ্ট হয় কিন্তু তাল ও তেঁতুলের কিছুই হয় না। এটাও তালের প্রতি প্রকৃতির আশীর্Ÿাদ। সে কারণেই হয়তো আজও তাল টিকে আছে বরেন্দ্রভূমির মতো খরাপীড়িত মাটিতেও ও শৈত্যপ্রবাহের দেশে।
এ দেশেও স্বাধীনতার আগে যে পরিমাণ তালগাছ ছিল এখন তা নেই। এখন তালগাছ লাগানোর যেমন লোক নেই, তেমনি তালগাছে উঠে রস নামানো ও তাল পাড়ার লোকও খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। দেশে তালগাছ কমে যাচ্ছে। সেজন্য আমরা শাস্তিও কম পাচ্ছি না। দেশে দেশে বজ্রপাতে মৃত্যু বেড়ে গেছে। এজন্য সরকারিভাবে দেশে তালগাছ রোপণের ওপর জোর দেয়া হয়েছে, আমাদেরকে সে উদ্যোগকে বেগবান করতে হবে।

লেখক : অতিরিক্ত পরিচালক (অব.), ডিএই, খামারবাড়ি, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭১৮২০৯১০৭, ই-মেইল : kbdmrity@gmail.com

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন