কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ এ ০৬:৩৫ PM

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রফতানিমুখী বাণিজ্যিক কৃষি : উন্নয়ন এবং চ্যালেঞ্জ

কন্টেন্ট: কৃষি কথা মাস: পৌষ সাল: ১৪৩২ প্রকাশের তারিখ: ১৪-১২-২০২৫

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রফতানিমুখী বাণিজ্যিক কৃষি : উন্নয়ন এবং চ্যালেঞ্জ
মোহাম্মদ আরিফুর রহমান
বাংলাদেশে একসময় খোরপোষ কৃষিই ছিল আমাদের কৃষির চালিকাশক্তি। বর্তমান কৃষি দানাজাতীয় ফসল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও ডাল, তেল, মসলাসহ বেশ কিছু ফসলে ঘাটতি আমাদের প্রায় ভাবিয়ে তোলে। তদুপরি কৃষি পণ্যের মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিটা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে অমৌসুমে এসব পণ্য আমদানি করে ঘাটতি পূরণ করতে হয়। পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়। বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (ডব্লিউএফপি, আগস্ট, ২০২৩) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রায় ২৪ শতাংশ (৪০ মিলিয়ন) মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। যা মানুষের শারীরিক, মানসিক, শিক্ষা এবং  জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলছে। 
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, বাংলাদেশে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৮৮.২৯ লক্ষ হেক্টর। মোট জনশক্তির ৪৫.৪ শতাংশ মানুষ কৃষিতে নিয়োজিত। জিডিপিতে শস্য খাতে অবদান ৫.৫১ শতাংশ। দানাদার ফসলের (চাল, গম, ভুট্টা) উৎপাদন প্রায় ৪৬৮ লক্ষ টন। শাকসবজির উৎপাদন ২২৫ লক্ষ মে.টন, তেল ফসল ১৬ লক্ষ মে.টন, ডাল ১০ লক্ষ মে.টন। তা ছাড়াও বাংলাদেশ প্রতি বছরই ৩.৫-৪.৫ মিলিয়ন দানাদার খাদ্যশস্য আমদানি করে থাকে। শস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে উপযোগী কৃষি আবহাওয়ার সাথে সাথে শস্য উপকরণ যেমন- সার, বীজ, বালাইনাশক, সেচের প্রয়োজনীয় জোগান নিশ্চিত করা অতীব প্রয়োজন। বাংলাদেশের চাহিদাকৃত সারের অধিকাংশই বিদেশ হতে আমদানি করতে হয়। সারের পরেই প্রয়োজনীয় উপকরণ হলো বালাইনাশক এবং সেচ। আমাদের দেশে প্রায় ৩০-৩১ হাজার টন পেস্টিসাইড বিভিন্ন দেশ হতে আমদানি করে থাকে।  এছাড়া সেচের জন্য ডিজেলের প্রয়োজন হয়। কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখার জন্য এসব উপকরণের সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন কৌশল গ্রহণ করা অতীব জরুরি।
বাংলাদেশ খোরপোষ কৃষি থেকে বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরের একটি ট্রানজিশন সময় পার করছে। বাণিজ্যিকভাবে ফল, সবজি ও মসলা চাষাবাদ হচ্ছে। বাজারব্যবস্থা আধুনিকায়নসহ মধ্যস্থতা ভোগীদের দৌরাত্ন্য কমাতে হবে। পণ্য পরিবহন পর্যায়ে নৈরাজ্য সহনীয় পর্যায় আনতে না পারলে এর প্রভাব ভোক্তার ওপর পড়াটা স্বাভাবিক। আমাদের দেশের সম্ভাবনাময় খাতে প্রায় ১০৪ রকম কৃষিজ পণ্য রফতানি হয়ে থাকে। কৃষিজ পণ্য রফতানিতে বেশ কিছু বাধা রয়েছে। উৎপাদন পর্যায় থেকে শুরু করে বাজারজাত পর্যন্ত বেশ কিছু বাধা আছে। উৎপাদন উত্তম কৃষি চর্চা প্রয়োগ, গ্রেডিং, প্যাকেজিংসহ কোয়ারেন্টাইন প্রক্রিয়া সহজীকরণে নজর দিতে হবে। 
বাংলাদেশ এলডিসি গেজেট প্রাপ্তির দ্বার প্রান্তে থাকায় কৃষি পণ্য রফতানিতে খাত ভেদে সরকার দশ শতাংশ পর্যন্ত নগদ     সহায়তা কমিয়েছে। মূলত এলডিসি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছে। উন্নত দেশের সাথে প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ নেয়া ছাড়া বিকল্প নেই। উন্নয়ন ভাবনার ব্যক্তিবর্গ বলছে রফতানি প্রতিযোগিতা বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি নগদ সহায়তা কোন সমাধান নয়।
বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ কৃষি রফতানিমুখী হিসবে অগ্রগামী। গত বছরে কৃষি পণ্য রফতানির পরিমাণ ১.১৬ বিলিয়ন ডলার ছিল। আশঙ্কার বিষয় বিষয় হলো গত ১০ বছরে ইউরোপে ফল ও সবজি রফতানি কমেছে মোট রফতানির প্রায় ১৩% (২০১৪ সালে ৫৪.৮% এবং ২০২৩ সালে ৩২%), অপর দিকে মধ্যপ্রাচ্যে রফতানি অংশ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ১৮% (২০১৪ সালে ৩০.৭% এবং ২০২৩ সালে ৪৯%)। এটি নির্দেশ করে রফতানি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক বাজার ধরে রাখার জন্য পণ্যের গুণগতমান বৃদ্ধির বিকল্প নাই।  
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের জনগণের খাদ্যাভাস এবং কৃষিজ পণ্য উৎপাদন চিত্র প্রায় কাছাকাছি। উপমহাদেশের বাঙালি জনণের খাদ্যাভাস খুব একটা পরিবর্তন করতে চায় না। প্রবাসে বসেও তারা দেশী খাবার খেতে পছন্দ করেন। প্রবাসীদের মতোই স্থানীয় বিদেশিরাও উপমহাদেশের খাদ্যের প্রতি বিশেষ করে আম, লেবুসহ বেশ কিছু প্রচলিত/অপ্রচলিত সবজি ও ফলের প্রতি আগ্রহী হচ্ছে না। বাংলাদেশ থেকে শতাধিক ফল ও সবজি  বিশেষত আম, জারালেবু, সাতকড়া, জাম্বুরা, পান, জলপাই, কাঁঠাল, কচু, আমলকী, ডেউয়া, লুকলুকি, শালুক, শুকনো বরইসহ অনেক অপ্রচলিত এবং  প্রচলিত ১০৭ ধরনের কৃষজ পণ্য রফতানিকারকরা সারা দেশ ঘুরে ঘুরে এসব পণ্য সংগ্রহ করেন। অনেক রফতানিকারকের কিছু চুক্তিবদ্ধ কৃষক রয়েছে। যারা নরসিংদী, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ থেকে পণ্য সরবরাহ করেন। বর্তমানে কৃষি শ্রমিকের অপর্যাপ্ততা, কৃষি উৎপাদন উপকরণের ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন খরচসহ মধ্যস্থতা ভোগীদের অতিরিক্ত চাহিদার কারণে মানসম্মত কৃষি পণ্যের দর বৃদ্ধির বিষয়টা অস্বীকার করার সুযোগ নাই। সরকারি দপ্তরসমূহ প্রতিনিয়ত এই ব্যয় হ্রাসের চেষ্টা অব্যাহত রাখা সত্ত্বেও পণ্যের নিরাপত্তা, বাছাইকরণ, প্যাকেজিংসহ গুণগতমান বজায় রাখার কারণে এসব পণ্যের দাম অন্যান্য পণ্যের চেয়ে স্বভাবতই বেশি হয়। তদুপরি রফতানির ক্ষেত্রে পণ্য পরিবহন ব্যয়, উন্নত প্যাকেজিং এবং গুণগতমান বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমান ব্যয় প্রতিবেশি অন্যদেশের তুলনায় কিছুটা বেশি। সব কৃষকদের উৎপাদন পর্যায়ে উপকরণ সহায়তাসহ অর্থাৎ বিশেষ মূল্যে উৎপাদন উপকরণ সরবরাহ করা গেলে মানসম্মত পণ্য প্রতিযোগিতা মূল্যে উৎপাদনে সক্ষম হতে পারত। এ ক্ষেত্রে বিদেশি ক্রয়কারীগণও এগিয়ে আসতে পারে। বিশেষ করে নিরাপদ পণ্য উৎপাদনের স্বার্থে জৈব বালাইনাশক, ফ্রুট ব্যাগিং, মালচিং শীট এবং আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি উপকরণ সহায়তা হিসেবে কৃষকদের সরবরাহ করা গেলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমে আসবে।
জলবায়ু পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, লবণাক্ততা, সেচের অভাব ইত্যাদি নানা প্রতিকূলতার পরও বাংলাদেশের কৃষকরা ফসল উৎপাদনে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছে গুণগত মানের পণ্য উৎপাদনের দিকে। পাশাপাশি বাংলাদেশে গবেষণা মাঠের উৎপাদন এবং কৃষকের মাঠের উৎপাদনের পার্থক্যটা কমিয়ে আনা প্রয়োজন। গবেষকদের খুঁজে বের করতে হবে উন্নত বিশ্বের সাথে তালমিলিয়ে স্বল্প জায়গায় অধিক উৎপাদন করে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করা। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে তালমিলিয়ে কৃষি পণ্য রফতানি বাণিজ্যের সাফল্যের ধারাবাহিকতা রক্ষার একমাত্র অবলম্বন হলো মানসম্মত পণ্য উৎপাদন, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, পণ্য সংগ্রহোত্তর উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার সেইসাথে নতুন বাজার অনুসন্ধান অব্যাহত রাখা গেলে রফতানির উলম্ব ধারাটা বজার রাখা সম্ভব হবে। 
বাণিজ্যিক কৃষিতে নজর দিতে হবে। কৃষির উৎপাদন ব্যবস্থার নজরদারির পাশাপাশি বাজারকাঠামো, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট, ভ্যালু এডেশন এবং প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থার  আধুনিকায়নে গুরুত্বারোপ করা দরকার। কৃষি উৎপাদনের সাথে কৃষি ব্যবসা শব্দটি প্রয়োগের সময় এসেছে। শিক্ষিত তরুণদের জোনিংভিত্তিক কৃষি ব্যবসায় সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। ফসল সাব সেক্টরের পাশাপাশি মৎস্য এবং প্রাণিজ সম্পদ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় শিক্ষিত তরুণদের আধুনিক চিন্তাকে সম্পৃক্ত করা গেলে কৃষি ব্যবসায় বিপ্লব ঘটা সময়ের ব্যাপার।  
বাংলাদেশের আবহাওয়া, ভৌগোলিক অবস্থান, কৃষ্টি এবং আর্থসামাজিক অবস্থা কৃষি উন্নয়নে সহায়ক বিধায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের সোপান হিসেবে কৃষি ভাবনাই                প্রাধান্য পাওয়া সমীচীন। 

তথ্য সুত্র : বাংলাদেশ ফুড এ্যান্ড ভেজিটেবল ও এলাইক প্রোডাক্ট এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশন।

লেখক : প্রকল্প পরিচালক, রফতানিযোগ্য আম উৎপাদন (১ম সংশোধিত) প্রকল্প, ডিএই, মোবাইল : ০১৮১৯৪৫৭৫৭৪, ই-মেইল :tamrahaman46@gmail.com

ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন