কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৫ এ ০৬:৩৭ PM

পরিবেশ সুরক্ষায় তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণে বিকল্প ফসল উৎপাদন

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: বৈশাখ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৩-০৪-২০২৫

পরিবেশ সুরক্ষায় তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণে 
বিকল্প ফসল উৎপাদন
মোঃ আলাউদ্দিন আহমেদ১ ড. মোঃ আব্দুল মালেক২
তামাক সেবন যেমনি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তেমনি পরিবেশ তথা মাটি, পানি ও বায়ুদূষণে তামাক চাষ ও তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রত্যক্ষ ও প্ররোক্ষ ভূমিকা পালন করে থাকে। একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে, তামাক চাষ অন্যান্য খাদ্যশস্য চাষের চেয়ে লাভজনক। মাঠ পর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা এবং     কৃষকদের তথ্য অনুযায়ী দেখা যায় তামাকের চেয়ে বিকল্প ফসল চাষে ২-৩ গুণ লাভ বেশি হয়।  তা ছাড়া, তামাকের ক্ষতিকর প্রভাবতো রয়েছেই। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে তামাক চাষিদের তামাকের বিকল্প নিরাপদ ফসল চাষে উৎসাহিত করছে। প্রতি হেক্টর জমিতে তামাক চাষের জন্য ৭৫০ কেজিরও বেশি রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হয়। ভুট্টার তুলনায় তামাক মাটি থেকে প্রায় ২.৫ গুন বেশি নাইট্রোজেন, ৭ গুণ বেশি ফসফরাস ও ৮ গুণ বেশি পটাশিয়াম শোষণ করে থাকে। তামাক চাষ মাটির পুষ্টি গুণাগুণ নষ্ট করে এবং মাটিতে ক্ষতিকর ধাতব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি করে, ফলে মাটির উর্বরতা কমে যায়। প্রতি হেক্টর জমির তামাক পাতা শুকানোর জন্য ১৫ টন কাঠ প্রয়োজন হয়। বিশ্বের শীর্ষ তামাক উৎপাদনকারী দেশগুলোর অন্তত ৩০ শতাংশ বন উজাড়ের জন্য দায়ী তামাক। উৎপাদন থেকে সেবন পর্যন্ত একটি তামাক শলাকা পরিবেশে ১৪ গ্রাম কার্বন ডাই- অক্সাইড নির্গত করে। বিশ্বে প্রতি বছর মোট ৬ ট্রিলিয়ন সিগারেট শলাকা উৎপাদন হয় যার জন্য পানি প্রয়োজন হয় ২২ বিলিয়ন টন। প্রতি বছর মোট ৪.৫ ট্রিলিয়ন টন ব্যবহৃত সিগারেট ফিল্টার আর্বজনা হিসেবে ফেলে দেন ব্যবহারকারীরা। বিষাক্ত এই বর্জ্যরে ওজন প্রায় ৭ লক্ষ ৬৬ হাজার ৫৭১ মেট্রিক টন। সিগারেট কার্টুন এবং মোড়ক থেকে আরো প্রায় ২ মিলিয়ন টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। সমুদ্র থেকে বিভিন্ন সময়ে উদ্ধার করা বর্জ্যরে প্রায় ২৯-৩৮ শতাংশই সিগারেটের ফিল্টার। তামাক ক্ষেতে কাজ করার সময় একজন চাষি অজ্ঞাতসারেই প্রায় ৫০টি সিগারেটের সমপরিমাণ নিকোটিন শোষণ করে থাকে। তামাক সেবনে বিভিন্ন রোগ যেমন- ফুসফুসের ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, শাসকষ্ট, চামড়ায় ক্ষত ইত্যাদির সম্ভাবনা বেড়ে যায়। বাংলাদেশের মোট জিডিপিতে তামাকের অংশীদারিত্ব প্রায় ২৩,০০০ কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ১.৩৬ শতাংশ। 
পিকেএসএফ বিগত ২০১৭-১৮ অর্থবছর হতে কৃষি ইউনিটের আওতায় ‘তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণে বিকল্প ফসল উৎপাদন ও বহুমুখী আয়ের উৎস সৃষ্টি’ শীর্ষক কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু করে। কার্যক্রমটি বর্তমানে সহযোগী সংস্থা ও কর্ম এলাকার তথ্য সারণি ১ দ্রষ্টব্য। 
সারণি-১: সংস্থার কর্মএলাকার তথ্য
নির্বাচিত তামাকচাষিদের জমির অবস্থান, উচ্চতা, উর্বরতা ও মাটির বৈশিষ্ট্য, স্থানীয় চাহিদা ও বাজার সুবিধা বিবেচনা করে উপযোগী ও লাভজনক তামাকমুক্ত শস্যবিন্যাস নির্ধারণ করা হয়। কার্যক্রমের আওতায় পরামর্শ, উপকরণ ও কারিগরি সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে বছরব্যাপী তামাক চাষিদের দ্বারা তামাকের পরিবর্তে খাদ্য ফসলভিত্তিক শস্যবিন্যাস বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তামাক চাষিদের উচ্চমূল্যের ফসল চাষে অনাবাসিক ও আবাসিক প্রশিক্ষণ প্রদান, ফলাফল প্রদর্শনী, উপকরণ (বীজ, জৈবসার, জৈব বালাইনাশক ইত্যাদি) প্রদান, উদ্বুদ্ধকরণ ভ্রমণ, মাঠ দিবস, সচেতনতামূলক সভা ইত্যাদি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ফসল চাষে উপযুক্ত ঋণ এবং উৎপাদিত ফসল বাজারজাতকরণে কার্যকর বাজার সংযোগ সৃষ্টিতে সহায়তা প্রদান করা হয়।
জুন ২০২৪ পর্যন্ত উল্লিখিত তিনটি কর্মএলাকার মোট ৩,২৫১ জন কৃষকের মাধ্যমে প্রায় ১,৯৩৬ হেক্টর জমিতে তামাক চাষের পরিবর্তে রবি মৌসুমে বিভিন্ন ফসল যেমন- টমেটো, অমৌসুমী তরমুজ, ঢেঁড়স, পেঁয়াজ, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শসা, লাউ, শিম, স্কোয়াস, কাশ্মিরি আপেলকুল ইত্যাদি চাষ করা হয়েছে। বিকল্প ফসল চাষ করে কৃষকগণ তামাকের চেয়ে প্রায় ২-৩ গুণ বেশি আয় করেছেন বলে মাঠ পর্যায়ের তথ্য হতে প্রতীয়মান হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনটি সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে চারটি কর্ম এলাকায় ১,০৫২ জন             কৃষক তামাক চাষ সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দিয়েছেন (সারণি-২)। 
সারণি-২: তামাকের পরিবর্তে বিকল্প ফসল চাষে চাষি এবং জমির তথ্য (জুন ২০২৪ পর্যন্ত)
পিকেএসএফ থেকে মিরপুর, কুষ্টিয়ার তামাক চাষি এবং বিকল্প ফসল চাষিদের আয়-ব্যয়ের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তথ্য অনুযায়ী বিগত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এক বিঘা জমিতে তামাক নির্ভর ফসল চাষে বছরে গড় মুনাফা ছিল ৩৯,৫৮৬/- টাকা এবং অন্যান্য ফসল চাষে গড় মুনাফা ৪৮,৯০৭/- টাকা। একক ফসল হিসেবেও আয়-ব্যয় তুলনায় ১৪টি ফসলের মধ্যে ১২তম অবস্থানে রয়েছে তামাক (সারণি-৩)।
সারণি-৩: এক বিঘা জমিতে তামাকের বিকল্প ফসলের আয়-ব্যয় চিত্র (জুন ২০২৪)
তামাক চায়ে কৃষকদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে প্রতিবছর তামাক মৌসুম শুরুর পূর্ব হতেই বিভিন্ন সিগারেট কোম্পানি কৃষকদের বিভিন্ন প্রণোদনা যেমন আর্থিক ঋণ, উপকরণ সরবরাহ, চারা বিতরণ ইত্যাদি করে থাকে। দেশের পরিবেশসহ মানব স্বাস্থ্যের ক্ষতিকর দিকগুলো বিবেচনায় নিয়ে এসব প্রণোদনা গ্রহণ করা থেকে নিরুৎসাহিত করতে সরকারি সংস্থাসমূহের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা প্রয়োজন।

লেখক :  ১ব্যবস্থাপক;  ২মহাব্যবস্থাপক, কৃষি ইউনিট, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ), আগারগাঁও, ঢাকা-১২০৭, মোবাইল : ০১৬২৭১৮০৪৭৭

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন